আমার ভালোবাসা, বাঁধ ভাসানো উচ্ছাস ॥ বাবুল আনোয়ার



আমার প্রথম বই ‘তবুও রয়েছি জেগে’। কবিতার বই, আমার প্রথম কাব্য। আমার লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন। আমার ভালোবাসা, বাঁধ ভাসানো উচ্ছাস, প্রাণের ছোঁয়ায় ফুটন্ত গোলাপ। আমার প্রথম বই আমার আবেগের জলে বর্ষার অবাধ নদী। দিগন্তে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করা আনন্দ ধ্বণি। যৌবন স্পর্ধিত অনিরুদ্ধ শব্দাবলীর দীপ্র উচ্চারণ।

প্রকাশিত হয় ১৯৯১ সালে। মিনা প্রকাশনীর নামে। আমার স্ত্রীর বড় ভাই অকাল প্রয়াত ফিরোজ আলম, প্রিয় ফিরোজ ভাই বইটি বের করার সব দায়িত্ব পালন করেন। এ সব লিখতে গিয়ে ফিরোজ ভাইয়ের স্মৃতি আমাকে তাড়া করছে। তার জন্য বেদনার্ত হয়ে ওঠছে মন। বইটির প্রচ্ছদ শিল্পী ছিলেন আমার সাংবাদিকতা জীবনের এক সময়ের সহকর্মী স্বজ্জন রফি হক। বইটিতে কবিতার সংখ্যা ৪০। মূল্য ছিল ত্রিশ টাকা। উৎসর্গ করা হয় আমার বাবা ছোবহান উদ্দীন আহমেদ, মা আম্বিয়া বসুনিয়া ও মা খোদেজা শাহকে। মুদ্রণ সংখ্যা ছিল ১২০০ কপি। এতো সংখ্যক কপি, তাও আবার কবিতার বই। অনভিজ্ঞতার কারণে এমনটি হয়েছিল। বইমেলায় বিভিন্ন স্টলে ১১২ কপির মতো বই বিক্রি হয়। অবশিষ্ট বইগুলোর মধ্যে আমার স্ত্রী সালমা আক্তার তার বিস্তৃত সার্কেলে মাত্র তিন মাসের মধ্যে ৬০০ কপি বিক্রি করতে সমর্থ হয়। ছয় মাসের মধ্যে বইটির সবগুলো কপি নিঃশেষ হয়ে যায়। ‘তবুও রয়েছি জেগে’র দ্বিতীয় মুদ্রণ হয় ২০১৭ সালের বইমেলায়। প্রকাশ করেন সংস্কৃতি প্রিয় প্রাণময় পুরুষ শ্যামল পাল তার পুঁথিনিলয় প্রকাশনী থেকে। ২০২০ সালে বইটি আবার, অর্থাৎ তৃতীয় মুদ্রণ করে পুঁথিনিলয়। এ সময় কয়েকটি কবিতার সামান্য পরিবর্তন করা হয়। বইটির এ মুদ্রণ এখন বাজারে আছে।

প্রথম বই একজন লেখকের জন্য অনেক কিছু। মেধা, সৃজনশীলতা, স্বপ্ন ও আবেগে জড়ানো সোনালী ফসল। সন্তানের মতো অবিছিন্ন। রক্ত সম্পর্কের মতো যেন চিরকালীন ফল্গু ধারার মতো আবেগ-অনুরাগের সঙ্গে সম্পর্কিত। আমার বইটিও তাই।

আমার প্রথম বইয়ের অধিকাংশ কবিতাই ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে দৈনিক বাংলা, দৈনিক ইত্তেফাক, বাংলার বাণী, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, সন্ধানী, রোববার, বাংলা একাডেমী সাহিত্য পত্রিকা উত্তরাধিকার উল্লেখযোগ্য।

