আমার চায়না মেয়ে-৩ ॥ আমিনুল ইসলাম



দমবন্ধ করা একটা অনুভূতি মনের মধ্যে চেপে বসলো। বার বার মনে হতে লাগলো, কোন দুর্ঘটনায় যদি মেট্রোরেলের টানেল বন্ধ হয়ে যায় তবে এই মাটির ১০০/১৫০ ফুট নীচ থেকে আর কোন দিন পৃথিবীর বুকে ফিরে আসা হবে না, মুক্ত বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নেয়াও হবে না। দেখা হবে না জন্মদাত্রী মা, আদরের মেয়ে, ছেলে, নাতনী, মেয়ের জামাই আর স্বজনদের সঙ্গে।
এমন ভাবনায় কিছুক্ষণ মন আচ্ছন্ন থাকলো। কিন্তু আপাতত মেয়ে নাতনীর কাছে ফেরার সহজতম পথ নিউইয়র্কের মেট্রোরেল। মনে সাহস সঞ্চয় করে পরম দয়ালু, দাতা আল্লাহ’র নাম স্মরণ করে পাতালে নামার সিঁড়ির দিকে আস্তে আস্তে হাঁটতে শুরু করলাম। এক সময় আমি সম্বিত ফিরে পেয়ে দেখি পাতাল স্টেশনে পৌঁছে গেছি। প্লাটফর্মের আপ টাউন অ্যান্ড কুইন্স সাইডে ট্টেনের অপেক্ষায় থাকলাম। এ সময় মনে প্রশ্ন জাগলো চায়না ভিসার জন্য আমেরিকার পাসপোর্টধারীদের ফি হলো ১০০ আমেরিকান ডলার, কিন্তু আমার ফি কেন মাত্র ৫০ আমেরিকান ডলার? একবার মনে হলো আমি গরীব দেশের পাসপোর্টধারী হয়তো সে জন্যে হয়তো হাফ-ফ্রি। আবার মনে হলো যেহেতু বাংলাদেশ থেকে চায়না ভিসার জন্য আবেদন ফি ৫০ আমেরিকান ডলার বা বাংলাদেশী ৪০০০/ টাকা। হয়তো সে কারনেই এখানেও বাংলাদেশী পাসপোর্টধারীদের জন্যও সেই ৫০ আমেরিকান ডলারই।

নিউইয়র্ক সিটিতে মেট্রোরেল থেকে নেমে যদি দুই ঘন্টার মধ্যে সিটি বাসে ভ্রমণ করা হয় তবে সেক্ষেত্রে নতুন করে আর ২.৭৫ ডলার খরচ করতে হয় না। একইভাবে সিটি বাস থেকে নেমে মেট্রোরেলে চড়লেও নতুন করে ভাড়া দিতে হয় না। তবে বাস ভ্রমণে যদি মেট্রোকার্ডের বদলে নগদে কয়েনে ভাড়া পরিশোধ করা হয় তবে অপারেটরকে ট্রান্সফার বলেলেই সে একবার ব্যবহার যোগ্য একটা ইলেকট্রনিক কার্ড দেয় আর তা বের হয় অবশ্যই অটোমেটিক মেশিন থেকে। ঐ কার্ড দিয়ে পাতাল রেলে ভ্রমণ করা যায় না, গেটের মেশিনে ঐ কার্ড স্যুইপ করা যায় না। ট্রন্সফার কার্ড শুধু অন্য রুটের বাসে গ্রহণযোগ্য অর্থাৎ অন্য রুটে ব্যবহার করা যায়। যাওয়া আর আসার জন্য সব সময়ই আলাদা ভাবে পৌনে তিন ডলার গুণতে হয়। এক টিকিটে বা একবারের খরচ করা ডলারেই দুইবার ভ্রমণ করা যায়, একবার ট্রেন আর একবার বাসে। ট্রেনে যতো সময় থাকলাম বুকের মাঝের ধুকপুক শব্দটা কোননমতেই থামাতে পারলাম না। মাটি চাপা পড়ে মৃত্যুর ভয়টা সরাতে পারলাম না। যাই হোক এক সময় কখন যে ১৬৯ জ্যামাইকা স্টেশনে পৌঁছে গেলাম তা জানতে পারিনি। হঠাৎ করে ট্রেনের সাউন্ডবক্সে শুনতে পরলাম ভরাট পুরুষালী কণ্ঠে জোরে উচ্চারিত হলো-‘দি নেকস্ট স্টপ ইজ জ্যামাইকা ১৬৯ স্ট্রীট’। আমি এবার নামার জন্য প্রস্তুত হলাম। এক মিনিট পরেই আবার ঘোষণা হলো ‘দিস ইজ জ্যামাইকা ১৬৯ স্ট্রিট’।

