আমার চায়না মেয়ে-৫ ॥ আমিনুল ইসলাম

প্রথম পর্বের শপিং শেষ হতেই দ্বিতীয় পর্ব শুরু। জননী জানালো তার ভাই ইলিশ মাছের ডিম, গরুর গোশতের ভুনা ঝুরি আর টিকিয়া কাবাব খেতে চেয়েছে। এখন যে ভাবেই হোক তা এই নিউইয়র্ক থেকে চায়নায় পাচার করতে হবে। আমি বললাম খাবার জিনিস নিলে কাস্টমসে খুব ঝামেল করে। প্রায়ই দেখা যায় অনেক কষ্ট করে, টাকা পয়সা খরচ করে তারপর অনেক বুদ্ধি করে সুন্দর করে প্যাকেট করা খাবার কোন দেশের এয়ারপোর্টে ধরা পরলে তার স্থান হয় এয়ারপোর্টের গার্বেজ ক্যানে। মেয়ের সোজা জবাব, আব্বা আমি তা ভালো করেই জানি।

তখন আমার মনে পড়ল, গত নভেম্বরে আসার সময় আমার মা তার আদরের বড় নাতনী নাফিসার মায়ের জন্য অনেক সখ করে কয়েক কেজি গরুর মাংস আর ইলিশ মাছ রান্না করে দিয়েছিলেন। খাবারগুলো সুন্দরভাবে প্যাকেট করে বেশ কয়েক দিন ডিপ ফ্রিজে রেখে আমার লাগেজে কাপড়ের ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন যেন কাস্টম চেকিংয়ে ধরা না পরে। কিন্তু কপাল খারাপ, আমি খুব ভালো মানুষের ভাব ধরে আস্তে ধীরে কাস্টমসের লোকজনকে না দেখার ভান ধরে তাদের এলাকা প্রায় পার হয়ে গেছি। এমন সময় হঠাৎ আমার সামনে যমদূতের মতো হাজির হয়ে পরিস্কার বাংলায় একজন বললেন, ভাই একটু এদিকে আসেন। কেন বলতেই উত্তর এলো লাগেজ চেক করবো। আপনি কি খাবার জিনিস এনেছেন? জ্বী বলতেই উনি বললেন প্লিজ লাগেজ খোলেন। আমি বললাম ভাই দেশের মানুষ আপনি ছেড়ে দেন। অনেক কষ্ট করে এতো দূর আনলাম, প্লিজ ছেড়ে দেন। ভদ্রলোক তখন আমার মুখরর দিকে তাকিয়ে বললেন, ভাই দেশের মানুষ সেই জন্যেই তো শুধু খাবার মাংসগুলো ফেলে দেবো, তবে মাছ ফেলবো না। দেশের মানুষ না হলে তো আপনার জরিমানা হতো। জেনে রাখেন যে কোন প্রকার মাংস আনা নিষেধ। তবে মাছ আনা জায়েজ আছে। আবার কাঁচা সবজি আনা নিষেধ, আস্ত কোন বীজ সেটা আনাও নাজায়েজ। আমার মায়ের এতো কষ্ট করে রান্না করা ৫৫০ টাকা কেজি দরের ৩/৪ কেজি মাংস যখন সফলভাবে গার্বেজ ক্যানে ফেলা সম্পন্ন হয়েছে, ঠিক তখনই এদেরকে আমার বাদশা নমরুদের বংশধর বলেই মনে হচ্ছিল। আমার মনের যখন এমন খারাপ অবস্থা তখন এক চাচীর লাগেজ থেকে বের হচ্ছিল তার নিজের হাতে লাগানো গাছের লাউয়ের ডগা, পুঁই শাক ইত্যাদি।

