অণু-দান ॥ কাজী মহম্মদ আশরাফ


তমার বয়স পাঁচ বছর তিন মাস। এবার তাকে স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণীতে। তিন মাস আগে ভর্তি সম্পন্ন হয়েছে। বিগত আড়াই মাস স্কুলে গিয়েছে তমা। এখন দেড় মাস ধরে যাওয়া হয় না। স্কুল বন্ধ। সারাদেশের, এমনকি সারাবিশ্বের অনেক দেশেরই স্কুল বন্ধ। চীন থেকে সারা পৃথিবীতে ভয়ংকর করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। তমা জানে না ভাইরাস কী, দেখতে কেমন। সে ভাবে ভূতের কার্টুন ছবির মতো ভয়ানক কিছু একটা হবে। মীনা কার্টুনে সাবান দিয়ে বার বার হাত ধোয়ার ভিডিওতে দেখেছিল ভাইরাসদের সারা গায়ে কাঁটা থাকে। মুখটা দেখতে রোবটের মতো। দ্রুত চলাচল করতে পারে। সাবান-পানি দিলে ওরা সহজেই কাবু হয়ে যেতে পারে। এ জন্যই সবাইকে বলা হচ্ছে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার কথা।

দেড় মাস পরে আজ তমা স্কুলে যাচ্ছে। সে তার ফুপু মণির সাথেই স্কুলে যায়। মণি সরকারি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে বিএ অনার্সে তৃতীয় বর্ষে পড়ে। সে নিয়মিত কলেজে যায় না। যেতে হয় না। গেলেও লাভ হয় না। কারণ ক্লাস হয় না। এই সময়ে সে একটা প্রাইমারি স্কুলে পার্টটাইম শিক্ষকতা করে। চাকরিটা সে আরো দুই বছর আগেই নিয়েছিল। মাঝখানে এক বছর চাকরিটা করতে পারে নাই। তার মায়ের ব্রেনস্ট্রোক করার পরে মণিকে চাকরি ছেড়ে দিয়ে সংসারের কাজ করতে হয়েছে। রান্না করে বিছানায় পড়ে থাকা মাকে খাওয়াতে হয়েছে। এভাবে আট মাস; তারপরে মা চিরবিদায় নিয়ে চলে গেছেন।

মণি প্রতিদিন সকালে তমাকে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে পৌঁছে দিয়ে তারপর নিজের স্কুলে যায়। এখন সবার স্কুল বন্ধ। মণির পার্টটাইম জবের বেতনও বন্ধ। আজ তমাকে নিয়ে স্কুলে যেতে হচ্ছে অন্য একটা কারণে। আজ পঁচিশ রোজা। আর চার অথবা পাঁচদিন পরে ঈদ। এবার টাকা-পয়সা না থাকা এবং করোনা ভাইরাসের ভয়ে মার্কেট বন্ধ থাকায় শপিংও বন্ধ। এখন পর্যন্ত বাসার কারো জামা-কাপড় কেনা হয় নাই, বানানো হয় নাই। হওয়ার সম্ভাবনাও নাই। মণিরা ভাড়া থাকে জামতলা কাসেম হাজির বাড়ি। সেখানে একটা বড় বিল্ডিংয়ে আটটা ফ্লাট তুলে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। সেগুলো ফ্ল্যাট বলা হলেও আসলে ফ্ল্যাট না। সে ধরনের কোনো সুবিধা নাই। কমন টয়লেট সবাইকে ব্যবহার করতে হয়। একটা মাত্র গোসলখানায় সবাইকে গোসল করতে হয়। কমন রান্নাঘরে গ্যাসের চুলায় সবাইকে রান্না করতে হয়।

এখন মণিদের বাসায় সদস্য সংখ্যা ছয়জন। বাবা, মণি, ছোট বোন অনি, ভাই রিফাত, ভাবী আর তমা। বাবা আগে কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। এখন নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। মাঝে মাঝে যান, মাঝে মাঝে যান না। আগের মতো পরিশ্রম করতে পারেন না। আসলে তিনি ঘরমিস্ত্রি, ফার্নিচারমিস্ত্রি না। ফার্নিচারের কাজ পারেন না। এ কাজ অনেক সূক্ষ্ম। গভীর দক্ষতা লাগে। আর এখন তো ফার্নিচার মিস্ত্রিদের সব কাজেরই মেশিন বেরিয়ে গেছে। দরজার কপাট, আলমারি, ওয়াল শোকেস, ওয়ার্ডরোবের কপাটের ডিজাইন করে দিয়ে মেশিনেই সব কাজ করা যায়। তবে মেশিনে করলেও হাত স্থির রাখতে হয়। বাবার এখন শরীর কাঁপে স্থির হাতে ফার্নিচার ডিজাইনের কাজ করতেও পারবেন না। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ফার্নিচার মিস্ত্রির কাজ করতে গেলে মেশিন চালালে নাকের ভেতর ধূলা জমে। বুকে ব্যথা হয়। রাতে ঘর্ঘর শব্দ হয়। নাক বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় মিস্ত্রিদের কাছে এসব সমস্যার কথা শোনা যায়। বুড়া বয়সে হাঁপানি দেখা দেয়। প্রবল শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। একারণে আব্বা ফার্নিচার মিস্ত্রির কাজ করেন নাই।

আর ঘরমিস্ত্রিদের কাজও এখন কমে গেছে। চারদিকে এখন দালান উঠছে। টিন-কাঠ-বাঁশের ঘর কমে গেছে। গ্রামের দিকে কাজ খুঁজতে যেতে হয়। গ্রামের দিকে এখনো টিনের-কাঠের ঘর আছে। তবে সেখানে মজুরি কম। আরেকটা সমস্যা আছে, উত্তরাঞ্চলের এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মিস্ত্রিরা কম মজুরিতে কাজ করে দেয়, ফলে দেশি মিস্ত্রিদের এখন ভাতেমরার অবস্থা। বাইরের জেলার তরুণবয়সী মিস্ত্রিরা বেশ সাহসী। তারা অনেক কাজ করতে পারে। বেশ পরিশ্রমী বলেই ওরা অল্প মজুরিতে কাজ করে, এখানে ওরা কোনো রকমে ডাইলেরপানি খেয়ে দিন কাটিয়ে টাকা-পয়সা দেশের বাড়িতে পাঠাতে পারে। একটা ছোট রুম ভাড়া নিয়ে আট-দশজন ঘুমায়। সবাই টাকা বাঁচায়। আর তাদের দেশের সংসার তো এদেশের মতো এত ব্যয়বহুল না। ধানের সিজনে ধান ওঠে। তখন মিস্ত্রিরা দলে দলে ধান কাটতে দেশে চলে যায়। তাদের জ্বালানি লাকড়ি কিনতে হয় না। অনেকের দেশের বাড়িতে মাছ-তরিতরকারিও কিনতে হয় না। আর এদেশি একজন মিস্ত্রির সবকিছু নগদ টাকায় কিনতে হয়। এমনকি খাওয়ার পরে দাঁত খোঁচানোর কাঠিটা পর্যন্ত। কান চুলকানোর তুলাওয়ালা কাঠিও।
আর যদি সন্তানদের লেখাপড়া করাতে হয়, তাহলে তো অনেক টাকা লাগে। এত টাকা এখন আর আব্বা যোগাড় করতে পারেন না। রিফাত ভাই বিয়ের সাজকাজের কাজ করেন। বিয়ের গায়ে হলুদের জন্য নতুন বউ এবং সখীদের সাজার জন্য পুঁতির মালা, কাপড়ের ফুল, কাপড়ের জামাই-বউ এগুলো কিছু কিছু জিনিস ঢাকার চকবাজার থেকে রেডিমেড কিনে এনে গ্লু-গান দিয়ে লাগিয়ে মাপমতো কর্কশিটে বসিয়ে রঙিন কাপড় লাগাতে হয়।

