সাহিত্যচর্চায় পুনর্জন্ম ও অন্যান্য প্রসঙ্গকথা ॥ মাসুদুল হক




মাসুদুল হক, কবি, প্রাবন্ধিক। জন্ম ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি ঢাকার জিন্দাবাহারে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতকোত্তর, পরবর্তীতে পিএইচডি। শিক্ষকতা করছেন দিনাজপুর সরকারি কলেজে। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা বিশের অধিক। সম্পাদনা করেছেন, ‘শ্রাবণের আড্ডা’ নামের ছোটকাগজ। বগুড়া লেখক চক্র পুরস্কার ও চিহ্ন পুরস্কারে ভূষিত।
মাসুদুল হকের সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন তুষার শুভ্র বসাক
কবির জন্মদিনে আমাদের শুভেচ্ছা। স.স



তুষার শুভ্র বসাক : কেমন আছেন?
মাসুদুল হক : ভালো।

তু.শু.ব : গত নভেম্বরে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ”THE POET’ ম্যাগাজিন আপনাকে ‘International Poet of the Week’ বলে সম্বোধিত করায় শুরুতেই অভিনন্দন। এই বিষয়ে আপনার অনুভূতি জানতে চাই।

মা. হ: তোমাকেও অভিনন্দন। ভালো লাগছে যে, আমরা কথা বলছি। ইংল্যান্ডের ‘THE POET’ ম্যাগাজিনটি প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো। বর্তমানে রবিন ব্যারেট (Robin Barratt) ম্যাগাজিনটির সম্পাদক। ওরা প্রত্যেক সপ্তাহে বিশ্বের একজন কবিকে ‘International Poet of the Week’ বলে ঘোষণা করে। নভেম্বর মাসে কবিতা পাঠানোর সাত-আট দিনের মধ্যে রবিন ব্যারেটের রেসপন্স পেলাম। এরপরের সপ্তাহে (১৫ নভেম্বর ২০২০) আমাকে ”International Poet of the Week’ বলে ঘোষণা করে। এটি আমার জন্য বড় প্রাপ্তি। বিশেষ করে কবিতার ক্ষেত্রে। কেননা আমার জীবনে সাহিত্যচর্চার শুরু কবিতা দিয়েই। নব্বইয়ের দশক থেকে কবিতা লিখছি, কিন্তু নব্বইয়ের পর থেকে গদ্যসাহিত্য আর গল্পে নিজেকে নিবিষ্ট করেছিলাম। গবেষণার প্রয়োজনে আমি প্রফেসর ড. হায়াৎ মামুদ স্যারের তত্ত্বাবধানে ‘বাংলাদেশের কবিতার নন্দনতত্ত্ব’ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করি।
করোনাকাল শুরুর আগেও আমি ফেসবুকে ছিলাম না। আমার ছেলে জোর করে বলল এটা (ফেসবুক) ব্যবহার করতে। আমার ভেতরে যে কবি-মন আছে তা বুঝি। তাই চিন্তা করলাম ফেসবুক যখন ব্যবহার করতেই হচ্ছে তাহলে তাতে কবিতা লিখি। এই মনন থেকেই কবিতাগুলো আসতে থাকলো। লিখতে লিখতেই ভাবলাম কবিতাগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করি। অনেকে হয়তো সরাসরি ইংরেজিতে লেখে কিন্তু আমার দ্বারা সেটা হয় না। আমি আগে মাতৃভাষায় চিন্তা করি, সাজাই, লিখি তারপর সেটাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করি। এরইমধ্যে আমি বেশকিছু বিদেশি কবির কবিতা অনুবাদ করেছি। তারা সাহিত্যের বিভিন্ন ব্লক, জার্নালে লিখছে; আমাকেও বলে কবিতা পাঠাতে। টালি (Tali Cohen Shabtai) নামে ইসরাইলি কবি, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০-এ ‘International Poet of the Week” ঘোষিত হয়। তার সাথেও আমার কথা হয়। তারপর আমিও কবিতা পাঠালাম আর এরপরেই তো এই ঘোষণা। এটি হওয়াতে আমি খুব অনুপ্রাণিত। আমার কবিতা হয়তো কিছু হচ্ছে। আরেকটি বিষয়, আমার মাঝে যে কবিসত্তা রয়েছে তার একটি পরীক্ষাপর্ব হয়ে গেলো। এখন মনে হচ্ছে কবিতা নিয়ে আরও কাজ করা দরকার।

তু.শু.ব : ‘বাংলাদেশের কবিতার নন্দনতত্ত্ব’-এর কথা উল্লেখ করলেন। এই নন্দনতত্ত্বকে ঘিরে যদি কিছু স্মৃতিচারণ করতেন?

মা. হ: আমি বাংলা একাডেমি কর্তৃক বৃত্তি-গবেষক হিসেবে মনোনীত ও নির্বাচিত হয়েছিলাম। সেবছর তিনজন বৃত্তি-গবেষক নির্বাচিত হন। অপর দুজন হলেন- খালেদ হোসাইন ও দিপু আশফাক। সেসময় বৃত্তি-গবেষকের জন্য ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। মূলত আমার গবেষণার টপিক ছিল নন্দনতত্ত্বের ওপর। বাংলাদেশের কবিতার ওপর অনেকেই কাজ করেছে কিন্তু নন্দনতত্ত্ব নিয়ে খুব বেশী কাজ না হওয়ায় আমার এই টপিক নির্বাচনকে তারা সাধুবাদ জানান। যেহেতু গবেষক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। তখন ড. হায়াৎ মামুদ স্যার আমাকে নির্বাচিত করেন। হায়াৎ স্যারের ফেলো হওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার। তিনি খুব কম সংখ্যক ফেলো নির্বাচিত করেন। পিএইচডি সাধারণত আড়াই থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে করতে হয়। কিন্তু আমার পিএইচডি করতে আট-নয় বছর লেগেছে। এর পেছনে যে ব্যাপারটি কাজ করে, তাহলো স্যার ছাত্র হিসেবে যাদের নেন তাদের সহজে ছাড়েন না। ছাড়েন না বলতে, স্যার আক্ষরিক অর্থে ছাত্রদের গড়েপিটে নিতে চান। হায়াৎ স্যার নিজেও একজন ভালো গবেষক, ষাটের দশকের কবি ও গল্পকার। তার মধ্যে শিল্পচৈতন্যের যে জায়গাটা রয়েছে, সেটা খুব প্রবল। অতীতে টোলের পণ্ডিতেরা ছাত্রদের যেভাবে গ্রহণ করতেন, তাদের বাড়িতে এসে থাকতে হতো; হায়াৎ স্যারের বাড়িটিও তেমনই একটি আড্ডার জায়গা। স্যারের বাড়িতে বইয়ের যে সাম্রাজ্য রয়েছে, স্যার আমাদেরকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে কাজে আটকে রাখতেন। তিনি পর্যবেক্ষণ করতেন আমরা কী ধরনের বই পড়ছি, দেখছি। দেখা গেল সেসময় নন্দনতত্ত্বের কাজের জন্য কবিতা লেখার চেয়ে কবিতা পড়ার প্রতি মনটা বেশী ছিল। তাই কবিতা অভিমান করে বোধ হয় ফিরে গিয়েছিল। সেসময় স্যার শুধু বাসায় নয়, বাইরের কাজেও আমাদের সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। সেখানে আমাদের বন্ধু, ফিলোসফার, গাইড বলে পরিচয় দিতেন। একজন গবেষককে কাজে উদ্বুদ্ধ করার জন্য যা করার দরকার, তিনি তাই করতেন। স্যারের সাথে আমাদের জীবনযাপন ছিল অনেক আনন্দের। স্যার কাজ করছে, আমরাও কাজ করছি। স্যার ফাঁকি দিচ্ছে তো আমরাও ফাঁকি দিচ্ছি। পড়ছি, লিখছি আর এভাবেই আট-নয় বছর লেগে গেছে।

