একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতা ॥ সোনালী ইসলাম


আমি মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করি…
আমি কি একা?
হ্যাঁ, অবশ্যই আমি একা।
দিনের প্রায় বারো ঘন্টা সময় আমি একটা চৌদ্দশ স্কয়ারফুট ফ্ল্যাটে একা থাকি।
পুত্র দেশের বাইরে। কন্যা তার সংসারে এবং আমার স্বামী তার ডাক্তারি জগৎ নিয়ে অত্যধিক ব্যস্ত।
এমনকি যেটুকু সময় বাড়িতে থাকেন সেই সময়ও ক্রমাগত রোগী বা হাসপাতালের ফোন আসতে থাকে। আমার জীবনের সায়াহ্নে আমি এখন একা।

‘একা’ এই শব্দটিকে আমি যদি নেগেটিভ ভাবে নিতাম তাহলে আমার মতন ‘দুঃখী হৃদয়’ আর কেউ নেই। মনে হতে পারে, সারাজীবন যাদের জন্য জীবনপাত করলাম, নিজের ক্যারিয়ার করলাম না… কত্ত কিছু ‘আকাশ পাতাল’ হতে পারতাম, কিন্তু হলাম না, শুধুই সংসারে সময় দিলাম। এখন তোমাদের নিজের জগৎ হয়েছে, তোমরা আমাকে ভুলে যাচ্ছ। আমাকে সময় দিচ্ছ না। এমন নেগেটিভ ভাবনা থেকেই আসে অস্থিরতা, বিষণ্নতা আর তারপর মানসিক অসুস্থতা।

কিন্তু, অনেক আগে থেকেই আমি নিজেকে প্রস্তুত করেছি এই সময়ের জন্য। আমি জানতাম, একটা সময়ে সবাই ব্যস্ত হবে এবং আমাকে অযথা সময় দেবার সময় তাদের থাকবে না। তাই আমি একা, কিন্তু নিঃসঙ্গ নই। আমি একা, কিন্তু এই একাকিত্ব আমি উপভোগ করি। কারণ ‘একা’ শব্দটিকে আমি পজিটিভলি অবশ্যম্ভাবী ধরে নিয়েছি। আমি যেন জানতামই, এই সংসার নামক বিশাল চাকরি থেকেও একদিন আমার অবসর নিতে হবে।
অথচ এটাও সত্যি যে, অনেক মানুষের মধ্যে থেকেও আমি প্রায়ই একা হয়ে যেতাম। আমি একা নই, এমন অনেকেই আছেন যারা সবার মাঝে থেকেও নেই। কারণ, চারপাশের যারা সঙ্গী হিসেবে আছেন বা গল্প করছেন, মতবিনিময় করছেন তাদের সাথে অনেক সময়ই কমিউনিকেট করা যায় না। মনের কথা, মনের ইচ্ছার কথা কিংবা কোন আইডিয়া শেয়ার করা যায় না। রাজনৈতিক মতবাদের কথা না হয় নাই-ই বললাম।

এমনকি সুন্দর প্রাকৃতিক জায়গায় বেড়াতে গেলেও আপনি একা হয়ে যেতে পারেন। নিউ অর্লিয়ন্সের রাস্তায় আমার সঙ্গী হয়েছিলেন যে মহিলা তিনি সারা গাছে আলো হয়ে ফুটে থাকা ম্যাগনোলিয়া ফুল কিংবা বারান্দা উপচে পড়া পিটুনিয়া, বোগেনভিলিয়াকে উপেক্ষা করে জাংক জুয়েলারি আর শ্যম্পু কিনতে আগ্রহী ছিলেন। ফলে, মানসিক ভাবে আমি আবার একা। আবার সাউথ আফ্রিকার টেবলটপ মাউন্টেনে আধা ঘন্টা কাটিয়ে শপিংমলে পাঁচঘন্টা সময় নষ্ট করার মত মানুষের সঙ্গেও আমাকে ঘুরতে হয়েছে। তারমানে, একাকিত্ব শব্দটি শুধুমাত্র শারীরিক নয়, এর সাথে ওতোপ্রতো ভাবে জড়িত মানসিক একাকিত্ব। আপনি যদি আপনার সমসাময়িকদের চাইতে একটু বেশি বা একটু অন্যরকম ভাবেন বা জানেন অথবা বিশ্বাস করেন, তা হলেই আপনি ‘একা’। আপনাকে একঘরে করতে একটুও দেরি করবে না আপনার আপনজনেরা।

এখানেই ফ্যাশান আর স্টাইলের তফাৎ। অবাক হচ্ছেন তো? একাকিত্বের সঙ্গে ফ্যাশনের সম্পর্ক কি? অবশ্যই সম্পর্ক আছে। ধরুন আমার এই বয়সে হিসেব মত ফ্যাশন হলো গিয়ে ডাই করা চুলে ছোট খোপা অথবা হিজাবে মাথা ঢাকা, সেই সাথে মানাক না মানাক সালোয়ার-কামিজ অথবা আবায়া পরা। এবং তিন থেকে চারজন এক জায়গায় জমায়েত হলেই বধূমাতা বা জামাতার নিন্দা করা।

