অমৃতের সন্ধানে এগিয়ে চলেছে যে জন ॥ শ্রাবণী প্রামানিক



মনুষ্যত্ব আর কবিসত্তা এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে পারেন খুব কম মানুষ। কথাটা কি জটিল মনে হলো? জটিল নয়, আমরা যারা শব্দকে সঙ্গী করে পথ পাড়ি দিচ্ছি, তারা বুকে হাত রেখে যদি বলি, তখন নিশ্চয় মনে মনে সত্য এই জানবো যে, কলম চললেই মানুষ খাঁটি হয় না। কলম না চালিয়ে, শব্দের ঘরে উঁকি না দিয়েও খাঁটি মানুষ হওয়া যায়। তবে আমার দেখা একজন ‘মামুন মুস্তাফা’ যতটা কবি, ততোটাই খাঁটি মানুষ।

কিছু গল্প বলি বরং। তখন ২০১৫। আমি তার বছর দেড়েক আগেই রাজশাহী থেকে ঢাকায় বসত গেড়েছি। থাকি ধানমন্ডি। বর্ষাকালের এক সকালে ফোন করে একজন নিজের নাম বললেন, মামুন মুস্তাফা। পরিচয় দিলেন, ছোটকাগজ ‘লেখমালা’র সম্পাদক হিসেবে। আমার একটি ছোটগল্প চাইলেন, তার ‘লেখমালা’র জন্য। জিজ্ঞাসা করলাম, কোথায় জেনেছেন, তিনি আমার কথা? তিনি বললেন, আমার আরেক প্রিয় ছোটগল্প লেখকের নাম। তিনি সৈকত আরেফিন।

এভাবেই কবি মামুন মুস্তাফার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ঘটলো। এরপর তিনি যতবার আমার লেখা চেয়েছেন, আমি মেইল করে দিয়েছি। পত্রিকায় প্রকাশিত হলে, তিনি একটি কপি আমার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতেন। কেবল ‘লেখমালা’র জন্য নয়, অন্যান্য ছোট পত্রিকার জন্যেও তিনি-ই আমার কাছে লেখা চেয়ে নিয়ে সেসব পত্রিকার সম্পাদকের কাছে পাঠিয়েছেন। ততোদিনে মামুন মুস্তাফা আমার দাদা। কিন্তু লেখার বাইরে আর কোন কথা তার সঙ্গে কখনো হয়নি।

এর বছর খানেক পরে দাদার কাছ থেকে আমন্ত্রণ পেলাম ‘লেখমালা’র সাহিত্য আলোচনা অনুষ্ঠানে যাওয়ার। কিন্তু যাওয়া হলো না আমার। তবুও দাদা বিভিন্ন সময়ে লেখা চেয়ে নিতে ভুললেন না। তারপর চলে গেলো বেশ কয়েক বছর। যদি ভুল না করি, তাহলে তিন বছর পরের লেখমালার অনুষ্ঠানে গেলাম। দাদার আহ্বান ফেলতে না পেরে। সামনাসামনি দেখলাম আমার দাদা মামুন মুস্তাফাকে। অভিভূত হলাম। যদিও তার কবিতায় বহুবার মুগ্ধ হয়েছি। পরে বুঝেছি, আসলে পারিবারিকভাবে এমন এক অমৃতধামে তার বাস, যে, কখনো গরল তাকে স্পর্শও করতে হয়নি।

কোনো আড়ম্বর নেই, অতি সংগোপনে তিনি সাধনা করে চলেন। মোক্ষ লাভ করতে হলে যে নিভৃতেই তপস্যা করতে হয়! আমাদের মামুন মুস্তাফা তাই-ই করছেন। তিনি আসলে ঔষধি গাছের মতো। প্রয়োজনে সকলেই তার শিকড় থেকে পাতা পর্যন্ত সব নিয়ে যাবে। কিন্তু সেই গাছের কি প্রয়োজন, কতোটা পরিচর্যার দরকার, সে খবর কেউ রাখে না। তবুও সেই গাছ অন্যের শুশ্রুষায় শেষ শেকড়টিও বিলিয়ে দেয়। এমনই এক মহাপ্রাণ মামুন মুস্তাফা গোলাপের মতো জনপ্রিয় না হোক, ঔষধি বৃক্ষের মতো প্রয়োজনীয় হয়ে উঠুক।

এখন থেকে যতদিন মানুষ বাঁচবে ততোদিন যেন একজন খাঁটি মানুষ, বিশুদ্ধ কবির নাম উচ্চারিত হয় গুরুত্বের সঙ্গে। বাংলা ভাষার সঙ্গে, কবিতার সঙ্গে ‘মামুন মুস্তাফা’ নামটি জড়িয়ে থাক শেকড়ে শেকড়ে।