অদ্বৈত মারুতের লেখালেখি ॥ বাবুল আনোয়ার


অদ্বৈত মারুত এ সময়ের একজন নিবিড় কবি, লেখক। সাহিত্যের নানা শাখায় তার লেখালেখি। নিরন্তরভাবে তিনি লিখছেন। তার লেখালেখির বয়স দেড় যুগতো হবেই। লিখছেন কবিতা, গল্প, ছড়া। তার লেখালেখি, মনযোগ, সৃষ্টিশীলতা নিয়ে কিছু বলার তাগিদ অনুভব করি। কারণ তিনি এক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দময়, স্বপ্রতিভ।

‘নিস্তরঙ্গের বীতস্বরে’ তার প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্হ। প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। দ্বিতীয় কবিতা গ্রন্হ ‘স্বর ভাঙার গান’ প্রকাশিত ২০১৫ সালে। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত গ্রন্হের সংখ্যা ১৩। শিশুতোষ ছড়া, কবিতা, গল্প গ্রন্হের মধ্যে রয়েছে, ভাল্লাগে না (২০১১), ‘হাজার তারার আলো’(২০১৪), ভূত খেলে কুতকুত, রুকু টুকুর গাছবন্ধু, লাল পিঁপড়ার সেলফি মেয়ে, মেঘের মেয়ে বৃষ্টি, ভূতু কুতু আর আমি ইত্যাদি।

মারুতের লেখালেখির ব্যাপারে প্রথমে কবিতা নিয়ে বলা যেতে পারে। জন্মসূত্রে গ্রামীন পরিবেশে বেড়ে ওঠেছেন তিনি। দেখেছেন প্রকৃতির বিষয় বৈচিত্র। সাধারণ মানুষের নিত্য দিনকাল। এ আবহ তার জীবন ঘিরে সব সময়। মননে মিশে আছে মাতৃভূমির রূপ-লাবণ্য, বর্ষার অবিরল বৃষ্টির ধারা, ফসলের মাঠে দোল খাওয়া বাতাসের হিল্লোল। তেমনি আছে চৈত্র-খরার তাপদাহ, জীবনের হাহাকার, রোদন। স্বাভাবিকভাবেই তার প্রভাব, প্রতিফলন তার সাহিত্য কর্মে সহজে প্রতিভাত হয়। কবিতায় তা লক্ষ করা যায় :
‘ফিরেছ তো সঙ্গে নিয়ে আকাশ ভর্তি মেঘ ;
নিমেষ চোখে করেছ
বালিবাঁধ ভেঙ্গে জলের বন্দনা;
হয়েছ বিনাশীও…
অনাবাদে ধানীজমি তাই হয়েছে উজার
তোমারই আগুন দাঁতে।
(দ্বিধাগ্রস্ত, নিস্তরঙ্গের বীতস্বরে)
দুঃখ- কষ্ট, শোক, স্বপ্নময়তা নিয়ে জীবন। তার অনেক কিছুই আমরা অবগত নাই। যে কষ্টগুলো চিহ্নিত ও দৃশ্যমান তাও চোখে পড়ে না অনেকের। আসে, যায়, নীরবে হারায়। অদ্বৈত মারুত উপলদ্ধি করেন কবি হৃদয়ের স্বরূপে। রূপায়িত হয় শব্দের বুননে :
‘ভয়, সতত সংশয় মনে
প্রতিদিন শোকের স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে যারা
ফিরে আসে ঘরে/
প্রতিদিন ভোগহীন দেহ যাদের পীড়িত
করে অনাহুত /
ওরা আমাদের স্বজন-মা বোন,
নিকটাত্মীয় কেউ কেউ

প্রজাপতি, ফুল আর বিষণ্নতা আজ
তাদের সঙ্গী যেন
(মার্চ ২০০৯- তিন, নিস্তরঙ্গের বীতস্বরে)

