আমার চায়না মেয়ে-৭ ॥ আমিনুল ইসলাম



বাস কয়েক মিনিট পরেই থামলে সবার সাথে সাথে আমিও দিলাম হাঁটা। বেশ খানিকটা হাঁটার পরে এক্সেলেটরে চড়ে তারপর বড় এলাকায় এসে এক এক জন একেক দিকে চলতে শুরু করলো। আমি তো হতবাক হয়ে শুধু এদিক আর ওদিক দেখছি আর এগিয়ে যাচ্ছি। আমার এখন কোন তাড়াহুড়া নাই, প্লেন আমাকে ফেলে চলে যাওয়ার কোন ভয় নাই, ভয় একটাই এতো সময় একা একা থাকবো কি ভাবে? আর খাওয়ার কি হবে? দুই কারণে না খেয়েই থাকতে হবে প্রথমটা হলো হালাল বে-হালাল খাদ্যের প্রশ্ন আর দ্বিতীয়টা হলো ফিনানসিয়াল বা ডলারের চিন্তা। মনে পড়লো ২০১৮ সালে মেয়ে আর নাতিনের সাথে নিউইয়র্ক থেকে দেশে ফেরার সময় ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্টে নাতনির জন্য খাওয়ার অযোগ্য এক টুকরা পিজা কিনেছিলাম মাত্র ৩০ ইউএস ডলার দিয়ে। তার ১৪ আনাই ফেলে দিতে হয়েছিলো অখাদ্য হিসেবে। অমন এক টুকরা পিজা ঢাকায় পাঁচ টাকা দিয়ে কেনার মানুষও হারিকেন জ্বালিয়ে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমার হাতে যেহেতু কমপক্ষে ১২ ঘন্টা সময় আছে তাই নির্ভয়ে এদিক ওদিক দেখতে থাকলাম। প্রথম সুযোগেই বসার জায়গার সদ্ব্যবহার করলাম। একটু জিরিয়ে নিয়েই এয়ারপোর্টের ফ্রী ওয়াই-ফাই কাজে লাগিয়ে মেয়েকে কল দিলাম। মেয়ে আমাকে বার বার বলে দিয়েছে সুযোগ পাওয়া মাত্রই কল করবে সেটা রাত বা দিনের যে কোন সময় হোক। তাই মেয়ের সঙ্গে কথা বলা শেষে ছেলের সাথেও কুশল বিনিময় করলাম। আমাকে যেহেতু ১২ ঘন্টা সময় এখানে থাকতে হবে তাই স্থির করলাম আস্তে ধীরে এই এয়ারপোর্টের টার্মিনাল ঘুরে ঘুরে দেখবো।

যে কথা সেই কাজ শুরু করলাম নাক বরাবর হাঁটা। যাচ্ছি তো যাচ্ছি-ই শেষ হয় না। এখানে টার্মিনালে সংখ্যা অনেক। একটা থেকে আরেকটার দূরত্বও অনেক তাই পথের মাঝে দেখলাম চলন্ত রাস্তার ব্যবস্থা। প্রায় ৩০০ ফুট রাস্তায় হাঁটতে হয় না ঐ অংশে দাঁড়িয়ে পড়লেই কাজ শেষ। এক এক বার একেক দিকে যাওয়া শুরু করলাম। এখানে শত শত বেশ বড় বড় দোকান দেখলাম। নামিদামী ব্রাডের পোষাকের দোকান, ব্রান্ডের ঘড়ির দোকান, বড বড় গোল্ডের দোকান, প্রসাধনীর দোকান আরো কতো কিছুর দোকান। ঝকঝকে চকচকে আর সুসজ্জিত দোকান দেখে দেখে আমি তাজ্জব বনে গেলাম যে, এয়ারপোর্টেই এতো দোকান? আমার ধারণা হলো ঢাকার শাহাজালাল আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দরের টার্মিনাল ভবনের চেয়ে এটার টার্মিনাল ভবন ২৫-৩০ গুন বড় হতে পারে। একবার চলন্ত সিঁড়িতে করে উপরে গিয়ে গোলাকার এক জায়গায় অনেকগুলো খাবারের দোকান দেখলাম। দোকানগুলোর সামনে ফাঁকা জায়গায় গুচ্ছ গুচ্ছ আকারে গোল টেবিল ঘিরে চেয়ার পাতা। তাতে সামান্য কয়েকজন খরিদ্দার বসে খাবারে ব্যস্ত সময় পার করছে। আমি ঘুরে ফিরে একটু বসে আবার ঘুরতে যাই। এভাবে এক সময় বেশী ক্লান্ত হয়ে আরো অনেকের মতো একটু ফাঁকা মতো জায়গা দেখে বেশ খানিকটা লম্বামতো গদিওয়ালা সোফায় কাধের ব্যাগটা মাথার নীচে দিয়ে ঘুমাতে চেষ্টা করতে থাকলাম। প্রত্যেক বসার জায়গায়ই মোবাইল বা ল্যাপটপ চার্জ দেয়ার জন্য ব্যবস্থা দেখে আমিও আমার মোবাইলটা চার্জ দিতে কানেকশন করে দিলাম।