বইটির প্রথম কবিতা ‘ফেরা’ ইত্তেফাকের একটি বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়ার পর বেশ হৈ চৈ পড়ে। সম্ভবত প্রকাশ সময় ছিল ১৯৯০। সে বছরই এ কবিতাটি বিএম (বরিশাল) কলেজের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় আবৃত্তির জন্য মনোনীত হয়। এ কবিতাটি তিন বিশিষ্ট বাচিক শিল্পী কণ্ঠে ধারণ করেন। এর মধ্যে খ্যাতিমান আবৃত্তি শিল্পী বদরুল আহসান খানও রয়েছেন। আরেকটি কবিতা ‘প্রত্যাবর্তন’ কিংবদন্তী কবি শামসুর রাহমান তার নির্বাচিত কবিতা হিসাবে ‘বিচিত্রায়’ ছেপেছিলেন। এ কাব্যের ‘গোলাপের গল্প’ কবিতাটি আমার সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সড়ক’-এর শিল্পীরা গান হিসেবে পরিবেশন করেন। ‘ফেরা’ কবিতাটি বৃন্দ আবৃত্তি হিসেবেও বেশ কয়েকবার পরিবেশিত হয়। এ কাব্যভুক্ত সবচেয়ে ছোট কবিতা ‘একান্ত বার্তা’ অনূদিত হয়ে Selected Asian poems নামে পশ্চিমবঙ্গ থেকে একটি সংকলনে ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয়। কবিতাটি খুবই ছোট বলে তুলে দিলাম:
আসবে যদি এসো
বাড়িয়ে দাও হাত-
চেয়ে দেখ চারিদিকে
জোছনা মাখা রাত।
ইংরেজিতে এর নামকরণ করা হয় ‘Exclussive message’। এ বইয়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কবিতা আমার বাবাকে নিয়ে লেখা ‘আজীবন শীতার্ত মানুষ’। তিনি তখন জীবিত ছিলেন। কবিতাটি শোনার পর অনেকক্ষণ নীরব থেকে বাবা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। চোখের জলে এক আশ্চর্য আবেগে বাবা ও সন্তানের আনন্দময় মিলনের এক মহাপর্ব রচিত হয় সেদিন।

প্রথম বই ও কবিতার কথা মনে হলে একজন কবি নীরবে আমার সামনে উপস্থিত হন। অথবা আমি তার প্রদীপ্ত, স্নিগ্ধ মুখাবয়ের কাছে নতজানু হয়ে পড়ি। তিনি ত্রিশরোত্তর বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি আহসান হাবীব। হাবীব ভাই বলে সম্বোধন করতাম আমি। অপত্য স্নেহ ও স্নিগ্ধতায় তিনি আমাকে সারাজীবন মুগ্ধতায় জাগিয়ে রেখেছেন। আজকের খ্যাতিমান কবি নাসির আহমেদ তখন হাবীব ভাইয়ের সহকর্মী হিসাবে দৈনিক বাংলায় কাজ করতেন। নাসির ভাই সব সময় আমাকে কবিতার বিষয়ে উৎসাহ দিতেন। হাবীব ভাইয়ের দেয়া পরামর্শগুলো তিনিই জানাতেন। কবিতার বিষয়ে বিশেষ করে ছন্দ সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি বইয়ের নাম তিনি হাবীব ভাইয়ের হয়ে আমাকে পড়ার জন্য জানিয়ে দেন। ১৯৮৩ সালে হাবীব ভাইয়ের হাত ধরে দৈনিক বাংলায় দুটি কবিতা প্রকাশিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয়ভাবে আমার কবি জীবনের পথ চলা শুরু। এরপর অনেকে বিশেষ করে কবি রফিক আজাদ ও কবি সিকদার আমিনুল হক আমাকে কবিতা বিষয়ক একান্ত আলাপচারিতা, সান্নিধ্যে লাভের সুযোগ দিয়েছিলেন। আজ সবাইকে আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।

প্রথম কবিতার বইটিতে তারণ্যদীপ্ত আবেগ জড়িয়ে আছে। কবিতাগুলোতে দেশ প্রেম, ভালোবাস, প্রগাঢ় মানবিক বোধ ও প্রতিবাদী চেতনার স্ফুরণ লক্ষ করা যায় । আমি চেষ্টা করেছি প্রবহমান অক্ষরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দে কবিতাগুলো লেখার। আমার কবিতায় প্রকাশ ও ভাবের একটা সহজাত গতিময়তা রয়েছে। পরিমিত বোধ, চিত্রকল্প, উপমার পরিপাটি বুনন রয়েছে বলে দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত আলোচনায় অভিমত প্রকাশ করা হয়। উত্তরাধিকার (জুলাই-সেপ্টেম্বর ১৯৯১) সংখ্যায় উল্লেখ করা হয় ‘বাবুল আনোয়ারের কবিতাগুলোতে শিল্পিত পরিচর্যা এবং প্রতিভার উজ্জ্বলতা আছে’।

আমার প্রথম বই আমার লেখক জীবনের উদ্বোধন স্মারক। আমার সাফল্য, ব্যর্থতা, আনন্দ, বেদনার মথিত বাণী। আমার ভালোবাসা। যেন রাত্রি জাগা নুলো ভিখিরীর গান, স্বপ্নময় ভোরের মোহনা।