আয়েশা মুন্নির কবিতা




ভুল ঠিকানায় চিঠি


আমি তোমায় আমার পুরোটা পৃথিবী দিয়েছিলাম…
তোমার উদার আকাশ আমি হয়েছিলাম…
কিন্তু তুমি পাখি হয়ে রইতে পারলেনা।

তুমি পরিবেশ ধ্বংসী বিষাক্ত কালো ধোঁয়া হয়ে
তোমার পৃথিবীর বুক ভরে দিলে তাতে…
অথচ তোমাকে দেয়া আমার এক আকাশে
তোমার নরম পালকের ওমে আমায় ঢেকে রাখার কথা ছিল।

জাগতিক সকল অনাচারের কালো ধোঁয়া বুকে
যখন ধারন করতে করতে পৃথিবী ক্লান্ত হয়।
ঝড় বৃষ্টি খরা জলোচ্ছ্বাস কোন কিছুই যখন মানুষের বোধে টোকা দেয় না।
জানো তো, প্রতি একশো বছর পর পৃথিবীতে একবার মহামারী আসে।

তবে আমিও এবার আমার হবো, নিজেকে নিয়ে ভাবার অবকাশে
নিজেই নিজের আকাশ হবো।
আমার আকাশের শুভ্রতার পবিত্রতায়
আমি সুন্দর থেকে আরো সুন্দর হবো।

আফসোসে অনন্ত নিজেকে নিজের গোপনে তুমি বলবে
ওই সুন্দর কখনো আমার ছিলো…
ওই পৃথিবী আমার ছিলো…
ওই শুভ্র আকাশটার মালিকানা আমার ছিলো…
কেন আমি পাখির মতো জীবন ছেড়ে বিষাক্ত হলাম।
তুমি ঠিকই দীর্ঘশ্বাসে ভারি বুক হালকা করতে
পৃথিবীর বুকে আরো বিষ ছাড়বে।
আবারো অপেক্ষা করবে আরো একটা পাখির জনমের…।

কিন্তু ভুল ঠিকানায় আর চিঠি যাবেনা আমার…


প্রেমহীন জীবন

প্রেম, ভালোবাসায়
লুটোপুটি সময়,
জীবনকে টানে শুধু আঁধারে,
যদি তুমি সুখ চাও
তবে সব ছেড়ে দাও,
প্রেম প্রীতি উড়ে যাক বাদাড়ে।

সহজ হিসেবে কিছু
বলে দাও প্রেম নীচু,
জাতপাতে সব সব- অচ্ছুত,
জানবে অন্তর্যামী
আমাদের পাগলামি,
প্রেমহীন জীবনটাই তেতো।

তাইতো বিন্দু থেকে
বৃত্ত হয়েছে শেষে,
ভালোবাসা বিজয়ী ভূলোকে…
বাঁধা ও দ্বিধা ভয়
সবকিছু করে জয়,
প্রেম তুমি এসো পলকে।


কাব্য খুনি

আমি কাকে, কখন খুন করছি নিজেই জানিনা।
আমি বলছি, কবিতার কথা।
প্রতিদিন খুন, প্রতিদিন রক্তপাত প্রতিদিন এক অসহ্য জীবন।
কবিতার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য
শিশুর ছিন্ন মাথার মত আমার টেবিলে পড়ে থাকে,
কলম হয় ছুরি।
কবিতা লিখা হলো কই।
কবিতাকে যখন খুন করি,
কবিতার মৃতদেহ জোড়া লাগে কই?
সুঁই নেই, সুতো নেই, শব্দের গাঁথুনি নেই, শুধুই বিপর্যয়
সৃষ্টি এখানে হাসে না।
নিঃতেজ পড়ে থাকে প্রতিমার দেহ।
প্রতিদিন খুন করি, প্রতিদিন খুনি হই,
প্রতিদিন অচ্ছুত অনুভূতির করি চাষ।
যে কিছুই পারে না সে শুধু শব্দ হত্যা জানে…
কবিতার মৃতদেহ নিয়ে বসে থাকে দিনের পর দিন,
না পারার লজ্জা এসে মুখ ঢেকে দেয়।
তোমরা আমাকে যদি কবি বলো,
হেসে ফেলবে ভোরের কাক,
এমনকি সদ্যজাত অবুঝ শিশুটাও।
আমি কবি নই, আমি কাব্য খুনি।