এই সমস্ত কথা ভালো করে বুঝিয়ে বলেও ভাইয়ের প্রতি বোনের মহাব্বত বিন্দু পরিমানও কমানো গেল না। আমার মেয়ের একই কথা আমার মা মরা ভাই চাইছে আমি দিমু তুমি মাথায় কইরা নিবা না কি? এয়ারপোর্টে ধরা খাইলে তারা ফালায়া দিলে দিব। তুমি তো ধরা খাইতে নাও পারো। তুমি প্রথমবার যখন আসলা মাকে সাথে নিয়া, তখন তো তোমাদের লাগেজ বা কোন কিছুই তো চেক করে নাই, স্ক্যানারেও দেয় নাই তুমি কি সে কথা ভুইলা গেছ? আমি ইলিশ মাছের ডিম, টিকিয়া কাবাব, গরুর মাংস দিয়া দিমু আমার ভাইয়ের কপালে থাকলে খাইবো, না হইলে চায়না এয়ারপোর্টের গার্বেজে যাইবো। বুঝলাম কথা বাড়াইয়া লাভ নাই তাই চুপ করে গেলাম। নিজের জন্যও কিছু জিনিস পত্র কেনা দরকার সেগুলোসহ পরের দিন সে সব জিনিস কিনলাম। আস্তে আস্তে জিনিসগুলি লাগেজে স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু করা হল। এদিকে মেয়ে তার ভাইয়ের পছন্দের খাদ্য রান্নার জন্য কাজ শুরু করে দিল। বেশী করে পেঁয়াজ দিয়ে ইলিশ মাছের ডিম দো পেঁয়াজা করল, এরপর টিকিয়া কাবাব ও গরুর মাংশ ভুনা আর ঝুড়ি করে তা ডিপ ফ্রিজে চালান দেয়া হল। আগেই বুকিং দিয়ে রাখা চায়না ইস্টার্নের টিকেট সংগ্রহ করা হল। রুট নিউইয়র্কের JFK (জন এফ কেনেডি) এয়ারপোর্ট থেকে হংকং এয়ারপোর্ট পর্যন্ত চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের এয়ার বাস আর হংকং থেকে Zhengzhou পর্যন্ত ক্যাথে ড্রাগনের বিমানে ভ্রমণের ব্যবস্থা নির্ধারন করা হয়েছে। বিমানে শুধু যেতে সময় লাগবে হংকং পর্যন্ত ১৫ ঘন্টা আর হংকং থেকে Zhengzhou পর্যন্ত সময় লাগবে ৩ ঘন্টা ৩০ মিনিট। আবার সেখান থেকে Jiaozuo পর্যন্ত বাসে যেতে সময় লাগবে দুই ঘন্টা। এরপর বাস থেকে নেমে ট্যাক্সিতে করে হ্যানান পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটিতে পৌঁছতে সময় লাগবে ১০ মিনিট। হংকং এয়ারপোর্টে ট্রানজিট আছে মাত্র ১২ ঘন্টা। আর নাফিসাদের বাসা থেকে ওর বাবার কারে JFK-তে যেতে সময় লাগবে ৩৫ মিনিট। তারপর বোর্ডিং পাশ নেয়া থেকে প্লেন ভূমি স্পর্শ ত্যাগ করা পর্যন্ত আরও কমপক্ষে দরকার তিন ঘন্টা সময়। তাই আমার এই বারের যাত্রার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মোট সময়ের প্রয়োজন হবে কম বেশী ৩৬-৩৭ ঘন্টা মাত্র। লম্বা সময় বিমানে কম টাকার টিকেটে আগে এক দুই বার ভ্রমণের দুর্ভাগ্য হওয়ায় আমি খানিকটা উৎসাহ হারিয়ে ফেলছি।