তু.শু.ব : করোনাকাল হিসেবে চিহ্নিত এই বৈশ্বিক সঙ্কটাবস্থায় মানবসভ্যতা ও সমাজব্যবস্থায় কীরূপ প্রভাব পড়েছে?

মা. হ. : এটা ঠিক যে করোনা আসাতে সারাবিশ্বের মানবসভ্যতা একটা সঙ্কটে পড়েছে। সঙ্কট বলতে একটি নতুন রূপ পেয়েছে। বিশ্বপ্রকৃতিকে নিয়ে ভাবনার আরেকটি জায়গা তৈরি হতে পারে, তা করোনা আমাদের শিখিয়েছে। আমরা যেভাবে প্রকৃতি-বিনাসী হয়ে উঠেছিলাম, সেই জায়গা থেকে করোনা আমাদের ফিরিয়েছে। কিন্তু মানবসভ্যতা যেভাবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল লাইফে এগিয়ে গিয়েছিল সেই জায়গাটা ব্যাহত হয়েছে, বিধায় আমরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি। আমাদের অনেক ইন্টেলেকচুয়াল মানুষ করোনার ভয়াল ছোবলে পড়েছে, ফলে অনেক প্রিয় মানুষকে আমাদের হারাতে হয়েছে। এটা অপূরণীয় ক্ষতি।

তু.শু.ব : করোনার প্রকোপে জনজীবন যখন বিপর্যস্ত ঠিক তখনই আমরা সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এক নতুন মাসুদুল হককে চিনতে-জানতে শুরু করেছি। এই নতুনত্বকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

মা. হ. : আসলে আমাদের যেমন একটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল লাইফ আছে চাকার সাথে জীবন, সময়ের সাথে চলবার। তেমনই আরেকটি জীবন রয়েছে সৃজনশীল। যখন আমাদের প্রাচীনসভ্যতার বিকাশ ঘটতে লাগল তখনও একটা মানুষের ভেতরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর সৃজনশীল লাইফ পাশাপাশি ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে তা ভাগ হয়ে গেছে। এখন ভেতরে সৃজন কাজ করে, আর ইন্ডাস্ট্রিয়াল লাইফের জন্য বিভিন্ন পেশায় আমাদের বাহিরে যেতে হয়। আমি কবিতা লিখি কিন্তু কবিতা দিয়ে তো অর্থনৈতিক যে প্রবৃদ্ধি দরকার বস্তুগতভাবে সেটা আসে না। সেই কারণে শিক্ষকতার সাথে জড়িত। অনেক কবি আছে যারা শ্রমজীবী জীবনের সাথে সংস্লিষ্ট। দেখা যাচ্ছে কবিরা সংসারে আছেন কিন্তু থেকেও নেই। যেনো রাজহংসের মতো; কাদায় আছে কিন্তু গা ঝারা দিয়ে শিল্পস্বরূপায় যেতে পারে। করোনার প্রকোপে অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, ঘরে পরে আছে। যারা সৃজনশীল মানুষ তাদের হয়তো একটা সুযোগ ঘটেছে নিজেকে জানার। নিজেকে জানতে হলে আত্মস্থ হতে হয়, আত্মমগ্ন হতে হয়, নিজের ভেতরে নিজে প্রবেশ করতে হয়। কিন্তু আমরা যান্ত্রিক-সভ্যতায় প্রবেশ করার কারণে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। আর এই করোনায় বাঁচার জন্য ঘরে ঢুকেছিলাম, ঢুকতে গিয়েই নিজের অস্তিত্বকে খুঁজেছি। এই জায়গা থেকে বলব করোনা আসার পর আমি আমার ভেতরের অস্তিত্বকে জানতে পেরেছি; আমার ভেতরে যে শিল্পের জায়গা কাজ করে, কবিতাবোধ কাজ করে তা উপলব্ধি করতে পেরেছি। আমি তো বলব এই জায়গায় আমার পুনর্জন্ম হয়েছে। আমরা দেখি শিল্প-সাহিত্যের লেখন পদ্ধতির সাথে যারা জড়িত, তারা সামাজিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, থাকতে হয় নইলে সৃষ্টি হয় না। ওরহান পামুক তার বাবার যে টিনের বাক্সটি পেয়েছিল তাতে বই, চিঠিপত্র, নোটবুক ছিল কিন্তু তাকে বছরের পর বছর ঘরে থেকে পড়তে, লিখতে হয়েছে। সালমান রুশদির (আহমেদ সালমান রুশদি) তো সংসার ভেঙে গেছে, কেননা তাকে ঘরে বসে লিখতে হয়। তার মানে যারা সৃজনশীল মানুষ তাদেরকে আগে আত্মমগ্ন হতে হয়। আমরা যারা শিক্ষকতা করি তাদের চিন্তার সময় থাকে কিন্তু আমরা চিন্তা করি না। চিন্তা না করায় আমরা ঠিক নিজেদের চিনতে পারি না। করোনা চিন্তা করার এই বিশেষ সুযোগ করে দিয়েছে। সেই কারণে যে নতুন মাসুদুল হকের কথা বলছ সেটা তোমাদের কাছে আবিষ্কৃত হয়েছে।

তু.শু.ব : তাহলে কী আমরা বলতে পারব করোনাকাল আপনার জীবনে শাপে-বর হয়ে দেখা দিয়েছে?

মা. হ. : শাপে-বরের সাথে তো অভিশাপের একটা ব্যাপার থাকে। করোনা হয়তো মানবসভ্যতার জন্য অভিশাপ কিন্তু প্রকৃতির জন্য নয়, বরং আমি বর বলব। আর ঐ প্রকৃতির অংশ হিসেবে যখন কবিতা লিখতে পারছি, তার মানে আমি প্রাকৃত মানুষ হতে পারছি, প্রকৃতিকে আত্মস্থ করতে পারছি। সেইক্ষেত্রে করোনাকে আমার জন্য একপ্রকার বর-ই বলব।

তু.শু.ব : সাহিত্যকে সময়ের পরিভাষায় শ্রেণিবিন্যাস করা হয়, করা হয়ে থাকে। করোনাকালের সাহিত্য কী সেভাবে বিশেষায়িত সাহিত্যধারা হিসেবে চিহ্নিত হবে?

