উত্তরবাঁকের মেঘ ও অন্যান্য ॥ মোহাম্মদ নূরুল হক


স্মৃতি চিহ্নহীন

স্মৃতিহীন প্রেম নাকি বাঁচেনা কখনো
বলেছিলে-‘আমাদের কোনো স্মৃতি নেই’
তাই তুমি চলে গেলে দূরে-বহুদূরে
নদীতে জোয়ার এনে আকাশে তুফান
হৃদয়ে বাদল এনে দুচোখে শ্রাবণ
একদিন উড়ে গেলে মেঘের সাম্পানে।

পেছনে ফড়িং কাঁপে-স্মৃতি চিহ্নহীন
ডানা ভেঙে ভুলে যায় বাঁচার সাঁতার
উড়ে আসে ডাকাত বায়স-
ঘাসে ঘাসে লেগে থাকে ডানার পালক।

আমাদের প্রেম ছিল-স্মৃতি চিহ্নহীন
শরীরে শরীর চেনে-চিনে ছিলে তাই
হৃদয়ের দাম নেই- ছিলনা কখনো?
বলো তবে-
কেমন স্মৃতির কথা বলেছিলে তুমি?

উত্তরবাঁকের মেঘ

উত্তরবাঁকের মেঘে জ্বলে ওঠে চান্দের আন্ধার
জলসত্রে নোনাজল। নদীতে বৈশাখ।

দুইফর্মা মেঠোপথে গলে পড়ে মুদ্রিত আকাশ!

এসো সখী রজকিনী, জলসত্র খোলো
হাঁটু গেড়ে বসে আছি হাছন-লালন।

অসুখী বয়সী রাতে ভেসে যাচ্ছি ধূলোস্রোতে আমরা কজন।
রাতগুলো ক্লান্তিহীন। সিলিং ফ্যানের হাওয়ারা-
কেঁপে কেঁপে ঘুমুচ্ছে দেয়ালে।
শুধু আমরা কজন নির্ঘুম চাঁদের সঙ্গী।
বসে আছি পবিত্র নরকে। পান করে গলিত জোছনা আর তার
অপরূপা রূপ।

আমরা সমুদ্রগামী। বৃত্তাকার জলবৃন্তে জেগেছে বাতাস।
অসীম জটিল জলে ডুবছে হৃদয়।
আমার বুকের নদী ঢেউ তোলে আজ কারো তিল বরাবর!
পাড় ভাঙে। ঢেউ ভাঙে তোমার ঠোঁটের কোণে তীব্র আলিঙ্গনে।
চুম্বনে অনীহা বুঝি! চুলগুলো দ্রোহী হয়ে উঠছে এখন।
চুলগুলো মেঘরাতে বয়স্ক শ্রাবণ।

কারা আজ পাঠ করে কুয়াশার শ্লোক?
একরত্তি স্বপ্নবাজ খরার মৌসুমে
নির্বিরোধী পঙক্তির বাসর শয্যায়
ডেকে আনি বন্ধুদের দৃষ্টির অঙ্গার।
পৌরাণিক জলসত্র হেঁটে যায় ঘুমন্ত নগরে।
আমাকে ডেকেছে দিঘির জলের বাকল।
সন্ধ্যারে করেছি মানা বিচূর্ণ বাতাসে-
যেন তার খোঁপা থেকে আন্ধার না ঝরে
নিষেধ মানেনি সন্ধ্যা; শিখেছে ছলনা।
আকাশে ওড়ে না ফড়িঙ-পোড়ে না হৃদয়
রাধিকারা জলপরী পরকীয়া রাতে।

অনুজ্বল দিগন্তের ফ্রেমে বসে ছবি আঁকে সতর্ক স্বকাল।
আমার তুলিরা মৃত।
পাহাড়ের আন্ধারেরা পাথরের অশ্রু মুছে দেয়।
অযথা বিকেলগুলো নষ্ট হলে ঈর্ষাতুর মেঘের পাড়ায়-
আজ আর বৃষ্টি হবে?

বহুবার কবরের সুনসান নীরবতা ভেঙে আমি
জেগে উঠি-
জেগে ওঠা সমকালে অতীতের দ্রোহী ক্ষুদিরাম।

আমার সামনে দ্রুত হেঁটে যায় শহরের প্রধান সড়ক।
লাফিয়ে ওঠে ঘুমন্ত বাড়িগুলো।
উড়ে যায় জানালার কাঁচ।
ক্লান্তি জমে রঙহীন ধূলোর বিকেলে
আর ধূলি জোছনায় স্নান করে আয়নার পুরাণ শকুন।
হারমোনিয়ামে গলা সাধি মৃত লখিন্দর;
আমার লাশের গন্ধে বিব্রত ঈশ্বর কাঁদে বেহুলার কোলে।