হলুদ খামের ইতিকথা

ইচ্ছে ছিল একটি দীর্ঘ কবিতা লিখে
হলুদ খামে পোস্ট করবো তোমাকে,
আজও আমি লিখতে পারিনি সেই কবিতা
তাই পোস্ট করাও হয়ে উঠেনি।

আমি লিখতে চেয়েছি সেই অতীত,
সেই কষ্ট বেদনার রোজনামচা
লিখতে চেয়েছি সেদিনের সেই অবহেলার বিভীষিকা,
লিখতে চেয়েছি বিরহ কিংবা গোপন অশ্রুপাতের ইতিকথা
লিখতে চেয়েছি প্রতিটি নির্ঘুম রাতের হাহাকার…
প্রথম সতীচ্ছদ…
লিখতে চেয়েছি প্রথম মাতৃত্বের বিষাদ,
দুগ্ধবতীর দুঃখ বিশেষ…।

এক এক ফোঁটা মাতৃদুগ্ধ আর চোখের অশ্রু
মিলেমিশে কী করে জীবন্ত রক্ত বিন্দু বিন্দু ঝরে।
লিখতে পারিনি…।
বহু চেষ্টা করেও লিখতে পারিনি
লিখতে পারি না…
কি করে লিখি বল?
লিখতে গেলেই চোখ ভিজে স্মৃতির ভীড়ে।
আমি তখন কেবল কাঁদি, শুধু কাঁদি।
সেই কান্না আমি আর কাঁদতে চাইনা,
তাই তোমাকেও লেখা হয় না,
যেমনি করে বলা হয়নি কখনো।
বলা হয়নি-তোমার পথ চেয়ে
আমার অপেক্ষার প্রহরের সার্বক্ষণিক উদগ্রীব থাকার গল্প।

এক জীবনে কতকিছুই বলা হয়নি তোমায়
হয়তো আর কখনোই বলা হবে না…
সে সব দিনরাত্রির আবেগ কি করে দাফন করেছি বুকের গভীরে।

হেলায় ফেলায় কাটানো জীবন আমার
ভরা পূর্ণিমার চাঁদ দেখি খোলা জানালার ফাঁক গলে,
জোছনা রাতে তারা গুণে কাটিয়ে দিয়েছি
এক জীবনের সকল বসন্ত…
তবুও একখানি দীর্ঘ কবিতা লেখা হলো না।

সেদিনগুলো আমাকে নীরবে কাঁদায়
আমি চেষ্টা করেছি বহুবার তবু
লিখতে পারিনি…
কি করে লিখবো…
লিখতে গেলে কত স্মৃতি চোখে ভীড় করে
তখন আমি কাঁদি কেবলি কাঁদি।

গভীর রাতে যখন নিঃশ্বাসের ভারে জানালা খুলে দেই,
খোলা জানালায় উদাস চেয়ে আকাশের গায়ে
তোমার প্রতিচ্ছবি আঁকি মনের খেয়ালে…
তারপরও- চিঠির মত দীর্ঘ কবিতা লেখা হয়ে উঠে না।
লজ্জায় চাঁদ ডুবে যায়
অন্ধকারে আমি কাঁদি
আরও বেশি কাঁদি…
তবুও হলুদ খামে দীর্ঘ কবিতা
পোস্ট করা হলো না তোমায়…!


ভাটিয়ালি ভাওয়াইয়া

-হ্যালো…
-কে বলছেন?
-চিনতে পারছ না? আমি
আ মি…
-ও, আপনি?

