ঊনপঞ্চাশ বাতাস : অন্যরকম প্রেমের গল্প ॥ তানিয়া রহমান


যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ দর্শকের চলচ্চিত্র রুচি তৈরি হবার সুযোগ হয়নি, যাদেরকে বছরের পর পর নিম্নরুচির চলচ্চিত্র দেখতে বাধ্য হতে হয়, সেখানে চলচ্চিত্র নিয়ে কিছু লেখা অনেক কঠিন কাজ। তবু সেই কঠিন কাজটিই করতে চাই ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ সিনেমাটার জন্য। চলচ্চিত্রটি সম্প্রতি বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে গিয়ে দলবেঁধে দেখার সুযোগ হয়।

ইংরেজি, হিন্দি, কোরিয়ান, ফরাসি, ইতালিয়ান কিংবা অমুক, তমুক তারকা পরিচালকের সিগনেচার সিনেমা কিংবা অমুক বছরের অস্কার জয়ী সিনেমা দেখার চোখ নিয়ে, তুলনা করার মন নিয়ে আমি বাংলা ভাষায় নির্মিত এই চলচ্চিত্র দেখতে যাইনি। আমি সাদা চোখে একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে দর্শকসারিতে বসে এই সিনেমা দেখেছি।

মোটের ওপর বলা যায় ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ প্রেমের গল্পেরই সিনেমা। আর যে প্রেম নিয়ে সিনেমা বানানো যায় সে প্রেমের গল্প যে গতানুগতিক নয়, সেটাই স্বাভাবিক। সেই স্বাভাবিক ভাবনা মাথায় রেখেই বলছি- ‘‘পর্দার নায়ক অয়ন আর নায়িকা নীরার প্রেমের দিনগুলো দেখে ওই রকম মুহূর্ত, ওই রকম ভালোবাসাবাসি, ওই রকম পাগলামিময় কর্মকাণ্ড আপনার জীবনের উঠোনে নেমে আসুক-আপনি মনে মনে তা চাইবেন। হয়তো বলে উঠবেন,’ ইশ্! নীরার মতো করে কেউ যদি ভালোবাসতো!’ কিংবা ‘অয়নের মতো মুগ্ধ কোনো প্রেমিক যদি থাকতো একান্ত আমার একান্ত।’’
তবে প্রেমই তো জীবনের সবটা নয়। জীবনে আরও থাকে রোগ, শোক, স্বপ্ন, সম্ভাবনা, ব্যর্থতা, আশাবাদ।

চলচ্চিত্রে দরিদ্র মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ অয়নকে নায়ক মনে হবে, তবে সে নীরার প্রেমিক বলে নয়। বরং অয়নের নিজের যোগ্যতার জন্য তাকে আপনার নায়ক মনে হবে; সে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায় বলে নায়ক মনে হবে। বিষয়টা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়- নায়ক অয়ন অসহায়, অবলম্বনহীন, অসুস্থ রোগী ও তার দিশেহারা স্বজনদের পাশে যে মানবিকতা, দায়িত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে আসে তা তাকে ‘মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ অয়ন’ থেকে ‘নীরার নায়ক’ করে তোলে। সিনেমার দৃশ্যে এরকম অসহায় এক রোগীর স্বজনকে আমরা বলতে শুনি, ‘আমি পীর ফকির দেখি নাই। ভাইজান, আপনি তার চেয়ে বেশি’।

সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক স্ট্যাটাস হিসেব করলে নায়িকা নীরার সঙ্গে দরিদ্র, সাধারণ অয়নের সম্পর্ক হবার কথা না। তবুও নীরা যে নায়িকা। সে তার ইমাজিনেশনকে বাস্তব রূপ দিতে পারে।
এতোদিনের বাংলা সিনেমায় দেখে এসেছি পূর্বরাগের সূত্র ধরে নায়ক নানাবিধ উপায়ে নায়িকার মন জয় করার চেষ্টা করে। এই সিনেমায় নায়িকা নীরা তার ইমাজিনেশনে থাকা ভালোলাগাকে বাস্তব করতে নায়কের সঙ্গে অনুরাগ পর্বে অদ্ভুত সব উপায়ে অদ্ভুত কর্মকাণ্ড করে যা দেখে, শুনে নীরার বন্ধুদের মতো দর্শকদেরও হাসির কলস্বর শোনা যায় সিনেমা হলরুম জুড়ে।
প্রবাদ আছে, হাসি শেষে কান্না। সুতরাং সিনেমার প্রেমময়, মিষ্টি দৃশ্যপটের শেষে দেখা যায়, সিনেমার নায়ক অয়ন মরণব্যাধিতে আক্রান্ত। নিয়তির এই নিষ্ঠুরতাকে দু’হাতে সরিয়ে অয়নের পাশে নীরা তার সমস্ত আবেগ নিয়ে থেকেছে শেষ পর্যন্ত।
উহু, না। শেষেরও পরে নীরা থাকতে চায় অয়নের সাথে। সে ডিএনএ সিকোয়েন্স রিসার্চ করে এমন কোনো উপায় খুঁজতে থাকে যাতে সে মৃত অয়নকে ফিরে পেতে পারে, আবার।
বিজ্ঞান কি আসলে পারবে মৃত্যুর পরেও মানুষকে আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে? এই প্রশ্ন রেখে শেষ হয় সিনেমা।

অন্যরকম প্রেমের গল্পের এ সিনেমায় আপনি গল্পের বাইরে মুগ্ধ হয়ে যা দেখবেন তা হলো- ক্যামেরার কাজ। এতো সুন্দর, এতো নান্দনিকভাবে ঢাকা শহরকে দেখানো হয়েছে যে ঢাকাবাসী এক নতুন চোখে ঢাকাকে আবিষ্কার করবেন এ সিনেমায়।
আর সংলাপ। একে আমি কাব্যিক বলবো না। বরং বলবো এক নতুন ধরনের ডায়লগ/ভাষা নিয়ে এসেছে ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’। এটা বইয়ের ভাষা না আবার আঞ্চলিক উচ্চারণের ভাষাও না। তবুও ভীষণ সাবলীল, মানানসই বচনে কথা বলেছে সিনেমার পাত্রপাত্রীরা।

‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ সিনেমায় নীরা চরিত্রে রয়েছেন অভিনেত্রী শার্লিন ফারজানা। তার বিপরীতে অয়ন চরিত্রে ইমতিয়াজ বর্ষণ। আরও রয়েছেন ইলোরা গওহর, ইনামুল হক, সেঁজুতি, মানস বন্দ্যোপাধ্যায়, খায়রুল বাসার প্রমুখ।
নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল পরিচালনার পাশাপাশি সিনেমাটির কাহিনী, সংলাপ, চিত্রনাট্য, গান রচনা, সংগীত পরিচালনা এবং পোস্টার ডিজাইনও করেছেন।

‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ সিনেমার সীমাবদ্ধতা যদি বলতে হয় তবে বলবো- এর ভয়েস/ডাবিং সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা। সদরঘাট, মিটফোর্ডের মতো জনবহুল জায়গায় সিনেমার দৃশ্যে উচ্চস্বরের কোলাহল, হর্ণ এসব থাকার কথা। সম্পাদনার গুণে সেই সমস্ত অহেতুক শব্দের যন্ত্রণা এই সিনেমায় নেই। সেই সঙ্গে সিচুয়েশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নায়িকার ভয়েসে ইমোশনের ওঠা-নামাও নেই এই সিনেমায়। (প্রায়) পুরো সিনেমায় বলতে গেলে একই মাপের ভয়েসে কথা বলেছে নীরা।

হলে বসে সিনেমা দেখতে বসলে আপনার চোখেও হয়তো নতুন কোনো সীমাবদ্ধতা চোখে পড়বে। সুতরাং দলবেঁধে এই নতুন ধরনের সিনেমার সীমাবদ্ধতা খুঁজতে আপনি হলে যাচ্ছেন কবে?
শুভ কামনা নতুন ধারার সিনেমা দর্শকদের জন্য। শুভকামনা ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ সিনেমার সকল কলাকুশলীর জন্য।

অক্টোবর, ২০২০,ঢাকা