আবুল মনসুর আহমদের ছোটগল্প ॥ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ


কঠিন জীবন বোধের রসিক শিল্পী আবুল মনসুর আহমদ। তাঁর ব্যঙ্গ-রসিকতার আড়ালে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে জীবনের কঠিন সত্য। ব্যক্তি আবুল মনসুর আহমদের প্রথাবিরোধী চিন্তা সাহিত্যচর্চায়ও প্রভাব বিস্তার করে। তাই তার ছোটগল্পে আমরা প্রথাবিরোধী চিন্তা-চেতনার উন্মেষ লক্ষ্য করি। যদিও ব্যাঙ্গাত্মক রচনা হিসেবেই সেগুলো বেশি জনপ্রিয়। তবুও তার মতো করে এমন ব্যঙ্গাত্মক সুরে শিক্ষা দিতে আর কেউ পেরেছেন কি-না, তা গবেষণার বিষয়ও বটে। তার প্রথাবিরোধী চিন্তায় ব্যঙ্গাত্মক রচনা দারুণভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে।

প্রথা বা রীতি হচ্ছে সুদীর্ঘকাল থেকে চলে আসা যেকোন ধরনের আচার-অনুষ্ঠান, নিয়ম-কানুন, বিধি-নিষেধ, বিশ্বাস অথবা কর্মকাণ্ড যা অধিকাংশ সাধারণ জনগণ বা সমাজ কর্তৃক যুগ যুগ ধরে বিনাদ্বিধায় পালন করাসহ মেনে আসছে। বিষয়গুলো সাধারণত একই দেশ, সংস্কৃতি, সময়কাল কিংবা রীতি-নীতির দ্বারা প্রথা পালন করা হয়ে থাকে ও আপনাআপনি গড়ে ওঠে। যদি কোন কিছু একই ধরন বা পদ্ধতি অনুসরণপূর্বক পালন করা হয় কিংবা একযোগে বা একই নিয়মে অনুসৃত হয়, তাহলে তা সামাজিক আইন, সনাতনী প্রথা বা প্রাচীন রীতি নামে পরিচিত। সংস্কৃতি শব্দের সাথে প্রথা বা রীতি শব্দের যথেষ্ট মিল রয়েছে। সামগ্রিকভাবে প্রথা মূলত প্রতিপালন ও চর্চার বিষয়। অন্যদিকে সংস্কৃতি একগুচ্ছ চিন্তাধারা বা প্রথার সমষ্টিবিশেষ, যা মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করে জীবনকে সচল ও গতিশীল রাখে।

আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন এসব প্রথার বিরোধী। তার সে চিন্তার ধারা আমরা লক্ষ্য করি তার ছোটগল্পে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা রীতির বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন তিনি। প্রতিবাদ করেছেন কঠিন ভাষায়। হাস্যরসের মধ্য দিয়ে কঠিন জীবন বোধের কথা তুলে ধরেছেন গল্পে। তবে আবুল মনসুর আহমদের লেখায় শুধু হাস্যরসই মূল উদ্দেশ্য ছিল না। হাসতে হাসতে কঠিন জবাব দিতেই তিনি পছন্দ করতেন। সে সবের প্রমাণ পাই আমরা ‘আয়না’ ও ‘ফুড কনফারেন্স’সহ অন্যান্য গ্রন্থে।

আবুল মনসুর আহমদের গল্পগ্রন্থ ‘আয়না’। আয়নার প্রথম গল্প ‘হুযুর কেবলা’। এ গল্পে এমদাদ নামের এক কলেজ ছাত্র ক্রমশ নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ক্রমান্বয়ে হুযুরের কবলে নিজেকে বিসর্জন দিতে থাকে। এরপর একদিন হুযুর তার মুরিদের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করলে তার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে এমদাদ মুরিদদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়, সেই বিষয়টি উন্মোচিত হয়। ‘হযুর কেবলা’ ধর্ম ব্যবসায়ীদের লোভ ও লালসা চরিতার্থ করার বাস্তব ঘটনা, যা অশিক্ষা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন দরিদ্র বাঙালি মুসলমান সমাজের বাস্তব দলিল। আবুল মনসুর আহমদ ধর্মের নামে এসব ভণ্ডামীর এক অসাধারণ চিত্রনৈপুণ্য ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মাধ্যমে চিত্রিত করে সাহসের পরিচয় দিয়েছেন।

