আমার বন্ধু রাশেদ ॥ সুশীল সাহা




ত্রিরিশ লক্ষ্ প্রাণের বিনিমিয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ অনেক ত্যাগ ও তিতিক্ষার পরীক্ষা দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে সম্মানজনক জায়গা করে নিয়েছে। বাঙালি হিসেবে এ আমাদের গর্বিত অর্জন। যে দেশের সরকারি ভাষা বাংলা, বাঙালি হিসেবে সেই দেশের প্রতি আমাদের এক অলখিত টান। তাছাড়া, আমাদের অনেকের শেকড় যে ওই দেশেই। দেশভাগের করুণ পরিনতির শিকার আমরা অনেকেই যে একসময় ছিন্নমূল হয়ে প্রতিবেশি দেশে আশ্রয় নিয়েছিলাম। ইতিহাস যাই হোক না কেন, দুই দেশের মানুষদের মধ্যে অনেক মিল। অনেক পুরনো সখ্যের স্রোতধারা আমাদের মধ্যে বয়ে চলেছে আপন গতিতে। তাই সীমান্তের কাঁটাতারের বিভাজনকে মান্যতা দিয়েও দুই দেশের বাঙালির ঐক্য ও সখ্যের মাত্রা বাড়ছে। আমরা তাই নিত্য একে অপরের খোঁজ নিই। একে অপরের নির্মাণ ও সৃষ্টির ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করি।

নয় মাসের এক নিদারুণ লড়াইয়ের অবসানে বাংলাদেশ অর্জন করে ‘স্বাধীনতা’। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বাংলাদেশের পরতে পরতে। খুব স্বাভাবিক কারণেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও তার প্রভাব অনিবার্যভাবে এসে পড়েছে। ভাবলে অবাক হতে হয়, মুক্তিযুদ্ধকালীন ১৯৭১ সালেই জহির রায়হানের মতো সাহসী দেশপ্রেমিক চলচ্চিত্রকার নির্মাণ করেছিলেন ‘স্টপ জেনোসাইড’ এবং ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’-এর মতো প্রামাণ্যচিত্র। শুধু তিনি নন, ওই সময় আলমগীর কবির ও বাবুল চৌধুরীর মতো নিবেদিতপ্রাণ চলচ্চিত্রকার নির্মাণ করেছিলেন আরো দুটি প্রামাণ্যচিত্র। তারপর থেকে বাংলাদেশের পরিচালকেরা তৈরি করেছেন অজস্র কাহিনি ও প্রামাণ্যচিত্র। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বাংলাদেশের সমস্ত শিল্পী কবি সাহিত্যিক ও সাধারণ মানুষদের মধ্যে। তাই বাংলাদেশের অসংখ্য নির্মাণের মধ্যে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ছাপ। সেই অজস্র নির্মাণের মধ্যে আমার পছন্দের একটি ছবিকে বেছে নিচ্ছি আলোচনার জন্যে। মুক্তিযুদ্ধের আবহে শিশুদের কথা ভেবে নির্মিত এই ছবিটির নাম ‘আমার বন্ধু রাশেদ’। পরিচালনা করেছেন মোরশেদুল ইসলাম।

বাংলাদেশের লেখক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল ছোটদের জন্য প্রচুর গল্প উপন্যাস লিখেছেন। তাঁর কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক লেখাগুলো সত্যিই অসাধারণ। তাঁর একটি বড় পরিচয় তিনি বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কলম ধরেছেন। এজন্যে তাঁকে অনেকবার অপশক্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে, নিজের প্রাণ বিপন্ন করেও। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এক কঠিন রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। ১৯৭১ সালের নয় মাসের সেই যুদ্ধ আজ সমস্ত বাঙালির গৌরবময় ইতিহাস। সেই ইতিহাসের পথ ধরে ছোটদের উপযোগি বেশ কয়েকটি গল্প/উপন্যাস লিখেছেন তিনি। ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এক অসামান্য কিশোর উপন্যাস। সেই উপন্যাস অবলম্বনেই ওই দেশের মান্য পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম ২০১১ সালে নির্মাণ করেছেন ওই একই নামের একটি সিনেমা। ১৩৫ মিনিটের এই ছবির মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন সেই রক্তস্নাত সময়ের একটি বিশ্বাসযোগ্য আখ্যান।

