একলা ফুলি, একলা হিল্লি ॥ মণীশ রায়




বিয়েবাড়ির ব্যাপারটাই আলাদা।
দেখলেই কেন যেন মন ভালো হয়ে যায়। ফিসফাস যৌবনের রহস্য মেশা গোপন নিঃশ্বাস সবখানে। ভাবলেই নেশা পায়, আলুথালু আনন্দের পিয়াস জাগে অন্তরে। খাওয়া-দাওয়া, উচ্ছ্বাস-আনন্দ আর আলো-ঝলোমলো গোপন অন্ধকারে কান পাতলেই যে-কেউ শুনতে পায়, ‘কিউ, জানো নি? আইজ ফুলি আর রহমইত্যার বিয়া। জানো না?’
লালু দুজনকেই চেনে। হিল্লির মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘ফুলির বিয়া। জামাই কেডা জানো নি?’ পোয়াতি হবার পর হিল্লি দিনদিন শান্ত হয়ে পড়ছে। যেখানে পা গেড়ে বসে সেখানেই ঝিমোয়। আগের মতো এক্কা-দোক্কা চঞ্চলতা নেই আচরণে।
‘কেডা?’ নরোম করে কৌতূহল জানায় সে।
‘রহমত ভাই।’ ফিচকি দিয়ে ফাঁকে একটা হাসি হেসে নেয় সে। দাঁত বেরিয়ে পড়ে মৃদু হাসির সময়।
‘কিতা কও?’ বিস্ময় ঝরে ওর ঘুমহীন ক্লান্ত চোখ থেকে।
‘হাছা। তরকারিওলা রহমইত্যা বিয়া করবো ফুলিরে।’
‘এই বুড়ায় বিয়া করবো আবার? তাও অদ্দুরা মাইয়ারে? ছিঃ।’ মুখ ফিরায় হিল্লি।
‘অত নাক সিঁটকাইছ না। পুষ্যালোকের বয়স কিতা? বউমরা জোয়ান বেডা, সমস্যা তো দেহি না।’
‘এই দুধের মাইয়া পারবো বিয়ার দখল সইতে?’ মুখ ঘুরিয়ে তাকাল হিল্লি ওর দিকে। ভাবখানা এমন যেন মানবসমাজের সব রীতিনীতি বুঝে বসে আছে সে।
‘খুব পারবো। এই নিয়া হুদা হুদা তোর মাথা গরম লাগদ না।’
‘চোহের সামনে মাইয়াডারে দেখছি না? হেদিনও বাজারের পিছে গোল্লাছুট খেলছে পোলাপানের লগে। আমারে প্রায়ই রুডি ছিইরা খাওয়াইতো। মায়া লাগে না?’ মমতায় চোখ বুজে আসে হিল্লির।
‘তালতলা বস্তিত এমোন বিয়া নতুন না লো। বিয়ার খাওন কতই তো খাইছি। দেহা আছে সব।’ লালু উত্তর দিয়ে বস্তির দিকে তাকায়।

ভুলুর দোকানের পিছনেই বস্তি। ফুলি-রহমতের বিয়েটা সেখানেই। রহমত ভ্যানগাড়িতে করে তরকারি বেচে মহল্লায়-মহল্লায়। ফুলির বাবা রাজ ওস্তাগর। মা-মরা মেয়েকে নিয়ে একটা ঘরে থাকে এখানে।
লালুর বেশ লাগছে। কারণ বিয়ে মানেই ভাল-মন্দ খাওয়া-দাওয়া। মানুষের এঁটো সবসময় উপাদেয় হয়না। কিন্তু বিয়েবাড়ির উচ্ছিষ্ট বেশ মুখরোচক আর ক্ষুধাবর্ধক হয়। সেখানে পোলাও-মাংস-কাবাব- সবকিছুর ভুক্তাবশেষ থাকে। চারপাশের বাতাসে যখন বিয়েবাড়ির খাওয়ার গন্ধটা ভেসে বেড়ায় তখন পেট মোচড়াতে শুরু করে। গভীর রাতে নিমন্ত্রিত মানুষগুলো খেয়ে-দেয়ে চলে গেলে বস্তির সামনে খাওয়ার স্তূপ জমে যায়। কত যে কামড়াকামড়ি হয় এ খাওয়া নিয়ে। একবার কার যেন কান কামড়ে ছিড়ে ফেলেছিল এক রাগী দাঁতাল। এ নিয়ে কত বিচার-আচার। এখন বাঘা ভাগ করে দিয়েছে এলাকা। লালুর ভাগে পড়েছে এ বস্তি। যত খাওয়া-খাদ্য সব ওর দখলে। সে সবাইকে নেমন্তন্ন দিয়ে এনে সুশৃংখলভাবে খেতে দেবে। সবাই যেন সমানভাবে খাবার পায় সেজন্যে এ ব্যবস্থা। এ নিয়মের পর ওদের ভেতর ঝগড়াঝাটি অনেক কমে গেছে।

