ইটের মিনার : ‘ভালোবাসার হীরের গয়না’॥ শুচি সৈয়দ



ঠিক ‘প্রথম বই’ বলতে আমি কোনটাকে চিহ্নিত করবো? কিংবা ‘বই’ বা ‘সংকলনে’র মধ্যে পার্থক্য করবো কীভাবে- তা ঠিক বুঝেও উঠতে পারছি না।
সংক্রান্তির জন্য মামুন ‘প্রথম বই’য়ের স্মৃতি, আবেগ, উত্তেজনা, ভালোবাসা এসব নিয়ে লিখতে বলেছেন- মেসেঞ্জারে রাতে জানতে চাইলেন, ‘লেখাটা শুরু করেছি কিনা’? উত্তরে লিখলাম, ‘কাল শুরু করবো;’ কিন্তু মনে হলো এখনই লিখি। লিখতে বসেই এমন বিপজ্জনক প্রশ্নগুলো গলা চেপে ধরল বলা চলে। মনে হচ্ছে তাঁকে কথা দেওয়াই ঠিক হয়নি- কেননা তিনি যে অবস্থান থেকে, বাস্তবতা থেকে লিখতে বলেছেন- সেই বাস্তবতা তো আমাদের সময়ে ছিল না।

এখন একটা ছেলে কিংবা মেয়ে লিখতে শুরু করলেই লিখে বই প্রকাশ করে একুশের বই মেলায় দোকানে বসে অটোগ্রাফ দিয়ে বই বিক্রি করতে বসে যায়- অনেকটা ‘বই প্যাকেজ’। প্রকাশক আছে, লেখক আছে, বইমেলা আছে, ক্রেতা আছে, আছে হয়তো পাঠকও। আর বই তো আছেই- এটা হচ্ছে মামুনদের সময়ের বাস্তবতা।

বর্তমান বাস্তবতার আরও সহজ সরল তরিকা তাহল- লিখেই ফেসবুকের ওয়ালে ছেড়ে দেওয়া- এখন এমনকি পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাকেও ফেসবুকে অনলাইনে তুলে দেয়া। যেন লিখে ফেললেই সেটা লেখা, সেসব বুক বা অনলাইনের ওয়ালে উঠালেই সেটা লেখা।
সংক্রান্তি’র মামুনকে আমি কী করে উপলব্ধি করাবো যে, আমরা বেড়ে উঠেছি একটা সদ্য স্বাধীন দেশে-যুদ্ধ বিধ্বস্ত, বন্যা-বিধ্বস্ত-দুর্ভিক্ষ বিধ্বস্ত দেশে- সর্বগ্রাসী নিঃস্বতার সময়। ‘বই’ তখন বহু দূরের চাঁদের মত প্রায়- আমাদের সেই প্রজন্মের কাছে। আমার কাছে অবশ্য বই ছিল বিস্কুটের মত। কারণ আমার বাবা শাহজাহান মাহমুদ ছিলেন এক আশ্চর্য মানুষ। রোজ তিনি আমার জন্য বাদশা কাকার ‘বইঘর’ থেকে একটা করে বই আনতেন। প্রগতি প্রকাশন মস্কো প্রকাশিত শিশুদের ঢাউস সাইজ রঙিন সেই বই। আর এক প্যাকেট বিস্কুট। সকাল বেলা ঘুম ভাঙলে আমি বিস্কুট খেতাম আর বই ছিল সারা দিনের সঙ্গী। বই ছিল আমার বেবিসিটার। কর্মজীবী মায়েরা তাদের সন্তানদের যেমন বেবিসিটারদের কাছে রেখে ডিউটিতে যায়- তেমন আমাকে বাবা রেখে যেতেন বইয়ের কাছে। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হবার ‘সৌভাগ্য’ ছিল বটে আমার। আমার ভাই-বোন-বন্ধু-আপন-জনের নাম ছিল- বই।

