আবুল হাসনাত : আমাদের হৃদয়ে থাকবেন অনন্তকাল ॥ শিউল মনজুর



আবুল হাসনাত, প্রিয় হাসনাত ভাই। চলে গেলেন, যেনো হঠাৎ করেই চলে গেলেন, না ফেরার দেশে, যেখান থেকে কেউ কখনো ফেরে না, ফিরে আসে না। প্রিয় হাসনাত ভাইও আর ফিরবেন না। তার কাছে আর কবিতা নিয়ে ছুটে যেতে পারবো না, দেখবো না তিনি তন্ময় হয়ে নিরবে নিঃশব্দে সম্পাদনার গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে যাচ্ছেন, শুধু একবার তাকাবেন তারপর বলবেন, বসেন। তাকে আর বলতে পারবো না, হাসনাত ভাই কবিতাগুলো পড়ে দেখবেন। তিনিও বলবেন, ঢাকায় আসলে দেখা করে যাবেন। তিনি পেশায় ছিলেন সাংবাদিক। কিন্তু পুরোদস্তুর ছিলেন লেখক, লিখেছেন কবিতা, প্রবন্ধ, শিশুতোষ। কবিতা লিখতেন মাহমুদ আল জামান নামে। ছিলেন আপাদমস্তক আধুনিক মনের মানুষ।

দীর্ঘ সময় সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্বপালন করেছেন সংবাদ সাময়িকীর সাহিত্যপাতার এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত প্রসিদ্ধ সাহিত্য মাসিক কালি ও কলমের। তিনি এই সব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তৈরি করেছেন অসংখ্য লেখক, কবি। তাকে বলা হয় লেখক তৈরির কারিগর। সাহিত্য কাগজ কালি ও কলম এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেবার পর, প্রবর্তন করেছিলেন কালি ও কলম তরুণ লেখক পুরস্কার। মর্যাদাপূর্ণ এই পুরষ্কার তরুণ লেখক কবিদের অনুপ্রাণিত করতো।

এই অসাধারণ মানুষটির সঙ্গে আমার সম্পর্ক হৃদয়ের-আত্মার। তার সঙ্গে যতবার দেখা করতে গিয়েছি সংবাদ অফিসে অথবা পরবর্তীতে বেঙ্গলে (কালি ও কলম অফিসে) ততবারই লাল চায়ের সঙ্গে পেয়েছি বিনয় ও ভালোবাসার স্পর্শ। মমতার উষ্ণতা। ছিলেন স্বল্পভাষী। তার কথায় বার্তায় লেখায় সম্পাদনায় জীবন যাপনে তিনি ছিলেন পরিপূর্ণ একজন ভালো মানুষের প্রতিচ্ছবি। হঠাৎ করে দেশ ত্যাগের পূর্বে ২০১৭ সালে দেখা হয়েছিলো জাতীয় জাদুঘরের এক অনুষ্ঠানে। ওখানে গিয়েও পেয়েছি তার আন্তরিকতা ও ভালোবাসার ছোঁয়া। অনুষ্ঠানের বিরতিতে শিল্প সাহিত্য নিয়ে তিনি অনেকক্ষণ আমার সাথে কথা বলেছেন। এ আমার অনেক বেশি পাওয়া।

শেষবার তার সঙ্গে দেখা হয়েছিলো নিউইয়র্ক আর্ন্তজাতিক বই মেলায়। ক্ষণিকের জন্য, ২০১৮ সালে। সে মেলা থেকে সংগ্রহ করেছিলাম তার নির্বাচিত কবিতার বই। মিনিট পাঁচেক কথাও হয়েছিলো। মাস ছয়েক আগে এই করোনাকালের দুঃসময়েও ফোনে কথা হয়েছিলো। আশাও করেছিলাম এই ফেব্রুয়ারিতেই দেশে গেলে চিন্তাশীল, জ্ঞানী ও উচুমনের এই মানুষের সাহচার্য আবার পাবো। লাল চায়ে চুমুক দিতে দিতে অনুভব করবো তার হৃদয়ের উষ্ণতা, অনুভব করবো তার জীবন অভিজ্ঞতার নানাবাঁকের কথা। হলো না। বিধাতা না ফেরার দেশে নিয়ে গেলেন। ফেসবুক বন্ধুদের কল্যাণে ০১ নভেম্বর ২০২০ সকালে যখন হাসনাত ভাইয়ের চলে যাবার খবর শুনলাম, তখন মনটা বেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলো। বুকটা হাহাকার করে উঠলো। শিল্প সাহিত্যে তার মতো মানুষের শূন্যতা অপূরণীয়। তবে তিনি আমাদের মতো লেখকদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।

তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ মাত্র তিনটি। জ্যোৎস্না ও দুর্বিপাক, কোনো একদিন ভূবনডাঙায়, ভূবনডাঙার মেঘ ও নধর কালো বেড়াল। এই তিনটি কবিতাগ্রন্থের মধ্যদিয়েই তিনি নির্মাণ করে গেছেন তার আবেগ অনুভূতি ভালোবাসা স্বদেশ প্রেম ও চিন্তাধারার স্বতন্ত্র স্বকীয়তা। তার লেখালেখির আরেকটি প্রিয় বিষয় ছিল চিত্রকলা। এই বিষয়ে তার একটি প্রবন্ধের বই রয়েছে। বইটির নাম- জয়নুল, কামরুল, সফিউদ্দিন ও অন্যান্য। বইটি আমাদের চিত্রকলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এ ছাড়া তার আরেকটি প্রবন্ধের বই- সতীনাথ, মানিক, রবিশঙ্কর ও অন্যান্য। শিশুদের নিয়েও তার রচিত কয়েকটি গ্রন্থ রয়েছে। শিশুতোষ বইয়ের মধ্যে- ইস্টিমার সিটি দিয়ে যায়, টুকু ও সমুদ্রের গল্প, যুদ্ধদিনের ধূসর দুপুরে, রাণুর দুঃখ-ভালোবাসা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া চার্লি চ্যাপলিন, সূর্যসেন ও জসীম উদদীন কে নিয়ে লিখেছেন জীবনী। কালি ও কলমের সম্পাদক ছাড়াও তিনি বেঙ্গল থেকে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক শিল্প ও শিল্পীর সম্পাদকও ছিলেন। তার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৭ জুলাই ঢাকায়।