একাকিত্ব ॥ মোনালিসা রেহমান

প্রত্যেকটি মানুষই একটা বিশেষ সময়ে একা হয়ে যায়। এই একাকিত্ব কেউ উপভোগ করে আবার কেউ কেউ যন্ত্রণাক্লিষ্ট মন নিয়েই জীবনযাপন করে। তবে আজকাল একা থাকাটা অনেকেই বেশ পছন্দ করছে। নিজের মতো করে একটুখানি বাঁচা। ঝুট ঝামেলা বিশেষ নেই ,নিজস্ব চিন্তাচেতনায় ছন্দপতন ঘটানোর খুব একটা সুযোগ নেই, এর ফলে নিজস্ব একটা ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে। আবার কখনও কখনও বেশি সময় নিজেকে দিলেও নিজের প্রতি বিরুক্তি আসে, দিনগুলো কিছুতেই শেষ হতে চায় না। তবুও নির্জন অন্ধকারে চোখ বুজে কত কথা ভাবা যায়। চেনা অচেনা জগতের সাথে একটা আত্মিক যোগাযোগ গড়ে ওঠে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অন্যভাবে আবিষ্কার করা যায়। তবে নিজস্ব ঘেরাটোপে বন্দি জীবন যাপন কি সত্যি সুখ বয়ে আনে?


ছোটবেলা থেকে হাসিখুশি স্বভাবের হলেও বুঝতে পারতাম একটা অজানা বিপন্নতা গ্রাস করত মাঝে মধ্যে, নিজেকে দুঃখবিলাসি মনে হতো সবসময়। নিজস্ব ভাবনাগুলোর সঙ্গে সময় কাটাতে ভালবাসতাম, মানুষের ভিড় থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতাম, একটা নিজস্ব কোণে। বাড়িতে সকলে ঘুমিয়ে পড়লে একাকিত্বই আমায় আনন্দ দিত। মনে হত এরজন্যই তো বেঁচে থাকা। নীরবতার যে কষ্ট ও যন্ত্রণা সেটা উপভোগ করা যায় একান্ত নির্জনেই। আমার নির্জনতাই আমার সঙ্গী। চোখের জল দিয়ে লেখা আমার কবিতার সঙ্গে একান্ত যাপন। আমার দমআটকানো জীবনের নির্যাসটুকু নিয়েই একাকিত্বের সঙ্গে আমি ভাব বিনিময় করি। আমার একাকিত্বের সঙ্গে আমি ছুটে ছুটে বেড়িয়েছি কত এলোমেলো পথ। কোন এক শ্রাবণ সন্ধ্যায় যেদিন মেঘ ছুঁয়েছিল আমার ঝুলবারান্দা, উঁচুস্বরে সেদিন গান ধরেছিল দোয়েল, একটা দুটো করে ডিভোর্সি পাখিরা উড়ে উড়ে যাচ্ছিল উদাসী হাওয়ায়। সেদিন কেন আমি এই একাকিত্ব থেকে মুক্তি চাইছিলাম তবে?

রাত্রি মানেই অদ্ভুত একটা কষ্ট, নিস্তব্ধতা, কিছু একটা হারাবার যন্ত্রণা, কিছু না পাওয়ার দুঃখবোধ… তারপরও এক একটি রাত্রি যেন আমার কাছে নতুন পৃথিবী। নতুন মোড়কে নতুন ব্যঞ্জনায় উপস্থিত হয়ে আমায় ভাঙ্গে গড়ে, তার সমস্ত ভালোবাসা নিয়ে যেন আমার কাছে হাজির হয়। আমি আবার রঙিন হয়ে উঠি। আমি কোনদিন গার্সিয়া মার্কেজ, কোনদিন বা চে’র সবুজ নোটবুক নিয়ে ব্যস্ত থাকি। কখনও বা শুধু রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কাটিয়ে দিই দিনের পর দিন।
জন্মজন্মান্তরের মাপজোক, পাওয়া না পাওয়া, হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলো একাকিত্বের সঙ্গী হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় মানুষের যাপন। তখন হাসি কান্না ধর্ম অধর্ম জন্ম মৃত্যু বাস্তব পরাবাস্তব সব মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। মানুষের জীবনে এ এক মুক্তি …

আমি ও আমার ভেতরের মানুষটি সম্পূর্ণ আলাদা। মাঝে মাঝে
নিজেকে আগন্তুক মনে হয়। আমার মধ্যে এক দ্বৈত সত্তা কাজ করে,
আমি তখন দোষারোপ করি অন্যদের।

আমাদের দিকে আজকাল নৈঃশব্দই চেয়ে থাকে
এক বিছানায় রোজ শুই পাশ ফিরে…
মাঝখানে এক অচেনা কোলবালিশ
অজ্ঞাতেই জায়গা করে নেয়।
অসংখ্য মুখোশের মধ্যে আমরা
প্রকৃত মুখটাকে খুঁজতে থাকি…
সর্বোপরি নিজেকেই।
(কবিতা : নৈঃশব্দ)

