আমার চায়না মেয়ে-১ ॥ আমিনুল ইসলাম



প্রায়ই মেয়েটার জন্য মনটা কেমন কেমন করে। তাকে দেখার জন্য মনটা আনচান করে। মাঝে মধ্যে মোবাইলে কথা হয় ২/৪ মিনিট। টাকার সমস্যা না, সমস্যা অনর্গল ইংরেজিতে আমার কথা বলতে না পারা। লেখা তাও মোটামুটি চলার মতো কিন্তু কথা বলতে গেলে সমস্যা। মেয়ে অবশ্য ইংরেজি ভালো লিখতে এবং বলতে পারে। তাই বাপ-বেটির মধ্যে ই-মেইলে কথা আদান প্রদান করা হয় যার যখন মনে চায়। সব কিছুই তো ই-মেইলে হয়, হয় না শুধু চোখের দেখা।

দুই হাজার দশ সালে চায়না থেকে ফেরার পরই আমার চায়না মেয়েকে দেখার জন্য মনটা কেমন কেমন করছে তা আর থামছে না। এর মধ্যে ২০১৮ সালে স্ত্রী বিয়োগের পরে ছেলেকে হ্যানান পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করে চায়না পাঠিয়ে দেই। অন্য দিকে আমি ৩১ বছরের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে প্রায় স্থায়ী ভাবে বসবাসের জন্য মেয়ের কাছে নিউইয়র্কে চলে আসি। নিউইয়র্কে কয়েক মাস থাকার পরেও ভালো লাগে না। কোন কাজও জোগার করতে পারলাম না। এখানে ইংরেজি বলতে না পারলে ভালো কাজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কষ্ট করে কথা যদিও বলা যায় কিন্তু বোঝা যায় না। আর কথা বোঝা যায় না বলেই কথার জবাব দেয়া যায় না। অবস্থা যখন এমন সেই সময় একদিন হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম চায়না যাবো ছেলেকে দেখতে।

তখনই মনে মনে সিদ্ধান্ত নেই, ছেলের সঙ্গে মেয়েটাকেও দেখে আসবো। তাহলে চায়নায় বেড়ানো হবে ফাও পাওনা। মেয়ের সঙ্গে আলাপ করলে মেয়ে বললো ভালো কথা, ‘যাও ঘুরেফিরে আসো। সারাজীবন তো কাজ আর বাজার করলে। কখনও কোথাও বেড়ানোর সময় আর সুযোগ পেলে না। এবার ছোট ভাইটাকেও দেখে আসো সেই সাথে এক দুই মাস বেড়ায়ে আসো। ওখানে গিয়ে কিপটামি করবা না। হাত খুলে, মন খুলে খরচ করবা। এখন টাকা বা ডলার জমায়া রেখে কোন লাভ নেই।তোমার ডলার খাবে কে? তাই যে কয়দিন বাঁচো, জানে কিছু দাও। প্রাণ খুলে এদিক সেদিক বেড়াও, দেখো’। মেয়ে আরও বলল, ‘তুমি কালকেই কনস্যুলেট জেনারেলের অফিসে গিয়ে পাসপোর্ট জমা দাও, আমি টিকেটের ব্যবস্থা করছি’।

যথারীতি পরদিন সকালেই আমি 520 12th Ave. New York, NY 10036 ঠিকানায় রওনা হই। প্রথমে বাসার পাশের ১৬৯ জ্যামাইকা মেট্রো স্টেশন থেকে F ট্রেনে চড়ে ৩৫ মিনিটে ১৩ টা স্টেশন পার হয়ে Manhattan সিটির 42 ST Brant Park Station-এ নামি। F ট্রেন থামলো মাটির নীচে, আমার ধারণা কমপক্ষে ১০০ ফুট নীচে। সেখান থেকে বড় বড় দুইটা এক্সেলেটরের চড়ে মাটির উপরে মেট্রোরেল স্টশনের বাইরে এসে হাফ ছেড়ে বাঁচি। গত ৩৫ মিনিটের প্রতি মুহূর্তেই আমার মনে হয়েছে, ট্রেন চলছে মাটির অনেক নীচ দিয়ে। মাটির নীচ দিয়ে যাচ্ছি কথাটা মনে হতেই দমবন্ধ হওয়ার অনুভূতি কাজ করছিল। তাই স্টেশনের বাইরে এসেই খুব লম্বা করে একটা শ্বাস নিলাম। এর পর মেয়ের কাছে ফোন করে বললাম, এখন কি করবো ? উত্তরে মেয়ে বললো, ‘আব্বু তুমি এর মধ্যেই সব গুলিয়ে ফেললে? গতরাতের আমার সব প্রচেষ্টাই তো দেখি বৃথা গেল। আচ্ছা আর কি করা, একটু অপেক্ষা করো আমি ২-৩ মিনিটের মধ্যের গুগল সার্চ করে জানাচ্ছি’।