ঘুম আর আধা জেগে থাকার মাঝেই এক সময় দেখি সকাল হয়ে গেছে। আমার অবস্থান থেকে দেখতে পেলাম একদিকে সমুদ্র আর অন্যদিকে পাহাড়। বিল্ডিংয়ের দুই পাশেই অর্থাৎ সমুদ্রের দিকে আর পাহাড়ে দিকেও সারি সারি নানান সাইজের বিমান দাঁডিয়ে আছে। আমার কানেকটিং বিমান ছাড়ার কথা ১১টা হলেও ছাড়লো দুপুর ১২টায়। হংকং এয়ারপোর্টে অবস্থানের সময় আমি খেয়াল করে দেখলাম বিপুল পরিমান যাত্রী আসা-যাওয়া করছে যাদের দেখে মনে হয়েছে তারা সকলেই অনেক গরীব। তাদের সঙ্গে থাকা ব্যাগ ও ট্রলি এবং পোষাক পরিচ্ছদ দেখে যে কেউ-ই বুঝতে পারবে যে তারা বেশ গরীব। তারা এতো গরীব হয়েও কেন বিমানে ভ্রমণ করছে তা আমার বোধগম্য হলো না। তবে আমি পরে অনুসন্ধান করে জেনেছিলাম এর কারণ। টার্মিনাল বিল্ডিংয়ে থেকেই সমুদ্রে চলাচলকারী নৌযান/জাহাজ আর পাহাড়ের পাদদেশে রাস্তায় চলাচলকারী মোটর যান দেখতে পাচ্ছিলাম। ট্রানজিট বিমানে উঠে দেখলাম আমি বাদে সবাই লোকাল প্যাসেঞ্জার গন্তব্য চীনের হ্যানান প্রভিন্সের রাজধানী Zhangzoou এয়ারপোর্ট। এই প্রদেশ তেমন উন্নত না হওয়ায় এখানকার মানুষ তুলনামূলক ভাবে অনেকটাই গরীব। এখানে কাজের সুযোগও কম। তাই এরা হংকংয়ে অনেক বেশী মুজুরিতে কাজ করে। বিমানে যেতেই সাড়ে তিনঘণ্টা লাগে তাই ট্রেনে গেলে সময় আরো অনেক বেশী লাগতো। সে কারনেই তারা বিমানে আসা যাওয়া করে আর বছরে তারা মাত্র ১-২ বার আসা যাওয়া করে তাই খরচ পুষিয়ে যায়। বিমান উড্ডয়নের প্রায় ঘন্টা খানেক পরে হালকা নাস্তা সরবরাহ করা হলে তা দিয়েই আমি প্রাতঃরাশ সেরে নিলাম আর এটাই হলো চীনের ভূ-পৃষ্ঠের কয়েক কিলোমিটার উপরে অবস্থানকালীন সময়ে আমার প্রথম খাদ্য গ্রহন

প্লেন ভূমিতে অবতরণ করলে সহযাত্রীদের সঙ্গে সঙ্গে আমিও এক সময় এক্সজিট গেটের কাছে পৌঁছলাম। ইমিগ্রেশন পুলিশের সঙ্গে কথা আদান প্রদানের আগে আমি বাইরে অবস্থনকারী ছেলের সাথে কথা বলার জন্য উতলা হয়ে গেলাম। কিন্তু কোন উপায় দেখছিলাম না। আমার মোবাইলে তো আমেরিকার সিম। আমি সবার পিছনে থাকায় তখন আশে পাশে আর কেউ ছিলো না। এমন সময় বেশ খানিকটা দূরে দুইজন যুবককে আলাপরত দেখে তাদের কাছে গেলাম। তাদের একজনকে মনে হলো বিদেশি আর একজন লোকাল। তাদের কাছে গিয়ে মনে সাহস নিয়ে ভেতরের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে বললাম, ‘এক্সকিউজ মি, আই নীড টু মেক এ ফোনকল টু মাই সান বাট মাই ফোন ইজ ডিজঅর্ডার নাও। প্লিজ হেল্প মি’। একথা বলতেই বিদেশি মতো যুবক ‘ইটস ওকে, নো প্রোবলেম’ বলে তার মোবাইলটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলে আমি থ্যাংকস এ লট বলে ছেলেকে কল দিলাম। ছেলে বললো তুমি বেরিয়ে আসো আমি সামনেই আছি। এবার আমি ঐ যুবককে প্রশ্ন করলাম হয়্যার আর ইউ ফ্রম? সে জবাব দিলো সাউথ আফ্রিকা এন্ড ইউ? আমি জবাব দিলাম নাউ ফ্রম ইউএসএ। এবার আমি তাকে থ্যাংক ইউ সো মাচ বলে ইমিগ্রেশন বুথের দিকে এগিয়ে গেলাম। চায়না ইমিগ্রেশন পুলিশ আর আমি উভয়েই উভয়ের ইংরেজি জ্ঞানের পরীক্ষা নিলাম। ফলাফল সমান সমান এতে দুই পক্ষই খুশিতে আটখান অবস্থা। চায়না পুলিশ আমাকে ছেড়ে দিয়ে আর আমি ছাড়া পেয়ে ইংরেজি বলার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে EXIT গেটের কাছে যেতেই আমার ছেলে দাঁড়িয়ে আছে দেখে বুকটার উপর থেকে পাহাড় সমান ওজন নেমে গেল।