মা. হ. : আমরা সাধারণত একাডেমিকভাবে সাহিত্যকে শ্রেণিবিন্যাস করি। এতে বিদ্যায়তনিক ব্যবস্থায় পড়ালেখা করতে সুবিধা হয়। চিহ্নিত করতেও সুবিধা হয়। আমাদের চিহ্নিত করার প্রবণতা রয়েছে। যে কারণে আমরা ক্লাসিক সাহিত্যের কথা জানি, রোমান্টিক পিরিয়ড এমনকি ভিক্টোরিয়ান পর্বের সাহিত্যের কথাও জানি। জানি এক্সপ্রেশনিস্ট, দাদাবাদ কিংবা সুরলিয়ালিস্ট সাহিত্যধারার কথা। সাহিত্য আবার বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। বিভিন্ন শিল্পচিন্তা, ব্যক্তিচিন্তার প্রভাব সাহিত্যে যখন পড়েছে, তখন একেকটির নামে সাহিত্যকে আমরা শ্রেণিবিন্যাস করেছি। তুমি উত্তরাধুনিকতার কথা বললে আর এখন পুনরাধুনিক সময় চলছে বলে অনেকে চিহ্নিত করছে। আমাদের পোস্ট-কলোনিয়াল যুগের সাহিত্যধারা তৈরি হয়েছিল। তার মানে সময়ের একটা অভিঘাত সাহিত্যের উপর পড়ে এবং পড়ে বলেই সাহিত্য সেসময়ের অভিঘাতে যে সৃষ্টিগুলো হয় তার একটা নতুন নাম, নতুন নিমিত্তি দিয়ে থাকে। ইউরোপে যখন শিল্পবিপ্লব হয় তখনকার সাহিত্য একধরনের, ইউরোপে যখন মানবতার উন্মেষ ঘটে মানে রেনেসাঁ পিরিয়ডে- সাহিত্যে একধরনের প্রভাব ছিল। তারপর দেখা যায় মানুষ যখন একদম স্বাধীন উত্তুঙ্গ মুহূর্তে চলে গেছে তখনও শিল্প-সাহিত্যের একরকম আন্দোলন হয়েছে এবং এর নামে সাহিত্যকে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে। আমরা ডাডা-ইজম বা দাদাবাদের কথা বলি, আমরা অ্যাবসার্ডিটির কথা বলি, আমরা অস্তিত্ববাদের কথা বলি এগুলো সবই বিভিন্নধরনের আন্দোলনের প্রভাব। বিশ্বের উদাহরণ দিয়ে যদি বলি- প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে এর মধ্যবর্তী সময়ে মানুষ নানামুখী সংকটে পড়েছে। আমরা দর্শনগতভাবে চিন্তায়- সার্বিকভাবে মানুষের কথা চিন্তা করতাম কিন্তু ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্ব যে সংকটে পড়েছে, সেই জায়গাটা কিন্তু কেউ দেখিনি। এর প্রভাব সেইসময় সাহিত্যের উপর পড়েছিল। জ্যাঁ পল সার্ত বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন এবং তিনি তার বিভিন্ন উপন্যাস-গল্প, সাহিত্যকর্ম, দর্শন-চিন্তায় অস্তিত্ববাদী চেতনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। জগতের প্রতিটি মানুষ তার পূর্ণাঙ্গ রূপের দিকে যেতে চায়। মানুষ অপূর্ণ; কেননা আমাদের অনেককিছু অপ্রাপ্তি থাকে, অনেককিছু চাওয়ার থাকে। এই চাওয়াটা আমরা ভেতর থেকে চাই যেন পূর্ণাঙ্গতার দিকে যেতে পারি। এইজন্যই জ্যাঁ পল সার্ত বলেছেন- মানুষ ঈশ্বর হতে চায়। অর্থাৎ আমরা ধরেই নেই ঈশ্বর পরিপূর্ণ। মানুষের এই পূর্ণতা নেই বলেই ঈশ্বরের কাছে চাওয়ার মাধ্যমে পূর্ণ হতে চায়। এই যে চেয়ার-টেবিল এগুলো আর অন্য কোনো রূপে পরিবর্তিত হবে না, একই অবস্থায় থাকবে। কিন্তু তোমার-আমার পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এটাই অপূর্ণতা। আমরা যদি পূর্ণ হতাম তাহলে পাথর হয়ে যেতাম। যাইহোক, এই করোনায় আমরা ঘরে বসে আছি যাতে গণসংযোগ না হয়, কেউ ছোঁয়াচে না হয়। আমরা ঘরে থেকেই যখন চিন্তা করছি, পড়ছি, লিখছি তাহলে সাহিত্যের একটা নতুন সৃজন হচ্ছে। এই সৃজনের চিহ্ন বা অর্থ হয়তো সমকালীন সময়ে আমরা বুঝছি না, চার-পাঁচ বছর পরে বুঝবো। কারণ এমন অনেক সাহিত্য আছে যাদের নাম ভুলে গেছি। আমরা তখনই কিছু মনে রাখি যখন তার একটা প্রভাব থাকে। ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে দেখছি করোনা নিয়ে অনেক সাহিত্যকর্ম রচিত হচ্ছে। এই সাহিত্যের মধ্যে যদি জৌলুস থাকে, সার থাকে তাহলে করোনা-সাহিত্য টিকে যাবে। তখন সাহিত্যের একটি নতুন বিশেষায়িত ধারা হিসেবে চিহ্নিত হতেই পারে।

তু.শু.ব : বিভিন্ন ভাষা ও সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উৎকর্ষসাধন- বিষয়টিকে কীভাবে প্রকাশ করবেন?