লেখকের ‘বিদ্রোহী’ গল্পটি ইংরেজ বিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবী দলের কর্মী ও নেতার স্ববিরোধীতার স্যাটায়ার। ‘ধর্ম-রাজ্য’ হিন্দু ও মুসলমানের সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও ইংরেজের ভূমিকার আক্ষরিক চিত্র। আয়না গ্রন্থে তিনি যেমন ধর্ম ব্যবসায়ী, ফতোয়াবাজ, মৌলবাদী, স্বার্থপর, সুবিধাবাদী রাজনীতিক দেখিয়েছেন; তেমন আবার বাংলার দুই প্রধান সম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলমান সমাজের সাম্প্রদায়িকতাকে সমান তীব্রতার সঙ্গে ব্যঙ্গ, পরিহাস, সমালোচনা করেছেন। ‘আয়না’ গ্রন্থের সমালোচনায় তাই তাকে দুর্ধর্ষই বলতেই হবে। সেই সাথে আর একটি বিষয়, আবুল মনসুর আহমদ তার রচনার বিষয় অনুযায়ী প্রচুর আরবি-ফারসি-ইংরেজি শব্দের ব্যবহার করেছেন। এসব শব্দ ব্যবহার করায় গল্পের শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে। এতে গল্পের কাহিনি, চরিত্র, সংলাপ, দৃশ্যপট বাস্তবিক হয়ে উঠেছে। তার রচনার ফর্ম শিল্পবোধকে করেছে তীক্ষ্ণ।

আয়নার মতোই ‘ফুড কনফারেন্স’ আবুল মনসুর আহমেদের আরেকটি রচনা। একে লেখকের শ্রেষ্ঠ পলিটিক্যাল স্যাটায়ারও বলা যায়। অন্নদাশঙ্কর রায় এ সম্পর্কে বলেছেন, ‘আবুল মনসুর আহমেদ ফুড কনফারেন্স লিখে অমর হয়েছেন। আসলেই, ব্যঙ্গাত্মক লেখার মাধ্যমে বাংলার তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সমাজকে সেইসাথে সমাজের মানুষের চরিত্র যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তা নিঃসন্দেহে অনবদ্য।’

এই বইতে রয়েছে বিভিন্ন স্বাদের নয়টি ছোটগল্প। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ফুড কনফারেন্স, সায়েন্টিফিক বিযিনেস, লঙ্গরখানা, গ্রো মোর ফুড, জমিদারি উচ্ছেদ ইত্যাদি। প্রতিটি গল্পই ভিন্ন স্বাদের, কিন্তু মূল ভাবধারা এক। তা হলো, সমাজের সুবিধাবাদী, স্বার্থান্বেষী রূপ। এখানেও লেখকের প্রথাবিরোধী চিন্তাধারা প্রস্ফুটিত হয়েছে। গল্পগুলোর সময়কাল বাংলা ১৩৫০-১৩৫৪ সাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর উপমহাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা এর উপজীব্য। দুর্ভিক্ষে মানুষের মানবেতর জীবন তার সাথে সাথে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থপরতা, উদাসীনতা ক্ষেত্রবিশেষে নির্বুদ্ধিতা, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার-এ সবই ফুটে উঠেছে গল্পগুলোতে। সময়কাল আজ থেকে বহু বছর আগে হলেও, আজও এর গল্পগুলো ঠিক একইরকম প্রাসঙ্গিক। তাই তো লেখকের চিন্তার ধারা যুগে যুগে প্রবহমান। সেই ধারায় নব্য আধুনিক সমাজও সিক্ত হয়েছে।