অদ্বৈত মারুত কবিতায় লোকজ শব্দাবলীর সংযোজন ও বিন্যাসে তৎপর। শৈল্পিক পরিচর্যায় তিনি আন্তরিক। তার সঙ্গে যোগ হয় আধুনিক বোধ ও মনস্কতা। কবিতায় বিশেষ করে চিত্রকল্প সৃষ্টিতে এ কবির দক্ষতা লক্ষ করার মতো। সব কিছু দেখেন তিনি। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও গভীর মননশীলতায়। কখনো বা তার কবিতায় বিরূপ অভিজ্ঞতা, বেদনা নীল হাহাকার ছায়া ফেলে। বহমান বৈরিতার বিরুদ্ধে জেগে ওঠেন কোমল স্বরে। অনুভব ও অন্তলান্তিক জাগরণে তার সৃষ্টির ফল্গুধারা প্রবাহিত হয়। কবিতায় তার প্রকাশ ঘটে শৈল্পিক স্পর্ধায় :
‘আঁধারের বনে জমে উঠেছে ঘোর
ইরৌসের ছুঁড়ে দেওয়া তীরে
যেদিকে তাকাই, শুধুই কাম কাম গন্ধ
ভরে উঠেছে আজ পাতাবন ঘিরে।
তবে গুলি ছোঁড়ার আগে বন্দুক দেখে
নেওয়া ভালো।
(পরামর্শ, স্বর ভাঙার গান)

এভাবেই মারুত কবিতার মগ্নতায় ডুবে থাকেন। শব্দের দ্যোতনায় রাত জাগেন। নানাভাবে নানা অনুষঙ্গের ব্যাপ্তি নিয়ে। মগ্নতার গভীরে, চেতনার ঋদ্ধ আলোয়। তার কবিতা এক আশ্চর্য অনুভূতির আলোড়ন। মৃত্তিকা মগ্নতার সাথে আধুনিক জীবনবোধের সম্মিলন। বাহুল্য বর্জিত শব্দ, সাবলীল গতি ও নিজস্ব বলার ভঙ্গি অদ্বৈত মারুতের কবিতাকে প্রাণময় করে তোলে। যাপিত জীবন, পরিচিত পরিবেশ থেকে আহরণ করেন তিনি কবিতার বিষয়। কখনো শিল্পের পরিভাষায় তা স্বাচ্ছন্দে ফুটে ওঠে। অতলান্তিক অন্তরঙ্গতায় পাঠককে কাছে টানে। সহজেই রঙ ছড়ায় আনন্দ, অনুভব ও বিষাদময়তায়। প্রকাশিত কাব্য দুটিতে তিনি জীবনবোধে বেশ গভীর, প্রসারিত। কাছে থেকে দেখা, দূর থেকে কাছে আসা এ রকম বিষ্ময়, বিহ্বলতা মারুতের কবিতা জুড়ে সর্বত্র।

শিশু সাহিত্য তার লেখার আরেক দিগন্ত। এ পর্যন্ত প্রকাশিত তার শিশুতোষ গল্প, ছড়ার বইয়ে উজ্জ্বলতায় ছাপ সুস্পষ্ট। শিশু মনের কথা, আনন্দ, আকুলতা সহজে ধারণ করেন তিনি। এটি তার লেখক হিসাবে অনন্য অর্জন। এক্ষেত্রে তার সৃজনশীলতা সফলতার সীমানাকে স্পর্শ করবে বলে সহজে অনুমিত হয়।
জন্ম সিরাজগঞ্জ জেলার দত্তবাড়ি গ্রামে। ১০ ডিসেম্বর ১৯৮০। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃত সাহিত্যে মাস্টার্স। শৈশব থেকে শুরু তার লেখালেখি। পেশা সাংবাদিকতা। শিশু সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ইতোমধ্যে পেয়েছেন ‘দেশ পান্ডুলিপি পুরস্কার’ (২০১৫) ও ‘লাটাই ছড়া সাহিত্য পুরস্কার’ (২০১৭)। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে তিনি ছড়া বিষয়ক ছোট কাগজ ‘পাঁপড়’ সম্পাদনা করে আসছেন। কবি অদ্বৈত মারুত আশা জাগানিয়া নাম। আলো- আঁধারের পথ ধরে চলা এক দুরন্ত সৃষ্টিমগ্ন প্রাণ। কবির জন্য শুভ কামনা নিরন্তর।