অবশ্য লালুর এখন খাবারের অভাব নেই। ওর ডেরার সামনেই পড়ে থাকে বিক্রি হওয়া মোরগ-মুরগির নাড়িভুড়ির পাহাড়। কত আর খাওয়া যায়? খেতে খেতে বিরক্ত এখন। হিল্লি তো আজকাল এসব খেতেই চায় না। একে তো পোয়াতি হবার কারণে রুচি নষ্ট হয়ে গেছে, তার উপর এই বৈচিত্রহীন একই খাওয়া মাসের পর মাস। ভালো লাগে?
বিয়ের খাওয়াটা একেবারেই অন্যরকম, তাতে বৈচিত্র মিশে থাকে। মানুষের রান্না করা খাবার খেতে এমনিতেই বেশ সুস্বাদু। মশলার গন্ধ মাখানো কষানো মাংস আর হাড্ডি মুখের সামনে পেলে আর কী লাগে? তাছাড়া ফুলি মেয়েটা হিল্লির খুব পছন্দ। দয়ার শরীর তার। গর্ভবতী হবার বেশ কদিন নিজ হাতে ফুলি নামের খুকিটা ওকে খাইয়ে দিয়েছে। ওর বিয়ে না খেলে কি করে হয়?
লালু যথারীতি ‘ঘেউ’ বলে-বলে নিমন্ত্রণের খবরটা সবার মাঝে বিতরণ করে দিয়েছে। ওর নিমন্ত্রণের ‘ঘেউ’ যতদূর পৌঁছেছে, বাকিটা ছড়িয়ে দেবার কাজটা করবে ওই এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত ওরই মতো কেউ। এভাবেই এক এলাকা থেকে অন্য এলকায় বাহিত হয় ওদের যত কথাবার্তা আর জরুরি সব সংবাদ। আগের মতো এখন আর মহল্লায়-মহল্লায় পায়ে হেঁটে যাবার দরকার পড়ে না।
শীতের সন্ধ্যেটা নামে একেবারেই বেরসিক হয়ে। মাথার উপর বিষণ্ন-মলিন আকাশটা পুরনো আলুর মতো কালচে; কোথাও কোন সাড়াশব্দ নেই, চোখ বুজে রয়েছে ঘাটের মড়ার মতো। চারদিকে মশার খুব উৎপাত। মানুষগুলো মশাদের লোলুপ শয়তানিতে ব্যতিব্যস্ত, ওরাও। তালতলা বাজারের পিছনে যেকটি চায়ের টং, এর সবগুলোই দখল করেছে খেটে খাওয়া বস্তির মানুষগুলো। কিন্তু মশার কামড়ে কেউ সুস্থির থাকতে পারছে না। প্রায়ই খেপে উঠে হাত-পা ছুড়ছে চারপাশে। কিছুতেই কোন বাধা মানতে চাইছে না মশারা।