বইতো অজস্র পড়েছি আর পড়তে পড়তে বোধহয় লেখার তাগিদও জন্মে- সেই সূত্রে লেখালেখির শুরু- এখনো আমি লেখালেখিতেই আছি- সেটা এখন জীবন জীবিকার বাহন। যা বলছিলাম- আমরা এ-তো নিঃস্বতার ভেতর দিয়ে এসেছি যে সেটা এ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা কল্পনাও করতে পারবে না। তাই আমার এই লেখাটিকে বরং প্রথম বইয়ের আবেগ উত্তেজনা না বলে বলা চলে লেখালেখির গল্পসল্প। আমরা যখন লেখালেখির শুরু করি, তখন লেখা প্রকাশের এত অবারিত সুযোগ-সুবিধা-অর্থ সম্পদ ছিল না। নিজেদের লেখা ছাপার জন্য নিজেদেরই উদ্যোগ নিতে হতো সংকলন বের করার। জীবনে প্রথম যে সংকলনটি প্রকাশের পেছনে প্রায় তিন চার মাস গাধার খাটুনি খেটেছিলাম- তাতে সম্পাদক হিসেবে আমার নাম ছাপা হওয়া তো দূরের কথা- সম্পাদকের সম্পাদকীয়তেও উল্লেখ করা হয়নি যে প্রায় ৩/৪ মাস রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বিজ্ঞাপন টোকানো আমাদের পরিশ্রমের কথা কিংবা সকাল-বিকাল যে প্রেসে সংকলনটি ছাপা হয়েছে সেটি (আবদুল হাই ভাইয়ের বুলবুল আর্ট প্রেস) সেখানে বসে সম্পাদনা, (কম্পোজিটর প্রাণেশ মণ্ডল দা’র কম্পোজ ছিল প্রায় নির্ভুল) প্রুফ দেখা, ট্রেডেল মেশিনের মেশিনম্যান নজরুলকে ছাপার অনুমতি দেবার কথা। আর শেষ পর্যন্ত ২০ ফেব্রুয়ারি সারারাত জেগে ফর্মা ভাঁজ করে, প্রচ্ছদে আঠা লাগিয়ে পেস্টিং করে কাটিং করিয়ে এনে প্রভাত ফেরিতে সংকলনসহ শরিক হবার সংগ্রামের কথা। না, কেউ মনেও রাখেনি। ভুলে গেছি আমি নিজেও। আমারই মনে হল- মামুনের লেখার তাগাদায়। হ্যাঁ, প্রভাত ফেরিতে বুকে কালোব্যাজ লাগিয়ে পাবনার মত মফস্বল শহরেও যখন বন্ধুদের বাগান থেকে চুরি করা ফুলে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি / আমি কি ভুলিতে পারি’ এই অমর পংক্তি বুকের গভীর গভীরতর স্তর থেকে উৎসারিত হয়েছে তখন হাতে ধরা সংকলনটিকে মনে হয়েছে শহীদদের প্রতি নিবেদিত সর্বশ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য, সর্বশ্রেষ্ঠ নৈবেদ্য। আমাদের সম্মিলিত শ্রমের ফসল সেই সংকলন।

এই ছিল প্রথম প্রকাশনা, প্রথম সংকলন। সেই পত্রিকার সর্বশেষ পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছিল আমার লেখা কয়েকটা লিমেরিক। এ যেন কায়েদে আজম মহম্মদ আলী জিন্নাহ-র উল্টো দিকে দৌড় দিয়ে ফার্স্ট হবার উদারহণ। সংকলনটি ছিল আমাদের শিশু সংগঠন ‘সবুজ সমিতি’র একুশের সংকলন ‘সবুজ পাতা’। বেরিয়েছিল ২১ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭ সালে।

সদ্য স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে তখন একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল ‘সংকলন’ প্রকাশনার উৎসবের মাস। সমস্ত দেশে ছড়িয়ে থাকা কিশোর-তরুণ-প্রবীণরাও একুশের শহীদদের স্মরণ করে লিখতেন, লেখা দিতেন, দিতেন উৎসাহ, সে সব সংকলন ছিল প্রাণের অর্ঘ্য- ভাষা-শহীদদের উদ্দেশে। এখনকার তরুণদের কি হাজারো ভাবে বুঝিয়ে বললেও সেটা তারা বুঝবে? উপলব্ধি করতে পারবে? আহা নগ্নপদে প্রভাত ফেরী শীতের ভোরে- ভাষার জন্য, দেশে জন্য যে শহীদরা জীবন দিয়েছে তাঁদের সেই আত্মত্যাগের কাছে কত তুচ্ছ ছিল আামাদের সেই প্রভাতফেরীর ভোর, নগ্ন পদের কষ্ট!