যে গল্পের নামানুসারে এ বই; সেই ‘ফুড কনফারেন্স’ গল্পে দেখা যায় সমসাময়িক দুর্ভিক্ষের বাস্তব চিত্র। সেখানে শেরে-বাংলা, মহিষে বাংলা, সিংগীয়ে বাংলা ইত্যাদি চরিত্রের মাধ্যমে লেখক দেখিয়েছেন, সমাজের সাধারণ মানুষের যে সমস্যা, দুঃখ-দুর্দশা, দুর্ভিক্ষ-তাতে নীতি নির্ধারক পর্যায়ের নিষ্ঠুর উদাসীনতা। সমাজের নীতি নির্ধারক পর্যায়ে কিছু অবাস্তব নীতি নির্ধারণ, সমাজের মূল সমস্যাকে চিহ্নিত করার অনীহা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, মিটিং-কনফারেন্সের নামে অহেতুক কালক্ষেপণ আর ভোজনবিলাস-এরকম নানা অসঙ্গতি। একপর্যায়ে এসব জটিল সমস্যা সমাধান করতে না পারার দরুন দুর্ভিক্ষে মানুষের করুণ মৃত্যু এবং সমাজে মানুষহীন হয়ে যাওয়ার শেষ পরিণতি।

যদিও এটি রম্যগল্প, কিন্তু এই রম্যগল্পের মধ্য দিয়েই সমাজের নিষ্ঠুর এবং করুণ বাস্তব চিত্র এখানে তুলে ধরেছেন। সবশেষে তাই তার সৃষ্ট চরিত্র ছাগলে বাংলার জবানিতে লেখক উচ্চারণ করেছেন, ‘কিন্তু শেরে বাংলা, হাতিয়ে বাংলা, শুধু জানোয়ারের বাংলায় আমরা বেঁচে রইলাম। আর মানুষে বাংলার যা আছে সবাই মরে গেল।’ পশু-এ-বাংলাকে জিন্দাবাদ আর মানুষ-এ-বাংলাকে মুর্দাবাদ জানিয়ে শেষ হয়ে যায় প্রহসনমূলক সেই ফুড কনফারেন্স।

‘সাইন্টিফিক বিজনেস’ গল্পটিতে দেখা যায় ব্যবসায় বাঙালির অসততার নির্মম রূপ। ব্যবসায় বাঙালির সীমাহীন লোভ-লালসা যে কতখানি ভয়ংকর হতে পারে, সেটাই এই গল্পের মূল প্রতিপাদ্য। গল্পের শুরুতেই, বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বাঙালিকে কেরানির পেশা ছেড়ে ব্যবসায় উদ্যোগী হতে বলেছেন, কেরানিগিরি ছেড়ে ব্যবসার সূচনা করতে বলছেন। তার বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে আজিজ ও নরেন নামে দুই বাঙালি বন্ধু ব্যবসা করার উদ্যোগ নেয়। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে তারা তাদের মাড়োয়ারি বন্ধুর সাথে পরামর্শ করতে বসে। মাড়োয়ারিরা জাত ব্যবসায়ী, বাঙালি ব্যবসার পরিকল্পনায় আজিজ আর নরেনের অসততা এবং ধূর্ততা দেখে মাড়োয়ারি বন্ধু তাদের সঙ্গ ত্যাগ করেন। এতটা অসৎ হয়ে ব্যবসা করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