চিঠি আসে। নীল খামে।
খামের ভেতর জাগে অবেলার ঘুম!
এ-ই ঘুম খরস্রোতে ভেসে যাবে আজ!
যদি ভেসে যায়-শিশু ঘুম-
প্রৌঢ় রাত্রী বেড়ে যায় অন্ধকার রাতের সমান।
ভরা জোছনার ঢেউ ভাঙে রজঃস্বলা রাতে

আর আমি-
হেঁটে যাই-
বাঙলার মেঘ গ্রামে গান গেয়ে একালের অতুলপ্রসাদ।


জংলি কুসুম

যদি ভুল করে কোনো ভুল ফুল ফোটে তোমাদের ছাদে
জেনে রেখো সে ভুল আমি;
জেনে রেখো তোমার খোঁপায় ঠাঁই হলো না
তাই ফুটেছি অকালে-হৃদয়ের দাবি নিয়ে জংলিকুসুম!

কাচের দেয়াল ঘেরা তুমি-আমি-আমাদের পৃথিবী
তবু কেন মনে হয়-এই ছুঁই এই ছুঁই?
আহারে মানবস্বপ্ন! দেয়ালের ওপারেই থাক!
আমাদের বিশ্বে শুধু বয়ে যাক প্রেমের জোয়ার।

কোনো রাজকন্যা নয়, না কোনো স্বর্গের দেবী
তোমাকে চেয়েছি শুধু শর্তহীন আঁধারে-আলোয়
অনন্ত পথের শেষে দাঁড়িয়ে থেকেছি বহুকাল
পথ শেষ হয় তবু, দেখা আমি পাই না তোমার

মনে হয় এই ছুঁই এই ছুঁই
জানি তুমি পথের শেষে নেই, আছ পথের ওপারে।

ফুটেছি বুনো ফুল পুকুর ঘাটে, ক্ষেতে ও খামারে
পায়ে পায়ে চুমো খাই সকালে-বিকালে
যদি তুমি ভুল করে হাতে তুলে নাও,
যদি ভালোবাসা পাই-তাই
ফুটেছি গোপনে ফুল, টবে নয় ছাদের কিনারে!


তৃষ্ণা

আমার সমস্ত রাস্তা যদি উড়ে যায় মেঘ স্রোতে
আর ওই রাত নামে হামাগুড়ি দিয়ে অনন্তের
আন্ধারের মতো;
সম্ভ্রান্ত সন্ধ্যারে কোন্ কবি বশ কওে নিয়ে যাবে
ডালিম ডানার মতো লাল-লাল সূর্যাস্তের আগে!

আপেল আর বলের দূরত্ব মাপতে গিয়ে কাল
তুমি নাকি এঁকেছিলে হৃদয়ের ম্যাপ!
তবে দ্বিধা কেন-
চলো পুড়ে যাই, চলো উড়ে যাই তৃষ্ণার দহনে
এই চলন্ত নগরী হা করে থাকুক
পোড়া কমন-হৃদয়!
দুরন্ত দুপুর ঝুলে থাক কামারের হাপরের
-লালে।
দেখেছ আগুন ফুল-উড়ে-উড়ে চৈত্রের হাওয়া
কামারের মুখে তবু হাসির উপমা!


সেদিন গোপন নদী

ঢেউহীন বেদনার স্রোতে ভেসে গেলে
আমাদের তর্ক তবু থেমে যায় লালমাছি গ্রামে
নগরে নেমেছে লাল এক জোড়ারাত!
এমন আন্ধারে তবু চিঠি লেখে যারা, তারা নাকি
বেদনার ভাষা ভুলে যায়!
তারা নাকি পাঠ করে প্রাচীন হৃদয়-
চুর হয়ে ডুবে থাকে রবীন্দ্র সঙ্গীতে!
কে তুমি হৃদয়হীন ডাক দিলে ডাক নাম ধরে
চৈত্রের অনেক দেরি
মাঠে মাঠে বাতাসেরা তর্কে মেতেছেন-

আমাদের চোখ তবু ফালি-ফালি তরমুজ দেখে।


পরানের ঘুম

সূর্যকে বগলদাবা করে দুপুরকে অন্ধকারে
রেখে আমি চলে যাব সন্ধ্যার সাম্পানে।
তোমার খোঁপার চুলে তারাদেও লুকোচুরি দেখে
ফেরারি চাঁদের হাসি লুটোপুটি খাবে
বেদনার মতো বিগলিত নীলরাত্রির শরীরে।

দুপুর ঝুলে থাকুক তোমাদের দেয়াল ঘড়িতে!

কামনা কাতর ফুল ভ্রমরের কানে কানে বলে-
যদি গো যাতনা দিলে, বাসনার ছোঁয়া কেন নেই?
হৃদয়ের ক্ষত তবে কার কাছে মেলে?

আহারে রাত্রির দেহ! তুইও কেমন
বিবাগী বাতাসে উড়ে ভুলে গেলি শরীরের ক্ষুধা!
এত কি সহজ তবে ভুলে যাওয়া পরানের ঘুম!