মা. হ. : বাংলা সাহিত্যের সুদীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। তার লিখিত রূপ চর্যাগীতিকা। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রাজ-দরবার থেকে যে পাণ্ডুলিপিটি উদ্ধার করেন, সেটি আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে আমাদের প্রাচীন সাহিত্যের রূপরেখার লিখিত রূপ পেয়েছি। লুই পা, কাহ্ন পা, কুক্কুরী পা, ভুসুক পা, শবর পা-এর মতো কবিরা যে কবিতা লিখেছেন, সেই সময়ের যে সামাজিক সঙ্কটগুলো তারা উপলব্ধি করেছেন, তাদের ব্যক্তি-উপলব্ধি, ব্যক্তি-অস্তিত্ব, কামনা-বাসনা, ভালোবাসা এসবই চর্যাগীতিকায় লিপিবদ্ধ আছে। আমরা এই ভাষাটাকে সান্ধ্য ভাষা বলি। কারণ- এরমধ্যে প্রতীকায়িত বিষয় রয়েছে, রূপ রয়েছে। অনেক ইঙ্গিত ও গূঢ়কথা নিহিত রয়েছে। সান্ধ্য ভাষার তুলনায় আমাদের বাংলা ভাষা অনেকটাই পাল্টে গেছে, কেননা ভাষা নদীর মত গতিশীল। পাল্টে যাওয়ার কারনে এখন চর্যাগীতিকা পড়তে গিয়ে অনুবাদ করতে হয়। অনুবাদের মধ্য দিয়েই আমরা চর্যাগীতিকা সম্পর্কে জানছি। যদিও মৌলিক কিন্তু প্রাকৃত ভাষা থেকে উৎকর্ষ সাধিত হয়ে আজকের বাংলা একটি রূপ পেয়েছে। অনেকে বলে বাংলা সংস্কৃত থেকে এসেছে কিন্তু আমি এই জায়গাটাতে দ্বিমত পোষণ করি। আমি রবি চক্রবর্তী এবং কলিম খান-এর সাথে একমত যে সংস্কৃত ভাষা হচ্ছে সংস্কার করা ভাষা। বহু ভাষার সমন্বয়ে সংস্কার করে যে নির্ভুল ভাষারূপ তৈরি করা হয়েছিল তাই সংস্কৃত। যে কারণে বাংলা সংস্কৃতের আগে; অর্থাৎ বাংলা প্রাকৃত থেকে এসেছে। প্রাকৃত ভাষাগুলো, মানুষের মুখে মুখে থাকে এবং মুখের ভাষাগুলো থেকেই শব্দ ও ভাষারূপ আহরণ করে সংস্কৃত ভাষা তৈরি। তাই বাংলা ভাষা প্রাকৃত মানুষের ভাষার খুব নিকটজন। এই নিকটজন ভাষাটাই আগে যা ছিল এখন তার অনেকটাই পাল্টে গেছে। পাল্টে যাওয়ার পেছনে অনুবাদের একটা যোগসূত্র আছে। অনুবাদ কিন্তু নতুন কিছু না। আমরা যখন কোন দৃশ্য দেখে দৃশ্যটাকে বাক্যে সাজাই, সেটা একটা অনুবাদ। আমি কোনো কিছু উপলব্ধি করে সেটা বলছি, সেটার ট্রান্সফর্মেশন ঘটাচ্ছি- এটাই হচ্ছে অনুবাদ। তার মানে শিল্পের সাথে অনুবাদের সম্পর্ক আছে। এখন ভাষা একটা বিষয়। ভাষার অন্তর্গত শব্দগুলোকে যদি ভাঙা হয় তাহলে ফনিম পাওয়া যায়। আলোকে বিভক্ত করলে যেমন ফোটন পাওয়া যায়, তেমনি। ফোটন কণা দিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে আলোর ওজন আছে। বাতাসেরও ওজন আছে। বেলুন ফুলিয়ে তা মাপা যায়। প্রত্যেকটা ভাষার বর্ণকে ভাঙলে ফোনিম পাওয়া যায়। মা, মাদার শব্দগুলোর একক কিন্তু এক। তাহলে বলতে পারি আমাদের মাতৃভাষা এক ছিল। এখন ধ্বনিপুঞ্জের স্বভাব বিচিত্র হওয়ার কারণে বর্ণ-শব্দ-বাক্য একেক অঞ্চলে এসে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে, পরিবেশগত কারণে আলাদা আলাদা হয়েছে। ফলে মানুষের কথাও আলাদা হয়ে গেছে। এগুলোকে একত্রিত করে ব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যাবে এর মূল একটাই। আমরা ইংরেজিতে উইডো বলি, বাংলায় তার অর্থ বিধবা। এখানে ধবা মানে স্বামী। মায়ের স্বামীকে বলা হয় মাধব। মাধব শ্রীকৃষ্ণের আরেক নাম। এই যে ধব শব্দটি, জার্মান ভাষার উইডো থেকে রূপান্তরিত হয়ে এসেছে। অনেকেই আছে যারা সংস্কৃত শব্দের সাথে জার্মান শব্দের মিল খুঁজে পায়। তাই বলা যায় মাতৃশব্দের এককগুলো একই। একই একক থাকা সত্বেও দেখা যাচ্ছে, প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। বান্দরবনে একটি ভাষা সম্প্রদায়ের মানুষ আছে। ম্রো-এর শাখা, রিংগিট ভাষা। বর্তমানে এই ভাষায় কথা বলে এমন তিনজনের মধ্যে দুজন বেঁচে আছেন। তারা মারা গেলেই ভাষাটাও মরে যাবে। বিশ্বে এমন অনেক ভাষা আছে যেটা মরে গেছে। সেই তুলনায় বাংলা ভাষার এবং বাংলা সাহিত্যের ব্যাপক উৎকর্ষসাধন হয়েছে।

তু.শু.ব : কবিগুরুর নোবেল বিজয়ের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ভাষাভাষী সাহিত্যিকদের কাছে বাংলা সাহিত্য যেভাবে পরিচিতি পেয়েছিল, রবীন্দ্রোত্তর যুগে সেই পরিচিতিতে ভাটা পড়ে। দেখা যাচ্ছে শতবছর পর- বর্তমানে বাংলা সাহিত্যকে জানার আগ্রহ পুনরায় ত্বরান্বিত হচ্ছে। কেন? বাংলা সাহিত্যের জন্য এটি যদি একপ্রকার বিপ্লব হয় তাহলে এর স্থায়ীত্ব ও ভবিষ্যৎ কী?

