একটি মলিন সন্ধ্যা ॥ কানিজ পারিজাত



ঘটনাটি ঘটার বেশ কিছুদিন পরে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে বসে রাফিদা। ঘটনা ঘটার সময় বুঝতে পারেনি। এখন মনে পড়ছে। সাদা চিকেন কাপড়ের বুটি দেওয়া ব্লাউজের নিচে পিঠের দিকে ঈষৎ উঁচু হয়েছিল অন্তর্বাসের হুক। নদীর বুকে জেগে ওঠা চর যেমন- সেখানেই ধীরে ধীরে বেশ সন্তর্পণে খেলেছিল কালো হাতের আঙুলগুলো। আশীর্বাদ যেন আঠা হয়ে লেপ্টে ছিল অন্তর্বাসের হুকে। ভাবতে ভাবতে একতলা ঘরের জানালার কাছে এসে দাঁড়ায় রাফিদা। জানালার পাশে একসারি গোলাপ গাছ, আফতাবের নিজ হাতে লাগানো। এই শেষ শীতে ঝাঁকেঝাঁকে গোলাপ এসেছে গাছগুলোতে, হঠাৎ একটা তাজা গোলাপের দিকে নজর যায় রাফিদার। অর্ধেকটা পোকায় খাওয়া। বাকি অর্ধেকটায় কামড়ে ধরে আছে একটি শুয়োপোকা। গা’টা কেমন ঘিন ঘিন করে ওঠে রাফিদার।
কালো পলিথিনে মোড়া গোটাকতক খলবলানো তাজা তেলাপিয়া মাছসহ ঘরে এসেছিলেন আফসার আলি। কালো লম্বা, দীর্ঘ শরীর, রাফিদার মামাশ্বশুর।
‘বৌমা সাকিবরে দেখলাম বাইরে মাছওয়ালার মাছের ঝুড়ির পাশে দাঁড়ায় আছে। অয় মনে কয় মাছ পছন্দ করে। সেইজন্যই নিয়া আসলাম, তোমার ছেলেরে ভাইজ্যা দিও’।
কৃতজ্ঞতায় নত রাফিদা দ্রুত হুড়মুড়িয়ে মামাশ্বশুরের পায়ে কদমবুচি করতে বসে পড়ে-
‘আহা! থাউক, লাগব না’-
বলতে বলতে মামাশ্বশুর আফসার আলির কালো হাতের আঙুলগুলো ধীরে ধীরে আশীর্বাদের বৃষ্টি ঝরাচ্ছিল রাফিদার পিঠে। এরপর থেকে মাঝে মাঝেই আফসার আলি আসেন। সাকিবের জন্য কখনো কালো তেলাপিয়া, কখনো আঙ্গুর, কলা, বিস্কুট বা চকোলেট নিয়ে। রাফিদাও নতশিরে এগিয়ে গেছে। আশীর্বাদের সময়ের পরিধি যেন ধীরে ধীরে বাড়ছে।

দুই.
একটি ছাই রঙের ভাঁজ খোলা শাড়ির সঙ্গে সাদা ব্লাউজ, তার ওপরে একটা সবুজ বোরখা চাপিয়ে প্রথম দিন অফিসে যায় রাফিদা। চাকরিটি তার স্বামী আফতাবের, স্বামীর অকাল মৃত্যুতে অফিসের বড়ো সাহেব ও আরও কয়েকজন মানুষের সহযোগিতায় রাফিদা চাকরিটা পেয়েছে। অবশ্য এজন্য কম ভোগান্তি হয়নি তার। ভাসুর জয়নাল চাকরিটা দাবি করেছিল, আইনে নাই জানার পর, রাফিদার কাছে প্রস্তাব পাঠায় জয়নাল। প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল খালাতো দেবর বক্কার-
‘ভাবি, সারাজীবন এমনে থাকবেন নাকি? আফতাব ভাই তো আর কোনোদিন আইব না। আপনে পাঁচ বছরের সাকিবরে নিয়া সারাজীবন চলবেন কেমনে? ছেলেডার ভবিষ্যতের কথা ভাবেন। জয়নাল ভাই তো আফতাব ভাইয়ের আপন ভাই, সাকিবও বাপ পাইব, আর আপনেও মাথার ওপরে ছায়া পাইবেন।’
‘ছিঃ ছিঃ বক্কার, এই কথা বলতে তোমার লজ্জাও করল না, উনি কেমনে ভাবলেন এই কথা? ওনারে বড়ো ভাইয়ের চোখে দেখি, নিজের ভাইয়ের ছেলেরে নিজের ছেলের মতো দেখবে, তার জন্য আমারে নিকাহ করতে হবে ক্যান্? আমার স্বামীর চাকরি যদি আমি পাই, আর ওপরে আল্লাহ যদি থাকে তবে সাকিবরে আমিই দেখতে পারব। নিকাহ করতে হবে না’-