ট্রেন থামার সাথে সাথে অটোমেটিক দরজা খোলা মাত্রই নেমে পড়লাম। ততোক্ষণে আবার ঘোষণা শুনতে পেলাম ‘স্ট্যান্ড ক্লিয়ার ক্লোজ দ্যা ডোর, দি নেকস্ট এন্ড লাস্ট স্টপেজ ইজ জ্যামাইকা ১৭৯ স্ট্রিট’।
ট্টেন আবার তার গন্তব্যের দিকে যখন চলতে শুরু করলো ততক্ষণে আমি পাতাল থেকে অনেকটাই উপরে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি ৩/৪ ফুটের মধ্যে পৌঁছেছি। মিনিটের মধ্যেই আমি পৃথিবীর খোলা হাওয়ার পরশ অনুভব করলাম। এখন দম বন্ধ হওয়া অনুভূতি হঠাৎই চলে গেল। সামনেই হাঁটাপথে তিন মিনিটের দূরত্বে আমার আবাস লাল রঙের ছয়তলা বিল্ডিংটা দেখে ভালো লাগার অনুভূতিতে মনটা ভরে গেল। আমি ধীর গতিতে সামনের দিকে এগুতে থাকলাম। বাসার কলিং বেল বাজাতেই শুনলাম জননীর উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর ‘আব্বা তুমি আইছো’ বলতে বলতে আমি জবাব দেয়ার আগেই দরজার লক ওপেন করার শব্দ। জবাব দিতে হলো না কারণ আমার কলিংবেল বাজানো আমার মেয়ে আর আমার বান্ধবী নাফিসা খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পারে। এরপর ঘরে ঢুকতেই জননী বলতে শুরু করলো, আব্বা আমিতো খুব চিন্তায় আছিলাম তুমি আবার কোন জায়গায় না কোন জায়গার গাড়িতে উঠলা, কতো ভয়ই না পাইতাছো, নাকি আবার ফোনটা হারাইয়া ফালাইছো তাই আর ফোন দিতাছো না। তুমি জানো না আব্বা আমি নানা রকম দুশ্চিন্তা করতাছিলাম। এতোক্ষণ ফোন না দিয়া থাকা তোমার মোটেই ঠিক হয় নাই।

তুমি আর কখনও এমন করবা না, কথাটা সব সময় মনে রাখবা। এবার আমি মুখটা খুললাম, ক্যান ভয় পাইয়া ঘনঘন ফোন দিলেও তো তুমি আবার ত্যাজ দেখাও। কও যে আমি নাকি শুধু শুধুই ভয় পাই আর তোমারে ফোন দেই। আজকে তাই পরীক্ষা করলাম যে, ভয় না পাইয়া আমি কতক্ষণ থাকতে পারি। আর নাফিসাগো দ্যাশে আমি একা একা চলতে পারি কি না? আমার মনে হয় আমি পরীক্ষায় ভালো মার্কস মানে কমপক্ষে A+ নাম্বার পাইছি। মেয়ে আমার এবার হাসতে হাসতে কয়, না আব্বা তুমি তো A++ পাইছো। মানে হইলো ১০০ তে ১০০ পাইছো। এবার বাপ বেটি এক সাথে এক চোট হাসলাম। তারতারি গোসল করে যোহরের নামাজ আদায় করে একটু সময় রেস্ট নিতে গিয়ে কখন যে ঘুমিয়ে গেছি তা আর টেরও পাইনি। ঘুম ভাঙলো নাফিসার ডাকে ‘নানা উঠো, মা ডাকে। নানা উঠো চা খাও, তারাতারি উঠো’।
ঘুম থেকে উঠে মেয়েকে চা খেতে খেতেই বললাম টিকেটের খবর কি? দাম কতো? জননী জবাব দিলো উতলা হইয়ো না। তুমি তো জানো যাত্রার তারিখের সাথে প্লেনের টিকেটের দামেরও সম্পর্ক আছে। তাই আগে দেখি কত দিনের ভিসা পাও। তার পরে টিকেট কিনবো। জবাবে বললাম খুব ভালো কথা। এবার মেয়ে বললো, কিছু খবর নিছি তাতে বুঝতে পারলাম ৯০০-১০০০/- ডলারের মধ্যেই চায়না যাওয়া আসার টিকেট পাওয়া যাবে। দাম কম বেশী যাই হোক টিকেট পেতে বেগ পেতে হবে না।