আমার চায়না মেয়ে-২ ॥ আমিনুল ইসলাম



দশ পনের মিনিটের মধ্যেই আমার নাম্বারটি ডিসপ্লে বোর্ডে দেখলাম। আমি এগিয়ে যাই কাউন্টার নাম্বার পাঁচের দিকে। এ সময় সাউন্ড বক্সের আওয়াজ এলো টোকেন নাম্বার ফিফটি সেভেন কাউন্টার নাম্বার ফাইভ। কাউন্টারের সামনে দাঁড়াতেই সেখানে থাকা ভদ্র মহিলা চাইনিজ টোনে পাসপোর্ট প্লিজ বলতেই, আমি থ্যাংকস বলে বাড়িয়ে দিলাম পাসপোর্ট আর চার পৃষ্ঠার ভিসার আবেদন। নেড়েচেড়ে দেখে তিনি এবার বললেন, মানিঅর্ডার প্লিজ। আমার একার বেকুব হওয়ার পালা। আমি কোনমতে বললাম- ক্যাশ ডলার, নো মানি অর্ডার। স্যরি স্যার, গো টু কাউন্টার নাম্বার ইলেভেন প্লিজ, বলে মহিলা আমার দিকে পাসপোর্ট এগিয়ে দিলো। আমি এবার পাসপোর্ট নিয়ে এগারো নাম্বার কাউন্টারে গিয়ে ভিসার ফি পঞ্চাশ ডলার নগদ আর পাসপোর্টটা কাউন্টারে বসা লোকটার দিকে এগিয়ে দিতেই সে বললো, স্যরি স্যার ক্যাশ কাউন্টার ইজ ক্লোজ নাও, মনি অর্ডার অনলি প্লিজ গো এ্যাহেড। এবার আমি আবার মহাসাগরের পড়লাম। উপায়ন্ত না দেখে তখন পোস্ট অফিস খুঁজতে বের হলাম। বের হয়ে বুঝলাম, মনি অর্ডার না হলে আমাকে আবার এই আবেদন জমা দেয়ার জন্য আসত হবে। তাই হন্যে হয়ে পোস্ট অফিস খুঁজতে লাগলাম। আশেপাশের রাস্তায় বেশ কিছু সময় হাঁটাহাঁটি করে হয়রান হলাম, কিন্তু পোস্ট অফিসের হদিস পেলাম না। রাস্তায় দেখা পাওয়া ট্রাফিক পুলিশ, দোকানদার, অফিসের গার্ড ছাড়াও বেশ কয়েক জন পথচারীকে প্রশ্ন করেও পোস্ট অফিসের হদিস পেলাম না।

পথচারীরা পারলো না সেটা মেনে নিলাম এই কারনে যে, তারা হয়তো এ এলাকার না। কিন্তু এই এলাকায় ব্যবসা করে, চাকরি করে তারা জানে না এই বিষয়টা আমার মনে খটকা লাগলো। আমার মাথা কাজ করছিল না। এদেশে মনি অর্ডার, পোস্টাল অর্ডার ইত্যাদি পোস্ট অফিস ছাড়া মুদিখানার দোকানেও পাওয়া যায় বিষয়টা জানতাম। তবে টেনশনে থাকায় কথাটা আমার মনে আসেনি। আর ঐ এলাকায় পোস্ট অফিস খোঁজার সময় কোন মুদিদোকান আমার চোখেও পড়েনি, এখন মনে হচ্ছে, মাথায় শুধু পোস্ট অফিসের চিন্তা থাকায়ই মুদিদোকান দেখতে পাইনি। যখন প্রায় দিশেহারা অবস্থা, ঠিক তখনি খেয়াল হলো, আমি একটা মুদিদোকানের সামনে দাঁড়িয়ে। আমার পাশেই স্ট্যান্ডের সাথে বড় বড় করে লেখা আছে Money Order/ Postal Order Available inside. আমার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো, হাফ ছেড়ে মুদিখানায় ঢুকে পড়লাম। কাউন্টারে সেলসম্যানকে বললাম, মনি অর্ডার। সে উত্তর দিলো ইয়েস। আবার বললাম, ফিফটি ডলার। উত্তরে বললো প্লাস টু ডলার, টোটাল ফিফটি টু ডলার। আমি জবাবে ওকে, নো প্রোবলেম, গো এ্যাহেড। দোকানিকে ডলারগুলো দিয়ে আমি মনিঅর্ডারটা নিয়ে দ্রূত হাঁটতে শুরু করলাম।