বক্কারের মুখের ওপর একশ্বাসে বলেছিল রাফিদা। আর কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে খানিক বাদে চলে যায় বক্কার। কিছুক্ষণ পর রান্নাঘরের জানালা দিয়ে রাফিদা দেখে দূরে দাঁড়িয়ে বক্কার কথা বলছে ভাসুর জয়নালের সঙ্গে। হাল্কা পেঁয়াজ রঙের গোল পাঞ্জাবি ও পায়জামা পরা জয়নালের গা থেকে ভেসে আসা আতরের গন্ধ এই দূরে দাঁড়িয়েও নাকে এসে লাগে রাফিদার। জয়নাল চার পুত্রকন্যার জন্ম দিয়েছে। আফতাবের মৃত্যুর পর আফতাবের চাকরি পাওয়ার প্রত্যাশায় মরিয়া হয়ে উঠেছে। অফিস কর্তৃপক্ষ মৃত আফতাবের বিধবা স্ত্রী রাফিদাকে মনোনীত করেছে শুনে অস্থির হয়ে আছে। ভাইয়ের চাকরিটা সে পেতে চায়। বিনিময়ে ভাইয়ের বিধবা স্ত্রী ও সন্তানের দায়িত্ব নেবে। এই নিয়ে একাধিকবার জয়নালের দূত হয়ে বক্কার এসে বুঝিয়েছে- কাজ হয়নি। প্রতিবার বক্কার বাড়ি ঢোকে, জয়নাল দাঁড়িয়ে থাকে বাড়ির বাইরে। বাইরে দাঁড়ালেও তার আতরের গন্ধ ঠিকই টের পায় রাফিদা। আজ যেন আতর বেশি পরিমাণে ঢেলে এসেছে। বাতাস ভারি করে দেওয়া আতরের গন্ধে রাফিদার মাথা ঘুরে বমি আসতে চায়।

তিন.
প্রথমদিন অফিসে ভালোই যায়। বড়ো সাহেব খুব ভালো মানুষ। ডেকে বলেন- ‘আফতাব যে পদে ছিল, সেই কাজ আপনার পক্ষে অসম্ভব, আপনি লেখালেখি ও টাইপের কাজ করবেন। ধীরে ধীরে শিখে নেবেন। কোনো কিছুতে অসুবিধা হলে আমাদের জানাবেন।’
বড়ো সাহেব অফিসের পেছনের কোয়ার্টারে দুপুরে ভাত খেতে যাওয়ার সময় রাফিদাকে ডেকে নিয়ে যান। বড়ো সাহেবের স্ত্রী নিজের হাতে খাবার বেড়ে দিয়েছে। তবে কেমন যেন একটু গম্ভীর হয়েছিল। বিষয়টি চোখ এড়ায়নি রাফিদার।
অফিসে প্রথম দিন তেমন একটা অসুবিধা না হলেও একটি অসুবিধা টের পেয়েছে রাফিদা- সারা অফিসে সে একা মেয়ে মানুষ, পুরুষেরা অহরহ যে বাথরুমে যাচ্ছে, সেখানে যেতে তার খুব সংকোচ হচ্ছিল। সারাদিন অল্প করে পানি খেয়েছে সে, যাতে বাথরুমে যেতে না হয়। অফিস ছুটির পর ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে মফস্বলের সরু রাস্তা ধরে সে বাড়ির পথে পা বাড়ায়। রাস্তার পাশে থাকা মুদি দোকানের ভেতর থেকে কেউ একজন বলে ওঠে, ‘আফতাবের বউ না? ভালোই তো ডাট দিছে।’
রাতে বিছানায় ঘুমন্ত সাকিবের সারা গায়ে পরম মমতায় হাত বুলায় রাফিদা। সেদিন রাতে আফতাব ভালো করে সাকিবকে আদর করারও সুযোগ পায়নি। সাকিব ঘুমিয়েছিল দাদীর কাছে, পাশের ঘরে। আর রাফিদা একা ঘরে আফতাবের কামনা প্রত্যাশী হয়ে তিরতির করে কাঁপছিল। কয়েকদিন ধরেই আফতাব উষ্ণতাপ্রত্যাশী রাফিদাকে ‘শরীর ভালো নয়’, ‘আজ ক্লান্ত লাগছে’, ‘কাল’- ইত্যাদি বলে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল। প্রতিদিন অফিস শেষে ব্যাডমিন্টন খেলে বেশ রাতের দিকে ফিরত আফতাব। আর শীতের রাতে একটু ভিন্ন উষ্ণতার প্রত্যাশা প্রতিদিনই বাড়ছিল রাফিদার। নানাভাবে সে আফতাবের পাশ ঘেঁষে