আখ্যানের মুখ্য চরিত্র রাশেদ আপাত দৃষ্টিতে একটু বোকা বোকা মনে হলেও সে অত্যন্ত বুদ্ধিমান। নামটি তার স্কুল থেকেই পাওয়া। লাড্ডু থেকে এই নাম পাওয়ার পর্বটি একটু মজার হলেও অচিরেই তার বুদ্ধির গভীরতা প্রকাশ পায়। স্বদেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ তার মনন ও মেধার প্রভাবে ক্লাসের অন্যরাও মুক্তিযুদ্ধের লড়াইয়ে শামিল হয়। গল্পের অন্য আর এক প্রধান চরিত্র ইবু আর রাশেদের বন্ধুত্বের সূত্র ধরেই সিনেমার শুরু। যুদ্ধোত্তর এই সময়টায় পরিণত বয়স্ক ইবু তার পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে দিনাজপুর শহরে, যেখানে একদা সে তার বন্ধু রাশেদকে পেয়েছিল, যার অকালপ্রয়াণ ঘটে যুদ্ধের বাতাবরণেই। স্বাধীনতার বিপক্ষশক্তি রাজাকারবাহিনি তাকে ধরে নিয়ে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে এই মাটিতেই। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত যে ছিল আদ্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ।

ইবু আর তার পুত্রের কথোপকথনের মধ্যে দিয়েই একটু একটু করে উন্মোচিত হয় কাহিনির পরত। একজন মুক্তিযোদ্ধা শফিকভাই রাশেদের সেই অর্থে গুরু। সেই গুরুর প্রভাবে রাশেদ নিজেও হয়ে উঠেছিল এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। তাই সে দেশের সব খবর নিতে থাকে এবং ইবুসহ অন্য বন্ধুদের দিতেও থাকে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করার পরও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তার দলকে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি পাকিস্তানিরা। বঙ্গবন্ধুর ১৯৭১ সালের সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পটভূমি এই ছবিতেই আছে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানী সেনাবাহিনির একটি দল ওই শহরে আসে এবং ইবু- রাশেদদের স্কুলে ক্যাম্প তৈরি করে। নদীর ওপারে মুক্তিযোদ্ধারা এসে পৌঁছায় একসময়। অসমসাহসী রাশেদের উদ্যোগে চার বন্ধু মিলে স্কুলের একটি ম্যাপ মুক্তিযোদ্ধাদের পৌঁছে দেয়। এছাড়া চূড়ান্ত অ্যাকশনের আগে ওই চারজন শরীরে প্রচুর বুলেট লুকিয়ে ওপারে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে দিয়ে আসে। যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনি পরাজিত হয়ে পিছু হটে কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা শফিক আহত হয়ে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে এবং প্রবল নজরদারির মধ্যে হাসপাতালে স্থানান্তরিত হয়। সুস্থ হলেই ওঁকে সেনাবাহিনিরা ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে হত্যা করবে, সেই আশঙ্কায় রাশেদ ও তার বন্ধুরা ওকে ওখান থেকে উদ্ধার করার উদ্যোগ নেয় এবং এক অসাধারণ আকশনের মাধ্যমে সফলও হয়। আমরা জানি তিরিশ লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগের মাধ্যমে ওই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু রাশেদের মত বহু কিশোররাও যে এ যুদ্ধে শামিল ছিল সে কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন লেখক তথা পরিচালক।

এই ছবির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য রচনা হয় শেষদিকে যখন পরিণত বয়ষ্ক ইবুর সামনে এসে দাঁড়ায় তাঁর বন্ধু রাশেদ একেবারে সেই কিশোর বয়সের রূপেই। কল্পনা আর বাস্তবের সেই অসামান্য মিশেল আমাদের অশ্রুসজল করে তোলে। ক্ষণস্থায়ী সেই দৃশ্যেই ওই রাশেদের জায়গায় একটু পরেই দেখা যায় ইবুর পুত্রকে। আসলে তার নামও যে রাশেদ। এইভাবে প্রিয় বন্ধুর স্মৃতিকে মনের মধ্যে চির জাগরুক করে রেখেছে ইবু। সিনেমা শেষ হয়।
দেশ ও জাতির গৌরবময় ইতিহাসকে তো মনের মধ্যে এইভাবেই তো বাঁচিয়ে রাখতে হয়।