লালু ল্যাজ দিয়ে, ঘাড়-শরীর নেড়ে, শরীরে দাঁতমুখ ঘষে-কামড়ে মশাদের শায়েস্তা করতে চাইছে। কিন্তু কিছুতেই ওদের কাছ থেকে রেহাই পাচ্ছে না সে। ভুলু মুন্সীর দোকানের সামনে স্তুপ-স্তুপ খাবার। কিন্তু একই খাবার বারবার খেয়ে রুচিটাই নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকদিন পর বিয়েবাড়ির খাওয়ার গন্ধ শরীরে সতেজতা এনে দিচ্ছে। চারপাশে মৌ-মৌ গন্ধের সঙ্গে একটা সুখের উদোম উল্লাস। এ ওকে জিজ্ঞাসা করে, ‘পুলা মাইয়ারে চিনষ?’
উত্তরদাতা লালু বলে, ‘রহমইত্যা আর ফুলি। তরকারিওলা রহমইত্যা পাকনা বেশি; বয়সটা বেশি। ফুলি হেই তুলনায় কচি। তের অইছে কিনা সন্দেহ। হেদিনও গোল্লাছুট খেলছে বাজারের পিছে খালি জাগায়।’
বাঘা মাথা নাড়ে। ওরও কেন যেন মনে হয় ব্যাপারটা ঠিক হচ্ছে না। রহমত মধ্যবয়স্ক এক পুরুষ। দেখতে-শুনতেও তেমন নয়। কুচকুচে কালো গায়ের রং, সারা শরীরে গরিলার মতো চুল। কথায় কথায় ঝগড়া বাধায়। যেমন কর্কশ তেমনি গোয়ার। বনিবনা না হলে ক্রেতার উপর চড়াও হতে এতটুকু দ্বিধা করে না সে। অথচ ফুলি খুব মিষ্টভাষী। চেহারাটা যেমন মিষ্টি তেমনি নরোম তার আচরণ। প্রায়ই কুকুর-বিড়ালদের খেতে দেয় যখন তখন, আদর দেয় কোলে তুলে। বাঘা কিছুতেই এ দুজনকে মিলাতে পারে না। লালু-হিল্লির মতো ওর মনেও খটকা লাগে।
লালুর ছোটভাই ভীমরু জানাল, রহমতের কাছ থেকে বউর চিকিৎসা করাতে এককালে বেশকিছু টাকা ধার নিয়েছিল ফুলির বাবা রাজ ওস্তাগর লিয়াকত। সেই দেনা চুকাতেই এ বিয়ে। ফুলির মা নেই। হয়তো মা বেঁচে থাকলে এ বিয়েটা যে করেই হউক রুখে দিত। বাঘার ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল।

বিয়েবাড়ির যাদুমন্ত্রটাই এমন যে বেশিক্ষণ মন খারাপ থাকে না। রাত যত বাড়ছে তত হৈ-হল্লা আর আলোর ঝলকানি একসঙ্গে মিলেমিশে আনন্দ বাড়াচ্ছে। অন্য বস্তি থেকে কড়া শীতে জবুথবু লোকজন উপঢৌকন নিয়ে বিয়েতে যোগ দিতে আসছে। বরপক্ষ-কনেপক্ষ মুখোমুখি। কাজীসাহেব বসে রয়েছেন মেয়ের সামনে। কাবিননামায় কতটাকা দেনমোহর ধার্য হবে তাই নিয়ে দরকষাকষি চলছে দুপক্ষের ভেতর। রহমত এড়াতে চেয়েছিল বিষয়টা। সামান্য তরকারি ব্যবসায়ী হয়ে সে কিভাবে কনেপক্ষ দাবিকৃত দশহাজার টাকার দেনমোহর দেবে? কিন্তু হুজুর বললেন, এইডা ফাঁকি দেয়া যাবে না। অগত্যা অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজি হয়ে গেল রহমত। মেয়েও অস্পষ্ট স্বরে কবুল বলে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে পোলাও মাংসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল সবদিকে।
বাঘা সামনে দাঁড়িয়ে থেকে সব লক্ষ করল। গভীর রাতে বিয়েবাড়ির উপাদেয় উচ্ছিষ্ট যখন আস্তাকুঁড়ে এসে জমা হল তখন ফুলি আর রহমত বেড়ার ঘরে বাসর রাতের এন্তেজাম করছে। অভিজ্ঞ রহমত তখন আদিম উত্তাপে টগবগ করে ফুটছে।
রান্নাবান্না মন্দ হয় নাই। গোমাংস আর পোলাও মূল খাদ্য। শেষপাতে জর্দা। বস্তির দুই পরিচিত রাঁধুনির রান্না এগুলো। বেশ সুস্বাদু।