এভাবে ঘরে বসে বানিয়ে দোকানে দোকানে দিয়ে আসে। মনোহারী দোকানে, ফুলের দোকানে, সাজ-কাজের দোকানে, ইদানিং কোনো কোনো কাপড়ের দোকানেও সাজকাজ রাখা হয়। করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পরে সারাদেশের বিয়ে-শাদি ইত্যাদি সামাজিক অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারি নির্দেশেই সামাজিক অনুষ্ঠান বন্ধ রাখা হচ্ছে। এমনিতেই চৈত্র মাসে বিয়েশাদি কম হয়। যারা পুরনো সংস্কার মানে না, অনুষ্ঠান করে বিয়ের আয়োজন করে, তাদের মধ্যে চৈত্র মাসেও সাজকাজ বিক্রি হতো। কিন্তু এবার চৈত্র মাস ঘরে আসার তিন দিন পর থেকেই দেশের সবকিছু বন্ধ।
বাবার কাজ নাই, ভাইয়ের কাজ নাই, মণির পার্টটাইম জব বন্ধ, তার টিউশনিগুলোও একেবারে বন্ধ। লকডাউনের ঘোষণার আগেই উচিত ছিল অভিভাবকদের, টিউটরদেরকে ডেকে প্রাপ্য টাকাগুলো দিয়ে দেওয়া। এটুকু বোধবুদ্ধি কি তাদের মাথায় নাই? প্রাইভেট টিউটরদেরওতো সংসার আছে, তাদের পেট আছে, তাদের ক্ষুধা আছে। একজনও মার্চ মাসের বেতন দেয় নাই। এরপর এপ্রিল গেল, মে গেল। কবে এই লকডাউন উঠবে, কবে স্কুল-কলেজ খুলবে কে জানে! এখন সামনে ঈদ এসে সালাম জানাচ্ছে। খরচ বাড়ছে, কিন্তু আয়ের কোনো পথ নাই।

অনিরও কলেজে যাওয়া বন্ধ। গেলে ব্যয় আরো বাড়ত। ইংরেজি আর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রাইভেট পড়ার খরচ হতো। অবশ্য কলেজ খোলা থাকলে তো সব কিছুই খোলা থাকত। কাজেই সে কথা বলে লাভ নাই।
মোট কথা গত দেড় মাস ধরে কোনো রুজি নাই। বাবার, ভাইয়ের, মণির হাতে যা কিছু ছিল, সব খাওয়া হয়ে গেছে। এমনকি এ সংসারে যারা উপার্জন করে না, ভাবী এবং অনির হাতে যে কটা টাকা ছিল, তাও শেষ। এখন সবারই মাথায় বাড়ি।
আজ মণি করোনার মধ্যেও তমাকে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে। স্কুলের কাছে যেতেই তমা দেখছে তাদের স্কুলের গেটের সামনে অনেক ঘাস জন্মে গেছে। ধূলাবালু আর ময়লা-আবর্জনায় সব যেন ঢেকে আছে। তমা মণির হাত ধরে স্কুলে যাচ্ছে। স্কুলের দিকে চেয়ে মণিকে বলছে, “ফুপি, আমাগো স্কুল এতদিনে কেমন ময়লা হয়ে গেছে।”
মণি আসলে তমার কথা বুঝতে পারে নাই। একেতো তমা অনেক ছোট, মণিও উচ্চতায় বেশি লম্ব না, বরং সে খাটো মেয়েদের কাতারেই পড়ে। তমার মুখে মাস্ক থাকায় তার মুখের কথা মণি বুঝতে পারছে না।

আজ এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাহেব ঈদের উপহার দেবেন তমাদের স্কুলের সব শিক্ষার্থীকে। এ কথা পাশের বাড়ি অন্তুর মা মণিকে ডেকে বলেছে।
স্কুলে গিয়ে দেখা গেল প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণী থেকে শুরু করে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত সব ক্লাসের সাড়ে আটশ ছাত্র-ছাত্রীর প্রায় সবাই উপস্থিত। সবার সাথে অভিভাবক। স্কুলের মাঠ, সব ভবনে লোকজন গিজগিজ করছে। অনেকের মুখেই মাস্ক নাই। আর এত লোকজন ভিড় করে আছে, দেখে মণির কাছে ভালো লাগল না। এমনও হতে পারে, অনেক অভিভাবক এমনকি অনেক শিক্ষার্থীও করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারে। চেয়ারম্যানের এই উপহার বা রিলিফের জন্য তথ্য লুকিয়ে এখানে এসে ভিড় করতে পারে। মণি ভাবছিল, যা কিছুই দিক না, কেন, এই রিলিফের জন্য এত ভিড় ঠেলে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশ অমান্য করে এসে শেষ পর্যন্ত নাকি আবার মরণব্যাধি নিয়ে বাসায় ফিরতে হয়।
স্কুলে ভিড় দেখে মণি একটু ঘাবড়ে গেল। সে এখন কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। এত লোককে এভাবে একসাথে না ডাকলেই ভালো হতো। হেডস্যার পারতেন একেক দিন একেক ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের ডেকে আনতে। অথবা দুই ক্লাস করে ডাকতে পারতেন। কিন্তু এখানে এসে মণি সবার মুখেই সমালোচনা শুনছে। এটা নাকি চেয়ারম্যানের ইচ্ছাতে হয়েছে। তিনি ত্রাণ বিতরণ করবেন, নিজের দাতাচরিত্র প্রকাশ করবেন, এটা সবাইকে না জানালে কেমন হয়! মনে হয় স্থানীয় কোনো কোনো পত্রিকার সাংবাদিকও ডেকে আনা হয়েছে। তারা ছবি তুলবে, প্রকাশ করবে। এসব কথা এখানে এসেই শুনছে মণি।

আর এগুলো জানা কথাই। শিশুশ্রেণীর ক্লাস টিচার মাঠে এসে গলা বাড়িয়ে ঘোষণা দিলেন যে, প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণীর সবাইকে নতুন চারতলা ভবনের নিচতলায় বামপাশের কক্ষে অবস্থান নিতে হবে। আর অভিভাবকরা বাইরে অবস্থান করবেন। মণি তমাকে ভালোভাবে মাস্ক পরিয়ে রুমের ভেতর এগিয়ে দিল। দেওয়ার সময় পেটের মধ্যে একটু চিন করে উঠল। এই ভিড়ের মধ্যে এতটুকু বাচ্চা মেয়ে কী করবে! যদি বিরক্ত হয়ে মাস্ক খুলে ফেলে তাহলে এখানকার অন্য শিশুদের থেকে করোনা ওকে সংক্রামিত করতে পারে। বিশেষ করে এখানকার বস্তিতে থাকা মিল-ফ্যাক্টরিতে কাজ করা পরিবারগুলোর শিশুরা সামান্য এই ত্রাণের লোভে রোগের কথা লুকিয়ে এখানে চলে আসতেই পারে। ভাইঝিকে চিরতরে হারানোর মতো একটা গভীর বেদনা অনুভব করছে মণি। কখন রিলিফ দেবে কে জানে! চেয়ারম্যান এলেই নাকি দেওয়া হবে। কখন আসে তার কি ঠিক আছে? আল্লাহ জানে এখান থেকে বাসায় ফেরার পরেই ঘরের সবাই আক্রান্ত হয়ে পড়ে কিনা।

মণি এখন বুঝতে পারছে মানুষের জীবনে টাকার প্রয়োজন কত গভীর। অবশ্য টাকাই যে সব নয়, এটাও সে এই করোনা রোগের মাধ্যমে বুঝতে পারছে। খবরে দেখছে, লোকমুখে শুনছে কত ধনীলোক এই করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। আগে যারা সামান্য একটা হাঁচি দিলেও সিঙ্গাপুর-ব্যাংকক চলে যেত, এখন লকডাউনে বিমান বন্ধ। তাই বিদেশ যেতে পারছে না। দেশেই বিনা চিকিৎসায় তারা মারা যাচ্ছে। কাজেই টাকা হলেই যে বাঁচা যাবে তা নয়।