বেঁচে থাকার সমস্ত উপাদান যখন প্রায় নিঃশেষিত, এক ক্লান্তিহীন আন্দোলন নিজের সঙ্গে ক্রমাগত, ক্ষয়িষ্ণু হয়ে
যাওয়া সুখস্মৃতিগুলো যখন একটার পর একটা শোকগ্রস্ত দিনে ভাষা হারায়। তখন যে আমার কি হয়, ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকি নির্বিকার। তখন একাকিত্বকে বিস্বাদ মনে হয়। মনটাও তো একটা অনুর্বর জমি, এটাকে উর্বর করতে দরকার পরিচর্যা। মন যখন আধ্যাত্মিক স্থিতিশীলতায় ও কর্মশীলতার বিষয়ে একাগ্র হয় তখন সকল গুণসম্পন্ন এক অনন্ত ভাণ্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যায়। আমরা আস্তে আস্তে অনু-পরমাণু থেকে এক বৃহত্তর আকাশের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারি। জীবনের আবহে কত সংশয়, কত ঘটনা, দাগ কেটে যায় হৃদয়ের গভীরে তার কোন ইয়ত্তা নেই। এই সমস্তকিছুই সময়ের সাথে সাথে রং পাল্টায়। ধারাবাহিক ভাবে বিষণ্ন বলয়ে আমরা শুধু কথা খুঁজতে থাকি। আমরা নিজেরাই অনেকসময় নিজেদের ঠিক চিনতে পারি না, আমরা ঠিক কি চাই? একাকিত্বের এই যে কষ্টগুলো সময়ের সাথে কিভাবে পাল্টে যায়। পুরানো সেই অতীত ঘেঁটে যেটুকু পাওয়া যায়, কার সঙ্গে ভাব ছিল, কার সঙ্গে ঝগড়া এগুলো এখন আর কোন বিষয়ই হয়ে দাঁড়ায় না।

আমি কিছুদিন দিকভ্রষ্ট ছিলাম। অযথা পরিতাপ করতাম অতীত নিয়ে। অনেক দিন নিজেকে মেনে নিতে পারিনি, অস্তিত্বসংকটে ভুগতে শুরু করেছিলাম, জানালা দিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম, অলক্ষ্যে আমার
চোখ দিয়ে শ্রাবণের ধারার মতোই বৃষ্টি নামত। তখন আমার সান্ত্বনা বলতে জানালা দিয়ে আকাশ দেখা। সীমাহীন
আকাশের একটুকরো আলোয় আমার মন উদ্ভাসিত হয়ে উঠত। উন্নতির পথে আত্মবিশ্বাস যোগাতে এইটুকু আলোর বিচ্ছুরণই যথেষ্ট, তারপর আরও, আরও, যতক্ষণ না পূর্ণ সত্যের মুখোমুখি হওয়া যায়। আর এই বেঁচে থাকার জন্য এই অপেক্ষা অনন্তকাল। এই অপেক্ষা যতই একাকিত্বের হোক না কেন। এ যেন নিত্যদিনের প্রবহমান ধারার মতো।

প্রত্যেকটা মানুষের বুকের মাঝে কিছু ক্ষত থাকে আর এই ক্ষত নিয়ে মানুষ বছরের পর বছর বেঁচে থাকে। কত নিদ্রাহীন রাত কেটে যায়। কখনও জীবন থেকে ভালবাসার কেউ হারিয়ে গেলেও সম্পর্কের বুনোটের সুতো কি সহজে আলগা হয়? এক অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে তখন কলমের আশ্রয় নিতে হয়। কিন্তু কিছুতেই সাদা পাতারা আর ভরতে চায় না। অজস্র আঁকিবুকি আর ক্লান্ত পরিত্যক্ত শব্দগুলো চারপাশে নৃত্য করতে থাকে। আমার ফুঁপিয়ে ওঠা কান্নার দিব্বি, সমস্ত উপকরণ মজুত থাকা সত্ত্বেও আমার কবিতা হয়ে ওঠে না। তখন শুধু নির্জনতার আকাশ ভেঙে অশ্রু নামে। পাতার পর পাতা জুড়ে সে কাহিনি লেখা থাকে হৃদয়ের মণিকোঠায় …আস্তে আস্তে আমি ফিরে যাই ছেলেবেলার স্মৃতিতে…
বৃষ্টি পড়লে কেমন করে কাগজের নৌকা বানাতাম, নৌকা উল্টে গেলেও কিছুতেই ডুবতে দিতাম না। তারপরও নৌকা ভেসে গেলে, পুনরায় নৌকা বানাতাম,কখনও হাল ছাড়তাম না।