একাকিত্বের রঙ আছে নিঃসঙ্গতার নেই ॥ শাকিলা চয়ন


‘ভেবো না,আমি তোমার পাশেই আছি ’-কথাটি বলার জন্য যখন কেউ থাকে না তখনই মানুষটি একা।

মানুষ জন্মগত ভাবেই সামাজিক। চারপাশে নানা রকমের বন্ধনের মাঝেই মানুষ বেড়ে ওঠে। তাই মানুষের পক্ষে একা থাকা কঠিন। কেউ যখন হঠাৎ একা হয়ে পড়ে তখন জীবনের ছন্দ হারিয়ে ফেলে। কোনো কিছুই তখন আর ভালো লাগে না। তবে একাকী বেড়ে ওঠা একজন মানুষের জন্য একাকিত্ব শব্দটি একটু অন্যরকম। তার একা থাকাটা অভ্যস্ততা নিয়ে গড়ে ওঠা বন্ধুর মতো। বরং বলা যায় একাকিত্ব কখনো কখনো তাকে সমৃদ্ধ আর শক্তিশালী করে তোলে। হাজারো মানুষের ভিড়ে একা থাকাটা তার জন্য যোগ্যতাও হতে পারে। তা হয়তো কখনো সে উপভোগও করে।

প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব কিছু সময় থাকা বাঞ্ছনীয়। যাকে আমরা বলে থাকি, নিজেকে একটু স্পেস দেয়া। এর মাধ্যমে আমরা নিজেকে জানতে ও চিনতে পারি। নিজেকে অনুভব করার জন্য এই সময়টুকু খুব জরুরী। যে ব্যক্তি নিজেকে জানবে, আবিষ্কার করবে এবং ভালোবাসবে, সে সবকিছুকে স্বাচ্ছন্দ্যে অতিক্রম করতে পারবে। ব্যক্তিগত জগৎ ব্যাক্তিকে সুখী করে। আর ব্যাক্তিসুখই পরিবার সমাজ ও পুরো পৃথিবীকে সুন্দর করে।
একা থাকার যেমন ভালো দিক আছে তেমনি মন্দ দিকও আছে। বেশি সময় ধরে একা থাকা মানুষের জন্য সুখকর নয়। মানুষকে মানসিকভাবে তা দুর্বল করে তোলে। আর এই দুর্বলতা থেকেই মানুষ অশোভন আচরণ আর অসুস্থ চিন্তা-ভাবনায় জড়িয়ে পড়ে। এর ফলে নিজেকে এবং অপরকেও তারা ক্ষতিগ্রস্ত করে বসে।
একাকিত্বের কারণে একজন মানুষের যখন আর নিজেকেই ভালো লাগে না তখনি তা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। জীবনে চড়াই উতরাই থাকবেই। একাকিত্ব যখন নিঃসঙ্গতায় রূপ নেয় তখন তা মলিন ক্যানভাসের মতো হয়ে উঠে। এককিত্বের রং আছে নিঃসঙ্গতার নেই। আমাদের জীবনযাত্রা যতো এগোচ্ছে ততটা নিঃসঙ্গ হচ্ছে মানুষ । বিশেষ করে শিশু এবং বয়স্করা বেশি মাত্রায় নিঃসঙ্গ হচ্ছে। অনেকক্ষেত্রে শিশুরা বেড়ে উঠছে গৃহপরিচারিকার সঙ্গে। যেটুকু সময় বাবা-মা বাসায় থাকছে, সে সময়টাও কেড়ে নিচ্ছে ফেইসবুক বা গুগল। কিশোর বা তরুণরা বিভিন্ন কারণে একাকিত্বের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে কখনো কখনো হেরে যায়। মাদক বা আত্মহত্যাকেও বেছে নেয় কেউ কেউ। ঠিক তখনই এমন একজনের পাশে থাকা উচিত, যে কাঁধে হাত রেখে বলবে, ‘আমি আছি’।

যদিও একটা সময় ব্যস্ত জগতের সাথে আমরা সবাই অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। তবুও আমরা আশা করতে পছন্দ করি, কেউ একজন আছে আমার পাশে। একাকিত্ব যেন উপভোগ্য হয় বেদনার নয়।
আমাদের প্রত্যেকেরই মনের কোণে সুরের মতো সঙ্গ খোঁজার ঢেউ জাগে। বন্ধু, পরিবার, পরিজনের সঙ্গ জীবনে এনে দেয় মায়া। মানব সঙ্গের সাথে কখনো পাখির ডাকের মিষ্টি সুরের সঙ্গ,জ্যোৎস্ন রাতের জোনাক জ্বলা আলোর সঙ্গ অথবা বৃষ্টি দিনের টুপটাপ ছন্দ আর ঠাণ্ডা হাওয়ার সঙ্গও আমাদের সমৃদ্ধ করে।