লালু যেরকম ভেবেছিল, নেমন্তন্ন পেয়ে তেমন কেউ আসেনি বাইরে থেকে। নইলে মুশকিলেই পড়তে হত ওকে। বাইরে কনকনে শীত। হুহু হাওয়ার দাপট মাথার উপর। এরকম সময়ে গরিবের বাড়ির বিয়ে কে খায়? শুধু বাঘা এসেছে। ওকে আসতে হয়। সে ওদের সমজাজপতি, দলনেতা। সবারই মন যুগিয়ে চলতে হয়। ডাকলে কেউ যেন নিরাশ না হয়, সেদিকে ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ।
রাত প্রায় বারোটা। ঘোঁৎ-ঘোঁৎ শব্দ করে আস্তাকুঁড় ঘেঁটে খাওয়ায় মগ্ন ওরা। ল্যাম্পপোস্টের আলো বেশিদূর এগোতে পারছে না। হাওয়াই মিঠাইর মতো ঘন কুয়াশা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। হিল্লির পাশে থেকে লালু ওকে সাহায্য করছে খেতে। বেচারা অসুস্থ। তবু খানিক খাদ্য-বৈচিত্রের আশায় সে এখানে ঘুরঘুর করছে।
এমনি সময় একটা হৈ-চৈ। ঠেলাগাড়িওলা কামাল ঘুম চোখে তালামারা গাড়িটা চাবিমুক্ত করে ছুটে গেল সামনের দিকে। রহমতের শাশুড়ি-ননদ ফুলিকে কোলে করে নিয়ে এসে শুইয়ে দিল ঠেলাগাড়িটার উপর। তারপর রহমতসহ ওরা উঠে বসল। গাড়িটা চলতে শুরু করল।
দৃশ্যটা দেখেই হিল্লি লাফ দিয়ে এগিয়ে গেল গাড়িটার সামনে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে মেয়েটা। চোখ বোজা। গোঙানির শব্দ প্রায় অচেতন মেয়েটার মুখ থেকে বেরিয়ে বাতাসে মিশছে।
ভয়ে-ত্রাসে হিল্লির শরীর কাঁপছে। সে জোরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ঘেউ, ঘেউ। ঘেউ ঘেউ।’
ডাক পেয়ে খাওয়া-দাওয়া ফেলে ছুটে এল লালু। পিছু পিছু বাঘা।
লালু জিজ্ঞাসা করে, ‘কি অইছে? কি ঘটছে?’
‘ফুলি অসুস্থ। চল ঠেলাগাড়িটার পিছু পিছু যাই।’
‘এত রাইতে?’

‘মাইয়াডা আমারে রুটি খাওয়াইতো। গলায় হাত দিয়া আদর করত। ওরে ভুলি নাই। চল, বিপদে আছে মেয়েটা। চল বাঘা?’ বলে ওরা আর দেরি করে না। অনুসরণ করতে থাকে গাড়িটাকে।
বেসরকারি এক হাসপাতালের ইমারজেন্সী বেডে ধরাধরি করে মেয়েটাকে রাখতেই কর্তব্যরত মহিলা ডাক্তার ফুলির দিকে তাকিয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে, ‘এ বাচ্চা মেয়েটার এ অবস্থা হয়েছে কিভাবে?’
ফুলির শাশুড়ি অর্থাৎ রহমতের মা বেশ মুখরা মহিলা। বস্তির কাইজা-ফ্যাসাদে সবার আগে থাকে সে। অনেকে ঝগড়া করার জন্য টাকা দিয়ে ভাড়া নেয় লড়তে। কেঁদে-কেটে চেঁচামেচি করে পুরো বস্তি মাথায় তোলার জুড়ি নেই তার। এজন্য সবাই ওকে ভয় পায়। মোড়ে চিতুই-ভাঁপা পিঠার দোকান। সন্ধ্যার পর খুব ব্যস্ত। সহজে কেউ খেতে যায় না সেদিকে। যারা যায় তারা কোন মন্তব্য না করে নীরবে খেয়ে টাকা চুকিয়ে কেটে পড়ে। স্বামী নেই। রহমতকে নিয়েই তার সংসার। আম্বিয়া নামে তার একটা মেয়ে ছিল, সে-ও গত বছর বাচ্চা হবার সময় এক্লেমশিয়ায় মারা গেছে বলতে গেলে বিনা চিকিৎসায়। আম্বিয়ার মা কিছুই করতে পারেনি। জামাই ফচকু মিঞা তো বহু আগেই ডাকাতির কেসে ফেরারি। কেউ জানে না সে কোথায়। এই একলা জীবনে শুধু রহমত আর ওর ঝগড়া করবার একমাত্র অস্ত্রটাই আম্বিয়ার মায়ের সম্বল।