তবে মণিদের মতো পরিবারের সামান্য মানুষদের জন্য টাকা খুবই প্রয়োজন। টাকার জন্য আজকে বাসায় দেখে এসেছে ভাইয়া আর ভাবীর মধ্যে ঝগড়া হচ্ছে। বিয়ের সময় ভাবীদের বাপের বাড়ি থেকে কী কী দেওয়ার কথা ছিল কিন্তু আজ পর্যন্ত দেয় নাই। সে সব অনাদায়ী বিষয়বস্তু নিয়ে ঝগড়া হচ্ছে। মণি কী আর বলবে! তাকে বিয়ে দেওয়ার সময় যদি ভাই আর ভাবী এমন করে! তাহলে সারাজীবন ঐ পরিবারে তাকে মাথা নত করে থাকতে হবে। সারা জীবন খোঁটা শুনতে হবে। আসলে এখন একটা সরকারি চাকরি দরকার ছিল। এখন স্কুল-কলেজ বন্ধ। সরকারি বেতনপ্রাপ্ত শিক্ষকরা ছাড়া আর কে আরামে আছে! সবাই আছে ব্যারামে। কেউ শারীরিক সমস্যায়, কেউ মানসিক সমস্যায়।

অবস্থাপন্ন একটা পরিবার থেকে যদি একটা প্রস্তাব আসত তার জন্য! তাহলে সে আর কবুল বলতে দেরি করত না। বাবা আর ভাই প্রতিদিন টাকার অভাবে যে কেমন করে! ঘরের পুরুষ মানুষের এই দুর্বলতা দেখতে ভালো লাগে না। টাকাওয়ালা একটা ছেলে কলেজে প্রায়ই যেত বন্ধুদের সাথে। মণি ছেলেটাকে পাত্তা দেয় নাই। সে অবশ্য টাকার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেও টাকাওয়ালা মানুষদের বিশ্বাস করতে পারে না। বয়স তো কম হলো না। এই বয়সে সে অনেক ঘটনা দেখেছে, শুনেছে। যে ছেলেটা মোটরসাইকেল নিয়ে তার সাথে দেখা করার জন্য সরকারি কলেজে যেত, সে ছেলেটার নাকি চারটা কারেনজালের মেশিন আছে। এই বয়সে সে চারটা কারেনজালের মেশিনের মালিক হয়ে গেছে। তাদের ফ্যাক্টরিতে অনেক শ্রমিক কাজ করে। তাদের মন নাকি সংসারী হয় না। উড়ুউড়ু ভাব থাকে। বিভিন্ন হোটেলে সুন্দরীদের সঙ্গে নাকি রাত কাটাতে যায়। এখানকার বিবাহিত, সন্তানের বাপ হয়ে গেছে এমন পুরুষরাই এমন চরিত্রের। আর অবিবাহিত, অল্পবয়সী ছেলেদের অবস্থা আর কেমন হবে! এদেশে তো ছেলেদের নানা অপরাধ এমনিতেই ক্ষমা করে দেয় মুরুব্বিরা।

টাকাওয়ালা ছেলের সাথে খাতির থাকলে এখন কিছু টাকা ধার তো অন্তত করা যেত! তবে তাদের কাছ থেকে টাকা ধার নিতেও ভয় আছে। সে টাকা তারা গায়ে-গতরে শোধ করে নিতে চাইবে। ভিডিও করে ব্ল্যাকমেইল করবে। বন্ধুদের সুযোগ দেবে। ফেসবুক-ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেবে। তাছাড়া আরেক ধরনের সমস্যাও আছে।
ঝুম্পা আপুর কথা মনে পড়ে মণির। ঝুম্পা আপু মণির এক বান্ধবীর বড় বোন; নারায়ণগঞ্জে বাড়ি। ঝুম্পা আপুদের সংসারটাই বলতে গেলে চালিয়ে যাচ্ছে টিটুভাই। টিটুভাইয়ের সাথে ঝুম্পাআপুর সম্পর্ক অনেক বছরের। এখন বিয়ে হওয়া বাকি। দুজনের পরিবারেই জানাজানি হয়ে আছে। ঝুম্পাআপুর বাবাকে কোন এক মামলা থেকে মুক্তি দেওয়ার সব ব্যবস্থা করেছে টিটুভাই। জেল থেকে খালাসও করিয়েছে। ঝুম্পাআপুর একমাত্র ভাই ফাহাদকে জাপান পাঠিয়েছে টিটুভাই। সেই টিটুভাইকে এখন অস্বীকার করছে ঝুম্পাআপু। টিটুভাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল ঝুম্পাআপু। টিটুভাই মণিকে মাঝে মাঝে ফোন করে মজার মজার কথা বলত। এতে অবশ্য ঝুম্পাআপু মাইন্ড করত না। টিটুভাইয়ের প্রতি ঝুম্পাআপুরও গভীর বিশ্বাস ও ভালোবাসা ছিল।

গত বছর আষাঢ় মাসের রথের মেলায় গিয়েছিল মণি তার এই ভাইঝি তমাকে নিয়ে। মেলার ভিড়ের মধ্যে ঢুকতেই তার মোবাইলে কল দিয়েছিল টিটুভাই। কানের চারপাশে মেলার ভিড়, আর মোবাইলের ভেতর থেকে মণির কানের ভেতর প্রবেশ করছিল টিটুভাইয়ের কান্নার শব্দ। পুরুষমানুষ এমন করে কখনো কাঁদতে পারে, তা মণির জানা ছিল না। তার মা মারা যাওয়ার সময় তার বাবাকে কাঁদতে দেখে নাই। তবে তার ভাইয়া কেঁদেছিল। মায়ের জন্য ভাইয়ার কান্নার চেয়ে প্রবল ও গভীর ছিল টিটুভাইয়ের কান্না। মণির ধারণা পুরুষ মানুষ যদি সত্যি কাউকে ভালোবাসে, তাহলে সে তার প্রতি এমনই দুর্বল হয়ে থাকে। মায়ের মৃত্যুর চেয়েও প্রেমিকার চলে যাওয়া তাদের কাছে বড় ঘটনা।

মোবাইলটা ছিনতাই হয়ে যাওয়ার ভয় ছিল। কেউ যদি তার কানের কাছ থেকে থাবা মেরে নিয়ে যেত কেউ সে চোরকে ধরতে পারত না। তবে মণির এই কমদামি সেট কে চুরি করে নেবে? কমদামি বুঝেই হয়তো সেদিন রক্ষা পেয়েছে। মোবাইলে টিটুভাই বারবার বলছিল, “আপনার ঝুম্পাআপু এখন আমাকে না চেনার ভান করছে কেন? একটু জিজ্ঞাসা করেন তো?”
মণি বুঝে উঠতে পারে নাই, ঝুম্পাআপু এমন বেঈমানি করছে কেমন করে? এতদিনের, এত গভীর সম্পর্ক এখন এমন হালকা হয়ে গেল কেন? এখন তো তাদের ঘর বাঁধার কথা। এতদিন এমনটাই শুনেছে মণি। বিয়ের কথাবার্তা নাকি দুই পরিবারেই চলছে। তাহলে এমন হলো কেন?

পরে একদিন মণি ঝুম্পাআপুকে জিজ্ঞাসা করেছিল। অবশ্য টিটুভাই যে তাকে কান্নাকাটি করে এত কিছু বলেছে সেসব কথা লুকিয়ে রেখেই মণি কথা বলেছে। তবে ঝুম্পাআপুও ইডেন থেকে পাস করা শিক্ষিত এবং বুদ্ধিমতী মেয়ে। সে ধরেই নিয়েছে টিটু মণিকে সবকিছু নালিশের সুরে জানিয়েছে। ঝুম্পাআপু যে কথা বলেছে, তা রীতিমতো ভয়ানক। টিটুভাইদের নারায়ণগঞ্জের প্রাণকেন্দ্র চাষাড়ায় তিনটি দোকান আছে। শহরে ফ্ল্যাট আছে। শহরের বাইরে জমি আছে। সব মিলিয়ে কোটি টাকার এসেট আছে তাদের। কিন্তু তাদের পারিবারিক ঋণ আছে দুই কোটি টাকার। ঝুম্পআপু মণিকে জিজ্ঞাসা করেছে, “যে পরিবারের এককোটি টাকার সম্পত্তি আছে আর দুই কোটি টাকার ঋণ আছে সেই পরিবারে তোমার আপন বোন তুমি বিয়ে দিবা? তুমি নিজে হিলে কি রাজি হবা?”