শুয়ে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। কিন্তু বিভিন্ন বাহানায় আফতাব তাকে এড়িয়ে গেছে। তাতে রাফিদার ছটফটানি আরও বেড়ে গিয়েছিল। সাকিবকে কৌশলে দাদীর কাছে ঘুমাতে পাঠায় সে। বিকেলের দিকে সুগন্ধী সাবান দিয়ে গা মাথা ভালো করে ধুয়ে একটি মেরুন রঙের উজ্জ্বল শাড়ি পরে। কেমন যেন একটা নতুন বউ নতুন বউ ভাব আসে তার। সুগন্ধী ক্রিম মুখে মেখে, চোখে হাল্কা কাজল পরে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল রাফিদা। কুড়ির কোঠায় বয়স হলেও তাকে সবসময়ই একটু বেশি বয়সী দেখা যায়। গায়ের রংটা বেশ ফর্সা- অনেকটা ফ্যাকাসে সাদা ধরনের। একহারা গড়ন, কপাল চওড়া। সমস্ত শরীরে কোনো কিছুই আকর্ষণীয় না হলেও যে বিষয়টি আফতাবকে আকর্ষণ করেছিল তা হলো- তার দীর্ঘ মেদহীন শরীর। আফতাবের ভাষায়- ‘তোমার শরীরের গাঁথুনি সুন্দর’। বিয়ের পর আফতাব প্রথম প্রথম খেলেছে তার শরীর নিয়ে। অনেকটা ছোট ছেলেরা নতুন খেলনা পেলে যেমন হয়, দুই বছর পরে আস্তে আস্তে সে খেলার জৌলুশ কমেছে। সাকিবের জন্মের পরে খেলায় আফতাবের মনোযোগে আরও ঘাটতি দেখা যায়। আফতাবের নারীপ্রীতির কথা মাঝে মাঝেই কানে আসত রাফিদার। নিজে ছোট চাকরি করলেও পোশাকে খুব ভাব নিয়ে চলত আফতাব। সুদর্শন, কথাবার্তায় চৌকস- মফস্বলে তার মতো সুদর্শন পুরুষের জুরি মেলা ভার। নারীমহলে বেশ কদর ছিল তার। কোনো মেয়ের সঙ্গে পরিচিত হলেই আফতাবের কথার জালে ও চেহারায় আকৃষ্ট হয়ে মেয়েরা যেমন এগিয়েছে, আফতাবও তার তরী বেয়ে তরতর করে এগিয়েছে। রাফিদার কাছে ধরা পড়লে প্রথমে গম্ভীর, পরে মাফ চেয়েছে, আর করবে না বলে, তবে কখনই থামতে পারেনি আফতাব। সেদিন রাতে উঠোন থেকে ছিঁড়ে আনা কামিনী আর গোলাপ দিয়ে ফুলদানি সাজিয়ে খাটের পাশে রেখেছিল রাফিদা। কেমন যেন ফুলসজ্জা ফুলসজ্জা মনে হচ্ছিল তার কাছে। অফিস ফেরত আফতাব বাড়ি এসেছিল বেশ দেরি করে- রাত প্রায় এগারোটার সময়। মায়ের ঘরে গিয়ে কথা বলে খাওয়া-দাওয়া শেষে শোবার ঘরে এসেছিল রাত বারোটারও পরে। উষ্ণতার প্রত্যাশায় তিরতির করে কাঁপতে থাকা রাফিদা আফতাব ঘরে ঢুকতেই দৌড়ে গিয়ে জাপটে ধরে তাকে। একটু অন্যমনস্ক আফতাব প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও পরে বলে, ‘বয়স কি কমলো নাকি তোমার, কী পাগলামি করো?’ রাফিদা উত্তরে বলেছিল- ‘সত্যিই পাগল হইছি, আজ কোনো কথা শুনব না, আজ তুমি আমারে ফিরাইতে পারবা না’। আফতাবও খানিক তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে ডুবে যেতে চেয়েছিল উষ্ণতার সমুদ্রে। তবে উষ্ণতার পর্বের শুরুতেই আফতাবকে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল। সে আর ফিরে আসেনি। তারপর আফতাবের সঙ্গে দেখা হয় রাফিদার তিনঘণ্টা পরে- হাসপাতালের মর্গে। তিন ঘণ্টা আগের সুদর্শন চৌকস আফতাব ততক্ষণে ডাকাতের গুলিতে নিহত। লাশ হয়ে শুয়ে আছে হাসপাতালের মর্গে।

চার.
