আমার চায়না মেয়ে-৪ ॥ আমিনুল ইসলাম



মে মাসের ৪ তারিখ নির্ধারিত দিন সকালেই রওনা দিলাম পাসপোর্ট ফেরত আনার জন্য। চেনা পথ তাই কোন ঝামেলা ছাড়াই প্রথমে মেট্রোরেল ও পরে মেট্রোবাসে চড়ে চীনা কনসাল জেনারেলের নিউইয়র্ক অফিসে পৌঁছে গেলাম। অফিসে প্রবেশ করার সময় বিল্ডিংয়ের বাইরের লাইনে দাঁড়ানোর আগেই গত দিনের কথা স্মরণ করে স্ট্যান্ডের সাথে লাগানো লেখা দেখে সঠিক লাইনেই দাঁড়ালাম। অল্প সমযের মধ্যই পাসপোর্ট ডেলিভারী কাউন্টারে পৌছলাম। আমার স্লিপটা কাউন্টারে বসা মহিলাকে এগিয়ে দিয়েই বললাম গুডমর্নিং। জবাবে তিনি বললেন, হ্যাভ এ গুড ডে ফর ইউ, স্যার ওয়েট এ মিনিট। মিনিট খানেক পরেই পাসপোর্টটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। এবার আমি পাসপোর্টটা হাতে নিয়েই ভিসা স্টিকারের দিকে তাকালাম। দেখলাম S2 Category-র ৬০ দিনের ভিসা মঞ্জুর হয়েছে। ভ্রমণের কারণ হিসেবে লিখেছিলাম হ্যানান পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত ছেলেকে দেখার বিষয়টি। এবার প্রসন্ন মনেই বাসার দিকে রওনা হলাম। পরশু দিন এ পথেই যাওয়া আসা করেছি। তাই আজ আর আগের দিনের মতো ভয় পেলাম না। বাসায় ফিরতে কোন সমস্যা হল না, নিরাপদেই ফিরলাম। এবার চায়না যাবার পালা।

জননী জানালো তার ভাইয়ের জন্য কিছু জিনিস কিনতে হবে। স্নেহের ছোট ভাই আবদার করেছে আইপড কিনে দিতে হবে দুইটা। একটা তার নিজের জন্য আর একটা তার বন্ধুর জন্য। বন্ধু অবশ্য দাম দিয়ে দেবে। তাতে আমার জননীর কোন লাভ লোকসানের কম বেশী হবে না। কারন বন্ধু তো টাকাটা দেবে আমার মেয়ের স্নেহের ছোট ভাইয়ের কাছে। আর আইফোনের দোকানে মোট ৪০০ ডলার পরিশোধ করতে হবে আমার জননীকেই।

