সম্পৃক্ততা ও বিচ্ছিন্নতার দ্বন্দ্ব ॥ মৃণাল ঘোষ



“একলা বসে বাদল-শেষে শুনি কত কী-
‘এবার আমার গেল বেলা’ বলে কেতকী॥”
একাকিত্ব নিয়ে একটি লেখা লিখতে হবে এই প্রস্তাবটি যখন প্রথম এসেছিল আমার কাছে, তখন, কেন জানি না, রবীন্দ্রনাথের গানের এই লাইনটি ভেসে উঠেছেল আমার মনে। ‘একলা’- এই শব্দটির অনুষঙ্গেই হয়তো। এই গানটিই তখন মনে করিয়ে দিয়েছিল- একাকিত্বের একটি আলোকিত দিকও আছে। একাকিত্ব সব সময় আত্মবিচ্ছিন্নতামূলক না-ও হতে পারে। হতে পারে আত্মসৃজনের একটি অনিবার্য শর্তও। এই গানটিতে যেমন। এই বাণীর যিনি স্রষ্টা, তিনি যদি একলা না হতেন, তাহলে কি শুনতে পেতেন ‘কেতকী’-র এই উদাস উচ্চারণ? সমস্ত গানটির মধ্যেই এক ধরণের নির্জনতার আবহ আছে। আবার সেই নির্জনতার অনুষঙ্গেই আসে এক সমর্মিতা, নিবিড় এক ঐক্য বা সংযুক্তির বোধ। ‘বৃষ্টি-সারা মেঘ যে তারে ডেকে গেল আকাশপারে/তাই তো সে যে উদাস হল- নইলে যেত কি॥’ মেঘ তাকে ডেকেছিল। তার কাছে এনেছিল আকাশের আহ্বান। একটি সংযুক্তির বা মিলনের সম্ভাবনা সঞ্চারিত হয়েছিল। তা থেকেই কি এসেছিল উদাত্ত এক উদাসীনতা? সেই উদাত্ততাই কি তার মধ্যে এনেছিল বিদায়ের অনুষঙ্গ? এখানে যে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সে কি সেই বেলা যাওয়ার কথা? ‘এবার আমার গেল বেলা’।

একলা না হলে কবি শুনতে পেতেন না কেতকী-র এই মগ্ন উচ্চারণ। তেমনি কেতকী-ও তার একাকিত্ব দিয়েই অর্জন করেছিল মেঘ তথা আকাশের আহ্বান। কেতকী-র সেই একাকিত্বের স্বরূপ ছিল কেমন? গানটির সঞ্চারী অংশে শুনি- ‘ছিল সে যে একটি ধারে বনের কিনারায়,/ উঠত কেঁপে তড়িৎ-আলোর চকিত ইশারায়।’ মাঝে মাঝে বনের ধারে তার অবস্থানের একাকিত্বের সঙ্গে সংযোগ ঘটত আকাশের বিদ্যুৎ বিচ্ছুরণের। একাকিত্ব আলোকিত হত। সেই আলো তাকে সুদূরের সঙ্গে সংযুক্ত করত। কেমন ছিল সেই সংযুক্তির ধরণ? ‘প্রাবণ ঘন-অন্ধকারে গন্ধ যেত অভিসারে/ সন্ধ্যাতারা আড়াল থেকে খবর পেত কি॥’ একাকিত্বের ভেতর থেকেই উৎসারিত হতে পারে অস্তিত্বের সুবাস। আর তাতেই তো একাকিত্ব বিশ্ব বা মহাবিশ্বের সম্পৃক্ততা পায়।

১৩৩২ বঙ্গাব্দে ৬৪ বছর বয়সে লেখা রবীন্দ্রনাথের এই গানটি একাকিত্বের এক অলৌকিক রূপ উদ্ভাসিত করে আমাদের সামনে। একলা না হলে কবি শুনতে পেতেন না কেতকী-র এই মর্মবাণী। আবার কেতকী-ও তার একাকিত্বকে রূপান্তরিত করছে আত্মদীপ্তিতে। যে আত্মদীপ্তি ‘শ্রাবণঘন-অন্ধকারে’ অভিসারে যেত সুবাসরূপে। মহাবিশ্বে পরিব্যাপ্ত হত তা। সন্ধ্যাতারা তার প্রতীক্ষায় থাকত।
এই হল একাকিত্বের একটি রূপ। আরও অনেক রূপ আছে। আর একটি রূপের কথা আমরা বুঝতে চেষ্টা করব রবীন্দ্রনাথেরই আর একটি গান থেকে। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’। যদিও এই গানটি লেখা হয়েছিল ১৯০৫ সালে, তবু এই গানের অনুষঙ্গে আমাদের মনে পড়ে মহাত্মা গান্ধির শেষ জীবনের কথা। শেষ জীবনে একেবারে একলা হয়ে গিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধি। সমস্ত দেশ স্বাধীনতা প্রাপ্তির আনন্দে উদ্বেল। ওদিকে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হচ্ছে নোয়াখালিতে, কলকাতার বেলেঘণ্টায়। গান্ধিজি সেখানে একা একা পদযাত্রা করছেন। কখনও অনশন করছেন মানুষের মধ্যে শুভবোধ জাগানোর জন্য। এসব করছেন, আবার আর একদিকে গভীর একাকিত্বে এই জীবন থেকে মুক্তি চাইছেন। ১৯৪৭ সালের ২৫ মে বলেছিলেন এরকম- ‘এতদিন আমি চাইতাম ১২৫ বছর পর্যন্ত বাঁচতে। এখন আর তা চাই না। দেশ যদি এইভাবে হিংসায় ডুবতে থাকে, আমার তবে বেঁচে থাকার ইচ্ছেও আর নেই।’