আসলে আগের রাতেই কি ভাবে কি করে চায়না ভিসা অফিসে যেতে হবে তা মেয়েটা বুঝিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু আমি একা একা নিউইয়র্কের কোথাও যেতে ভয় পাই। সে কারণে পারত পক্ষে মেয়েকে না নিয়ে কোথাও যাই না। আজ মেয়ে আমাকে এক প্রকার জোর করেই একা পাঠালো। তার যুক্তি, ‘একা একা চলতে না শিখলে তুমি এই দেশে থাকতে পারবে না। আমি তো সব সময় তোমার সাথে যেতে পারবো না। তাই এই ট্রেনিং’।

অভয় দিয়ে মেয়ে বললো, ‘তুমি তো হারিয়ে অন্য দেশে যেতে পারবে না। কাজেই হারানোর ভয় নাই। তুমি এক জায়গার বদলে শুধু অন্য জায়গায় চলে যেতে পারো। এছাড়া আর কোন ভয় নাই। আর যদি কোন কিছুই না পারো তবে আমাকে ফোন দিও আমি উবার কল দিয়ে দেবো। তুমি তাতে করে বাসায় ফিরে আসবে, তবে মনে রেখো এটা করবো তোমার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরে।

আমার মা জননীর কথায় বিশ্বাস করে তার শেখানো কথাগুলো মুখস্থ করে আল্লাহর নামে বাসা থেকে বের হলেও ভয়ে আমার মুখস্থ করা সকল কথাই তালগোল পাকিয়ে গেছে। কোথায় কার সাথে কি ভাবে কথা বলতে হবে সে বিষয়েও আমাকে সংক্ষিপ্ত তালিম দিয়েছিলো। কিন্তু সময়মতো কিছুই কাজে লাগাতে পারলাম না। একারণে ফোন দিয়ে আবার নতুন করে সমস্ত কিছু শুনে মেয়ের বাতালানো কথামতো মিনিট খানেক হাঁটতেই W42 St & 6Avenue এর M42 Metro Bus-এর স্টপেজে পৌঁছাই।

মিনিট দুই পরেই বাস এলে তাতে উঠে বসি।বাসে তেমন ভীড় ছিলো না। জননী বলেছিলো, ৭ স্টপ পরের স্টপেজে নামতে হবে। রাস্তা পার হলে সামনেই আশেপাশেই চায়না ভিসা সেন্টার।
বাস থেকে নেমে কয়েক মিনিট আশেপাশের দৃশ্য দেখে নিলাম। পাশেই অনেক চওড়া HUDSON RIVER, বাস স্টপেজের পাশে নদীর পাড়ে কাছেই HUDSON RIVER PARK. এই পার্ক আমার চেনা। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে কানাডার স্থায়ী বাসিন্দা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড বাহাউদ্দিন রতনকে নিয়ে এখানে বেড়াতে এসেছিলাম। আমি এবার ডানে বামে দেখে শুনে সিগন্যাল লাইট অনুসরণ করে রাস্তা পার হলাম।কয়েক মিনিটের মধ্যেই কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায় পৌঁছলাম। দেখলাম বেশ কিছু নর-নারী লাইন ধরে আছে। আমি কোন কিছু না দেখে শুনে সবার পিছনে দাঁড়িয়ে যাই। বিধিবাম বেশ কিছু সময় পরে গেটে ঢোকার মুহূর্তে গেটে দাঁড়িয়ে থাকা কর্মরত ব্যক্তি প্রশ্ন করলো, স্যার আর ইউ কাম হেয়ার ফর পিকআপ পাসপোর্ট ? শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে কোনমতে জবাব দিলাম, নো স্যার, আই এম হেয়ার ফর সাবমিট মাই ভিসা এপ্লিকেশন। তখন সে উত্তর দিলো, স্যরি স্যার, ইউ মে গো গেট নাম্বার টু।
আমি থ্যাংকস এ লট বলে গেট টু-এর দিকে হাঁটা শুরু করলাম। এখন খেয়াল করলাম আমি যে লাইনে এতোক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম তার শুরুতে একটা ঝকঝকে স্টেইনলেস স্টীলের স্ট্যান্ডের উপর একইরকম ফ্রেমের মধ্যে বড় বড় ইংরেজি কালো হরফে লেখা PICK UP PASSPORT ONLY আর একটা লাল তীর চিহ্ন দেয়া আছে।