আজিজ ও নরেনের উদ্যোগে ‘নিখিলবঙ্গ বণিক সংঘ’ গঠন করা হয়। বাঙালি জাতির কল্যাণার্থে সেই সঙ্ঘ ব্যবসা শুরু করে। তাদের ব্যবসায় এতই বেশি ধূর্ততায় ভরা ছিল যে, এক পর্যায়ে তাদের অসততার কারণে, তাদের ব্যবসার দুই নম্বরীর কারণে বাঙালি জাতি একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এমনকি এই অসততার চক্রে পতিত হয়ে একসময় তাদের আত্মীয়রা এবং সবশেষে তারা নিজেরাও একদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এভাবে পৃথিবীর বুক থেকে ঐতিহাসিক একটি জাতি-বাঙালি জাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বাঙালি জাতির জন্য কাঁদবে এমন একটি লোকও অবশিষ্ট থাকে না।
গল্পের সবশেষ অংশে দেখা যায়, শেষ বিচারের পর বাঙালিকে জাতিশুদ্ধ জাহান্নামে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানেও অসততা এতটাই প্রকট হয়ে ওঠে যে, তাদের দুর্নীতির প্রভাব জান্নাত-জাহান্নামে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাদের শঠতা আর দুর্নীতির কাছে বেহেশত ও দোজখের প্রহরীরাও নিরুপায় হয়ে যায়। সব কিছু দেখে-শুনে স্রষ্টা, তার সৃষ্ট এই অদ্ভুত বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেন এবং যেখানে যেখানে বাঙালি জাতির জন্ম হয়েছিল, সেখানে হাইজেনিক মেজার হিসেবে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দিতে বলেন। নিঃসন্দেহে এটি এই প্রহসনমূলক রচনার শ্রেষ্ঠ অংশ। এখানেই লেখকের প্রথাবিরোধী চিন্তার সার্থকতা। তিনিই কেবল এমনভাবে ভাবতে পেরেছিলেন। তার সেই ভাবনা এখনো পাঠককূলকে ভাবিয়ে যাচ্ছে।

‘রিলিফ ওয়ার্ক’ গল্পটি দুর্নীতিপরায়ণ বাঙালির চিরাচরিত এক প্রতিচ্ছবি। যে চরিত্র বাঙালির আগেও ছিল, আজও বদলায়নি, ভবিষ্যতেও কোনদিন বদলাবে কি-না জানা নেই। গল্পের প্রধান চরিত্র হামিদ একজন কর্মচারী। দেশের প্রবল বন্যায় পীড়িত মানুষের দুর্দশা দেখে তার মন কাঁদে। সে কিছু করতে চায় দুর্দশাগ্রস্ত এই লোকদের জন্য। হামিদের সামান্য সামর্থের মধ্যে তার বেতনের টাকার একটি বড় অংশ সে রিলিফ কাজের জন্য দিয়ে দেয় এবং এজন্য তাকে পরবর্তীতে ধন্য ধন্য করে রিলিফ কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট করে নেওয়া হয়। পরে সে দেখতে পারে যে, রিলিফের নামে আসলে কতখানি অসততার চর্চা হয়। আর্তমানবতার সেবার জন্য অফিস থেকে ছুটি মঞ্জুর করে রিলিফ ওয়ার্কে যোগদান করে।
সে দেখে রিলিফের নামে চলছে সেখানে আরও বড় প্রহসন। ক্ষুধার জ্বালায় রুগ্ন-দুস্থ মানুষগুলো যখন রিলিফের জন্য আকুল হয়ে আসে, তখন তাদের সাথে যে দুর্ব্যবহার করা হয়। এক টিকিটে পেন্সিলের দাগ মুছে আবার যাওয়ার জন্য যে অসততাটুকু তারা করে-সেটুকুও তাদের ক্ষমা করা হয় না। অথচ অপর দিকে দেখা যায় যে, সমাজের তথাকথিত ভদ্রলোক যারা আছেন; তাদের আদতেই সাহায্যের কোনো দরকার নেই। তাদেরকে বস্তা ভরে ভরে রিলিফের ত্রাণসামগ্রী, খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিয়ে আসা হয়। যেখানে শত শত লোক বন্যা পীড়িত হয়ে দু’বেলা ঠিকমতো খেতেও পারছে না, সেখানে দেখা যায় কমিটির লোকেরা খাদ্য বিলাসে মত্ত হয়ে আছে।
হামিদ জিনিসগুলো মেনে নিতে পারে না। কর্তৃপক্ষের সাথে তাদের বেশ বাকবিতণ্ডা হয় এই নিয়ে। পরিস্থিতি চরমে চলে যায়, যখন সে দেখতে পায় এ বঞ্চিত দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষ, বন্যা পীড়িত মানুষগুলো ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে রাতের অন্ধকারে রিলিফ কমিটির গোডাউন থেকে চালের বস্তা চুরি করতে আসে এবং ধরা পড়ে যায়। এই অপরাধে শত শত গ্রামের লোককে পরবর্তীতে রিলিফ কমিটির সহায়তায় পুলিশ হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যায়। কঠিন বিচার হয় শেষে। তাদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। হামিদ আর সহ্য করতে পারে না। এমন দুর্দশা দেখে রিলিফের কাজে ইস্তফা দিয়ে হামিদ পরের দিনই চাকরিতে যোগদান করে। এভাবেই শেষ হয়ে যায় হামিদের রিলিফ ওয়ার্কের আগ্রহ। আসলে এখানে হামিদ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রতিভূ-যারা দেশের জন্য কিছু করতে চায়। কিন্তু একসময় তাদের এই চেষ্টা বাধা পড়ে যায় সিস্টেমের সমস্যার কারণে।
সম্প্রতি করোনা দুর্যোগেও এমন চিত্র আমরা দেখতে পেয়েছি। সংবাদের শিরোনাম হয়ে ত্রাণ চুরি, চাল চুরি অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন অনেক অসৎ জনপ্রতিনিধি। দুর্যোগ কবলিত মানুষ ত্রাণ না পেয়ে ট্রাক থামিয়ে চাল-ডাল লুট করেছে। ত্রাণ চুরি করতে বাধ্য হয়েছে। পার্থক্য শুধু সময়ের।