অভিজ্ঞতার আগে যখন কাউকে বিমান ভ্রমণের পরে খুব টায়ার্ড লাগছে বলতে শুনতাম তখন মেজাজ খুব খারাপ হত। মনে করতাম ব্যাটার ভাব দেখ, আরামে বিমানে বইসা থাইকা এখন আবার কয় টায়ার্ড হইয়া গ্যাছে, ভাব দেখানোর আর জায়গা পায় না? কিন্তু এখন তো বুঝি গরীবের কষ্ট সব জায়গাতেই। বিমানের ইকোনোমি ক্লাসের দীর্ঘ সময়ের যাত্রীকে যে কি সীমাহীন শারীরিক কষ্ট সহ্য করতে হয় তা তো আমি ইতিমধ্যেই বার কয়েক হাড়ে হাড়ে বুঝেছি। ২০০৬ সালে হজ্বের সময় প্রায় ৪৬ বছর বয়সের জীবনে প্রথম বিমানে উঠেই বুঝেছিলাম ইকোনমি ক্লাসের যাত্রীদের ভ্রমণের মজাটা কি? সীটের অবস্থাতো ঢাকার লোকাল বাসের মতো। একটু লম্বা ঠ্যাং যাদের তাদের তো বলতে গেলে ঠিক মত বসাই অসুবিধা।
ভেতরের সীটের যাত্রীর ওয়াসরুমে যেতে হলে পাশের জনকে উঠে দূরে গিয়ে দাঁড়াতে হয় নতুবা সে বের হতে পারবে না। পা নাড়াচাড়া না করিয়ে ১/২ ঘন্টা বসে থাকলে হাঁটুতে যে কি প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয় তা বলে বোঝানো সম্ভব না। সামনের সীটের পিছনের দিকে টিভি মনিটর থাকে সেটা চালিয়ে পছন্দের সিনেমা বা ডকুমেন্টারি দেখা যায়। তবে সেই কাজটা আমার মতো বলদদের পক্ষে মোটেই কোন সহজ কাজ না। সিট কোচের সীটের মতো কিছুটা শোয়ানো যায়। তবে একটু শোয়াতেই পিছনের জন গুতাগুতি শুরু করে সিট খাড়া করার জন্যে। আরামে বসার কোনই সুযোগ নাই ইকোনমিক ক্লাসের যাত্রীদের। যথেষ্ট ক্ষুধা লাগার পরে দেয় ফাইভ স্টার স্ট্যান্ডার্ডের খাবার যা গলার নীচে নামানোর জন্য অনেক মেহনত করতে হয়। হাই স্ট্যান্ডার্ডের খাদ্যে না থাক ঝাল, লবন আর না থাকে তেল। তাই অনভ্যস্থ জিহ্বা আর গলা তা সহজে গ্রহণ করতে রাজী হয় না।

বেশীরভাগ যাত্রীকেই দেখি পরিবেশনকৃত খাদ্যের অর্ধেকের বেশি উচ্ছিষ্ট হিসেবে রেখে দেয়। আমার বিষয়টা অবশ্য একটু আলাদা কারন আমি নানান পদের খাদ্যের স্বাদ আস্বাদন করতে পছন্দ করি। তাই বলে সবাই তো আর আমার মত না তাই, একারণেই দীর্ঘ বিমান ভ্রমণে ইকোনমিক ক্লাসের যাত্রীরা ভ্রমণ শেষে খুবই ক্লান্ত হয়ে য়ায়। প্রথমবার বিমানে উঠার আগে মনে মনে ধারণা ছিল বিমানের ওয়াসরুম না জানি কত লাক্সারিয়াস কিন্তু যখন প্লেনের টয়লেটে প্রথমবার বিপদগ্রস্থ হয়ে প্রবেশ করতে বাধ্য হই তখনই আগের ধারণাটা যে কতোবড় ভুল ছিলো তা হাড়ে হাড়ে বুঝতে হলো।

কতো ছোট জায়গায় টয়লেট বানানো যায় তা কেবল মাত্র আর আমার মতে একমাত্র যে কোন বিমানের ইকোনোমি ক্লাসের টয়লেট দেখলেই বোঝা সম্ভব। মাত্র দুই ফুট বাই দুই ফুট জায়গায় এমন টয়লেটের ডিজাইন করার কারণে ডিজাইনাকে নোবেল পুরষ্কার প্রদানের জন্য আমার মনে প্রবল ইচ্ছা জেগেছিল। ক্রমশই আমার নিউইয়র্ক থেকে বিদায়ের জিরো আওয়ার কাছে আসতে শুরু করল। নতুন দেশে নতুন জায়গা আমার মনকে টানলেও নাফিসাদের জন্যও মনটা আমার কেমন কেমন যেন করে। মেয়ে নাতনীদের রেখে বেশ অনেক দিন চায়না থাকতে হবে মনে হলেই মনটা কেমন যেন মোচড়ামুচড়ি শুরু করে। এই রকম অবস্থায় এক সময় জিরো আওয়ার সামনে হাজির হল।