মণি চিরকাল শুনে এসেছে কথায় কথা বাড়ে। কিন্তু কখনো কখনো যে কথায় কথা থামিয়ে দেয়, শেষ করে দেয় সে অভিজ্ঞতা তার ছিল না। ঝুম্পাআপুর কথায় সে কোনো কথাই বলতে পারে নাই। এর পরে তাদের আর কী কী ঘটেছে সে জানে না। এখন যে ছেলেটা চারটা কারেন জালের মেশিনের মালিক হয়ে তাকে ভালোাবসতে চায়, তাদের ব্যাংকঋণ কত লক্ষ টাকা তা কে জানে? একেকটা মেশিন আট লাখ টাকা কর হলে চারটা মেশিনের দাম বত্রিশ লাখ। এছাড়া জমি, গোডাউন, রানিংপুঁজি ও অন্যান্য মিলিয়ে অর্ধ কোটি টাকার মালিক! এটা বিশ্বাসযোগ্য না যে তাদের ব্যাংকঋণ নাই। আজকে এই মহূর্তে তমাদের স্কুলে অভিভাবকদের ভিড়ে বসে থেকে ভাবতে ভাবতে তরুণ শিল্পপতির আবেগের ব্যাপারটা একেবারে রিফিউজ করে দিয়েছে মণি।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে গরম বাড়ছে। কালো জর্জেটের বোরখার ভেতর মণি ঘেমে উঠেছে। কিন্তু কী আর করা! একবর মনে চায় তমাকে ডেকে এনে বাসায় চলে যাবে। কিন্তু যখনই মনে পড়ে সংসারের কথা, তখন মনে হয় আজ ভিক্ষা করে হলেও কিছু টাকা অথবা চাউল নিয়ে ঘরে ফিরতে হবে। বাসায় যদি একটা অঘটন ঘটে যায়! ভাই যদি ভাবীকে মারধর করে! ভাবী যদি রাগ করে বাপেরবাড়ি চলে যায়! যদি আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে! এসব বিষয় ভাবতে ভালো লাগে না। মণির ধারণা, তার বয়সী মেয়েরা, অনার্সে পড়া মেয়েরা তার মতো বাপ-ভাইয়ের সংসার নিয়ে ভাবে না। তারা নিজেদের শরীর, মন, প্রেম, আগামী ভবিষ্যতের রোমান্টিকতা অথবা ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত থাকে। শুধু তাকেই আজ বাপের সংসারে থেকে চাউল নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। গত বছর তার জন্য একটা প্রস্তাব এসেছিল, ছেলে বিদেশে থাকে। সেখানে মণি রাজি হয় নাই। হলে আজ খারাপ হতো না। অবশ্য সে কথাও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশিরা বেশি সংখ্যায় করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে। মারাও গেছে দেশের তুলানায় বেশি। কাজেই আজকের এই করোনাযুগের হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম।

মণি হঠাৎ দেখতে পেল, লোকজন স্কুলের গেটের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে। চেয়ারম্যানসাহেব বোধ হয় এসে গেছেন। সে খাটো মানুষ, বেশিদূর পর্যন্ত দেখতে পায় না। একটু পরে লোকজন আবার ফিরে এলো। জানা গেল, চেয়ারম্যান না, তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে তার ভাই। গেটের সামনে তার ভাইয়ের গাড়ি এসে ভিড়েছে। আবার সবাই পিঁপড়ার ঝাঁকের মতো দৌড়ে ফিরে আসছে।
এটা কত বড় অবিশ্বাস্য ব্যাপার যে আজকে ঘরে দুপুরের খাবার নাই। অল্প কিছু চাউল ছিল, সকালে রান্না করা হয়েছে। মণিদের পাশের বাসা থেকে এক পিরিচ কাঁঠাল দিয়ে গিয়েছিল, আজ শুধু সে কাঁঠালের দানা ভর্তা করা হয়েছে। কাঁঠাল সাধারণত জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসের দিকে পাকে। সম্ভবত হাইব্রিড জাতের কোনো গাছের কাঁঠাল এই বৈশাখ মাসে পেকেছে। সে কাঁঠালটির দানা ভর্তা করাতে ভালোও লাগে না। অনি সবার ছোট, মা-বাবা দুজনের আদুরে সন্তান। সে খাওয়ার ব্যাপারে অনেক বাছগোছ করে। অনিকে সকালে দেখা গেছে দানাভর্তা নিয়ে বসে কাঁদছে। সে এসব দিয়ে ভাত খেতে পারে না। কিন্তু কী করার আছে? মণি কিছুক্ষণ অনিকে বুঝিয়েছে। সে বুঝতে রাজি না। শেষে রাগারাগি করে এসেছে মণি।
আকাশে মেঘ জমা হচ্ছে। ধীরে ধীরে মেঘ উত্তর-পশ্চিম দিকে গিয়ে সম্মেলন করছে। লোকজন সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছে। একটু পরে গেটের কাছে একটা শাদা পাজেরো গাড়ি দেখা গেল।

চেয়ারম্যান সাহেব গটগট করে নেমে এলেন। এসেই দ্রুত হেডমাস্টারের রুমে ঢুকে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে কয়েকজনের হাতে শাদা ব্যাগ তুলে দিলেন তিনি। ছবি উঠল, হাত তালি বাজল। কয়েকজনের হাতে দিয়েই চেয়ারম্যান দ্রুত চলে গেলেন। এই শাদা ব্যাগগুলো বোধহয় স্কুল ভবনের ভেতরে রাখা হয়েছিল। এতক্ষণে চোখেও পড়ে নাই মণির। সে উঠে গিয়ে স্কুলের গেটের সামনে দাঁড়াল। সেখানে দেখা গেল ক্লাস ফাইভের বাচ্চারা ব্যাগগুলো দুই হাতে ধরেও ওজনে পারছে না। যার যার অভিভাবকরা কাছে গিয়ে মুখবাঁধা শাদা বস্তাগুলো নিজ হাতে নিয়ে নিচ্ছে।

প্রতিটি বস্তায় ত্রিশ কেজি করে চাউল, পাঁচ কেজি আলু, সেমাই, চিনি, লবণ, তেলসহ আরো কী কী যেন আছে। শুনে ভালো লাগছে মণির। একটা বস্তা পেলে ঈদটা ভালোভাবে করা যাবে নিশ্চিন্তে। চেয়ারম্যানসাহেবের প্রশংসা না করে সে পারল না। সত্যিই, দেওয়ার মতো মন-মানসিকতা সবার থাকে না। আর এ সময় যদি ধনীরা এগিয়ে না আসে, তাহলে গরিবেরা বাঁচবে কেমন করে! মণি ইতিবাচক চিন্তাই করছিল। এরমধ্যে তার পাশে দাঁড়ানো এক মহিলা বলে উঠল, “সরকারের রিলিফ কতটুকু মারছে কে জানে, সামনে তো আবার মেম্বারি-চেরমেনি ইলেকশন আইতাছে, কিছু কিছু না দিলে যে ভোট পাইব না।”

মণি মহিলার কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল। প্রথমে তার কাছে মহিলার কথাগুলো বিরক্তি সৃষ্টি করল। মানুষ এত নেগেটিভ চিন্তা করে কেন? মানুষ কি ভালো চিন্তা করতে পারে না? পরে সে নিজে অনেকক্ষণ পর্যন্ত চিন্তা করে দেখল, সারা দেশে ত্রাণ চুরির ঘটনা ঘটছে। প্রতিদিনই সে শুনছে, খবরে জানছে। এর মতো লোকেরই তো চোর। চোরের তো আর আলাদা চেহারা থাকে না। কত মেম্বার-চেয়ারম্যান ত্রাণচুরি করে ধরা পড়ছে। তারা কারা? এমনই তো দামি গাড়ির মালিক তারা। আস্তে আস্তে মহিলার কথায় স্বীকৃতি চলে এলো মণির মনের ভেতর। সে বুঝতে পারল, আজকের এই ত্রাণ কার টাকায় দেওয়া হচ্ছে তা জানতে পারলে ভালো হতো। চেয়ারম্যান কি নিজের পকেট থেকে দিচ্ছে, নাকি সরকারের পক্ষ থেকে।