আরও উল্লেখ করা যেতে পারে ‘গ্রো মোর ফুড’র কথা। গল্পে রাজা হবুচন্দ্র আর তার মন্ত্রী গবুচন্দ্রকে নিয়ে এসে গাঁজার চাষ করে খাদ্যসমস্যা সমাধানের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে লেখক কৃষির অব্যবস্থাপনার গল্পই শুনিয়েছেন। ‘জমিদারী উচ্ছেদ’-এ মুন্সিজি কিংবা ‘জনসেবা য়ুনিভার্সিটি’র ইয়াকুব থেকে লর্ড জ্যাকব-এরা সমাজের সুবিধাবাদী ক্ষমতালোভীদের প্রতিভূ। মানুষের সেবার নামে কীভাবে নিজের আখের গোছানো যায় সেটাই দেখা গেছে। বইয়ের গল্পগুলো পড়ে একটি জিনিসই উপলব্ধি হয়, তা হলো-মানুষের মানসিকতা যদি অসৎ হয়, তাহলে সেই অসৎ উদ্দেশ্যকে হাসিল করতে মানুষ নানা যুক্তি-কুযুক্তির শরণাপন্ন হয়। এর বিপরীতে যারা ভুক্তভোগী-তারা থাকে নীরব-অসহায়।

এ ছাড়া ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত আরেক ব্যঙ্গরচনার সংকলন ‘আসমানী পর্দা’য় আবুল মনসুর আহমদ পাকিস্তানি শাসনামলে চরিত্র ঠিক রাখার জন্য নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে হাস্যকর পর্দাপ্রথা প্রচলনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তাকে ব্যাঙ্গাত্মকভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। এ গ্রন্থের অন্যান্য গল্প ‘খাজাবাবা’, ‘নিমক হারাম’ প্রভৃতি গল্পেও স্বার্থন্বেষী মানুষের আপন স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত কূটকৌশল উন্মোচনের মাধ্যমে তাদের প্রতি লেখকের ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে। ‘আদুভাইয়ে’র মতো অসাধারণ রস রচনাটিও এ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। যে আদুভাই এখনো মানুষের মুখে মুখে। লেখকের সৃষ্ট চরিত্র আজও মানুষের অনুভূতিতে জীবন্ত হয়ে আছে। তারই ধারাবাহিকতায় আবুল মনসুর আহমদের সর্বশেষ ব্যঙ্গরচনার সংকলন ‘গালিভারের সফরনামা’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৯ সালে। লেখক পাকিস্তানি শাসনামলের রাজনীতির নানা ত্রুটি-বিচ্যুতিসহ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের অনিয়ম এবং বিশৃঙ্খলার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন সেখানে। এটি মূলত একটি রাজনৈতিক ব্যঙ্গ।