-কেমন আছো?
-ভালো।
-আমি খুব বুঝতে পারি বাইরে ব্যক্তিত্বের কঠোর লেবাস পড়ে থাকলেও ভেতরে তুমি একা, খুব একা। তেমন আমিও।
-বাহ্, মনোবিশ্লেষক।
-হা হা, তা বলতে পারো।
-বলুন আপনি কেমন আছেন?
-ভালো থাকার চেষ্টা বলতে পারো।
তবে ঠিক ভালো নয়।

-তা কেন?
-খুঁজছি এমন কাউকে যেখানে পরম নির্ভরতায় মাঝে মাঝেই নিঃশ্বাস রাখা যায়।
-বাহ্, আমিও ঠিক তাই ভাবছিলাম।
-এটা হলো তোমার সাথে আমার মনের মিল। একই অনুসন্ধান চলছে ভেতর ভেতরে, তাই।
-অনুসন্ধানের শেষ হয়নি আজও।
-ওমা তাই? আমার প্রতি বিশ্বাস রাখতে পার, আমি সেই লোহার সিন্দুক।
-তবে নিরীক্ষা তাপস শুরু…
-আমাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার উর্ধ্বে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে পার।
তবে একটা অনুরোধ।

-নিশ্চয়ই।
-আমাকে তুমি বললে খুশি হবো।
-হয়ে যাবে ক্রমান্বয়ে।
-এখন আপাতত বিদায় নিতে চাই, স্নানে যাবো, ভিজবো।
-আমিও তাই যাচ্ছিলাম, কথার মায়ার আটকে গেলাম। ভালো থাকুন।
-আজ স্নান ভালো হবে, কবিতার মতো ছন্দময়, কল্পনায় কবি, অনিন্দ সুন্দরী এক কবি। মরেই যাবো।
-হা হা, পাগল। আসি তবে। একটু পরে কথা হবে।

… বেশ কিছু সময় পর …

-গোসল শেষ তোমার?
-হুম।
কেমন হলো মনোবৃষ্টির স্নান?
-দারুণ, মনোহর ।
তোমার?
-হারাতে পারিনি।
আচ্ছা, এখন কাজ আছে।
ভালো থাকবেন পরে কথা হবে।

…. পরদিন…

-আমাদের কি দেখা হতে পারে?
-হয়তো হবে, হয়তো না।
-তোমাকে আমন্ত্রণ। আমার বাসা এক নির্জন কবিতার আশ্রম।
-নির্জন কেন?
-সব মানুষেরই শ্বাস ফেলার জন্য নিজস্ব একটা সবুজ কর্ণার দরকার। মানুষ প্রকৃত প্রস্তাবে খুব একা, সকলের মাঝে থেকেও একা। দূরে থেকে থেকে খুব সন্তর্পণে হাসি খুলে দেখি, ভেতরে তার মহাসমুদ্র। যেমন তুমি, কতবার নিজের সঙ্গে কথা বলো অবিরাম। ঠিক আমিও তেমন।
-কী করে বুঝলেন?
-মুখ দেখে বুঝতে পারি। বিশ্বস্ত আদর কোথাও নেই।
-তা হয়তো নেই, তবে আমার নিজের সাথে নিজের একটা জগত আছে।
-কি উর্বর তুমি, তোমার কবিতার মত। সে কবিতার নাভিমুলে আমি ভিজবো। কি নামে ডাকি তোমায়?
-ঐ যে বললেন ‘কবিতা’।
-মুগ্ধ আমি।
-মুগ্ধতা আসে ক্রমান্বয়ে।
-হুম, ধীরে ধীরে দ্বার খুলে গুঢ়তার রহস্য উন্মোচনের, তবেই তো রচিত হয় কবিতা।

-কবির সান্নিধ্যে নিভৃতে আনন্দের জন্য কবির একখানা ছবি চাই, যা দেখে আমিও লিখবো ১২ হাজার গীতিকবিতা। কবিতার বৃন্তে পংক্তি রচনা করেই হবে ভাটিয়ালি ভাওয়াইয়া…