মা. হ. : চর্যাগীতিকা থেকে রবীন্দ্রনাথের সময় পর্যন্ত যদি এক হাজার বছর ধরি তাহলে এরমধ্যে অনেক যুগ এসেছে, আবার চলেও গেছে। যুগের ধারাবাহিকতায় অনেক কবির পরিচয়ও মেলে। তবে প্রাচীনযুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত যদি ধরি তাহলে আমাদের কবিতায় আন্দোলনগত চিন্তা, স্বভাবগত চিন্তা এবং কাঠামোগত চিন্তার অনেক পরিবর্তন এসেছে। মধ্যযুগের শেষপ্রান্তে এসে মুসলিমদের দ্বারা সাহিত্যে মানবতাবাদী চিন্তা, মানুষকে বড় করে দেখার যে প্রবণতা এগুলো কবিতায় বেশি করে প্রকাশ পেয়েছে। আবার রামায়ণ ও মহাভারতের মতো যে সাহিত্যগুলো রয়েছে, সেখানে আমরা দেখি- রাজনীতি, সমাজ বাস্তবতা, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, এগুলো প্রাচীনযুগ থেকেই বিকশিত হয়ে এসেছে। কাহিনি ও কিচ্ছার ভেতর দিয়ে লোকসংস্কৃতির যে জায়গা তৈরি হয়েছিল সেখানে আমরা কবিতার উপস্থিতি দেখি। এখন যদি এগুলো পড়তে চাই তাহলে অনুবাদের মানসিকতা নিয়েই আমাদের পড়তে হবে। কেননা এখন আর ঐ সময়টা নেই, ঐ ভাষারও অনেক শব্দ হারিয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ বাংলায় লিখলেও ব্রজবুলি ভাষায় অনেক কবিতা লিখেছেন। মথুরা ও তার আশপাশের এলাকায় ব্রজবুলি ভাষা প্রচলিত ছিল। আমাদের যে নগরকীর্তন- সেগুলোতেও ব্রজবুলি ভাষার প্রভাব দেখা যায়। এসব চিন্তা করেই রবীন্দ্রনাথ তার সাহিত্যে ব্রজবুলি ভাষা ব্যবহার করেছেন। রবীন্দ্রনাথের দ্বারা যে সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি হয়েছে তা যদি ইংরেজিতে ট্রান্সফর্মেশন ঘটানো না হতো তাহলে রবীন্দ্রনাথের কাব্যে যে আধ্যাত্মবাদী চিন্তা রয়েছে তা বিশ্বদরবারে প্রকাশিত হতো না। এভাবেও বলা যায় যে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি মানে ‘সং অফারিংস’ ইংরেজিতে যদি অনূদিত না হতো তাহলে নোবেল কমিটিতে যারা ছিলেন এবং যারা ঐসময়ের বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিক তাদের কাছে রবীন্দ্রনাথকে মূল্যায়ন করা সম্ভব হতো না। সেইসময় গীতাঞ্জলির কাজে কবি ইয়েটস জড়িত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথের পরিবার এবং বাংলায় রবীন্দ্রনাথের প্রভাব, এসব হয়তো বিশ্বের অগণিত পাঠক নিউজে পড়ছিল কিন্তু মূল পড়াটা আর হয়ে উঠছিল না। রবীন্দ্রনাথের ভেতর দিয়েই বিশ্ব সাহিত্য, বিশ্বসাহিত্যিক পরিমণ্ডলের যারা সদস্য তারা বুঝতে পেরেছিল যে বাংলা সাহিত্য কতটা সমৃদ্ধ হতে পারে। কারণ- হঠাৎ করে তো আর একজন রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি হয় না। একটি পরিবারে একজন মানুষ যখন বড় হয়ে ওঠে তখন ঐ পরিবারের যে ঐতিহ্য রয়েছে, সেই ঐতিহ্যকে ধরে রেখেই সে বড় হয়। এই পরিবারটাকে যদি সমাজ বা রাষ্ট্র হিসেবে চিন্তা করি তাহলে বাঙালি সমাজকাঠামোতে যে দীর্ঘদিনের একটি ঐতিহ্য রয়েছে তা বোঝা যায় এবং ইংরেজরা, ইউরোপের মানুষেরা তা বুঝতে পেরেছিল। সেসময় রবীন্দ্রনাথের নোবেলপ্রাপ্তির ভেতর দিয়ে সারাবিশ্ব বাংলা কবিতার প্রতি, বাংলা সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। রবীন্দ্রনাথের অনেক আগেই আমরা মাইকেল মধুসূদন দত্তকে পাই তিনি ফ্রান্সে পাড়ি দিয়েছিলেন এবং সেখানে ইংরেজির পাশাপাশি ফ্রান্সের ভাষায় লিখতে শুরু করেছিলেন। তিনি পাণ্ডিত্যও অর্জন করেছিলেন কিন্তু খেয়াল করে দেখলেন- মূলধারার সাহিত্যকে যদি সুস্থ ও সবল রাখতে হয়, তাহলে মাতৃভাষায় কাজ করতে হবে। তাই তিনি দেশে ফিরে মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। সাহিত্যিক যতই বড় হোক না কেন তাকে মাতৃভাষাতেই চিন্তা করতে হয়। রবীন্দ্রনাথ আগে মাতৃভাষায় লিখেছেন তারপর লেখা অনূদিত হয়েছে। এই যে চর্চার জায়গাটা আর রবীন্দ্রনাথ প্রসারিত হচ্ছেন, ঠিক তখনই বাংলা সাহিত্যের প্রতি সারাবিশ্বের একটা আগ্রহ সৃষ্টি হয়। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য কোথাও যেন একটা ছেদ পড়েছিল। আর এভাবেই একশ বছর পেরিয়ে গেছে। এরমধ্যেই আবার অনেক ভালো কাজ হয়েছে, বিশেষ করে কবিতা-গল্প আর উপন্যাসে। রবীন্দ্রনাথের পর আমরা উপন্যাসে মানিক বন্দোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ীকে পেয়েছি। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, অমিয় ভূষণ মজুমদার, অভিজিৎ সেন, দেবেশ রায়-রা কিন্তু সাংঘাতিক ভালো কাজ করেছেন। তারা বাংলা গদ্যসাহিত্য এবং উপন্যাসে যে উত্তুঙ্গ জায়গাটা তৈরি করেছিলেন, দুর্ভাগ্যবশত রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা সাহিত্যের ওপর যে ফোকাসটা হওয়ার দরকার ছিল সেটা আর সেভাবে হয়নি। তাদের সাহিত্যকর্মগুলো যদি পাশ্চাত্যে সেভাবে অনুবাদ হতো তাহলে বহির্বিশ্বের ফোকাসটা আরও বেশি পেতাম। রবীন্দ্র পরবর্তী কবিতায় আমরা জীবনানন্দ দাশকে আবিস্কার করি। তার কবিতায় ইউরোপীয় কাব্য-চেতনার প্রভাব লক্ষণীয়। কিন্তু তিনি তার মৌলিকত্বের জায়গাটাতে এই প্রভাব আত্মস্থ করে বাংলার পরিবেশ-প্রকৃতি, দর্শনকে কবিতায় প্রকাশ করেছিলেন। তাই বাংলাসাহিত্যে তার একটা আলাদা জায়গা রয়েছে। তার ‘রূপসী বাংলা’ বইটি পাঠ করলে আমরা বাংলাকে চিনতে ও জানতে পারি। তেমনি বাংলাদেশকে জানতে গেলে, বাঙালি সংস্কৃতিকে জানতে হলে রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়। রবীন্দ্রনাথের যে ছিন্নপত্রাবলী রয়েছে তা পাঠ করলেই বর্ষা, প্রকৃতি এসব জানা যায়। যাইহোক, রবীন্দ্রোত্তর যুগে বাংলায় অন্যান্য ভাষা জানে এমন শিক্ষিত ব্যক্তিত্বও ছিলেন। তখন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতো মানুষ ছিলেন। তিনি বহু ভাষা জানতেন। সম্প্রতি আলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত মারা গেলেন; তিনি আঠারোটির অধিক (২০টি) বাংলা কবিতার বই ইংরেজি ও জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছেন। বিচ্ছিন্নভাবে এমন অনেক কাজ হয়েছে। পাশ্চাত্যসাহিত্য বাংলায় অনুবাদও হয়েছে। কিন্তু কোথাও যেন একটা মিসলিঙ্ক ঘটেছিল। সাহিত্যের তো অনেকগুলো শাখা; অন্তত কবিতার ক্ষেত্রে আমি বলতে পারি- কবীর চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমান ক্লাসিক সাহিত্য অনুবাদ করেছেন কিন্তু সমকালীন সাহিত্য ও সাহিত্যিকের সাথে যে সংযোগ রাখা দরকার ছিল সেটা ছিল না। বিধায় একটি মিসলিঙ্ক বা ছেদ ঘটেছিল। রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার জন্য ইয়েটস-এর অবদান আছে। ইয়েটস রবীন্দ্রনাথকে পেয়েছে, মানে সমকালীন সংযোগ ছিল। আবার আমরা দেখি চল্লিশের দশকে সমর সেনদের সময়ে কিংবা আহসান হাবীবদের সময় কবি-সাহিত্যিকেরা বাংলাকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চা করেছে কিন্তু ইউরোপকে জানার বা জানানোর যে প্রচেষ্টা সেটা খুব তীব্র রূপ ছিল না। রোম্যাঁ রোলাঁ-এর মতো বিভিন্নজনের অনুবাদ সাহিত্য আমরা পড়েছি কিন্তু এর পাশাপাশি যদি আমাদের সাহিত্য রূপান্তর করা হতো তাহলে সমকালীন সংযোগ গড়ে উঠত। ঐ সময়টাতে সমকালীন সাহিত্য অনুবাদ না করে ক্লাসিক বা পুরনো সাহিত্যিকদের সাহিত্য অনুবাদ করা হয়েছে। আর এখন যেটা হচ্ছে- সমকালীন যে কবি-সাহিত্যিক রয়েছেন যেমন ধরো চীনের কবি সু-ঝু, হুয়াং হুইবো, লিয়াও ঝিলি; বেলজিয়ামের কবি অ্যাগ্রোন শেলে; ভুটানের কবি বাগাওয়াথ ভান্ডারী, যোগিতা পোখরেল, ফুরপা; লিথুনিয়ার কবি রাইসা মেলনিকোভা; নেপালের কবি কমল ধুনগানা; প্যালেস্টাইনের কবি মোহম্মদ হেলমি আল-রিশাহ; নাইজেরিয়ার কবি প্রিন্স স্টিভ ওয়েবোড; আসামের কবি গায়ত্রী দেবী; রাশিয়ার কবি তাতায়ানা তেরেভিনোভা তারা বাংলা সাহিত্যকে অনুবাদ করছে, আমিও তাদের সাহিত্য অনুবাদ করছি। মাসুদুজ্জামান আছেন, দেখছি তিনিও অনুবাদ করছেন। এখন তো ফেসবুকের মাধ্যমে সমকালীন কবি-সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্ম পড়তে পারছি। কারও লেখা ভালো লাগলে তার সাথে চ্যাটিং করছি, কোন একটা শব্দ ভুল বা এর অর্থ বুঝতে না পারলে জেনে নিচ্ছি। গুগলে সার্চ করে আদ্যপ্রান্ত তথ্য জানা যায়। কবির সাথে সরাসরি কথা বলে, অনুমতি নিয়ে সাহিত্য অনুবাদ করছি। আগের দিনগুলোতে স্বত্ব বা অনুমতি পেতে সময় বিলম্বের একটা ব্যাপার ছিল কিন্তু এখন আর সেটা হয় না। যে ব্যাপারটা এখন খেয়াল রাখতে হবে- এই যে অনুবাদ করছি, একটা সংযোগ তৈরি হলো; পরবর্তী প্রজন্মকে সেটা ধরে রাখতে হবে। অনুবাদের ভেতর দিয়েই একটা ভাষা, সংস্কৃতির যে বৈভব তা বিশ্বদুয়ারে পৌঁছায়।