রাত ১২ টায় বিমান নিউইয়র্কের ভূমির স্পর্শ ত্যাগ করবে। তাই বোর্ডিংয়ের জন্য কম পক্ষে তিন ঘন্টা আগে রিপোর্ট করতে হবে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে এটাই নিয়ম। তাই বাসা থেকে সাড়ে তিন ঘন্টা আগে মানে রাত সাড়ে আটটায় বের হলাম। বিদায় দেয়ার জন্য নাফিসা, নাফিসার মা আর বাপে হলো সাথী। এক্ষত্রে আমার ৩০/৩৫ ডলার বেঁচে গেল ট্যাক্সি ভাড়া বাবদ যা আমাকে খরচ করতে হত। এখন তা লাগল না এই জন্যে যে এখন ট্যাক্সি ড্রাইভারের ভূমিকায় অভিনয় করছে নাফিসার বাবা আমার মেয়ের জামাতা জাহাঙ্গীর হোসেন। এয়ারপোর্টে পৌঁছেই হালকা জাতিগত প্রীতির বিড়ম্বনার শিকার হলাম। আসলে আমার কোন তাড়াহুড়ো ছিল না, তবে জামাইয়ের ডিউটি থাকায় সে কিছুটা হুরোহুরি করছিলো। লাগেজ বুকিংয়ের জন্য কোন ভীড় ছিল না। আমার সামনে ছিল একজন, এমন সময় পাশের কাউন্টারের অপারেটরকে বাংলায় কথা বলতে দেখে মেয়ে বললো আব্বা চলো পাশের লাইনে যাই, তখন সেই লাইনে কেউ ছিল না। ততোক্ষণ আমার সামনের জনের কাজও শেষ হয় হয় অবস্থায় আমরা লাইন পাল্টালাম দেশি ভাইয়ের কাছে গেলে তাড়াতাড়ি হবে ভেবে। কিন্তু ফল হলো উল্টো। আমার আগের লাইনের অপারেটর ছিল চাইনিজ তার সাথে কথা বলার বিড়ম্বনার কথা বিবেচনা করে সময় বাঁচানোর জন্যই আমরা লাইন বদলেছিলাম। কপাল খারাপ হলে যা হয় আমারও তাই হল।

আমার দেশি ভাই অযথা কোন কারণ ছাড়াই আমার পাসপোর্ট, গ্রীনকার্ড, টিকেট ইত্যাদি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করে দিল। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি জবাব দিলেন, প্লিজ আমার কাজ আমাকে করতে দেন। আমাকে কি করতে হবে তা আমি আপনার চেয়ে ভাল বুঝি। একথা বলার পরে তো আর কোন কথা বলা চলে না, এই ভদ্রলোকের দেশ আমেরিকায়। আমাদের ২০ মিনিট সময় দাঁড় করিয়ে রেখে তারপর দেশীভাই আমাকে মাফ করাসহ দোয়া করলেন। কেন সেই অচেনা অজানা আমার বাংলাদেশী যুবক আমাকে হয়রানি করল আজও ভেবে কুল কিনারা করতে পারলাম না। এরপর দ্রুত আমাকে বিদায় দিতে আসাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নির্ধারিত নাম্বারের গেটের খোঁজে হাটা শুরু করলাম। শেষ মুহুর্তে নাফিসা যখন বুঝল, সে আমার সাথে মামাকে দেখতে যাচ্ছে না তখন নাতনী আমার ‘নানা আমি তোমার সাথে যাবো, আমাকে সাথে নিয়ে যাও, আমাকে নিয়ে যাও’ বলে গগন ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করল।

মনটা ভীষণ খারাপ হলেও পেছনে না তাকিয়ে সামনে এগোতে থাকলাম। আমার মানস চক্ষে দেখতে পেলাম ক্রন্দনরত নাতনিকে তার বাবা আর মা বল প্রয়োগ করে বাসার পথে নিয়ে যাচ্ছে। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই সিকিউরিটি চেকিং এরিয়া। কোমরের বেল্ট, মানিব্যাগ, মোবাইল ফোন, জুতা, চাবি আর হ্যান্ডলাগেজ ইত্যাদি সেখানে রক্ষিত প্লাস্টিকের ট্রেতে করে স্ক্যানারে দিয়ে নিজেও একটা রুম স্ক্যানারে ঢুকে স্ক্যান্ড হয়ে আবার জুতা, বেল্ট ইত্যাদি পরিধান করলাম। এমন রুম স্ক্যান মেশিন আগে কোথাও দেখিনি। তখন ম্যানুয়ালি চেক করা হত। মেটাল ডিটেকটরও ব্যবহার করা হত।