সারাদেশ থেকে প্রকাশিত একুশের সংকলনগুলো ছিল- দেশের মানুষের প্রতিটি জনপদের প্রাণের কোলাহলে পূর্ণ- সেসব সংকলনের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় থাকতো যৌথ শ্রম, উদ্যম, ভালোবাসার উত্তাপ।
তখন আরো যে সময়গুলোতে সংকলন বেরুতো- ২৬ মার্চ, স্বাধীনতা দিবস স্মরণে। ১ লা বৈশাখ, নববর্ষ উপলক্ষে। ১৬ ডিসেম্বর, বিজয় দিবস উপলক্ষে। কোথাও কোথাও ঈদ উৎসব এবং দুর্গাপূজার সময়ও সংকলন প্রকাশের আয়োজন চলতো। সেই দিনগুলো এখন দৈনিক পত্রিকা বিশেষ সংখ্যায় রূপান্তরিত হয়েছে। তখন দৈনিক পত্রিকাগুলো নববর্ষ-ঈদ-পুজোর বাইরে সরকারি ক্রোড়পত্রের মত এক পৃষ্ঠার কিছু একটা করতো হয়তো, তার বেশি নয়। বাংলাদেশের ১৯ জেলাকে তখন বলা হতো, মফস্বল- এটা পত্রিকার ভাষায়। অর্থাৎ গ্রাম নয়, আধা শহর। ‘গ্রামের মানুষ’ বা ‘মফস্বলের মানুষ’ ছিল অচ্ছুৎ একটা বিষয়। আদর করে কেউ কেউ বলতেন ‘দেশের মানুষ বা আত্মীয়’ অর্থাৎ তাদের জমিজমার দেখভালকারী।
স্বাধীনতা আমাদের সেই তুচ্ছতাটা অন্তত অবলোপন করেছে। এসব কথা বলার অর্থ বাংলাদেশের সুবিস্তৃত জনপদে যে মানুষের ভেতরে অদম্য প্রাণশক্তি আছে সেই কথা স্মরণ করা। ওইসব সংকলনগুলো ছিল সেই প্রাণশক্তির উত্তাল ঢেউ। এখন নদী শুকিয়ে যাবার মত শুকিয়ে গেছে সেই প্রাণের ঢেউ। এখন আর কেউ সংকলন বের করার চিন্তা করে না- বই বের করে ফেলে সরাসরি। অর্থাৎ চিন্তার যৌথতার, ভালোবাসার, প্রয়োজনীয়তা যেন অনুভবের বাইরের বিষয়। তো, আমরা ছিলাম যুথবদ্ধ যুগের মানুষ।

আমি আমার বই প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে সেই ‘যুথবদ্ধতাকে’ উপলব্ধি করছি। আমাদের প্রথম বইয়ের নাম ‘ইটের মিনার’। নাকি এটা একটা সংকলন যাকে আমি বই বলছি ভালবেসে।
পকেট সাইজের এই ‘ইটের মিনার’ নিউজপ্রিন্টে ছেপে বের হয়েছিল পাবনার আবদুল হাই ভাইয়ের বুলবুল আর্ট প্রেস থেকে। একই সঙ্গে বইটি ছিল আমার পিতৃপ্রতিম অগ্রজ শ. ই শিবলীরও। অর্থাৎ সেটি ছিল যৌথ সংকলন।
সেটি বের করার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব শিবলী ভাইয়ের। তিনি তাঁর লেখা পনেরটি এবং আমার লেখা পনেরটি ‘লিমেরিক’ একত্র করে স্বাধীনতা দিবস উনিশ শ’ আশিতে ছেপে বের করেছিলেন। নিউজপ্রিন্টে ছাপা হওয়া সেই বইটি নিয়ে সমাজে কোনো আলোড়ন-বিলোড়ন ঘটেনি। এমনকি আমার মাঝে যে সেটি খুব আবেগ-উত্তাপের ছাপ রেখেছিল তা নয়। কিন্তু সেই প্রথম সংকলনটিই আজ আমার কাছে এক আশ্চর্য রকম মানবিক ভালোবাসার, জীবনের শ্রেষ্ঠ মহার্ঘ হয়ে ওঠার বিষয় হয়েছে।