চেয়ারম্যান চলে যাওয়ার পরে প্রাইমারি স্কুলের হেডস্যার আর অন্য শিক্ষকেরা ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাস রুম থেকে বের করে দিলেন। বললেন, বাইরে থেকেই দেওয়া হবে। প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন যার যার অভিভাবককে সাথে নিয়ে এসে ব্যাগ নিয়ে যায়। আসলেই এটা ভালো সিদ্ধান্ত, মণি ভাবল। কারণ এত বড় বস্তা প্রাইমারির শিশুরা বইতে পারবে না।
এরপরে স্যারেরা শাদা বস্তা নিয়ে এদিক-সেদিক দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিলেন। স্কুল ভবনের বারান্দা দিয়ে তারা এ রুম- সে রুম যাচ্ছেন- গ্রিল দেওয়া বারান্দার বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে। মাঠ থেকে কেউ কেউ মন্তব্য করতে ছাড়ছে না। “এই যে স্যারেরা-ম্যাডামেরাও চোরা চের্মেনের শিষ্য হইয়া গেছে। পোঁটলা লুকাইতাছে।”

পাশ থেকে নেভিব্লু বোরখাপরা একজন মন্তব্য করল, “আরে না, হ্যারা শিক্ষিত মানুষ, সরকারি বেতন পায়, হ্যারা কি চুরি করব? হ্যারা যেই সব পোলাপান প্রাইভেট পড়ায়, টিউশনি করে তাগো জইন্য আগেই আলাদা কইরা রাখতাছে।”
খয়েরি রংয়ের পুরনো স্টাইলের বোরখাপরা আরেক মহিলা প্রতিবাদের সুরে বলে, “এইটা কি ঠিক হইতাছে? প্রাইভেট পড়া তো প্রাইভেটই। বেশি মায়া লাগলে নিজেগো টেকা দিয়া কিন্না দিবো।”
আগের মন্তব্যকারী মহিলা শক্ত হয়ে বলে, “আগো, নাম আর রুল নম্বর ধইরা ধইরাই তো রাখতাছে। এমন তো যে অন্য স্কুলের পোলাপানেগো দিতাছে। এই স্কুলের পোলাপানেরা পাইলেই তো হয়।”
মণি দেখছে আকাশের অবস্থা ঘোলাটে। বৃষ্টি নামতে পারে। কালবৈশাখী ঝড়ও নামতে পারে যে কোনো সময়। যা দেওয়ার তা তাড়াতাড়ি দিয়ে দিলেই তো হয়। শুধু শুধু সময় নষ্ট করছে। বৃষ্টি নামলে শিশুরা কোথায় যাবে?

নিচের ক্লাসের ছোট শিশুদের আগে না দিয়ে আগে ক্লাস ফাইভের বাচ্চাদের দেওয়া শুরু হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণী ক-শাখা, খ-শাখা, চতুর্থ শ্রেণী ক-শাখা, খ-শাখা এভাবে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি শিক্ষার্থীর নাম ডেকে তার হাতে বড় শাদা ব্যাগ ধরিয়ে দেওয়া হয়। সাথে সাথে তাদের সাথে আসা অভিভাবকরা গিয়ে ব্যাগটা নিজহাতে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। এবাবেই দেওয়া হচ্ছে। এতেও সময় লাগবে অনেক, এর মধ্যে বৃষ্টি নেমে যেতে পারে।। মণি গেটের দিকে তাকিয়ে আছে। লোকজন শাদা বস্তা নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আর নতুন নতুন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা আসছে। মণি লক্ষ্য করে দেখে, কেউ কেউ দুইটি বস্তা নিয়েও গেট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। দুটি বস্তা কেন? তার সন্দেহ হলে সে তার পাশে দাঁড়ানো খয়েরি বোরখাপরা মহিলাকে জিজ্ঞাসা করে, “তারা দুইটা বস্তা নিয়া যায় ক্যামনে?”
খয়েরি বোরখাপরা মহিলার কথা বলার আগেই সেই নেভিব্লু বোরখাপরা মহিলা বলে, “আপনে কি সবাইরে চিনেন, সবার কতা জানেন? যাগো দুইজন পোলাপান এই স্কুলে পড়ে, তারাই দুইটা কইরা নিতাছে। বেশি নিব কইত্থিকা?”
এবার খয়েরি বোরখাপরা মহিলা বলে, “দ্যাহেন শেষ পর্যন্ত, কার বস্তা কে নিয়া যায়?”

করোনার এই সময় মণির সব টিউশনি বন্ধ থাকায় দ্রুতই বাসায় ফিরতে হয়। তাহলে বাড়িওয়ালা এবং তার বউ নানা বাজে কথা বলে। মণিদের দুই বোনকে নিয়ে তারা নানা রকম গুজব ছড়ায়। কয়দিন আগে ঘরভাড়া চেয়েছিল, মণির ভাইয়া বলেছে, “কয়েকদিন পরে দেই, এখন তো কাজকর্ম নাই।” এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বাড়িওয়ালি বলে, “আপনের বোনেগো টেকার অভাব আছে? বাসা থিকা বাইর হলেই তো টেকা!”
এই কথার উত্তরে মণি কিছু একটা শক্ত কথা বলতে চেয়েছিল, তার ভাইয়া থামিয়েছে তাকে। “তুই কিছু কইস না। ঘরে যা।” ভাইয়ার কথায় মণি ঘরে ফিরে এসেও কান খাড়া করে রেখেছে। আবার কথাটা বলে কিনা। ভাইয়ার কারণে সেদিন মণি পাল্টা কথা বলতে পারে নাই।

ঘরে ফিরে গিয়ে দেখে অনি বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে কাঁদছে। তাদের দুই বোনের চরিত্র নিয়ে কথা বলেছে বাড়িওয়ালি, এ কথা সে সহ্য করতে পারে নাই। মণি বোঝে, অনি সবার ছোট, সবার আদরের বলে তার সহ্য করার ক্ষমতা কম। সে কথায় কথায় কেঁদে ফেলে। মণি দেখেছে কান্না করে কোনো লাভ হয় না। উল্টা সবাই দুর্বল মনে করে। তবে সেও যে বিপদে-আপদে কান্না করে না, তা না। সেও মাঝে মাঝে কান্না করে মায়ের অভাব পূর্ণভাবে অনুভব করে। তবে তার ধারণা মাঝে মাঝে পরিবর্তিত হয়। সে দেখেছে কান্না মাঝে মাঝে মেরুদণ্ডের নোনাপানি চোখ দিয়ে বের করে দেয়, এর পরে মেরুদণ্ড অনেক শক্ত হয়ে যায়। সে একদিন কলেজে কোন স্যারের কাছে যেন শুনেছে, অনেক মানুষই আত্মহত্যা করতে পারে না সাহসের অভাবে। মনে শক্তি পায় না। এজন্য তারা প্রাণভরে কান্না করে। কান্নার পরে ভেতরটা যখন শুকিয়ে আসে, তখনই আত্মহত্যার চেষ্টাগুলো সফল হয়। অনেকে নাকি কান্না করার পরে খুনও করে। কথাগুলো সত্য কি মিথ্যা কে জানে। সবই শোনা কথা।
এখন ত্রাণের ব্যাগ দ্রুত বিলি করা হচ্ছে। মণি স্কুলের গেটের দিকে তাকিয়ে দেখছে কেউ কেউ দুইটা এমনকি তিনটা পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে। সে বিস্মিত হয়, এ কী অবস্থা! এমন হচ্ছে কেন? এখানেও ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম হচ্ছে বলে মনে করছে মণি। সে উঠে গিয়ে স্কুলের অফিসের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। যেখান থেকে বিলি হচ্ছে। সে দেখে এখনো অনেক ছাত্র-ছাত্রী লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকে এখনো আসছে। হয়তো রাস্তাতেও অনেকে আছে। কিন্তু ত্রাণের শাদা ব্যাগের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় কম মনে হচ্ছে। আল্লাই জানে, কারটা কে মেরে দিয়েছে।

