আধুনিকতাবাদী সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দ ॥ বঙ্গ রাখাল


আবদুল মান্নান সৈয়দ (০৩ আগষ্ট, ১৯৪৩-০৫ সেপ্টেম্বর, ২০১০) বাংলা সাহিত্যের বহুমাত্রিক প্রতিভা, বহুগুণে গুনান্বিত ব্যক্তি। যার করতলে একের পর এক কবিতা, কাব্যনাট্য, সমালোচনা, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস এসে ধরা দিয়েছে যার মধ্যে আমরা এক অনুসন্ধানি প্রতিভার সন্ধান পাই। শিল্পকে নিজের মত করে সৃজন করার লক্ষ্যেই তিনি সৃষ্টি করেছেন শিল্পের ভেতরে নবশিল্পকলা। এই শিল্পকলাই তাকে যুক্তিবোধের সীমিত সীমা ভেঙ্গে অসীমের দিকে দৃষ্টিপাত করতে সাহায্য করেছে। যে কারনে আজ আবদুল মান্নান সৈয়দ আমাদের বাংলা কবিতার এক প্রাসঙ্গিক ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন। আজ যদি জীবনানন্দের গবেষণার কথা উল্লেখ করি তাহলে তার সাথে অন্য একটি নামও প্রাসঙ্গিকক্রমে উচ্চারিত, তিনি আবদুল মান্নান সৈয়দ।

এই কবি আমাদের দিয়েছেন জন্মান্ধের কবিতাগুচ্ছ (১৯৬৭), কবিতা কোম্পানি প্রা. লি.(১৯৮২), মাছ সিরিজের (১৯৮৪) মতো কবিতার বিপুল সম্ভার। যার অন্তর জগতের চিন্তা চেতনা আমাদের কবিতার ধারাকে বেগবান করে তোলে। জন্মান্ধের কবিত্গুচ্ছ কবিতার ভেতর দিয়ে তিনি কবিতার নতুন পথ অবলম্বন করে না হাঁটা পথে হেঁটে বুঝিয়েছেন না চলা পথে চলতে শেখা। বাংলা কবিতায় এ এক স্পর্ধা প্রদর্শন। যে সময় কবিতার প্রতি মানুষের বিদ্বেষ আর কবিতার নামে দুর্বল লাইনে প্রতিস্থাপনে প্রাণদনা সেইসময় আবদুল মান্নান সৈয়দ নির্মাণ কবিতার এক নতুন শহর। যেখানে কবিতার শ্রী ও সুর দুটোই বিদ্যমান। এ কবিতা নির্মাণ বলতে মানুষকে দেখিয়ে দেয়া শিল্পের প্রবাহিত রূপ রস। জন্মান্ধের কবিতাগুচ্ছে কবি সৃজন করলেন এক গদ্য ছন্দের, শব্দের ঐশ্বর্য, আর কবিতা রুচির এক ইমারত যার সৌন্দর্য আর লাবণ্যের শোভামণ্ডিত কবিতা যা সমকাল তো বটেই উত্তরকালেও প্রশংসাযোগ্য।

প্রবন্ধ সৃষ্টিতেও তার বিচিত্র চিন্তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতিপ্রবণ সৌন্দর্যের সন্ধান মেলে। অনুভূতিপ্রবণ বলছি এ কারণে তার অধিকাংশ প্রবন্ধে ব্যক্তিগত কল্পনা শক্তির পরিচয় মেলে। তবুও তার প্রবন্ধে দার্শনিক চিন্তার উদ্ভাস বিদ্যমান। সাহিত্যের গূঢ় তথ্যানুসন্ধানের সূত্র ধরে তিনি আলোকপাত করেছেন ধূলোপড়া সাহিত্যে অনালোচিত বিষয়গুলোও। আবদুল মান্নান সৈয়দের গবেষণাগ্রন্থ ‘শুদ্ধতম কবি’ (১৯৭২) প্রকাশিত হওয়ার মাধ্যমে তিনি চিহ্নিত হন প্রাবন্ধিক হিসেবে এবং এ গ্রন্থটি প্রকাশের সাথে সাথে তিনি এতটাই আলোচিত হন যে তার কবি, গল্পকার পরিচয় ছাপিয়ে প্রবন্ধকার বা গবেষক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেন। এই গ্রন্থটি রচিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সমগ্র বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দকে নিয়ে মাত্র চারটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তবুও এগুলো ব্যাপক অর্থে নয়। অম্বুজ বসুর ‘একটি নক্ষত্র আসে’ (১৯৬৩), সঞ্জয় ভট্টাচার্যের ‘কবি জীবনানন্দ দাশ’ (১৯৭০), গোপালচন্দ্র রায়ের ‘জীবনানন্দ’ (১৯৭১), এবং অন্যটি জীবনানন্দের স্ত্রী লাবণ্য দাশের ‘মানুষ জীবনানন্দ’ (১৯৭১)। এসব গ্রন্থ প্রকাশিত হলেও আবদুল মান্নান সৈয়দ একমাত্র স্বাতন্ত্র্য ব্যক্তি যিনি শুদ্ধতম কবি নামে বিশিষ্ট একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন যা সমালোচনা সাহিত্যেও এক বিরল দৃষ্টান্ত। এছাড়াও তিনি সাহিত্যের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত বিষয় নিয়েও সক্রিয় ছিলেন। কাজ করেছেন নজরুল ইসলাম : কবি ও কবিতা (১৯৭৭), দশ দিগন্তের দ্রষ্টা (১৯৮০), বেগম রোকেয়া (১৯৮৩), করতলে মহাদেশ (১৯৮৯), ফররুখ আহমদ: জীবন ও সাহিত্য (১৯৯৩), বাংলা সাহিত্যে মুসলমান (১৯৯৮), রবীন্দ্রনাথ (২০০১), আধুনিক সাম্প্রতিক (২০০১), ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত থেকে শহীদ কাদরী (২০০৮), এছাড়া মোহিতলাল মজুমদার, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, কায়কোবাদ, শাহাদাত হোসেনকে নিয়েও তিনি তাত্ত্বিক সমালোচনায় সক্রিয় ছিলেন।

মুসলমানদের বাংলা সাহিত্যের অবদান নিয়ে ও সেই সময় তাদের ভূমিকা বা তাদের সাহিত্যের অবদানের যথার্থ মূল্যায়ন করতে তিনি সক্ষম হন। তিনি জানতেন কোনো সময়ের সাহিত্যকে সমালোচিত করতে হলে সেই সময়কে ধরতে হবে এবং অনালোচিত বিষয়কে তুলে আনতে হয়। যে কারণে তিনি আজ একজন আধুনিকতাবাদী সমালোচক হিসেবেই সমধিক পরিচিত।