ডাক্তারের কথা শুনে ওর মাথা গরম হয়ে গেল। নাক-মুখ-চোখ কুঁচকে চিৎকার দিয়ে ওঠে সে, ‘বোঝেন না? বিয়ার রাইতের এই ঘটনা। বোঝেন না কিছু?’
ফুলির পালস দেখে ডাক্তার। প্রচুর রক্তপাত হচ্ছে যৌনাঙ্গ থেকে। পলকা শরীরে জড়ানো বিয়ের লাল শাড়িটা চুপসে গেছে রক্তে। চেহারা ফ্যাকাসে হচ্ছে ধীরে ধীরে। মুখ দিয়ে গোঙানির শব্দ বের হচ্ছে। চোখের পাতা ভারি হয়ে আসছে আস্তে আস্তে। মাথার চারপাশে এলানো চুল। কী যে মায়া লাগছে হিল্লির মেয়েটার জন্যে। কাচের দরজার ফাঁক দিয়ে সে ঠিকই দেখতে পাচ্ছে ওকে।
ডাক্তার আবার বাইরে বেরিয়ে এলেন। চরম বিরক্ত মহিলা। আম্বিয়ার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, ‘মেয়েটাকে বাঁচাতে চাই। এক্ষুণি অপারেশন করা প্রয়োজন। কী নির্মম, কী নির্মম। মেয়েটার স্বামী কে?’

সবার পিছনে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়েছিল রহমত। পরনে সাদা লুঙি আর একটা সবুজ রঙের চাদর। সাদা লুঙি আর চাদরের কোনে কোনে রক্ত। শুকিয়ে এখন খয়েরি রং।
ডাক্তার ধমক দিয়ে বলে ওঠে, ‘আপনি মানুষ? এ বয়সের একটা মেয়েকে আপনি, ছিঃ। এটা রেপকেস। পুলিশ আসবে। তার আগে ওকে বাঁচাতে হবে। অপারেশন লাগবে। তৈরি হন, বর্বর কোথাকার।’ আপনমনে গজগজ করতে করতে মহিলা ভিতরে ঢুকে পড়ল। কপালে চিন্তার ভাঁজ। টিস্যু-ফিস্যু ছিড়ে সব ছারখার। এক্ষুণি অপারেশন টেবিলে নিয়ে টিস্যুগুলো জোড়া না দিতে পারলে অতি রক্তপাতে হয়তো মেয়েটা মারা যাবে। এতগুলো আত্মীয়-পরিজনের কেউ সঙ্কটটাই বুঝতে পারছে না!
‘টাকা লাগবে। জটিল অপারেশন। একলাখ নিয়ে আসুন আপাতত। চিকিৎসাটাতো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।’ ডাক্তার জানালেন।
এবার চেঁচিয়ে ওঠে রহমতের মা, ‘ট্যকার গাছ আছে আমরার? গরিব মানু আমরা, সামান্য মলম লাগাইয়া ফেরত দ্যান মাইয়াডারে। নাইলে রাইখা দেন, ট্যাকা নাই আমরার।’ কথা বলার সময় কেন যেন বেড়ার ফোঁকর দিয়ে ধোঁয়া আসার মতো ভয় ভর করে আম্বিয়ার মায়ের অন্তরে। একফাঁকে কাউকে কিছু না বলে রহমত কেটে পড়ে পিছন থেকে।
একজন পুরুষ ডাক্তার তীব্র প্রতিবাদ করে একথার। বলে, ‘এ অবস্থায় কোন পেশেন্টকে কি ছেড়ে দেয়া যায়? বাইরে গিয়ে বলবেন ভাল মেয়েটারে ডাক্তাররা মিলে মেরে ফেলেছে। আপনাদের চিনি। পুরা বস্তি চলে আসবেন তখন ঝগড়া করতে। এসব ছেড়ে টাকা যোগাড় করেন। এটা পুলিশ কেস। সবকটা জেলে যাবেন।’