তু.শু.ব : একটা সময় ছিল যখন অনুবাদ সাহিত্যকে সেভাবে গ্রহণ করা হতো না কিন্তু বর্তমানে অনুবাদ সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক ও তার গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। একজন সাহিত্যপ্রেমী অনুবাদ সাহিত্য বলতে কী অর্থ বহন করবে?

মা. হ. : আক্ষরিক অর্থে বোঝা যাচ্ছে যেকোন বিদেশী ভাষা থেকে অনুদিত সাহিত্য হলো অনুবাদ। অনুবাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় হুবহু অনুবাদ করা হয়, মানে যেটা আক্ষরিক অনুবাদ। আবার যে সাহিত্য অনুবাদ করছি তার যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সেটাকেও রূপায়িত করতে হয় অনুবাদের মধ্যে। যেকারনে অনুবাদ এখন ট্রান্সলেশন না ট্রানস্ক্রিয়েশন। অর্থাৎ নতুন কিছুর সৃষ্টি। এটা মানতেই হবে যে আগে অনুবাদের প্রতি আমাদের একটা তাচ্ছিল্যভাব ছিল। মসৃণ যোগাযোগ না থাকার কারণে আমরা বলতাম- ‘অনুবাদটা তো আক্ষরিক, মূলটা তো আর পড়িনি’। ‘এটাতো বিদেশি জিনিস, আমার পড়ে কী হবে’? প্রতিটি জাতিসত্তার নিজস্ব সংস্কার রয়েছে, বিশ্বাস রয়েছে। আমি যখন সেক্সপিয়র পড়ছি তখন ইংল্যান্ডের সভ্যতা-সংস্কৃতি সম্পর্কে পড়ছি, জানছি। এর আগে যেটা হয়েছিল যে কিছু কিছু শব্দ, কতিপয় নিজস্ব সাংস্কৃতিক চিহ্ন রয়েছে যেগুলো অনুবাদ সাহিত্যে আবিষ্কৃত হচ্ছিল না। এখন ফেসবুক, গুগলের সহায়তায় জেনে বুঝে তারপর সেই শব্দগুলো, সাংস্কৃতিক চিহ্নগুলো অনুবাদ করতে পারছি। এতে করে অনুবাদ সাহিত্য আরও উৎকর্ষতা পাচ্ছে। অনুবাদকে শুধু অনুবাদ সাহিত্য না ভেবে এখন যদি কেউ মৌলিক সাহিত্য হিসেবে অনুবাদ করতে পারে তাহলে সেটাও একটা সৃষ্টিশীল কর্ম হবে। সৈয়দ আলী আহসান সফোক্লিসের ইডিপাস নাটকটিকে অনুবাদ করেছেন। অনেকেই সেটাকে নাট্যরূপ দিচ্ছে। খুব ভালো অনুবাদ সেটি। শামসুর রাহমান যখন হুইটম্যান অনুবাদ করলেন, সেটিও খুব চমৎকার অনুবাদ হয়েছে। সেভাবে যদি কেউ আত্মস্থ করতে পারে তাহলে একজন কবি অনুবাদের ক্ষেত্রে কবিতার কাজটা ভালো করবে, একজন উপন্যাসিক অনুবাদের ক্ষেত্রে উপন্যাসের কাজটা ভালো করবে। এইরকম কবি মানুষের দ্বারা যদি অনুবাদ করা হয় তাহলে অনুবাদ আর অনুবাদ থাকে না, মৌলিকত্বের যে স্বাদ, সেই জায়গায় আমাদের নিয়ে যেতে পারে।