কালের ধুলায় কেউ যে কর্মকে মনে রাখেনি, এমনকি আমি নিজেও- সেই সংকলনটিই যখন ‘পোকায় ধরা’ অবস্থায় আমার মায়ের মত ফুপু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাসে বিভাগের অধ্যাপক ড. আয়েশা বেগম তাঁর অজস্র কাগজের স্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া কপিটি আমাকে ফিরিয়ে দিলেন, আমার কন্যার সামনে তখন সত্যি নিজেকে আশ্চর্য সুন্দর এক রাজার কুমার রূপে উপলব্ধি করছিলাম। আমাকে একটা সম্পূর্ণ রাজ্য লিখে দিলেও আমি কী এতো খুশি হতাম? জানি না। যাকে বলে সাত রাজার ধন, সেই সাত রাজ্যের ধন- পাবার অনুভূতি আমি উপলব্ধি করছি এই লেখাটি লিখতে বসে। কেন এই বোধ? তার অনেকগুলো কারণ- প্রথম কারণ হচ্ছে বইটি আমার প্রয়াত পিতা শাহজাহান মাহমুদ, যাঁর ডাক নাম ‘পান্নু’ তিনি একটি বাক্য লিখে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন তাঁর চাচাতো বোনের সন্তান অনুপম কামালকে। আব্বা বইটির প্রচ্ছদের ওপর লিখেছিলেন, ‘‘অনুপম মামাকে- পান্নু মামা’’।

আমার বাবা যিনি ছিলেন বইয়ের ভান্ডার। তার ওপর তাঁর বন্ধু ভাষাসংগ্রামী আমিনুল ইসলাম বাদশা কাকার বইঘর ছিল তখন পাবনা শহরে রূশ, চীনসহ বিশ্ব সাহিত্যের বইয়ের সবচাইতে সমৃদ্ধ একটি পুস্তক বিপণি। সেখানকার চাররঙা অসংখ্য বইয়ের মধ্য থেকে অনেক বই তিনি তার ভাগ্নেকে দিতে পারতেন, সম্ভবত দিয়েছিলেনও। তার সঙ্গে আমার এই তুচ্ছাতিতুচ্ছ ‘লিমেরিক সংকলন’টি যে তিনি উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন- তা আমার জন্য অনেক গর্বের এবং অহংকারের। তার মানে আমাকে তিনি একজন লেখক বলে মনে করেছিলেন- পুত্র স্নেহে নয়, পুত্র গর্বে। এর চেয়ে বড় গৌরবের, তৃপ্তির কিছু আজ পর্যন্ত কি পেয়েছি লেখালেখি থেকে- জীবিকা সংস্থান ছাড়া। শুধু আমার ভালোবাসাই নয় এই সংকলনটি অনেক মানুষের ভালোবাসার চাদরেই মোড়া। যেমন- আমার ফুপুটি এবং তাঁর গোটা পরিবার- তাদের ভালোবাসাটা কি কম মূল্যবান? ১৯৮০ থেকে ২০২০ অনেক দীর্ঘ সময়- এই সময়ে তাঁরা এই ঢাকা শহরে কত বাসা পাল্টেছেন, কত যে স্থানান্তরের মধ্যে দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছেন- সেই অজস্র স্থানান্তর, পরিবর্তনের ভেতরও- ছোট একটা নিউজপ্রিন্টের তুচ্ছ বই যত্নে রেখেছিলেন- সে তো ভালোবাসার কারণেই, আমার কাছেও যার কপি নেই। তার ওপর উপহার হিসেবে দেয়া কিছু ফেরত পাবার মধ্যে একটা অসাধারণ বিস্ময়ের ব্যাপার যে কারও কাছে- সেটা ওই ভালোবাসার স্পর্শই বটে। একই সঙ্গে প্রয়াত বাবার আর জীবিত ফুপুর ভালবাসার দুর্লভ প্রাপ্তি নয় কি।