এবার মিইয়ে যায় রহমতের মা। বলে, ‘মাইয়ার বাপেরে খবর দ্যান। তারারে কন কিছু করতে। আমরা কিতা করুম? খাওনই যোগাড় অয়না, আবার চিকিচ্ছ্যা।’ ঠোঁট উল্টে দেয় আম্বিয়ার মা।
এককোনে দাঁড়িয়েছিল ফুলির বাবা লিয়াকত মিঞা। কথা শুনে এগিয়ে এল সামনে। হাত জোড় করে বলে উঠল, ‘আমার মাইয়ডার পোড়াকপাল। জন্মের ফর চাইর বচ্ছরের মাথায় মাডারে খাইছে। বিয়া দিয়া ভাবছি সুখ আইবো। আল্লাপাক আমার কতা হুনে নাই। অহন যা কপালে আছে অইবো। আমার কাছে মাত্র পাঁচশ ট্যাকা আছে। এইডাই দিবার পারুম। মাইয়াডারে কষ্ট দিয়েন না। মাবুদ যা চায় তাই অইতে দ্যান। শান্তিতে মরতে দেন পোড়াকপাইলা মাইয়াডারে।’ বলে হোঃ হোঃ করে কেঁদে ওঠে সে। ওর কান্না দেখে লোক জমে যায় হাসপাতালের করিডোরে। সামনে দাঁড়ানো দুজন ডাক্তার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। কী করবে বুঝতে পারেন না। লোকগুলো কিছুতেই বুঝতে চাইছে না ঘণ্টাখানেকের ভেতর রোগিনীর যৌন-গহ্বরের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন টিস্যুগুলো অপারেশন করে ঠিক করা না হলে বাঁচানো সম্ভব হবে না। অথচ এটা প্রাইভেট হাসপাতাল, টাকা ছাড়া চিকিৎসা দেয়া প্রায় অসম্ভব । এমন শোচনীয় অবস্থায় পেশেন্টকে ছেড়ে দেয়াও ডাক্তারি পেশার পরিপন্থি। তাহলে?
দূর থেকে হিল্লি, লালু আর বাঘা সব শুনতে পাচ্ছে। চোখের সামনে মেয়েটা নেতিয়ে পাড়ছে; অথচ কারোরই কিছু করার নেই। স্বামী রহমতের দেখা নেই অনেকক্ষণ। ঝগড়াটে মাটাকেও এখন আর চোখে পড়ছে না। সে-ও ছেলের মতো এককথা-দুকথা বলে হাসপাতালের ভিড়ের ভেতর মিলিয়ে গেছে। হয়তো পালিয়ে গেছে। শুধু অসহায় লিয়াকত হাতে একটা পাঁচশ টাকার নোট নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে হাসপাতালের এককোনে।

হিল্লি বলল, ‘আমরার কি কিছুই করার নাই? চোহের সামনে মাইয়াডা এমনি এমনি মরব?’
লালু উত্তর দিল, ‘আমরা সামান্য পশু। মানুষের দয়ায় বাঁচিমরি। আমরা কী করুম, ক? ওদের মা-বাবাই তো অসহায়।’
‘ওগো দুষ দিয়া লাভ নাই। গরিবানা ওদের বহু আগেই মেরে দিয়েছে। ওগো বাঁচা-মরা একরহমই।’
পাশ থেকে বাঘা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে হিল্লির দিকে। হিল্লি সত্যি সত্যি আর আগের মতো নেই। তার মত-পথ ও দেখার চোখ সব পাল্টে গেছে। গাপ্পু ওর মনশ্চক্ষু ঠিকই বদলে দিয়ে গেছে। নইলে এসব কথা ওর উপলব্ধির ভেতর কোনদিনই উঁকি মারত না। সে ঠিকই অন্যদের মতো লালুর কথায় মাথা নাড়ত। প্রভু বলে কথা!
বাঘা বলে উঠল, ‘আমি একজনরে চিনি। এই হাসপাতালের পিছনেই থাকে। আমরার প্রতি খুব দরদ। বড়লোক খুব, দুইডা বাড়ির মালিক, যাইবি?’
‘অত রাইতে? কি কছ? দারোয়ানের লাডির বাড়ি খাইতে ইচ্ছা অইতাছে?’ মাথা নেড়ে অনিচ্ছা প্রকাশ করে হিল্লি।