চক্ষু বিস্ফারিত, মুখটা ঈষৎ হাঁ হয়ে থাকা আফতাবের রক্তাক্ত নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে রাফিদার মনে হয়- এ কে ? এ কি তিনঘণ্টা আগের চেনা আফতাব? কান্নার কোনো শক্তি তার ছিল না। সবকিছু কেমন দুঃস্বপ্নের মতো ঘটেছিল তার চারপাশে। শুধু আফতাবের অফিসের এক সহকর্মী বিমূঢ় হয়ে বসে থাকা রাফিদাকে যখন ধরে উঠাতে যায়- ‘চলেন ভাবি আপনারে বাসায় দিয়ে আসি,’। রাফিদা যেন তখন সম্বিত ফিরে পায়, বেশ ধীরে অথচ দৃঢ়স্বরে বলে, ‘আমারে ধরতে হবে না, একাই উঠতে পারব।’
কয়েকদিন খুব দুঃস্বপ্নের মতো কেটে গেছে, শোকের আগুন কিছুটা থিতু হলে, রাফিদা সাকিবের দিকে খেয়াল করে। পাঁচ বছরের ছেলে কিছুই বোঝে না, শুধু বোঝে তার বাবা ডাকাত মারতে গেছে, ডাকাত মেরে আসবে। রাফিদাও কিছু চেনা-অচেনা মানুষের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিতে দিতে ক্লান্ত। কেউ একজন রাতে তাদের সদর দরজায় ‘ডাকাত পড়ছে’ বলে হাঁক দিয়েছিল, আফতাব তাকে ধাক্কা দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল, সে ঠেকাতে গেলেও আফতাব শোনেনি, তাকে ঠেলে সরিয়ে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে যায়। এর পনেরো/বিশ মিনিট পরে সে গুলির শব্দ শুনেছে। আসলে আফতাব ডাকাতকে ধাওয়া দিয়ে পেছন থেকে একজনকে জাপটে ধরেছিল, সে পালিয়ে যাওয়ার সময় আফতাবের বুকে গুলি ছোড়ে। একা ঘরে রাফিদা অনিষিক্ত কাব্য হয়ে অপেক্ষা করছিল আফতাবের ফিরে আসার- সে আর ফিরে আসেনি।
অফিস থেকে রোজ ফেরার পর সন্ধ্যাগুলো রাফিদার কাছে ভীষণ মলিন, রাতগুলো এক একটি দীর্ঘ সমুদ্র মনে হয়। আফতাব কিছু রেখে না গেলেও একতলা টিনশেড বাড়ি রেখে গেছে। আর রেখে গেছে উঠোন ভর্তি গোলাপ, কামিনী, হাসনাহেনাসহ অনেক ফুলের গাছ। সন্ধ্যা নামলেই কামিনী, গন্ধরাজসহ সুগন্ধী ফুলেরা রাফিদাকে কেমন ঘিরে ধরে, কেমন এক ধরনের শূন্য শূন্য লাগে রাফিদার।

পাঁচ.
অফিসে কিছুদিন পার হওয়ার পর রাফিদার এক ধরনের অভ্যস্ততা তৈরি হয়। বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হলে এখন সে স্টাফ কোয়ার্টারে যায়। ওখানকার ভাবিদের সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠেছে। প্রথম দিকে বোরখা পরে আসলেও, কয়েক মাস পর থেকে সে স্বাভাবিক শাড়ি, ব্লাউজে আসতে শুরু করেছে। রাফিদার পাশের টেবিলে বসেন হাবিব ভাই। হালকা কোঁকড়া চুলের মাঝারি গড়নের হাবিব ভাই আফতাবের সমবয়সী। বিবাহিত, দুই বছরের একটি ছেলে আছে তার। রাফিদাকে কাজকর্মে বেশ সাহায্য করেন। ছয় মাস পার হওয়ার পর একদিন ঠাট্টা করে বলেন-
‘ভাবি আপনারে দেখলে কেমন খেলোয়াড় খেলোয়াড় লাগে, ছোটবেলায় গাছে চড়তেন নাকি’? রাফিদা হেসে উত্তর দেয়- ‘পেয়ারা গাছে কত চড়ছি।’ এবার হাবিব ভাই পরবর্তী প্রশ্ন ছোড়েন, ‘বড়ো হয়েও কি গাছে চড়ছেন নাকি, শাড়ি পইরা?’ এবার রাফিদা সতর্ক হয়। উত্তর না দিয়ে গম্ভীর হয়ে থাকে। হাবীব আর কথা বাড়াতে সাহস পায় না। এর কয়েকদিন পরে হাবিব ভাই রাফিদাকে বলেন-
‘ভাবি’ জালাল ভাইরা ভিসিআর কিনছে। চলেন একদিন জালাল ভাইয়ের বাসায় ভিসিআরে সিনেমা দেখি। প্রসেনজিতের একটা সিনেমা আছে- ‘অমরসঙ্গী’।
‘জি, আপনি যান।’
হাবিব ভাই আবার বলেন-
‘সাকিবরেও নিয়া যাবেন, অসুবিধা কি? ঐ ভাবি কতদিন যাইতে বলছে। ঐ সিনেমার একটা গান আছে- ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’…
ইদানীং হাবিব ভাই পাশের টেবিলে বারবার গুনগুনিয়ে ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ গাইতে থাকেন। রাফিদা আগের তুলনায় একটু গম্ভীর থাকে। কথাবার্তা খুব সংক্ষেপে বলে। হঠাৎ একদিন হাবিব ভাই রাফিদাকে একটি শব্দের সন্ধি বিচ্ছেদ জিজ্ঞেস করেন। শব্দটি হলো ‘পীনোন্নত’। রাফিদা উত্তর দিচ্ছে না দেখে নিজেই বলতে থাকেন-
‘এক কথায় প্রকাশ হবে- পীনের ন্যায় উন্নত যাহা। সন্ধিবিচ্ছেদ কী হবে- পীন+উন্নত?’