তু.শু.ব : আধুনিক গদ্যকবিতায় যতিচিহ্নের ব্যবহার নেই বললেই চলে। পক্ষান্তরে, অনেক কবি তার কাব্যে যতিচিহ্নের পাশাপাশি বিজ্ঞানের বিভিন্ন গাণিতিক-চিহ্ন প্রয়োগ করছেন। কবিতায় ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে এই চিহ্নসমূহ কতটা প্রাসঙ্গিক ও অর্থবহ?

মা. হ. : এই যে আমি শ্বাস নিচ্ছি, শ্বাস নেওয়ার জন্যও যতির দরকার। বোধের অর্থ প্রকাশ করার জন্য কোথায় বিরাম নিব, কোথায় থামবো তা প্রকাশ করার জন্যেও যতিচিহ্নের ব্যবহার রয়েছে। জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতায় আছে- ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য;’ এখানে যে দৃশ্যপট রয়েছে তার জন্য আমাকে যতিচিহ্ন ব্যবহার করতে হচ্ছে। এখন ইউরোপে বা বাংলা কবিতায় চর্চার উৎকর্ষতার জায়গায় দর্শনগত মনন তৈরি হওয়ার কারণে- অনেকেই কবিতায় দাঁড়ি দিচ্ছে না। আমিও দিচ্ছি না। এখানে দুইরকম ব্যাপার আছে। একজন আবৃত্তিকার নিজের মতো করে যতিচিহ্ন প্রয়োগ করে একটি কবিতা পড়বে, আবৃত্তি করবে। এখানেই এই স্বাধীনতাটা দেওয়া হচ্ছে। কবিতার ভাষায় গূঢ়-সৌন্দর্য, জাদুর মতো কিছু একটা নিহিত থাকে। ‘মেঘও কাঁদায়’ বাক্যটির শুনলে মনে হয় মেঘ বুঝি কাঁদায়। আবার মেঘ ও কাঁদায় এমনটিও বোঝা যায়। তদ্রূপ ‘মন আয় না ও জঙ্গলে’ বললে অনেকে মনে করে মন, আয়না ও জঙ্গল নিয়ে কবিতাটি লেখা হয়েছে। এগুলো তো আছেই কিন্তু এখানে বলা হয়েছে- মন আয় না ওই জঙ্গলে। যতিচিহ্ন ব্যবহার করলে বাক্যটির অর্থ এককেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে কিন্তু যতিচিহ্ন ব্যবহার না করলে বহুমাত্রিক অর্থ প্রকাশ পায়। দ্বিত্ব অর্থ বজায় রাখার জন্য যতিচিহ্ন ব্যবহার করার দরকার নেই। প্রাথমিক পর্যায়ে যে কবিতাগুলো সৃষ্টি হয়েছিল সেখানে যতিচিহ্নের ব্যবহার অনিবার্য ছিল। এখন কবিতায় অনেক প্রতীক ব্যবহৃত হচ্ছে। চর্যাগীতিকাতেও আমরা এমন প্রতীক খুঁজে পাই। মূলত এগুলো বৌদ্ধ দোহা। এই দোহাগুলোতে সামাজিক কথা বলা হলেও সেখানে আধ্যাত্ম-চেতনার ভাব সুপ্ত রয়েছে। চর্যাগীতিকার একেকটি শব্দই প্রতীক। এখন এও দেখা যাচ্ছে যে, অনেক কবি কবিতায় বিজ্ঞানের অনেক প্রতীকায়িত শব্দ ব্যবহার করছেন, গাণিতিক চিহ্ন ব্যবহার করছেন। এরফলে একটি কবিতা একজনের কাছে সামাজিক তো কারও কাছে প্রেমের কবিতা হিসেবে ধরা দেয়। কারও কাছে ব্যক্তি-উপলব্ধির কবিতা, তো কারও কাছে জাতীয় সঙ্কটের উপর লেখা কবিতা মনে হয়। কবিতা একটি বহুমাত্রিক অবয়ব। তাই কবিতায় বারবার প্রতীকের কথা আসে, চিহ্ন ও সংকেতের কথা আসে, রূপকের কথা আসে। আর এগুলো আসতেই থাকবে।

তু.শু.ব : আপনার প্রকাশিত ও প্রকাশিতব্য বইগুলোর মধ্যে একজন পাঠক কী কী খুঁজে পায় বা পাবে, একজন পাঠক হিসেবে তা জানতে চাই?