সেখানে কাঁচাপাকা ছোট চুলের আমি যদি সুতির শাড়ি পরে জানতে চাই আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন এর খবর কি? তাইলে? আমি ‘একা’ হব না তো কি পাড়ার অন্য মহিলা একা হবে?
আমার ‘একাকিত্ব’ দেখে দুঃখিত হওয়া কন্যার উপদেশ মোতাবেক একটা তের চৌদ্দ বছরের মেয়ে রাখলাম। ইচ্ছা ছিল লেখাপড়া শেখাব, বড় হলে যেন নিজে রোজগার করে খেতে পারে। তো প্রথম দিন সে চুপচাপ আমাকে অবজার্ভ করল। দ্বিতীয় দিন এসে বলল, খালাম্মা আপনি টিভি দেখেন না?
– হ্যাঁ, খবর দেখি।
– কেন জিবাংলাতে কুসুমদোলা হয়, সেটা দেখেন না।
-জিবাংলা? সেটা আবার কত নম্বরে?
আমি রিমোট টিপে খুঁজতে থাকি তারপর আলজাজিরা চ্যনেলের একটা জরুরী সংবাদে এসে আটকে যাই।
পরদিন মেয়েটা আমার ড্রাইভার কে বলে গেলো, জিবাংলা দেখে না এমন অশিক্ষিত বাসায় আমি থাকতে পারব না।
অতি সত্য কথা, তাবৎ মহিলারা যখন জিবাংলায় কুসুমদোলা দেখছে ঘরের কারেজ সহায়তাকারীর সঙ্গে, সেখানে আমি কোন অশিক্ষিত, যে কিনা আলজাজিরার খবর দেখি? আমার মেয়ে শুনে বলল, – মা, তুমি না একটা ইম্পসিবল। বাতিকগ্রস্ত।

সে যা হোক, এটা একেবারেই সত্যি যে আমি একা থাকি, কিন্তু একাকিত্বে ভুগি না। আমি একা কিন্তু নিঃসঙ্গ নই একেবারেই। কারণ বহু আগে থেকেই আমি একাকিত্ব থেকে বাঁচার রাস্তা খুঁজেছি এবং তা খুঁজে পেয়েছি। যে সময়টুকু আমি এক্কেবারে একা থাকতে পারি, সে সময় আমার নিজের জন্য আমি খরচ করি। না, আমার বন্ধু-বান্ধব সার্কেল নাই, আড্ডা বা হ্যাংগ আউট করতেও যাই না। আমার বন্ধু গাছ, বই আর সেলাই। সাতফুট বাই তিনফুটের বারান্দায় আমার বাগান। ছোট ছোট টবে ক্যাকটাস স্যাকুল্যান্ট মানিপ্ল্যান্ট। প্রতিটি পাতা আমার চেনা, প্রতিটি গাছ আমার সাথে কথা বলে। রোদ-বৃষ্টি, সার, পানি সব মিলিয়ে আমার ঘন্টা দুই-একের ব্যস্ততা।

আর আছে বই, যতদিন চোখের জ্যোতি আছে ততোদিন বই পড়তে বাধা কই? পড়ার ব্যাপারে আমি ছাগল গোত্রীয়। ধর্ম দর্শন উপন্যাস গল্প কবিতা ইংরেজি বাংলা কিছুই বাদ দেই না। প্রতিদিন ঘন্টা খানেক সময় আমার কাটে বই এর সঙ্গে। এছাড়া পত্র পত্রিকা তো আছেই। মনে করুন ব্যালকনির সোফায় অথবা বিছানায় এককাপ কফি আর একটা দারুণ গল্পের বই আর একা আপনি, সময় কাটবে কি দারুণ!।
আমার শেষ সঙ্গী আমার সেলাই। আমি এমব্রয়ডারী করি, উল বুনি, ক্রশকাটার কাজ করি। এই আনন্দটুকু একান্তই আমার। কখনো এতে ক্লান্তি আসে না। গরম কালে হাতে থাকে সুইসুতা আর শীতকালে উলকাটা। ফলে, কখনোই আমি নিঃসঙ্গ থাকি না।

আমি একা থাকি কিন্তু একাকিত্বে থাকি না। কারণ আমি আমার নিজের জগৎ তৈরি করে নিয়েছি। অথচ আমার মা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। ছাত্র পড়ানো খাতা দেখা ছাড়া আর কোন জগৎ তিনি তৈরী করেননি। ফলে চাকরি থেকে অবসর নেবার পর তিনি পরিপূর্ণ একা হয়ে গেলেন। এবং একাকিত্বের কারণে বিষণ্নতায় ভুগতেন। অভিযোগ করতেন, কেউ তার সঙ্গে সময় কাটাতে চায় না বলে। হয়ত তাকে দেখেই আমার মনে হয়েছে, আমাদের জীবনে আসলে আমরা জন্মাই একা এবং মারাও যাই একা। সঙ্গীসাথী শুধুমাত্র মধ্যবর্তীকালীন সুসময়ের জন্যই পাওয়া যায়। তাই, একাকিত্বকে ভয় না পেয়ে তাকে উপভোগ করাই ভালো।

এভাবেই তো ভালো আছি আমি আর আমার একলা সময়। একা কিন্তু নিঃসঙ্গ নই একেবারেই।