এক ধরনের অস্বস্তিতে রাফিদার মাথা ধরে যায়। বাড়ি ফিরে সাকিবকে অকারণে ধমকায়, গায়ে হাত তোলে। রাতে সাকিব ঘুমালে, সারাগায়ে হাত বুলিয়ে দেয়। বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে। সারামুখে, কপালে চুমু খায়। কলিজার টুকরা মানিক তার। সাকিবের জন্য সব কষ্ট সইতে পারে সে।

ছয়.
কদিন পরে কিছু অদ্ভুত ঘটনার মুখোমুখি হয় রাফিদা। অফিস থেকে ফিরে রাফিদা পেছনের বারান্দায় শুকনো কাপড় উঠাতে গিয়ে দেখে সব কাপড় আছে শুধু তার অন্তর্বাস নেই। সারা ঘর খুঁজেও সে কোথাও তার পরিধেয় এই একান্ত বস্ত্র খুঁজে পায় না। দুই-তিন দিন পর আবারও সেই একই ঘটনা। সব কাপড় থাকে শুধু তার অন্তর্বাস গায়েব। সে অফিসে যাওয়ার পর ঘরে ছেলে সাকিব, শাশুড়ি ও বাঁধা কাজের লোক মন্টুর মা। মন্টুর মা কিছুই বলতে পারে না। শাশুড়িকে কিছু জিজ্ঞাসা করার সাহস সে পায় না। শাশুড়ি আয়েশা খাতুনের বয়স ষাটের ওপরে। কালো লম্বা, একহারা শরীর। শুরুতে রাফিদার সঙ্গে স্বাভাবিক ব্যবহার করতেন। ছেলের মৃত্যুর পরে সাকিবকে বুকে আগলে রাখলেও, রাফিদার সঙ্গে শীতল। সামান্য কথা বলেন। মাঝে মাঝে রাফিদাকে দেখলে মন্টুর মায়ের সঙ্গে মহিলাদের বিভিন্ন পাপ ও পাপের শাস্তি নিয়ে আলাপ করতে থাকেন।
মাঝে একদিন রাতে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। মধ্যরাতে টিনের চালে ঢিল পড়ার দড়াম আওয়াজ। চমকে ওঠে রাফিদা। সারারাত আর কোনো ঢিল না পড়লেও, রাতে সে দুই চোখের পাতা এক করতে পারে না। ঘুমন্ত সাকিবকে বুকে জড়িয়ে সারারাত জেগে পার করে।
সেদিন দুপুরে স্টাফ কোয়ার্টার থেকে আসার সময় ইসমাইল ভাইয়ের স্ত্রী বলে-
‘ভাবি আপনি দেখি সুন্দর সুন্দর রঙিন রঙিন শাড়ি পরেন?’
‘এগুলো আফতাবের পছন্দের। ও যাওয়ার পর হালকা রঙের শাড়িই তো বেশি পরি ভাবি।’
‘তা ঠিক আছে। ইদানীং মনে হয় আপনার বয়স বুঝি কমতেছে। সুখে আছেন মনে হয়?’
রাফিদা ইসমাইল ভাইয়ের স্ত্রীর এই প্রশ্নে কেমন চুপ হয়ে যায়। তার কাছে মনে হয় দিন দিন সে কেমন নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছে।

সাত.
ঘাড়ের ওপর কারও উষ্ণ নিঃশ্বাস টের পেয়ে পেছনে তাকায় রাফিদা। শেষ বেলায় অফিসের এই রুমে সে, হাবিব ভাই, পিয়ন ময়েজুদ্দিন ছিল। বিকেলের নাস্তা আনার জন্য কিছুক্ষণ আগেই ময়েজুদ্দিনকে বাইরে পাঠিয়েছে হাবিব ভাই। একমনে কাজ করছিল রাফিদা, নিজের টেবিল ছেড়ে হাবিব ভাই কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে টের পায়নি সে। অবাক জিজ্ঞাসা নিয়ে রাফিদা তাকাতেই দেখে হাবিব ভাইয়ের ঘোর মাখা দৃষ্টি।
‘কী ব্যাপার?’