এই সংকলনটিকে বলা যায় পুরোপুরিই আমাদের যৌথতার সময়ের সম্মিলিত ভালোবাসার স্মারক। সংকলনটি ছাপা হয়েছিল এপিঠ-ওপিঠ অর্থাৎ একদিকে ‘শ.ই শিবলীর পনেরোটি লিমেরিক’ অন্য পিঠে শুচি সৈয়দের লিমেরিক। এমন সংকলনের উদাহরণ শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা, বাংলাদেশে আফজাল হোসেন আর ইমদাদুল হক মিলনের; আবার শুচি সৈয়দ ও শ্যামল দত্তর কাব্য সংকলনে অনুসৃত হয়েছে।
কীভাবে ব্যক্ত করি কৃতজ্ঞতা এর নেপথ্য কুশীলবদের প্রতি- শিবলী ভাইয়ের এই উদ্যোগের পেছনে আরও যাঁদের ভালোবাসা-প্রশ্রয় জড়িয়ে ছিল, তাঁরা হলেন বুলবুল আর্ট প্রেসের স্বত্বাধিকারী আবদুল হাই ভাই, কম্পোজিটর প্রাণেশ মন্ডল, কাজেম উদ্দিন, মেশিনম্যান নজরুল- এঁদের পরিশ্রমও। আমি চোখ বন্ধ করে এটা উপলব্ধি করছি- এঁদের সবার কাছে আমি ঋণী। কারণ এঁরা এই সংকলনটি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে সম্পন্ন করেছিলেন। অর্থাৎ তাঁদেরকে কোনো অর্থ দেওয়া হয়নি। তাদেরকে সেই না দেওয়া অর্থ তো আসলে ঋণই- অপরিশোধিত ঋণ। সেই ঋণটুকু কি আমাদের কৃত অপরাধ নাকি আমাদের প্রতি তাদের নিঃশর্ত ভালোবাসা?

কবি, সম্পাদক, আইনজীবী শফিকুল ইসলাম শিবলী- শিবলী ভাই ছিলেন আমাদের বুদ্ধদেব বসু। ১৯৮০ সালে লেটার প্রেসে ছাপা আমাদের যৌথ সংকলন ‘ইটের মিনার’ নির্ভুল বানানে প্রকাশ সম্ভব হয়েছিল তাঁর জন্যই। নির্ভুল লেখার আদর্শ তাঁর কাছ থেকে পাওয়া। শুধু তাই নয়, তাঁর কাছে থেকেই শিখেছিলাম অভিধান কী করে দেখতে হয়- অভিধানের শব্দের সমুদ্র থেকে সঠিক শব্দটি খুঁজে বের করারও আছে যথার্থ নিয়ম। অনেকেই তা জানেন না। এখন অনেককে দেখি অভিধান দেখতে জানেন না অথচ ‘বানান রীতির প্রণেতা’ হয়ে বসে আছেন। শিবলী ভাইয়ের কাছে ‘সমস্ত কিছু নির্ভুল হওয়া চাই’ এটাই ছিল ন্যূনতম ‘মান’। সেটা তিন তাঁর সমস্ত কিছুতে অনুসরণ করেছেন- কিন্তু তাঁকেই আমরা বেশি ভুল মূল্যায়ন করেছি। তিনি ছিলেন খুব পারফেকশনিস্ট আর আমরা ছিলাম অস্থির। আমাদের সংকলনটির ওপর চোখ বুলাতে বুলাতে শুধু এটুকুই মনে হচ্ছে, আহা যাকে বলে ‘সাধনা’ তা থেকে কতো কতো দূরে এই আমরা। অনুজের প্রতি এই ভালোবাসা কোথায় পাবো আর।

আমাদের সেই যৌথতার সময়ের বিচারে তাদের এই ঋণকে আমার ভালোবাসা বলেই মনে হচ্ছে। কিংবা ভাবতে ভালো লাগছে। আসলে যে কোনো সৃষ্টি ও সৃজনের শক্তি হচ্ছে ভালোবাসা, যৌথতা- জীবনের শক্তিও তাই। আর তাই আমাদের লিমেরিক সংকলনটি ‘ইটের মিনার’কে আমার কাছে ‘ভালোবাসার হীরের গয়না’ বলে মনে হচেছ। অনেক মানুষের ভালোবাসা- যে ভালোবাসার ঋণ অপরিশোধ্য। শোধ করা যায় না কোনো শব্দবন্ধে, কোনো অর্থমূল্যে।
ঢাকা, ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর ২০২০