আকাশের অবস্থা খারাপ হচ্ছে, দ্রুত বাসায় ফেরা দরকার। ভাই-ভাবীর মধ্যে ঝগড়া হলে দেখা যাবে, ভাবী তার বাপের বাড়ি চলে যাবে। লকডাউনের মধ্যে রিকশা পাওয়া কঠিন কবে না। ভাইয়াও বাসা থেকে বেরিয়ে কোথাও চলে যাবে। মহল্লার মধ্যেই কোথাও আড্ডায় গিয়ে বসবে। অনি তখন বাসার একাকীত্বের সুযোগ নিতে পারে। আব্বা বাসায় থাকলেও হয়তো ঘুমিয়ে থাকবে। অনি সে সুযোগ নিয়ে তার বয়ফ্রেন্ডকে ফোন করবে। আলাপ জমাবে। মণি এসব ফ্রেন্ডের সম্পর্ককে বিশ্বাস করে না। উচ্চ মাধ্যমিকে থাকতে তারও বন্ধু ছিল। বন্ধুত্বের ব্যাপারে ছেলেরা কসম খেয়েও বন্ধুত্ব রক্ষা করতে পারে না। বুকে হাত দিতে চেষ্টা করে। মণির ব্যাপারে এমনটাই ঘটেছিল। তারপর থেকে ছেলেটার সাথে আর সম্পর্ক রাখে নাই।

এখন অনির বন্ধুরা কেমন তা কে জানে! এই বয়সের বন্ধুরা যেমন হওয়ার, তেমনই হবে। অনির একটা শারীরিক সমস্যা আছে। সে লম্বায় ঘরের সবার চেয়ে উপরে। পাঁচফুট তিন। মণি, ভাইয়া কিংবা আব্বা কেউ এত লম্বা না। শুধু অনিই এমন। লম্বা হলেও কী হবে, তার শারীরিক গঠন ছেলেদের মতো। পায়ের গিরা বেশ শক্ত, পাহাড়ী নারীদের মতো। তার বুকের গঠন অনেকটা সমতল। এ ধরনের মেয়েদের পড়াশোনা হয় না। কারণ, তারা অনেকের কাছে শোনে যে ছেলেদের হাত না পড়লে তাদের ফিগার সুন্দর হয় না। তাই তারা ছেলেবন্ধুদের গায়ে হাত দেওয়ার সুযোগ দেয়। আর শরীরে এভাবে কাউকে অধিকার দেওয়ার পরে সে সম্পর্ক অথবা সে চাহিদা অথবা সে অভ্যাস ও আকাঙ্ক্ষা বিয়ের দিকে টেনে নিয়ে যায়। এ কারণে এসব মেয়ের পড়ালেখা বেশিদূর এগোয় না। এটা মণি অনেকের কাছেই শুনেছে, চিন্তা করে শোনাকথায় বাড়তি ধারণা যুক্তও করেছে। আর দুয়েকটা দৃষ্টান্ত যে দেখে নাই, তা না। অনিকে নিয়ে তাই মণির এই ভয়। ওকে অন্য সবকিছু দিয়ে বিশ্বাস করা গেলেও ছেলে সম্পর্কিত ব্যাপারে বিশ্বাস করা কঠিন।
মণিকে এখন যে ছেলেটা ভালোবাসে, তার দেশের বাড়ি বরিশাল বিভাগের কোনো জেলায়। কলেজের হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে। ছাত্র ভালো, কিন্তু কেমন গ্রাম্যস্বভাবের। আর বরিশালের কোনো ছেলের সাথে মণিকে বিয়ে দেবে না তার আত্মীয়রেরা। মণির সর্বদাই ইচ্ছা, তার বিয়ে যেন গ্রামের বাড়িতে গিয়ে মায়ের পক্ষের, বাপের পক্ষের এবং বরযাত্রী আসা শ্বশুরপক্ষের সবার উপস্থিতিতে হয়। এখানকার ভাড়া বাসায় না। সে কোনো ধরনের লুকোছাপা করতে চায় না। তাদের বাড়িওয়ালি যেমন তাদের দোষ খুঁজে বেড়ায়, তেমন তাদের নিজেদের ঘরেও এমন শত্রু আছে। মণির ধারণা তার ভাইয়ের অশিক্ষিত বউটা, মানে তার মূর্খ ভাবীটা সর্বদা তার দোষ খোঁজার চেষ্টায় আছে। তার ভাবীর ধারণা, কলেজে পড়তে গেলে মেয়েরা নষ্ট হয়ে যায়। ছেলেদের সাথে বন্ধুত্ব করা মানেই চরিত্রহানির ব্যাপার। টিউশনি করতে গেলে ভাবী মনে করে, ছাত্র-ছাত্রীদের বাপের সাথে গোপন সম্পর্ক গড়ে তোলা। অথবা টিউশনির নামে অন্য কোথাও যাওয়া হয়। আর এভাবেই পোলাপান পড়ানোর নামে টাকা কামায় মেয়েরা। মণি মাঝে মাঝে ভাবে, এই মূর্খ মহিলাকে কে বোঝাবে, লেখাপড়া কী জিনিস!

মণি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে রেখেছে ক্লাসমেট, কলিগ আর কোনো শিক্ষকের সাথে বিয়ের সম্পর্ক রচনা করবে না। কারণ ক্লাসমেটের সাথে বিয়ে হলে সম্পর্ক মধুর হয় না, কিছুদিন পরে তুইতোকারিতে নেমে যায়। বিশেষ করে কোনো বিষয়ে তর্ক হলে। সন্তানের সামনে তুই-তোকারি করলে সন্তানের ওপরে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। কলিগ বিয়ে করলে প্রাইভেসি নষ্ট হয়। পারিবারিক গোপনীয়তা প্রতিষ্ঠানের সবাই জেনে যায়। আর শিক্ষক বিয়ে করলে কখনোই স্ত্রীকে স্ত্রীর মর্যাদা পাওয়া না। শিক্ষক স্বামী সর্বদাই স্ত্রীকে ছাত্রী মনে করে, খালি জ্ঞান দেয়, আর জ্ঞান দেয়।
মণি এটাও জানে যে, সে কাঠমিস্ত্রির ঘরের মেয়ে। যতই অনার্স-মাস্টার্স পাস করুক, বিয়ের সময় বাপের পেশাটা, ভাইয়ার জীবিকা একটা প্রভাব রাখবেই। তাই সে চায় তার পক্ষের সমস্ত আত্মীয় যেন একটু সুদৃষ্টি দেয় তার প্রতি। তবে মণি এই বাসাবাড়ি থেকে বিয়ে বসবে না। নিজেদের গ্রামের বাড়িতে গিয়েই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সারবে। এখনকার অনেকেই ভাড়াটে বলে তাদেরকে নানাভাবে ইনসাল্ট করে। মনে করে, এরা বুঝি নদীভাঙ্গা এলাকা বা কোনো বাস্তুহারা থেকে আসা লোক।

মাঝে মাঝে মণি এ আশঙ্কাও করে, অনি কি তার আগেই স্বয়ম্বরা হবে? যদি হয়ও, সংসারে একটা ঝামেলা হয়ে যাবে। তবুও সে সবাইকে নিয়েই এই দেশের রেওয়াজমতো পূর্ণ আনুষ্ঠানিকতায় বিয়ে বসবে। তার ভাবী যেন কোনোদিন চোখতুলে তাকে নিয়ে কোনো কথা বলতে না পারে। আর খালিহাতে কোনো ছেলের হাত ধরে চলে গেলে, সংসার পাতলে, আরেকদিন লাথি মেরে খালি হাতেই খেদিয়ে দিতে পারবে। সে সাহস রাখবে ছেলেরা। কিন্তু সমাজের দশজন নিয়ে বিয়ে হলে ছাড়াছাড়ি করার সময় হলে সেই দশজনের সালিশীতেই একটা সমাধান হবে।