‘ব্যাপার তুমি বোঝো না?’ অনায়াসে আপনি থেকে তুমিতে নেমে গেলেন হাবিব ভাই।
‘কতদিন থেকে তোমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি। তোমাকে খুব ভালো লাগে। সারাজীবন যেমন মেয়ে খুঁজেছিলাম তুমি যেন আমার সেই স্বপ্নের মানুষ। দেরিতে হলেও তোমার দেখা আমি পেয়েছি। কোনো ভাবেই হারাতে চাই না।’
‘আপনি এসব কী বলছেন?’ রাফিদার এই প্রশ্নের উত্তরে আরও কাছে সরে আসেন হাবিব ভাই-
‘এই বয়সে তুমি একা। তোমার জন্য খুব কষ্ট হয় আমার। মনে হয় তোমার সব কষ্ট দূর করে দিই। আমরা কি আর একটু কাছাকছি হতে পারি না?’
‘কাছাকাছি হওয়া মানে কি?’ শক্ত গলায় বলে রাফিদা।
বেশ দ্রুত হড়বড়িয়ে যেন রাফিদাকে বোঝাচ্ছেন, এমন করে হাবিব ভাই বলতে থাকেন-
‘কাছাকাছি হওয়া মানে এক হওয়া। মানে তুমি আর আমি আলাদা কেউ না। আমরা যেন এক হয়ে যাব।’
‘ঠিক বুঝলাম না।’ একই রকম গলায় বলে রাফিদা
‘বুঝলা না ? মানে… মানে প্রয়োজনে তোমাকে আমি বিয়ে করব… কেউ জানবে না।’
এমনভাবে আমরা স্বামী-স্ত্রী হয়ে থাকব… কেউ টেরই পাবে না… আসলে এত অল্প বয়সে সারাজীবন এই ভাবে পার করবে… তোমার এই কষ্ট আমার সহ্য হয় না… আমি তোমাকে স্বামীসুখ দিতে চাই। পরে রাফিদার হতভম্ব বিস্ফারিত দৃষ্টি দেখে আর একটু নরম গলায় বলেন-
‘চাকরির কারণে তোমার পক্ষে কোনো দিন কাউকে বিয়ে করা সম্ভব নয়- জানি। সেটা নয় নাই করলাম। কিন্তু মানসিকভাবে তো আমরা এক হয়ে থাকতে পারি… স্বামী-স্ত্রীর মতো… তাই না?’
‘আপনার না বউ-বাচ্চা আছে?’ একটু শক্তভাবে বলে রাফিদা।
‘আরে ধুর! ও আসলে আমার যোগ্য না। তখন তো বুঝি নাই। তোমার সাথে মনের যে শান্তি আসে তা ওর সাথে কখনো আসে না। একটা ভুল করে ফেলছিলাম।’
‘আমি যতদূর শুনছি মীনা ভাবিকে আপনি দেখেশুনে পছন্দ করে বিয়ে করেছিলেন’- থেমে থেমে দৃঢ়ভবে বলে রাফিদা।
‘আরে তখন কি দেখে বুঝছিলাম নাকি? ওর সাথে মনের কোনো মিলই নাই আমার। আর তাছাড়া ও আমাকে কতটুকু পাবে। আমার সবটুকুই তো তোমার। ও তো শুধু কাগজে-কলমে বউ থাকবে। আমার মনের আসল বউ তো হবা তুমি। মানসিকভাবে আমরা বৈধ থাকব।’
এবার রাফিদার গলায় ঝাঁজ ঝরে পড়ে। বেশ উঁচু গলায় কড়া ভাষায় সে বলে-
‘ছিঃ ছিঃ আপনার ঘরে বউ-বাচ্চা থাকতে আপনি এসব কথা বলেন বা ভাবেন কীভাবে? আপনি ভালো করেই জানেন, আমি কোনো দিনও কাউকে বিয়ে করব না বা কারও সাথে জড়াব না। আপনি যদি ভাবেন গোপনে আপনার সাধনসঙ্গী হয়ে আপনার চাহিদা মিটাব, সেটাও ভুল। আপনাকে ভালো মানুষ হিসেবে জানি। বন্ধু ভাবি। দয়া করে আমাকে কঠিন হতে বাধ্য করবেন না।’
হাবিব ভাই একেবারে দমে যান। তবে পরদিন থেকে একটি পরিবর্তন দেখা যায়। হাবিব ভাই রাফিদার আপন বন্ধু থেকে একেবারে শত্রুতে পরিণত হন।

আট.
ইদানীং টিনের চালে প্রতিরাতে একাধিক ঢিল পড়ে। সাথে জানালায় খসখস শব্দ। সবচেয়ে অদ্ভুত কথা হলো- জানালায় শব্দের সাথে একটি খুব পরিচিত গন্ধ এসে রাফিদার নাকে লাগে। শাশুড়ি রাফিদাকে শুনিয়ে শুনিয়ে অনেক কথাই বলছে। যার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হচ্ছে : নারীর চলাফেরা, তার পাপ ও সেই পাপের শাস্তি।
সেদিন অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পর রাফিদা দেখে হুলস্থূল কাণ্ড। মামাশ্বশুর আফসার আলি বসে আছেন সামনের রুমের বেতের সোফায়। একটি কাপড়ের ব্যাগে কাপড় চোপড় নিয়ে বসে আছেন শাশুড়ি আয়েশা খাতুন। রাফিদাকে দেখার পর মামাশ্বশুর ভেজা চোখে তার দিকে তাকান। রাফিদার অবাক প্রশ্ন-
‘কী হইছে?’