একদিন পরেই Queens Centre Shoppings Mall এ গেলাম মেয়ের সাথে। বাসা থেকে বের হবার সময় জননী বললো, আব্বা খেয়াল রেখো, বিশালের জন্য একটা ভালো পারফিউম কিনতে হবে। ওপছন্দ করে। এই ‘বিশাল’ তার মায়ের খুব ঘনিষ্ট বান্ধবীর একমাত্র ছেলে। বিশাল আমার ছেলের চায়না যাওয়ার ব্যাপারে সহযোগিতা করেছিলো। তারা দুইজন এখন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। শপিং মলটা বাসা থেকে কাছেই। তবু ট্রেন বদল করতে হলো। শপিং মলটা আমার কাছে আকর্ষণীয় বলেই মনে হলো। বেশ কয়েক তলার বিশাল ভবন নিয়ে এই শপিংমল। নানান পদের নানান জিনিষের চকচকে ঝকঝকে দোকান আর দোকান। আমার জানা প্রায় সব নামিদামি ব্রান্ডের দোকানই এখানে দেখা গেল। কসমেটিকস, তৈরিপোশাক, খেলার সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিকস কোনটাই বাদ দেখলাম না। বলতে গেলে সকল আইটেমেরই সকল নামিদামি ব্রান্ডের শোরুম চোখে পড়লো। মেয়ে যখন আই ফোনের দোকানে দাম পরিশোধ করছিলো, তখন আমার খুবই খারাপ লাগছিলো এতোগুলা টাকা নষ্ট করার জন্য। আমার বারবার মনে হচ্ছিলো, ১০০/২০০ টাকা দামের হেডফোন দিয়েই যখন চমৎকার চমৎকার সব গানই শোনা যায় তাহলে কেন ৪,০০০ /- হাজারেরও বেশী টাকা দিয়ে এইটুকু জিনিস কেনা হচ্ছে? মেয়েকে আমি না কেনার জন্য উৎসাহ যোগাচ্ছিলাম কিন্তু কোন লাভ হলো না। সে আমাকে উত্তরে বললো আব্বা তুমি তো এসবের মর্ম বুঝবা না। তোমার ১০০/২০০ টাকার জিনিস আর এই জিনিস দিয়া গান শোনার পার্থক্য যে কতো তা তোমাকে বোঝানো আমার পক্ষে অসম্ভব। জননী এবার একটু হেসে বললো, তুমি তোমার ঐ হেড ফোন দিয়া পল্লীগীতি আর ভাওয়াইয়া গান শুনতে থাকো। আমি আর কথা বাড়ালাম না।

এরপর বললো তনয় তো ক্যাপ পছন্দ করে, চলো ওর জন্য একটা ক্যাপ কিনি। ঠিক আছে বলে আমি জননীর সাথে সাথে সামনের দিকে পা বাড়ালাম। এবার সে ঢুকলো আর্মেনিয়ান এক্সচেঞ্জের সো-রুমে। বেশ সময় নিয়ে দেখে দেখে একটা ক্যাপ পছন্দ করে ভাইকে ভিডিও কল করে সেটা দেখালে, তনয় বললো তার পছন্দ হয়েছে। আমার কাছে ক্যাপটা একেবারেই সাদামাটা মনে হলে বললাম দাম কতো? আমার মা জননীর জবাব শুনে আমার ভিমরি খাওয়ার দশা। মেয়ে বলে কি? এই সামান্য একটা ক্যাপের দাম ৫০ ডলার, মানে আমার দেশের ৪২৫০/- (চার হাজার দুই শত পঞ্চাশ) টাকারও বেশী। আমার মেজাজটা আসলেই বেশ খারাপ হয়ে গেল। আমি একটু রাগত স্বরেই প্রশ্ন করলাম এই ক্যাপে কি আছে যে এতো দাম? আমি তো এখানে আসার সময়ে একটা কিনেছিলাম মাত্র ৮০ টাকায় ৷ সেটাও তো অনেক সুন্দর, আর পড়তেও তো কোন অসুবিধা হয় না। তা হলে এটার দাম এতো কেন? এবার জননীর জবাব তুমিতো বুঝবা না, আর বুঝতেও চাও না। এই যে দেখো এই মনোগ্রামটা, এই যে বড় করে A আর X একসাথে লেখা দেখছো, এইটা এই ব্রান্ডের চিহ্ন যে বা যারা নামি দামী ব্রান্ডের জিনিস ব্যবহার করে তারা এক নজর দেখলেই বুঝবে যে আমার ছোট ভাই চার হাজার টাকা দামের ক্যাপ পড়ে আছে। আমি তখন শুধু মিনমিন করে জবাব দিলাম, তা হলে তো এই মনোগ্রামের দামই চার হাজার আর বাকীটা হলো তোমার ক্যাপের দাম, তাই তো? না কি তুমি আরো কিছু বলবা? এবার মেয়ে জবাব দিলো, ‘আব্বা তুমি যা কইলা এর পরে তো আমার জবাব দেয়ার আর কিছুই থাকে না’।