নিজের ভুল বুঝতে পেরে আর মেয়ের কথা না মানার জন্য বেশ খারাপ লাগলো। মেয়ে আমাকে অনেকবার বলেছে এদেশে যখনই তুমি যে কোন জায়গায় যাও না কেন, হোক সেটা রেল স্টেশন, বাস স্টপেজ, বাস টার্মিনাল, শপিং মল, কোন দোকান, যে কোন সরকারি বা বেসরকারি অফিস আদালতেই যাও না কেন আগে খেয়াল করবে সেখানে টানানো নোটিশ।যদি নোটিশ থাকে তাহলে সেই নোটিশ ফলো করবে। নয়তো তুমি অনেক ঠকবে বা অনেক কষ্ট ভোগ করবে। মেয়ের কথার আজ হাতে হাতে প্রমাণ পেলাম। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, এখন থেকে বিষয়টা খেয়াল করবো। প্রায় ৩০ মিনিট সময় আক্কেল সেলামী বাবদ অপচয় করে গেট নাম্বার দুইয়ে ঢোকার মুখে আবারও সুবেশী সিকিউরিটি অফিসারের প্রশ্নে হোঁটচ খেলাম। স্যার আর ইউ হেয়ার ফর সাবমিট ভিসা এপ্লিকেশন? উত্তরে ইয়েস স্যার বলতেই সেই সুবেশী থ্যাংকস এ লট, গো এ্যাহেড স্যার। আমিও থ্যাংকস বলে বড় একটা হল রুম প্রবেশ করলাম।আমি ধাতস্থ হয়ে আস্তেধীরে চারিদিকে দেখে সারি সারি সাজিয়ে রাখা চেয়ারের মধ্যে থেকে খালি একটাতে বসলাম।এবার আমি এখানে কি কি ঘটছে তা মনোযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করতে থাকলাম। দেখলাম অনেকগুলি কাউন্টার, কোন কোন কাউন্টারে এ্যাটেন্ড করার জন্য কেউ নাই। অপেক্ষাকারীদের সামনে সবাই দেখতে পারে এমন জায়গায় একটা বড় ইলেকট্রনিক ডিসপ্লে বোর্ডে সিরিয়াল নাম্বারের সাথে সাথেই দেখা যাচ্ছে কাউন্টার নাম্বার।

একই সাথে সাউন্ডবক্সেও শোনা যাচ্ছে সুরেলা মহিলা কন্ঠ। সেই সাউন্ডবক্স থেকে ভেসে আসছে যেমন – সিরিয়াল নাম্বার থার্টিন কাউন্টার নাম্বার সেভেন ইত্যাদি। দুই নাম্বার গেট দিয়ে ঢুকতেই পাশে দাঁড়ানো একজন গার্ড একটা মেশিন থেকে প্রত্যেককে একটা করে সিরিয়াল নাম্বারের কুপন দিচ্ছিলো। আমার সিরিয়াল নাম্বারটা ৫৭। তখন চলছিলে সিরিয়াল নাম্বার থারটিন। আমি আমার সিরিয়াল নাম্বারটি ডিসপ্লে বোর্ডে দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে সেদিকে নজর রাখতে থাকলাম।