দরজায় দাঁড়িয়ে রাফিদার প্রশ্নের উত্তরে শাশুড়ি ঝাঁজের সঙ্গে বলেন-
‘আফসার অরে বইল্যা দেও, নাজায়েজ মাতারির লগে আমি থাকুম না।’
রাফিদা অবাক হয়। বলে-
‘আমি কী করছি আম্মা?’
শাশুড়ি চেঁচিয়ে ওঠেন-
‘বেপর্দা চলাফেরা করে, রাইতে ঢিল পড়ে ক্যান্ হেইয়া মনে করো মোরা বুজি না?’
স্তব্ধ হয়ে যায় রাফিদা। শাশুড়ি চলে যাওয়ার পর রাতে ধীরে ধীরে রান্না করতে যায়। কড়াইয়ের তেলে কাটা তেলাপিয়াগুলো আস্ত ছেড়ে দেয় রাফিদা। হঠাৎ রাফিদার মনে হয় কালো তেলাপিয়ার চোখগুলো যেন ঘোলা দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। কেমন ভেজা ভেজা দৃষ্টি তাদের। দু’পা পিছিয়ে সরে আসে সে, কেমন যেন ঘিন ঘিন লাগছে তার। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে মন্টুর মাকে বাকি রান্না শেষ করতে বলে।

নয়.
পরদিন একটি হালকা লেমন কালার সুতি শাড়ির সঙ্গে সাদা ব্লাউজ পরে অফিসে যায় রাফিদা। দুপুরের দিকে পিওন ময়েজুদ্দিন এসে বলে, বিকেলে যেন বড়ো সাহেবের বাসায় যায় রাফিদা। বেগম সাহেবা দেখা করতে বলেছেন। শেষ বিকেলে লম্বা লম্বা পা ফেলে অফিসের পেছনে বড়ো সাহেবের কোয়ার্টারে যায় রাফিদা। ড্রয়িং রুমে স্টাফ কোয়ার্টারের দুই ভাবী বসা। বেগম সাহেবা গোসলখানায়। দুই ভাবীর একজন আবার সাগুদানা দিয়ে এক ধরনের পিঠা বানিয়ে এনেছে। কিছুক্ষণ পর বেগম সাহেবা আসলেন। সামান্য কুশলাদি জিজ্ঞাসা করলেন। নাশতা খেতে দিলেন। রাফিদা হেসে কথা বলার চেষ্টা করছিল, কিন্তু কেন যেন জমে উঠছিল না। তার খালি মনে হচ্ছিল, ঐ তিনজন নদীর ওপারে আর সে একা নদীর এপারে- মাঝে বিস্তর তফাৎ। হঠাৎই আচমকা প্রশ্নটা করলেন বেগম সাহেবা,
‘আপনি তো প্রথম দিকে বোরখা পরতেন, এখন পরেন না যে?’
একটু অপ্রস্তুত হয় রাফিদা, ভাঙা ভাঙা দুর্বল কণ্ঠে বলে-
‘সারাদিন থাকতে হয়- গরমেও কষ্ট হয় তাই…’
মুখের কাঠিন্য না ভেঙে বেগম সাহেবা বলেন,
‘আপনার চলাফেরা নিয়ে কিছু কথা উঠতেছে।’
রাফিদা অস্পষ্ট ঘ্যারঘেরে গলায় বলে-
‘ঠিক বুঝলাম না।’
বেগম সাহেবা তখন স্টাফ কোয়ার্টারের দুই ভাবীর দিকে তাৎপর্যপূর্ণ চোখে তাকান। তাদের মধ্যে ইসমাইল ভাবী বেগম সাহেবার চোখের ইশারা ধরতে পেরে যেন ব্যাখ্যাসহ বোঝাচ্ছে রাফিদাকে এমন ভঙ্গিতে বলেন-
‘এমনে আপনের চলাফেরা নিয়া কিছু কথা উঠতেছে। এই যেমন আপনে আগে বোরখা পরতেন; এখন আর পরেন না। আর আপনের তো স্বামী নাই। তাইলে আপনে ঐসব পরেন ক্যান্? আর পরেনই যদি তাইলে হেইয়া ব্লাউজের নিচে দেখা যাইবে ক্যান্? মানুষে গো এইয়া বুঝাইয়া বুঝাইয়া আপনে চলেন ক্যান্?’ বাকরুদ্ধ রাফিদার জন্য তখনো কিছু শব্দ যেন বাকি ছিল ইসমাইল ভাবীর। তিনি আবার বলেন-
‘আপনের শাশুড়ি ভাবীর কাছে বইল্যা গেছে আপনের স্বামী বাইচ্যা নাই- তাও আপনে এইগুলি পইরা ডাট দিয়া দিয়া চলেন।’
