আমার চায়না মেয়ে-৬ ॥ আমিনুল ইসলাম


নিউ ইয়র্কের প্রধান বিমান বন্দর J F K ( জন এফ কেনেডি )-এর চেকিং শেষে আবারও চায়না ইষ্টার্ন এয়ারলাইন্সের নিজস্ব চেকিং উৎরানোর পরে ওয়েটিং হলে অপেক্ষার পালা। অপেক্ষায় থাকার সময় অপচয় না করে মেয়ে আর নাতিনের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললাম। তখনও বিমানে উঠার ব্যবস্থা না হওয়ায় সেলফি কালচারে লেগে গেলাম। দুই-একটা ছবি ফেসবুকে আপলোড করলাম। ততোক্ষণে বিমানে উঠার জন্য ঘোষণা শুনলাম। বিমানের নিয়ম দেখলাম প্রায় সব এয়ারলাইনসের একই। আগে ঢুকবে যারা ধনী তারা মানে হলো বিজনেস ক্লাসের যাত্রী, এরপর হুইল চেয়ারের যাত্রী, তারপর যাদের সাথে শিশু আছে তারা, সব শেষে আমিনুলরা অর্থাৎ ইকোনোমিক ক্লাসের বা গরীব যাত্রীরা। এতে তো আমার কোন সমস্যা নাই। আমার শুধু নিরাপদে পৌছাতে পারলেই হলো, আমি তাতেই আল্লাহর দরবারে লক্ষ কোটি বার শুকরিয়া জানাবো। অবশেষে আমাকেসহ বিমান উড়াল দিলো হংকংয়ের উদ্দেশ্যে। আমি আগেও খেয়াল করেছি বিমান মাটি ছাড়লেই আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। বার বার মনে হতে থাকে এখন যদি কিছু হয় মানে যদি দুর্ঘটনা এটুকু মনে হলেই আরো দম বন্ধ হয়ে যেতে চায়। এবারও এর ব্যতিক্রম হলো না। এই অবস্থা প্রথম কয়েক মিনিট থাকে। এক সময় মনটা একটু শান্ত হতেই দেখি বিমানের ডানাকাটা পরীরা আমাদের উদর পুর্তির ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত সমস্ত হয়ে পড়েছে।

এই সমস্ত বিমানবালাদের সম্পর্কে আগে কতো কথাই না শুনেছি। তখন তাদের কথা শুনে হিংসা হতো। এদের মতো একই কাজ করার জন্য সুন্দর চেহারার পুরুষও দেখি, তবে তাদেরকে কি নামে ডাকা হয় তা আমি এখনও জানতে চেষ্টা করিনি। এই ডানাকাটারা কি কাজ করে তা দেখার পরে আর হিংসা করি না, তাদের জন্য করি আফসোস। তবে একথা ঠিক তাদের বৈধ আয় রোজগার যে কারোরই ঈর্ষার কারণ না হয়ে পারে না। বিমান উড়ার কিছুক্ষণ পরেই দেখলাম খাবার সার্ভ করার আয়োজন চলছে। একজন বিমানবালা এসে আমাকে প্রশ্ন করলো আর ইউ এম ডি ইসলাম? আমি ইয়েস বলতেই সে কোন রকমে থ্যাংকস বলেই বিদায় নিলো। একটু পরে সে ট্রেতে করে আমার জন্য বরাদ্দকৃত খাবার নিয়ে এসে আমার সামনের সিটের পেছনে আটকানো মিনি সাইজের ডাইনিং টেবিলে রেখে গেল। দেখলাম এ্যালুমিনিয়াম ফয়েল বক্সের উপরে লাগানো স্টিকারে লেখা MOSLAM FOOD, MD ISLAM. বাসা থেকে বের হওয়ার পরে অনেক আগেই ক্ষুধা লেগেছিলো কাজেই বিলম্ব না করে খাওয়া শুরু করলাম।