মা. হ. : একজন পাঠক কী কী খুঁজে পায় বা পাবে, যিনি লিখছেন তার সেটা বলে দেয়াটা ঠিক হবে না। আমার যেটা মনে হয়- প্রত্যেক লেখকেরই ভাষাটা নিজস্ব। তুমি কবিতা লিখলে সেটা তোমার মতোই হবে, কেননা তুমি যেরকম জীবনযাপন করো তার ভেতর থেকে মন্থিত হয়ে তোমার বাক্য রূপ নিবে। আমার লেখা কবিতা আমার মতো, মকবুল ভাইয়ের কবিতা তার মতোই হবে। কিন্তু মাঝখানে সংকট দেখা দিয়েছিল। আমরা প্রায় একইরকম কবিতা লিখছিলাম, আলাদা করা যাচ্ছিল না। নাম কেটে দিলে মনে হয় এটা একজনেরই লেখা কবিতা। একজন কবির বিশেষত্ব বা বৈশিষ্ট্যের জায়গাটা একটু ভিন্ন হতে হয়। জীবনানন্দ দাশকে আমরা চিহ্নিত করতে পারি কারণ তিনি সবার ভেতর থেকে একা হতে পেরেছিলেন। এই একা হওয়াটা শুধু ব্যক্তিজীবনের ক্ষেত্রে নয়, সাহিত্যেও তিনি তার পরিচয়কে স্বাতন্ত্র্য রূপ দিতে পেরেছিলেন। আমার রচনাতে দেখা যাবে যে নৃগোষ্ঠীর জীবনযাপন, সংস্কৃতিকে খুঁজে পাচ্ছি। আমি যেহেতু দর্শনের ছাত্র, দর্শনের নানা চিন্তা লেখায় এসেছে, আসবে। তারপরে আমি যেহেতু লোকসংস্কৃতি নিয়ে কাজ করি, লোকজীবনযাপনের যে গাঁথা এবং আমাদের যে গল্প বলার রীতি তা আমার গল্প-কবিতায় রূপায়ন করার চেষ্টা করেছি। এই ব্যাপারে আমি উদ্বুদ্ধ হয়েছি কবি মোহাম্মদ রফিককে দেখে। তার কবিতায় বাংলার মাটি, হাওয়া, পানি এই বিষয়গুলোর রূপায়ন খুবই প্রবল। জসীমউদ্দীনের কবিতায় আমাদের লোকজীবন পাওয়া যায় একেবারে সাধারণ লোকসংস্কৃতির মতো কিন্তু আল মাহমুদের কবিতায় যে লোকজীবন আছে তা কিন্তু আধুনিক। আমিও আমার কবিতায় আমার ভাষায় এই বাংলাকে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। সমকালীন যে সংকট তা কিন্তু যে কোন কবিকে তাড়িত করবে। রাজনৈতিক দলন-পীড়ন-নিপীড়ন এইসব কবিতায় আসবে কিন্তু কেউ উগ্রভাবে প্রকাশ করে তো কেউ প্রকাশ করে রূপকের আশ্রয়ে। আমি রূপকের আশ্রয়ে লিখি। সিলেটের এমসি কলেজে যে ঘটনা ঘটলো, নেক্রোফিলিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে যে ডোম মৃত তরুণীকে ধর্ষণ করছে, দিনদিন ধর্ষণ বাড়ছে, এগুলো কিন্তু কবিতায় আসছে। সমকালীন চিন্তাধারা একজন কবির মাঝে আসতে বাধ্য, যদি সে বেসিক কবি হয়ে থাকে।


তু.শু.ব : আমরা আপনাকে কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও গবেষক হিসেবে চিনি, জানি। তারপরেও বলব হয়তো আপনি নিজেকে কবি হিসেবে পরিচয় দিতে বেশী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। নিজের মুখে যদি এই আনন্দটা প্রকাশ করতেন?

মা. হ. : কেউ যদি একটা ভালো উপন্যাস-শিল্প তৈরি করে থাকে তাকেও আমরা কবি বলবো। কেউ যদি একটা ভালো নাটক লিখে, একটা ভালো কবিতা লিখে তাকেও আমরা কবি বলবো। কারণ সংস্কৃতিতে কবি-কোবিদ বলে একটা শব্দ রয়েছে। শিল্প-সংস্কৃতির যে কোন অঙ্গনেই হোক কেউ ভালো উৎকর্ষতা লাভ করলে তাকে কবি বলা হয়। দেখো- নাটক দেখে বলা হয় কাব্যিক; কী কাব্যিক দৃশ্য, চিন্তা। মানিকের উপন্যাস, দেবেশ রায়ের উপন্যাস, অদ্বৈত মল্লবর্মণ বা সমরেশ বসুর কোন ভালো উপন্যাস পড়ে দেখো, এগুলো একেকটা উৎকৃষ্ট মানের কবিতা। ওই অর্থে কবি; এরপরও সবাই কবি নয় কিন্তু আজকাল আমরা সবাই কবি হয়ে যাচ্ছি। যারা বোঝে তারা কবি পরিচয় বলতে একটু শ্লাঘা অনুভব করে। আসলে কবি একটা গর্বের সম্বোধন। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় ফার্স্ট ইয়ারের পর সবাই আমাকে কবি মাসুদ বলে ডাকতে শুরু করে। আমার বন্ধুবান্ধব এবং সমকালের যারা ছিল তারা বিষয়টি জানে। পরবর্তীতে গবেষণার কাজের জন্য অনেকের কাছে আমি গবেষক হয়ে গেছি। এটাও একটা আনন্দের ব্যাপার।

তু.শু.ব : করোনার মধ্যে সময় করে এত সুন্দর একটা আড্ডা দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। পাশাপাশি আপনার উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে জানতে চাই- নবীন লেখক, কবি ও পাঠকদের উদ্দেশ্যে আপনার মন্তব্য ও বক্তব্য কী?

মা. হ. : আমি তো বলব শেষপর্যন্ত কাল এবং পাঠক একজন প্রকৃত কবিকে চিনতে পারে। পাঠক ঠিকই বোঝে কোনটা কবিতা হচ্ছে, কোনটা হচ্ছে না। আমি এটা দেখছি- ফেসবুকে যখন কোন কবিতা পোস্ট দেই, ভালো কবিতা হলে পাঠক ক্লিক করে, সেটা পড়ে। আমি পাঠককে সবসময় আমার মাথার উপরে রাখি। একজন পড়তে পড়তেই পাঠক হয়। যত পড়বে ততই পাঠকের মনের অন্ধকার দূর হবে। তখন পাঠক একজন লেখক বা কবির প্রকৃত সত্তাকে আবিষ্কার করতে পারবে। তরুণ প্রজন্মের অনেক পাঠক পরবর্তীতে কবি হয়ে ওঠে। তাদের দায়িত্ব অনেক। আমরা সাহিত্যচর্চা যখন শুরু করি তখন যেভাবে পড়াশোনা করতাম; প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য নয় বরং নিজের জানার আনন্দের জন্য, সেই আঙ্গিকের পড়াশোনা এখন কম হচ্ছে। অনেকে বলে ফেসবুকে পড়া হয় না। আমি তো দেখছি ফেসবুকে বেশি করে পড়া যায়। ফেসবুক গুগল-এ ক্লিক করলেই সব তথ্য চলে আসছে। আমি খুব বিনয়ের সাথে বলতে চাই- বাংলাদেশের কবি, পাঠক, লেখকেরা মনে হয় জীবনকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করার প্রচেষ্টা এবং পড়াশোনার মাত্রাটা কমিয়ে দিচ্ছে। এটা বাড়ানো উচিত। এটা মনে রাখতে হবে বাংলা সাহিত্যকে বাংলাদেশই লিড দিবে। কারণ এখানে রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলায় চলে জীবনবোধ, নিরবিচ্ছিন্ন বাংলায় জাগে লোকসংস্কৃতি। আমাদের পড়তে হবে, জানতে হবে, লিখতে হবে। কেননা নতুন প্রজন্মের ঘাড়ের উপর ভর করেই বাংলা সাহিত্য এগিয়ে যাবে। আমরা যারা লিখছি, আগে যারা লিখেছে, নতুন প্রজন্ম যারা লিখবে, আমরা সবাই কালের গুণ টানছি। একজন আরেকজনের কাঁধে দিয়ে যাব লেখার ভার। কাজেই এই কাঁধটা শক্ত করার জন্য পড়তে হবে। ধন্যবাদ।