কথাবার্তা আরও কিছুদূর এগোলো। রাফিদার কান-মাথা দিয়ে কেমন যেন গরম ভাপ বের হচ্ছিল। সন্ধ্যার একটু আগে বিহ্বল রাফিদা বেগম সাহেবাকে সালাম দিয়ে বের হয়ে আসে। শ্লথ পায়ে বাড়ির পথ ধরে। তার একান্ত ব্যক্তিগত পরিধেয় অন্তর্বাস নিয়ে কথা হচ্ছে, যা একান্তই ব্যক্তিগত ও অতি আবশ্যকীয় বিষয় ছিল তার। অনেকদিন পর কেন যেন আফতাবের ওপর ভীষণ রাগ ওঠে তার। এক অদ্ভুত সংগ্রামের মুখে রাফিদাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছে সে। হঠাৎ পাশ থেকে চলে যাওয়া রিকশা জোরে ডাক দিয়ে থামায় রাফিদা। বাড়ির দিকে না গিয়ে রিকশা নিয়ে উল্টো দিকে ছোটে। বাজারের পেছনে টিনশেড দোচালা ঘরে ভাসুরের বাসা- সেখানেই সেই সন্ধ্যায় রাফিদা এসে দাঁড়ায়। ভাসুর বাড়িতে ছিল না। ভাসুরের বউ নুরবানু বারান্দায় বসে লাউ কুটছিল। আর ভেতরে শাশুড়ি বসেছিলেন ভাসুরের ছোট বাচ্চা মেয়েকে কোলে নিয়ে। রাফিদাকে সিঁড়িতে দাঁড়ানো দেখে তারা অবাক। বেশ দৃঢ় ও জোর গলায় রাফিদা ভাসুরের স্ত্রীর উদ্দেশে বলে-
-‘বুজি, আমি বড়ো কষ্টে আমার ছেলেরে মানুষ করতেছি। ভাইজানরে বলবেন আমারে যদি আর একবার বিরক্ত করে- আর একটা ঢিল যদি পড়ে আমার চালে- আমি কিন্তু সোজা থানায় জানাব।’
কারও দিকে না তাকিয়ে রিকশা নিয়ে বাড়ির পথ ধরে সে।


রাফিদা যেন দীর্ঘ এক সমদ্র পাড়ি দিয়েছে। একা, দৃঢ় আপোসহীন নাবিকের মতো। সাকিবের বয়স এখন ত্রিশ। মায়ের খুব খেয়াল রাখে। একটি নামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণরসায়নে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দামি একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে উঁচু পদে আছে। রাফিদার শরীর অনেকটাই ভেঙে গেছে। ইদানীং রাফিদার এক অদ্ভুত অভ্যাস হয়েছে- সুন্দর আর উজ্জ্বল রঙের কিছু দেখলে তার ভালো লাগে। নিজে সারাজীবন হালকা আর ফ্যাকাসে রং পরে এখন রঙিন কিছু দেখলে মুগ্ধ হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যায় রাফিদা বারান্দায় বসে থাকে।
সাকিব ঢাকা থেকে তিনজন সহকর্মীসহ বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। তাদের মধ্যে একটি মেয়ে আছে- রাখি। ভারি মিষ্টি চেহারা। শিগগিরই নাকি জার্মানি যাচ্ছে পিএইচডি করতে।
গাঢ় নীল রঙের একটি সুন্দর সিল্ক শাড়ি পরেছে মেয়েটি, সাথে অফহোয়াইট স্লিভলেস ব্লাউজ। কাছেই ঘুরতে যাওয়ার আগে বারান্দায় বসে থাকা রাফিদাকে এসে জড়িয়ে ধরে। তার গা থেকে মিষ্টি একটা গন্ধ এসে লাগে রাফিদার নাকে-
‘খালাম্মা আপনিও চলেন, ভালো লাগবে- সবাই মিলে একসাথে ঘুরব।’
মৃদু হেসে রাফিদা বলে,
‘তোমরা যাও।’
সাকিব আর মেয়েটা হেঁটে যাচ্ছে- মেয়েটার স্বচ্ছ ব্লাউজের ভেতরে দৃশ্যমান অন্তর্বাস। এক অদ্ভুত ঘোলা দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকে রাফিদা। বিকেলের শেষ আলো ম্লান হয়ে আসছে। হঠাৎ আবেশি ফুলের গন্ধে আবিষ্ট রাফিদার সেই মলিন সন্ধ্যাটাকে বেশ উজ্জ্বল মনে হতে লাগল।