দুই স্লাইচ পাউরুটি, জেলি, মাখন, মধু, আইসক্রিম, আনারস, আপেল, আম, সিদ্ধ সিমের বীচি, সাদা ভাত আর ঘন ঝোলসহ কাটাছাড়া মাছের টুকরা। সাথে ছিলো দই, পানি আর কোক। সব কিছুই পরিমানে অল্প তবে আইটেম বেশী হওয়ায় ভরপেট খাওয়া হলো একচোট। প্রথম দফা শেষ হতেই আবার কমপ্যাক্ট ট্রলিতে চাপিয়ে আনা হলো কফি, চা, আম, আপেল আর আনারসের জুস এবং কোল্ড ড্রিংকস যার যা পছন্দ আমি নিলাম ম্যাংগো জুস। ইতিমধ্যে উচ্ছিষ্ট খাবারসহ খাবারের প্যাকেট ইত্যাদি পরিস্কার করা হয়ে গেছে। এবার আস্তে আস্তে সমস্ত লাইট বন্ধ করে দেয়া হলো। আশে পাশের সবাই ঘুমিয়ে পড়তে শুরু করলো। আমি আবার কখনই বিমানে ঘুমাতে পারি না, জার্নি যতো লম্বা সময়েরই হোক না কেন। আমার ব্রেন তখন বিমানের ব্যবস্থাপনার বিষয়ে গবেষণায় ব্যস্ত হলো। কতো কিছুই তো জানি না তবুও জানার ক্ষেত্রে নতুন একটা পালক যোগ হলো যখন মেয়েকে যখন প্রশ্ন করেছিলাম লম্বা জার্নিতে আমার খাওয়ার কি হবে? চায়না বিমান সংস্থায় আবার যাচ্ছিও চায়না ওরা তো সব-ই খায় আমার কি হবে? জননী জানালো তোমার কোন ভয় নাই হালাল খাবারই পাবে। প্রশ্ন করলাম কি ভাবে? জননী বললো আমার তো অনেকেই জানি না যে বিমান সংস্থা যাত্রীদের নানাবিধ সুবিধা দিয়ে থাকে। এর মধ্যে দূরের যাত্রীদের পছন্দ মাফিক আমিষ বা নিরামিষাশী খাদ্য সরবরাহ করা, শিশুদের জন্য অর্ডার মাফিক খাদ্য সরবরাহ করা। এছাড়াও যে যাত্রী একা চলাচল করতে পারে না তাদের জন্য হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা করে থাকে।

শুধু হুইল চেয়ারই না, যদি এমন যাত্রী একা একা ভ্রমণ করে তবে ঐ যাত্রীকে বিমান সংস্থা তাদের ব্যবস্থাপনায় এক বিমান থেকে নামিয়ে নিয়ে ট্রানজিটকালীন সময়ে তাদের জিন্মায় রেখে আবার পরবর্তী বিমানে উঠিয়ে সীটে বসিয়ে দেয়ার দায়িত্বও পালন করে। শুধু তাই না হুইল চেয়ারের যাত্রীকে তার গন্তব্য স্টেশনে পৌছার পরে তার রিসিভারের নিকট হস্তান্তরের দায়িত্বও পালন করে। তবে এসব কাজের জন্য কোন আলাদা ফি চার্জ করে না। এর মানে হলো কোন বোবা, কালা এবং অন্ধ একজন মানুষও একা একা এক দেশ থেকে অন্য দেশে নিরাপদে ভ্রমণ করতে পারবে যদি তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সাথে থাকে। তবে এ জন্য আগে থেকেই বিমান সংস্থার সাথে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করতে হবে। আমার মনে হলো আহা রে আমার মতো যদি মেয়েও এতো সব না জানতো তা হলে তো আমাকে শুধু পানি, চা, কফি আর কোল্ড ড্রিংকস খেয়েই ৩৬/৩৮ ঘন্টা পার করতে হতো। যাক আরো বার দুয়েক এরকম ভারী খাদ্য আর হালকা খাদ্যে উদর পুর্তি করার পরে পাইলট নিজের নাম ইত্যাদি বলে ঘোষণা করলেন যে, আমাদের আকাশ যান আর কিছুক্ষণের মধ্যেই হংকং এয়ারপোর্টের মাটি ছুতে যাচ্ছে। এ ঘোষণার সাথে সাথেই বিমানবালারা আমাদেরকে সীটবেল্ট বাঁধার জন্য বার বার তাগাদা দিতে শুরু করলো। অবশেষে আমরা বিমান রানওয়ে স্পর্শ করার মৃদু ঝাঁকুনি অনুভব করলাম। সেই সাথে সাথে আমার দীর্ঘ বিমান ভ্রমণের ১ম পর্বের আপাততঃ সমাপ্তি ঘটলো বলে মনটা একটু খুশি হলো। আবার সাথে সাথেই আগামী ১২ ঘন্টা ট্রানজিটের যাতনার কথা মনে পরতেই মনের সমস্ত পুলকিত ভাব নিমিষেই শেষ হয়ে গেল। এ অবস্থায় ক্লান্ত পরিশ্রান্ত দেহ ও মন নিয়ে বিমান থেকে নমে বাসে উঠলাম। সাথে সাথেই বাস হংকং এয়ারপোর্টের টার্মিনাল ভবনের দিকে যাত্রা শুরু করলো।