মণির স্বপ্ন একটা চাকরি পাওয়া। সে প্রাইমারি স্কুলে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করে, এ চাকরিটা তার ভালো লাগে। যদিও অনেক পরিশ্রম করতে হয়, তবুও ভালো। যে ভেবে রেখেছে, যদি আর কয়েকটা বছর আব্বা সুস্থ থাকেন, কাজ করতে পারেন। ভাইয়া যদি তাদের ছেড়ে ভিন্ন হয়ে না যায়, তাহলে অনিকে আরো কয়েকটা বছর পড়াবে। যদি সে মনোযোগ দিয়ে পড়ে। এরমধ্যে সে চাকরির জন্য পড়াশোনা করছে। আরেকটু ভালোভাবে পড়ে, যদি আল্লাহ আল্লাহ করে প্রাইমারিতে সরকারি একটা চাকরি পেয়ে যায়, তাহলে আর আব্বাকে কাজ করতে দেবে না। তখন যদি ভাইয়া-ভাবী সংসার ভিন্ন করে ফেলেও, তখন সব কিছু সে সামলাতে পারবে। নিজে একজন সরকারি চাকুরে দেখে বিয়ে বসবে। এর মধ্যে অনিকে গ্রাজুয়েট করে ওকেও ভালো বর দেখে বিয়ে দেবে। তারপর আর সংসারে পিছুটান থাকবে না।

তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বান্ধবী রূপা অবশ্য সরকারি চাকুরে পছন্দ করে না। তার ভালো লাগে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তাদের বেতন বেশি। মণি তার বান্ধবীর সাথে একমত না। এবার এই করোনাকালে সে বুঝেছে সরকারি চাকরির গুরুত্ব কত! দেশ-বিদেশে কত হাজার হাজার, লাখ-লাখ এমনকি কোটি কোটি মানুষের চাকরি চলে যাচ্ছে। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে কর্মচারীদের আর রাখবে কেন? অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের বেতন কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সে তুলনায় সরকারি চাকরিজীবীরাই বোধ হয় পৃথিবীর সবদেশে ভালো আছে। এ কারণে মণি মনে করে, সরকারি চাকরি যদি নিম্নগ্রেডেরও হয়, তবু ভালো। ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তা আছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যে লোক গতকাল এমডি ছিল, যার ভয়ে সবাই কাঁপত, আজ সে লোক বেকার। তাকে আজ কেউ সালামও দেবে না।

এসব মণির স্বপ্ন। বাস্তবায়িত হওয়া কঠিন কিছু না। তবে তার স্বপ্নের নকশিকাঁথাটার মাঝখানে একটা সুতা কুঁচকে আছে। পুরো কাঁথাটার সৌন্দর্য নষ্ট করে দিয়েছে। একটা সন্দেহের সুতা সেখানে খাটো হয়ে আছে। আব্বা যদি সুস্থ থাকে তাহলে আরেকটা সমস্যা আছে। মা-মারা গেছে এগারো মাস আগে। এর মধ্যে আব্বা নাকি কোন এক মহিলার সাথে খাতির গড়ে তুলেছে। এ জন্য মণি প্রবল এক দ্বিধার মধ্যে আছে। সে চায় তার আব্বা সুস্থ থাকুক। এটা একটা মঙ্গলময়তা, শুভবোধ। কিন্তু সে মঙ্গল যদি তাদের সংসারের অমঙ্গল বয়ে আনে? আব্বা যদি এই সময় আরেকটা বিয়ে করে ঘরে আনে, নিঃসন্দেহে ভাইয়া তার সংসার নিয়ে ভিন্ন হয়ে যাবে। তখন অথই পানিতে পড়বে অনি আর মণি। তাদের ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তা হারিয়ে যাবে। তবে মণি এটা ভেবে রেখেছে, কাউকে না জানিয়ে একাই ভেবে রেখেছে, যদি আব্বা এই সময় আরেকটা বিয়ে করেই ফেলে, তাহলে সে প্রথমেই গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তিন চাচাকে হাত করবে। সে প্রথমেই সবার কাছে গিয়ে বলবে, আগে আমাদের দুইবোনের ব্যবস্থা করে দেন, তারপরে আপনাদের ভাইকে বাড়িতে উঠতে দেবেন। মণির তিন কাকাই মণিকে আদর করে। এর প্রধান কারণ সে এই পরিবারের মধ্যে প্রথম মেয়ে। তার উপরে সে অনার্সে পড়ছে। এতদূর পর্যন্ত এ বংশের কোনো মেয়েই আগে পড়ে নাই। সে গুছিয়ে কথা বললে, তার কাকারা তার কথা রাখবে।

তবে মণি যে স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের চিন্তাই করে, তা না। সে তার আব্বার ব্যাপারটাও মাথায় রেখেছে। বুড়াকালে আব্বাকে দেখাশোনা কে করবে? এদেশে একটা কথা প্রচলিত আছে, সৌভাগ্যবতী স্ত্রীর মৃত্যু হয় স্বামীর আগে। আর দুর্ভাগ্যবান স্বামীর স্ত্রীর মৃত্যু হয় আগে। তার আব্বাকে বুড়াকালে কে দেখাশোনা করবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নাই। তার একমাত্র ভাবী তো কিছুই করবে না। তাদের দুইবোনের কোথায় বিয়ে হয় কে জানে! তারা কোথায় থাকবে তা আল্লাহ ছড়া কেউ জানে না। আগে তাদের দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেলে আব্বার বয়সের উপযোগী একজন মহিলাকে এনে দেওয়া যাবে। তবে সমস্যা হলো, আব্বা ততদিন ধৈর্য ধারণ করতে পারবেন কি না।
স্কুলের অফিস ভবনের সামনে থেকে লোকজন পাতলা হয়ে এলেও এখনো অনেক মানুষ আছে ত্রাণের আশায়। এর মধ্যে একটা ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে গেল মাঠের ওপর দিয়ে। একটু পরেই বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টির মধ্যে সমস্ত রুম তালা দেওয়া বলে কোথাও তারা উঠতে পারল না। তমা আর মণি ভিজতে লাগল। তাদের মতো আরো অনেকেই ভিজছে। আকস্মিক বৃষ্টিতে কোথাও গিয়ে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ হলো না। মণি তার বোরখার তিনটা বোতাম খুলে কাপড়ের ঝুলটা তমার মাথার উপরে দিয়ে রাখল। তাতেও রক্ষা হলো না। তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে গেল মাঠের সবাই।