ক্যাপের দাম পরিশোধ করেই বললো আব্বা চলো এবার তারাতারি অন্য দোকানে যাই। এবার ঢুকলো Addidas-এর শোরুমে। সেখান থেকে ভাইয়ের জন্য পানি খাওয়ার একটা বোতল কিনলো যার দাম মাত্র ৬০ ডলার। এই বোতলে ঠাণ্ডা পানি ঠাণ্ডা আর গরম চা, কফি বা গরম পানি গরমই থাকে। এই বোতল মেটালের তৈরি হাত থেকে পড়ে গেলে বা আছাড় খেলেও ভাঙবে না। এবার আমি শুধু বললাম আম্মাজান, এবার তো আমার মনে হচ্ছে এই বড় বড় হরফে এই লেখার দাম ৫০ ডলার আর বোতলের দাম ১০ ডলার। আমার কথা শুনে মেয়ে হেসে বললো, আব্বা তুমি আর কথা বইলো না। ঐ দোকান থেকে বের হয়েই আমি বললাম চলো তোমার চায়না বোন আর দুলাভাইয়ের জন্যও কিছু গিফট কিনি। জননী হাসতে হাসতে কয় আব্বা দেশী মেয়ের জন্য তো কিছুই কিনলা না, এখন চায়না মেয়ের জন্য কিনবা? কি আর করা আমার কপাল যখন খারাপ চলো চলো। এবার আমি মেয়েকে প্রশ্ন করলাম কি কি কেনা যায়? মেয়ে বিজ্ঞের মতো উত্তর দিলো, কি আর কিনবা আমার বোন যখন চলো কসমেটিকসই কিনি। আমিও সাথে সাথেই বললাম ঠিক আছে চলো।

আমি মেয়েকে বললাম অনেক তো হাটাহাটি হলো এবার একটু বসে জিরিয়ে নেই, সেও সাথে সাথেই রাজি হলো। এই মলটার মাঝখানে ফাঁকা চারপাশে দোকান তবে লম্বার তুলনায় চওড়া অনেক কম। প্রতি ফ্লোরেই একপাশ থেকে অন্যপাশে যাওয়ার রাস্তার বড় ফাঁকা জায়গায় বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে বেশ কয়েক জনের বসার জন্য অতি সুন্দর ব্যবস্থা। প্রতি ফ্লোরের বারান্দায়ই আছে চা, কফির ছোট দোকান। মেয়ে দোকান থেকে দুই কাপ কফি আর নাফিসার জন্য আইসক্রিম আনলো। আরামে বসে এগুলো শেষ করে আবার আমরা দোকানে দোকানে ঢুঁ মারতে থাকলাম। কয়েকটা দোকান ঘুরে মেয়ে জামাইয়ের জন্য বডি লোশন, ক্রিম,সাবান, পারফিউম আর চাবির রিং এবং বিশালের জন্য দামী ব্রান্ডের পারফিউম কিনেই আমাদের আজকের শপিং শেষ করলাম। এর পর আমরা তিনজন আবার ফিরতি পথে চলতে শুরু করলাম। নাফিসা এতোক্ষণ চুপচাপই ছিলো কারণ সে তার মায়ের মোবাইলে গেম খেলায় ব্যস্ত ছিল। এখন মোবাইলটা হাত বদল হওয়ায় বাস্তবে ফিরল। ট্রেনে বসেই সে ইংরেজি আর বাংলা মিশিয়ে যা প্রশ্ন করলো তা নিম্নরূপ- মা এগুলা কার জন্য কিনলা? মায়ের জবাব শুনে আবার প্রশ্ন, মামার কাছে কে নিয়ে যাবে? উত্তরটা শুনেই আমার দিকে তাকিয়ে বললো, নানা আমিও তোমার সাথে মামাকে দেখতে যাবো। বলো আমাকে নিয়ে যাবে তো? আমি আপাতত জবাব দিলাম চিন্তা করে দেখি। এবার নাফিসার জবাব না, আমি যাবোই যাবো, নানা আমাকে নিতেই হবে। এর পর আমরা তিন জনই চুপ করে রইলাম। ট্রেন চলছে জ্যামাইকার পথে।