এবার যখন ওয়েটিং রুমে প্রবেশ করলাম তখন দেখলাম সেটা প্রায় খালি। আমার যাওয়া আর ফিরে আসার মধ্যেই একঘন্টা ২৫ মিনিট সময় মহাকালের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে। এবার সোজা পাঁচ নাম্বার কাউন্টারে গিয়ে হাই বলে পাসপোর্ট আর মানিঅর্ডারটা এগিয়ে দিলাম। কাউন্টারের মহিলাটি এবার কম্পুটারের কিবোর্ডের নবগুলো ৩০/৩৫ সেকেন্ডের মতো সময় নাড়াচাড়া করলো। তারপর আমাকে পাশে লাগানো একটা বড় ধরনের ওয়েব ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে বললো। ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতেই দুই এক বার হেড আপ, হেড ডাউন, লেফট আর রাইট এসব বলে ক্যামেরায় ক্লিক করলো। তারপরে পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে বলল, প্লিজ গো টু কাউন্টার নাম্বার ইলেভেন। আমি ১১ নাম্বার কাউন্টারে গিয়ে সেখানে বসা যুবকের দিকে আমার পাসপোর্ট এগিয়ে দিতেই সেটা নিয়েই কম্পিউটারের মনিটরের দিকে দৃষ্টি দিয়ে মাউসটা একটু নাড়াচাড়া করেতেই প্রিন্টার চলার মৃদু শব্দ কানে বাজলো। প্রায় সাথে সাথেই সে আমাকে একটা প্রিন্টেড স্লিপ দিলো, যাতে লেখা পিকআপ ইউর পাসপোর্ট ডে আফটার টুমরো। এবার আমার ফেরার পালা। আমার মা জননীর উপদেশটা এবার আর ভুললাম না। আমি এবার এদিক ওদিক নজর দিতেই চোখে পড়লো একটা চলমান ইলেকট্রনিকস ডিসপ্লে বোর্ড। তাতে ক্রমাগত ভাবে বড়বড় লাল চলমান ইংরেজি অক্ষরে লেখা ফুটে উঠছে আর তা হলো ‘পাসপোর্ট পিকআপ টাইম নাইন এ এম টু টুয়েলভ থার্ট পি এম ফ্রম মানডে টু ফ্রাইডে’।

আমি উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করলাম। এখানে সিটি বাস স্টপেজে ফুটপাতের উপর একটা খাম্বাতে বাসের নাম্বার লেখা থাকে। আমি চায়না কনস্যুলেট অফিস থেকে বের হয়েই ডান দিকে কনস্যুলেট অফিস ঘেঁসে কয়েক কদম যেতেই বাস স্টপেজে আমার কাঙ্খিত বাসের নাম্বার লেখা দেখে সেখানেই পায়চারী করতে থাকলাম। ৫-৭ মিনিটের মধ্যে বাস এসে থামতেই তাতে উঠে মেট্রো কার্ড পাঞ্চ করে ফাঁকা সীটের একটাতে বসলাম। এখন একটু হলেও মনটা ভালো লাগছে এই ভেবে যে, যা হোক একা একা আমার মা জননীকে বাদ দিয়েই কাজটা ভালোভাবে শেষ করলাম। বাসটা কিছুক্ষন নদীর পাড়ের লাগোয়া রাস্তা দিয়ে চলে তারপর ডানে মোড় নিয়ে রাস্তা ধরে চলতে থাকলো। আমি মনে মনে শুধু খেয়াল করছি কখন জানি আমার নামার বাস স্টপটা পার হয়ে যায়। অন্য স্টপে নামলে যেমন আমাকে আবার ২.৭৫ ডলার খরচ করে ফিরে আসতে হবে তেমনি আবার অনেকটা সময়েরও অপচয় হবে। এইসব ভেবেই আমি খুব সতর্কতার সাথে খেয়াল করছি যেন W42 St & 6Avenue এর M42 Metro Bus বাস স্টপ পার হয়ে না যাই। এ রাস্তা সে রাস্তা ঘুরে এক সময় বাস আমাকে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে ভুস করে সামনের দিকে অদৃশ্য হলো। আমিও স্বস্থির নিঃস্বাস ফেলে এদিক ওদিক তাকাতেই মেট্রোরেলের পাতালে যাওয়ার পথটা দেখতে পেলাম। মেট্রোরেলের পাতালে নামার রাস্তাটা দেখা মাত্রই বুকের ভেতরে ধুকপুক করার রেটটা অনেক বেড়ে গেল।