এই বৃষ্টিতে তমার জ্বর আসে কিনা ভাবছে মণি। এ সময় জ্বর হলে চিকিৎসা নাই। বিনা চিকিৎসায় তার ভাইঝি মারা যাবে। এখন কোনো ডাক্তার ঠাণ্ডা-সর্দি-জ্বরের রোগী দেখেন না। করোনার ভয়ে ডাক্তাররা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোনো হাসপাতালে, কোনো ক্লিনিকেও ঠাণ্ডা-সর্দি-জ্বরের রোগীদের আশ্রয় নাই। নিজেদেরই ওষুধ কিনে এনে খাওয়াতে হবে। অথবা পল্লীচিকিৎসক দেখাতে হবে। তাদের হাতে ভালো হলেই ভালো। না হলে হায়াত-মউত আল্লাহর হাতে বলে মেনে নিতে হবে। বৃষ্টিতে ভেজার ফলে মণির দুশ্চিন্তা নানা দিকে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করতে শুরু করেছে।
আজকে রান্নার জন্য চাউল যেমন দরকার, তেমন দ্রুত বাসায় ফেরাও দরকার। অনি আরো একটা ভুল কাজ করে বসতে পারে। ও এসব বিষয় সাধারণত খেয়াল করে না। পাশের বাসার রিয়ার সাথে বসে লুডু খেলা শুরু করে দিতে পারে। লকডাউনের পরে রিয়া বা তার ভাই রায়হান এমনকি তার মাকে মণিদের বাসায় আসা পছন্দ করে না মণি। কারণ ওরা মাস্ক পরে না। সারাদিন পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়। কোথায় কোথায় রিলিফ দেওয়া হচ্ছে, সে সব জায়গায় ঘোরাঘুরি করে। সারাদিন ঘুরে ঘুরে রিলিফ আনে। পরিচয় লুকিয়ে এক জায়গা থেকে বার বারও আনে। রিলিফ আনতেই পারে, কিন্তু কোনো স্বাস্থ্যবিধি মানার তোয়াক্কা করে না। এ-বাড়ি সে-বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। মাস্ক না পরার কারণে রিয়াকে তাদের ঘরে আসতে নিষেধ করে দিয়েছে মণি। সেই থেকে মণি ঘরে থাকলে আসে না। কিন্তু আজকে দীর্ঘ সময় ধরে মণি বাসার বাইরে আছে, এই সুযোগে রিয়াকে নিয়ে অনি লুডু খেলা শুরু করে দিতে পারে। মাস্ক পরা নিয়ে মণির সাথে রিয়ার মায়ের ঝগড়াও হয়েছে।
মাস্ক পরা নিয়ে শুধু রিয়ার মায়ের সাথেই না, এই বাড়ির ছয় ঘর ভাড়াটের মধ্যে চার ঘরের লোকজনের সাথেই মণির কথা কাটাকাটি অথবা মুখ কালাকালি হয়েছে। জলিলের বউ তো মণিকে বলেছে, “তোরাই জায়গামতো মাস্ক লাগাইয়া থুইয়া দে। দেহি তগো মরণে ধরে কিনা?”

এই হলো এদেশের মানুষ। শুধু মাস্ক পরতে বলায় মণিকে এমন অশ্লীল কথা বলেছে জলিলের বউ। মাস্ক তো পরবেই না, উল্টা অসভ্য-অভদ্র কথায় দিয়ে খোঁচাবে! মা জীবিত থাকতে মণি কারো সাথে ঝগড়া করত না। এখন সে করে। তার নিজের বিবেচনায় সে প্রতিবাদী হয়েছে। এতটুকু প্রতিবাদী না হলে সমাজে বাঁচা যায় না। মা থাকতে বলতেন, “তোরা সামনে থেকে যা। আমি থাকতে তোদের কতা কইতে হইব না। কলেজে ভর্তি হইছত, কলেজের ইজ্জত রাখিস।”
যে রোগের ওষুধ নাই, সে রোগ সম্পর্কে মানুষের আচরণ ঠিক পরস্পর বিপরীত দুই প্রকারের। কারো কাছে এটা আতঙ্কের মতো। আবার কারো কাছে এটা নিয়ে মাথা ব্যথাও নাই। যা হয় হবে এমন ভাব। মানুষ কোনো স্বাস্থ্যবিধিই মানতে চায় না। বরং বলতে গেলেই শত্রু মনে করে।

গ্রীষ্মকালের বৃষ্টি হঠাৎ যেমন শুরু হয়, তেমনই হঠাৎ থেমে যায়। বৃষ্টি থেমে যেতেই মণি তমাকে নিয়ে কলেজের গেটে গিয়ে দাঁড়াল। গিয়ে দেখে ভেতরে শাদা বস্তা আছে অল্প কয়েকটা মাত্র। দশ-বারোটা হবে। কিন্তু লোকজন আছে এখনো শ খানেক। মণিদের প্রতিবেশি, কাসেম হাজির ভাইয়ের নাতিন রিমাও তমার সাথে পড়ে। রিমাকে মাসের ছাব্বিশ দিনের মধ্যে বিশ দিনই মণি হাতে করে ধরে স্কুলে নিয়ে আসে। এক হাতে তমা, আরেক হাতে রিমাকে নিয়ে সে স্কুলে আসে। রিমার বাবাকে দেখা গেল দুটি বস্তা টানাটানি করে স্কুলের গেটের দিকে যাচ্ছে। শুকনা মানুষ, দুটি বস্তা নিয়ে পারছে না। তাকে মণির বরাবর আসতে দেখে মণি ভেবেছিল, সে বলবে, “আফা আপনের লাইগা নিয়া আইছি, এইটা আপনে নিয়া যান।”

মণির মনের মধ্যে আশার একটা ক্ষীণ আলোরেখা ফুটে উঠেছিল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রিমার আব্বা রাস্তায় গিয়ে রিকশায় উঠে চলে গেল বাড়ির দিকে। হতাশ হলো মণি। এতদিনের এই প্রতিদান এই! দুঃখ লাগল তার। সম্পন্ন পরিবারের লোক। বাড়িতে দোতলা দালান, তাদেরও ত্রাণের জন্য আসতে হয়! তাও অবৈধভাবে দুইটা নিয়ে যেতে পারে! মানুষের বিবেক কোথায়?
দশ-বারোটা বস্তা অল্প সময়েই বিলি হয়ে গেল। আশি-নব্বই জন অভিভাবক বৃষ্টিতে ভিজে এতক্ষণ অপেক্ষায় ছিল। হাত-পা-চুল-মাথা ভেজা নিয়ে স্কুলের অফিসের সামনে গিয়ে হেডস্যারকে কড়াভাষায় নানা কথা বলছে। কিন্তু তাতে লাভ কী?
এ সময় স্কুলের গেটে পুলিশের গাড়ি এসে থামলে একটা। একজন পুলিশ অফিসার কয়েকজন কনস্টেবলকে নিয়ে স্কুলের মাঠে প্রবেশ করে জিজ্ঞাসা করে, “এখানে এত ভিড় কেন?”
একজন মহিলা উত্তর দেয়, “এখানে চেয়ারম্যানের ঈদের উপহার দিতাছে।”

পুলিশ অফিসার বিরক্ত হয়ে যায়, “তা এমন ভিড় করতে বলেছে কে? আপনারা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে মাঠে আসবেন, তা না। কারো মাথায় কিছু নাই? সবাই কোন সাহসে বাচ্চাদের নিয়ে এভাবে ভিড় করিয়ে রিলিফ দেয়? একটা অসুস্থ বাচ্চার থেকে দশটা বাচ্চা আক্রান্ত হতে পারে। তখন তো আপনারা সরকারকে দায়ী করবেন।”
পুলিশ অফিসার ত্রাণবঞ্চিত বিক্ষুব্ধ অভিভাবকদের সাথে কথা বলে, তাদের অভিযোগ আর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া শুনে স্কুলের অফিসের সামনে গিয়ে দেখে গ্রিলের গেটে তালা লাগিয়ে স্কুলের শিক্ষকেরা হাওয়া হয়ে গেছে। তারা কিছুক্ষণ রাগারাগি করে চলে গেল। বঞ্চিতরা শূন্য চোখে সব দেখছে।

পুরো বিষয়টা কেমন হয়ে গেল! মণি তমার মুখের দিকে তাকাতে পারছে না। তমার শ্যামলা মুখটা একেবারে এ সময়ের আকাশের মতো কালো হয়ে গেছে। সে কথা বলতে পারছে না। মুখটা ফুলে গেছে। মণি ঘটনার আকস্মিকতায়- আসলে ঘটনা তো আগে থেকেই ঘটে চলেছে, সহসা যবনিকায় সে স্তম্ভিত হয়ে গেছে।
এখন কী আর করবে? তার নিজেরই কান্না পাচ্ছে। চাউলের জন্য কান্না পাচ্ছে না। শিক্ষকদের চরম অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতিতে তার কান্না পাচ্ছে। এতটুকু ছোট্ট শিশুর ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চনার কারণে তার কণ্ঠস্বর ভেঙে আসছে। এই শিশুটা এই স্কুলে পড়তে পড়তে বড় হবে, কিন্তু কী শিখবে সে এখান থেকে?
তমা তার ফুপুর ভেজা বোরখার সাথে মুখ গুঁজে লেপ্টে রইল। তার পা কিছুতেই হাঁটার শক্তি পাচ্ছে না।

মণি তমাকে হাতে ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বাড়ির দিকে।