আবহমান ও অন্যান্য॥ মোহাম্মদ নূরুল হক



লালরাত্রির কসম

লালরাত্রির কসম—এই নীলরাত্রির কসম
আমার আকাশ জুড়ে একটিই চাঁদ
অনন্ত তৃষ্ণায় আমি পুড়ি, আর পোড়ে
রাগি রোদ্দুরের চৈত্রে গেরুয়া বাউল;
আমাদের রাত্রি তবু সুর তোলে চির বিরহের।

কত না বরষা গেলো, কত না বাদল
কত প্রজাপতি উড়ে গেলো বিরান প্রান্তরে
কত অহঙ্কারে কুসুমেরা
ফিরিয়ে দিয়েছে চিরকাল
ভ্রমরের নিবেদন।
এইসব লিখে রাখে হৃদয়ের নীল ইতিহাস?

আহারে বেকুব কবি আজো তুই হৃদয়ের দাস।
আজো তুই নতজানু তেমনই বেকুব।
দ্যাখ, চেয়ে দ্যাখ
তোর হৃদয় রক্তাক্ত—ঝরছে ভীষণ রক্ত আজও
দ্যাখ ওই রক্তের স্রোতে
ভেসে যায় সবুজ প্রান্তর
কৃষকের ধানিমাঠ—ফসলের গোলা
পোয়াতি লাউয়ের ডগা কেঁপে কেঁপে উঠছে ভীষণ।
তবুদ্যাখ—সেই সুখী ফুলগুলোর কেমন অহম
তোর মৃত্যুর খবরেও বিচলিত হয় না কখনো।

আহারে বেকুব কবি—তবু তুই ভালোবেসে গেলি!


নিশাচর রাশির জাতক

রাত্রি যত বুড়ো হয়—তত জাগে নিশাচর রাশির জাতক
সম্ভ্রান্ত আন্ধারে দেখি উড়ে যায় ডানাঅলা হাঙর—কুমির
কপালে সিঁদুর মেখে যে নারী দেখায় সুখ চিকন সিঁথির
তার লগে কথা কই নিশিজাগা কোনো এক নাদান রীতির।

এইভাবে চুপচাপ চলে যায়, দিনরাত, সপ্তাহ ও মাস
গর্দানের তেজ নিয়ে যেমন গর্জন করে গাঢ়ো লাল ষাড়
তেমনই একরোখা নির্ঘুম রাত্রি কেবলি: আমি ও ভয়াল
আমারে ডরাও যদি, আমি দেব শর্তহীন প্রেমের করাল।

আহারে বেকুবরাত্রি। ভয় তো পেলো না মোটে—পরন্তু ক্ষেপিল
কেড়ে নিলো বাকি ঘুম। নিভে গেলে তারাগুলো সোনারবরণ—
আমাকে দেখায় ভয়, আমি যেন দূরাগত বেকুব পথিক।
ভুলেছি নিজের নাম, গ্রামের ঠিকুজি আর রসের মরণ!

আয় তবে তন্দ্রাহীন—আয় এই না দানের বুকের গহিনে
কেমনে মিটা বিতৃষ্ণা আদিগন্ত প্রেমহীনে শরাব বিহনে?


আবহমান

আকাশে ফুটেছে ফুল আলেয়ার নামে
নেমেছে প্রেমের চাঁদ মেঘেদের খামে।
মেঘে-মেঘে রটে গেলে প্রণয় খবর
তারাদের গ্রামে ছোটে প্রেমিকপ্রবর।
হৃদয়ে হৃদয়ে বাজে নূপুরে নূপুর
বৃষ্টি ভেজা মন খোঁজে ঝুলন্ত দুপুর।
প্রেমিক পুরুষ গেলে প্রেমিকার পানে
চতুর রাধিকা ছোটে বণিকের টানে।

রাত যত বাড়ে তত প্রেমিকের মনে
কত শত শঙ্কা জাগে ক্ষণে—প্রতিক্ষণে
সুদূরে প্রেয়সী গেছে হলো বহুদিন
বুকের পাঁজরে তাই ব্যথা চিনচিন।
লাইলীকে খুঁজে-খুঁজে মজনু যখন
ঘুরছিল পথে পথে আঁধারে তখন।
পাহাড়ের বুক চিরে উঠলো আওয়াজ
ভালোবাসি—ভালোবাসি ভুলে লোকলাজ।
লখিন্দর উঠে আসে বেহুলার পানে
চতুর বালিকা ছোটে বণিকের টানে।

রূপকথা—উপকথা—লোককথা শুনে
পথ কাটে প্রেমিকের দিন গুনেগুনে।
ফাগুনে আগুন ফোটে আজ যার মনে
তারে খুঁজে ফিরে যায় কোকিলেরা বনে।
পাখিরাও ভুলে যায় নিজেদের গান
হরিণী স্বভাব নারী করে আনচান।
বৈষ্ণবীও পথ ভোলে বাউলের গানে
চতুর রমণী ছোটে বণিকের টানে।

প্রেমিক কবির পুঁজি কেবল হৃদয়
তাই দিয়ে প্রেমিকার কী এমন হয়।
প্রেমিকা তো চায় শুধু অঢেল সম্পদ
পুরুষের সাধ্য নেই দেয় সব পদ।
তাই কাঁদে প্রেমিকেরা হারিয়ে সে প্রেম
রাধাহারা বৃন্দাবনে কাঁদে একা শ্যাম।
জুলেখা রে ফিরে পায় ইউসুফ-প্রাণে
চতুর গোপিনী ছোটে বণিকের টানে।