স্বল্প পরিসরে আবুল মনসুর আহমেদের গল্পের ব্যবচ্ছেদ করা সম্ভবপর নয়। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ, নিরীক্ষা, গবেষণা দরকার। যারাই তার গল্প নিয়ে আলোচনা করেছেন; তাতে উঠে এসেছে দীর্ঘ ইতিহাস। এমনকি তাঁর প্রথাবিরোধীতার স্বরূপ, চিন্তার ধারা তাতে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আবুল মনসুর আহমদের ছোটগল্পে প্রথাবিরোধী চিন্তাধারা সম্পর্কে ‘আয়নার ফ্রেম’ নামক ভূমিকায় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন-‘এমনি আয়নায় শুধু মানুষের বাইরের প্রতিচ্ছবিই দেখা যায়। কিন্তু আমার বন্ধু শিল্পী আবুল মনসুর যে আয়না তৈরি করেছেন, তাতে মানুষের অন্তরের রূপ ধরা পড়েছে। যে সমস্ত মানুষ হরেক রকমের মুখোশ পরে আমাদের সমাজে অবাধে বিচরণ করছে, আবুল মনসুরের আয়নার ভেতরে তাদের স্বরূপ মূর্তি মন্দিরে, মসজিদে, বক্তৃতার মঞ্চে, পলিটিকসের আখড়ায়, সাহিত্য সমাজে বহুবার দেখেছি বলে মনে হচ্ছে।’

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের একটি বক্তব্য উল্লেখ করার মতই, ‘পরশুরাম হিন্দু দেবদেবী নিয়ে অনেক কিছু বলেছেন, হিন্দু সম্প্রদায় তা সহ্য করেছে। আবুল মনসুর আহমদের দুঃসাহস সেদিন সমাজ সহ্য করেছিল। আজ কোনো সম্পাদক এমন গল্প ছাপতে সাহস করবেন কিনা এবং সমাজ তা সহ্য করবে কিনা সে-সম্পর্কে আমার সন্দেহ আছে। আবুল মনসুর আহমদের আক্রমণের লক্ষ্য কোনো ব্যক্তি, ধর্ম বা সম্প্রদায় নয়, তার বিদ্রোহ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। আয়না প্রকাশের এতকাল পরেও মনে হয়, এরকম একটি গ্রন্থের প্রয়োজন আজো সমাজে রয়ে গেছে।’

আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন একজন সমাজ সচেতন এবং জীবনঘনিষ্ঠ সাহিত্যিক। সমাজের সব ধরনের অপসংস্কৃতি এবং কুসংস্কার নিজে অনুভব করার পাশাপাশি তা সাহিত্যের পাঠকদের সামনে উন্মোচিত করার মহান দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। ব্যঙ্গ এবং বিদ্রুপের মাধ্যমে মূলত সমাজ, জাতি এবং রাষ্ট্রকে জাগিয়ে তোলার প্রয়াস চালিয়েছেন আজীবন। তাই বর্তমান সময়ে এসে আবুল মনসুর আহমদ চর্চা আমাদের জন্য আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আবুল মনসুর আহমদের প্রয়াণের এতো বছর পর এসেও মনে হয়-আমরা কি তাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পেরেছি? শিক্ষাজীবনে পাঠ্যপুস্তকে তার লেখাও যেন সীমাবদ্ধ হয়ে আসছে। জোর গলায় বলতে পারি, সমকালে দাঁড়িয়ে তার মতো অকুতোভয়ে এমন ব্যঙ্গাত্মক তীর আর কেউ নিক্ষেপ করতে পারেননি। তার নিক্ষিপ্ত সেই তীর এখনো বিদ্ধ হয় ভণ্ড পীরের, ভণ্ড রাজনীতিকের এবং অসাধু ব্যবসায়ীর অন্তরে। একজন সার্থক জীবন শিল্পী ছিলেন তিনি। তাই তো তার প্রথাবিরোধী চিন্তার ধারা আজও প্রবাহিত পাঠকের অন্তরে। পাঠকের আশেপাশে এখনো ঘুরে বেড়ায় তার সৃষ্ট চরিত্র।