‘ওইরকম না লোকটা। আমাদের লইয়া তার অনেক গবেষণা। তুই-আমি ডাক দিলেই টের পাইবো। দেহিস।’
একটুক্ষণ কি যেন ভেবে নেয় হিল্লি। তারপর বাঘাকে বলে ওঠে, ‘চল।’ যাওয়ার সময় লালুকে বলে গেল, ‘তুমি থাক। কোন অসুবিধা অইলে খবর দিও।’
লালুর এসব ভাল লাগে না। সে নিরিবিলি ঝঞ্ঝাটহীন জীবন কাটাতে চায়। হিল্লিকে মনে হয়েছিল ওরই মতো। কিন্তু এখন যত দিন এগোচ্ছে তত মনে হচ্ছে সে আগেকার সেই চেনা হিল্লি নয়। আকাশের মতো পাল্টে যাচ্ছে ওর মন। লালু বুঝতে পারে না। সুখে থাকলেই কি হুজ্জোতির থলে থেকে লুকানো ভূত বেরিয়ে আসতে চায়?
বাঘা হিল্লিকে নিয়ে ড. শাফায়েত সাহেবের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। রাস্তাঘাটে মানুষজন নেই। যে পাগলটা সারাদিন ঘুরে বেড়ায় রাস্তায় রাস্তায়, সে-ও কোত্থেকে একটা আকাশ রঙ্গের কম্বল গায়ে দিয়ে ফুটপাথে শুয়ে পড়েছে। বাঁশি-লাঠি হাতে গার্ডগুলো চক্কর কাটছে ঘনঘন। হাতের টর্চগুলো কোনা খুপচিতে সহসা সূর্যের মতো জ্বলে উঠছে। একটাই উদ্দেশ্য, চোর-ডাকাতের উপদ্রব থেকে মহল্লাকে রেহাই দেয়া। শুধু শাফায়েত সাহেবের দোতলার ঘরটায় আলো জ্বলজ্বল করছে। তাই দেখে বাঘা বলল, ‘ডেকে ওঠ। কাজে দেবে। দেহিস।’

হিল্লি আর দেরি না করে করুণ সুরে ডেকে ওঠে। সঙ্গে কণ্ঠ মিলায় বাঘা। একবার, দুবার, তিনবার। মানুষটা জানালা দিয়ে তাকাল নিচের দিকে। ওরা যে রাস্তায় অস্থির হয়ে চক্কর কাটছে তা চোখে পড়ে গেল। ভদ্রলোকের কেন যেন মনে হল প্রাণী দুটি বিপদে রয়েছে। সাহায্যের প্রয়োজন তাদের। তিনি গেট খুলে রাস্তায় নেমে এলেন। হিল্লি আর বাঘা শাফায়েতকে ঘিরে চক্কর কাটল প্রথমে। তারপর কুঁইকুঁই শব্দ করে অভিযোগটি উত্থাপন করার পর ভদ্রলোকের কাপড় মুখে নিয়ে সামনের দিকে টানতে শুরু করে দেয়।
শাফায়েত সহজেই বুঝতে পারে ওরা ওকে সামনের দিকে যেতে বলছে। তিনি হাঁটতে থাকেন ওদের পিছু পিছু। হাসপাতালে পৌঁছে তিনি দেখলেন, বাঘা ইমারজেন্সীর কাচের দরোজায় আঁচড় কেটে চলেছে। বুঝতে অসুবিধা হল না এর ভেতরেই যত সমস্যা।

তিনি এতটুকু দেরি না করে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। তরুণ ডাক্তারদের অনেকেই তার পরিচিত। বাড়ির পাশে বেসরকারি এ হাসপাতাল। সমাজসেবার নানারকম প্রয়োজনীয় কাজে এখানে ওকে আসতে হয়। সেদিনও এসিড সন্ত্রাসের শিকার একটি মেয়ের চিকিৎসার কাজে এখানে আসতে হয়েছিল।
জিজ্ঞাসা করতেই বেরিয়ে এল ফুলির ঘটনা। মহিলা ডাক্তার কপালে চিন্তার ভাঁজ নিয়ে বলে উঠলেন, ‘বলেন তো শাফায়েতভাই, এখন কী করি? মেয়েটাকে অপারেট না করলে বাঁচবে না। একটা ইমম্যাচিউর বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে দিয়ে কি হাল করেছে, দেখেন নিজের চোখে?’
শাফায়েতের একটাই মেয়ে। ক্লাস এইটের ছাত্রী। ফুলি সম্ভবত ওর মেয়ে টিউলিপের বয়সী। একঝলক দেখতেই চকিতে শরীরের লোমকূপগুলোয় শিহরণ খেলে গেল ওর। মানুষ এতটা হিংস্র স্বভাবের হয় কিভাবে? তীব্র ব্যথায় মুখ ফিরিয়ে সামনে দাঁড়ানো ডাক্তারকে শুধু বললেন, ‘বাচ্চাটাকে বাঁচান প্লিজ। টাকার চিন্তা করবেন না।’ হাতে ধরা ওর ক্রেডিটকার্ড। চোখ ছলছল।
এসময় ফুলির বাবা লিয়াকত এসে দাঁড়াল ওর পাশে, ‘তুমি কেডা জানি না। মনে লয় দেবদূত, এই ট্যাকাডা লও হাতে।’ বলে হাতে ধরা পাঁচশত টাকার নোটটা ওর হাতে গুজে দিল। বিড়বিড় করে বলল, ‘আমি ফুলির বাপ।’

শাফায়েত হতভস্ব হয়ে রইল কিছুক্ষণ। সহসা কী ভেবে লোকটাকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে বাঘাদের আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে উঠলেন, ‘দেবদূত আমি না, ওরা। ’
লিয়াকত বুঝতে পারে না। শুধু মেয়ের কথা ভেবে বারবার চোখের জল মুছতে থাকে।
শাফায়েতের সঙ্গে সারারাত জেগে রইল লালু, বাঘা আর হিল্লি। অস্থির এক উত্তেজনা সবার মাঝে- মেয়েটা বাঁচবে তো? হিল্লি ঠাণ্ডায় রীতিমতো কাঁপছে। দুর্বল শরীরে বারবার বলতে থাকে, ‘মেয়েটা যেন বাঁচে। আবার যেন আমি ওর হাতের পাঁউরুটি খেতে পাই।’ এসময় রাতের হিম পড়া ঘোলা আকাশটার দিকে তাকিয়ে এমন একটা মিনতিভরা গর্জন দিয়ে উঠল যে সবার বুক ফুঁড়ে হুহু কান্নার বাতাস বইতে থাকে।
পরদিন দুপুরে বাঘা খবর নিয়ে এল, ফুলি বেঁচে গেছে। শাফায়েত সাহেব ওদের পাউরুটি বিস্কুট খেতে দেয়। ওরা চক্কর কেটে নিজেদের কৃতজ্ঞতা জানায়। তারপর হিল্লি, লালু আর বাঘা ফিরে আসে ভুলু মুন্সীর ডেরায়।

বিদায় নেবার সময় বাঘা হিল্লিকে বলল, ‘তোরে আমি এখন আর চিনতে পারি না। তুই বদলে গেছিস।’
মাথা নিচু করে সে হাসে। টের পায় পেটের ভেতর বাচ্চাগুলো নড়াচড়া করছে। মাতৃত্ব যেন কথা কয়ে ওঠে। সে আলগোছে নিজের শরীরখানা মাটির উপর এলিয়ে দিয়ে রোদ পোহায়। মিষ্টি তাপে ঘুম চলে আসে চোখে।
সহসা তীব্র চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দে হিল্লির ঘুমের ঘোরটা ভেঙে যায়। লালুর মুখ তখন ওর মুখের কাছে, ‘হিল্লি, রহমতরে পুলিশ ধইরা নিয়া যাইতাছে। এইডা শাফায়েতভাইর কাণ্ড। আমি নিশ্চিত।’
‘খুব ভালা অইছে।’ বলে সে বস্তির দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়। সেখানে তখন অনেক পুলিশ। রহমতের কোমরে দড়ি। মাথা নিচু করে পুলিশের পিছু পিছু হাঁটছে।

কোত্থেকে ভিমরু ছুটে এসে হিল্লিকে জানায়, ‘একটা কামড় দিমু নিকি ভাবী?’
হিল্লি মুচকি হাসে। ফুলির জন্য মনটা বড় পোড়াচ্ছে ওর। একবার হাসপাতালে গিয়ে মেয়েটাকে দেখে না এলে মন শান্ত হবে না।
একলা হিল্লি পা বাড়ায় সামনের দিকে।