একাকিত্বের দুই রূপ আমরা দেখছি এখানে। যে মানুষ সারা জীবন যৌথতার আন্দোলনে দীক্ষিত করেছেন সারা দেশকে। সমস্ত স্বরের সম্মিলনে গড়ে তুলেছেন ঐকতান, শেষ জীবনে তাকেই নিমজ্জিত হতে হল কঠিন একাকিত্বে। সেই একাকিত্বই একদিকে যেমন তাকে নিজের আদর্শে অবিচল রেখেছে, মরণপণ সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছে, আর একদিকে নিজের জীবনের প্রতি তৈরি করেছে গভীর বিরাগ। একাকিত্বের একদিকে রয়েছে আত্মপ্রত্যয়, আর একদিকে জীবন থেকে নিজেকে বিযুক্ত করার মতো বিষাদ। এই বিষাদ অবশ্য আঁধারলীন বা শূন্যতাময় নয়। কেননা এই বিষাদকে আবৃত করে রাখে এক উজ্জীবনের স্বপ্ন। আজ যা ব্যর্থ বলে প্রতিপন্ন হয়েছে, তার মধ্যেই সুপ্ত হয়ে আছে এই সভ্যতার সম্ভাবনা।। কাজেই এই একাকিত্ব ও একাকিত্বজনিত মৃত্যুচেতনা বিচ্ছিন্নতা সঞ্জাও নয়। বিচ্ছিন্নতা থেকে জেগে ওঠে যে একাকিত্ব সেই একাকিত্বই জীবনকে কালিমালিপ্ত করে।

এরকম একাকিত্বই আজ আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে বেশি। বিচ্ছিন্নতা সঞ্জাত এই একাকিত্বই সভ্যতাকে ক্রমশ সংকুচিত করে। এরই বিরুদ্ধে একদিন প্রতিবাদ ব্যক্ত করেছিলেন পাশ্চাত্যের রেনেসাঁস যুগের প্রখ্যাত দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন (১৫৬১-১৬২৬)। বলেছিলেন, নির্জনতায় যে আনন্দ লাভ করে, সে হয় বন্য পশু অথবা দেবতা। ‘Whosver is delighted in solitude is either a wild beast of a god’. বেকন মনে করতেন যে নির্জনতা বা একাকিত্ব মানুষকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে সেই একাকিত্ব ভয়ংকর। তবু একাকিত্বের যে উজ্জ্বল দিক, যা মানুষকে আত্মস্বরূপের সঙ্গে যুক্ত করে, সে সম্পর্কেও তিনি সচেতন ছিলেন। ‘দেবতা’ কথাটি হয়তো সেই সূত্রেই এসেছিল। বেকন ছিলেন শেক্সপিয়ার-এর (১৫৬৪-১৬১৬) প্রায় সমসাময়িক। শেক্সপিয়ার-এর নাটকে এই একাকিত্বের নানা রূপ আমরা দেখতে পাই। ম্যাকবেথ বা ওথেলো-র একাকিত্ব উঠে আসে তাদের নিজস্ব পাপবোধ থেকে। যে একাকিত্ব তাদের ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। অন্যদিকে কিংলিয়র হয়ে ওঠে তার নিজেরই ভ্রান্ত বোধের বলি। মানুষের অহংকার ও উচ্চকাঙ্খা কেমন করে মানুষকে এই জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে একাকিত্বের গভীর অন্ধকারে নিমর্জ্জিত করে, শেক্সপিয়ার তার অজস্র নাটকে এর নিবিড় বিশ্লেষণ করেছেন।

পাশ্চাত্যে রেনেসাঁস যুগের চিত্রকলা বা ভাস্কর্যেও আমরা দেখতে পাই- মানুষ তার অজস্র বৈভবের মধ্যেও কোথায় যেন একলা হয়ে আছে। বিপন্ন এক পাপবোধ তাকে যেন কেবলই কুরে কুরে খায়। লিয়নার্দো দা ভিঞ্চি-র (১৪৫২-১৯১৯) ‘লাস্ট সাপার’-এ টেবিলের চারপাশে বসে আছে সে সন্তরা, তাদের সারা জীবনের ধর্মসাধনা সত্ত্বেও কোথায় যেন এক নিবিড় বিষাদ তাদের আবৃত করে রাখে। মিকেলাঞ্চেলো-র (১৪৭৫-১৫৬৪) ‘পিয়েতা’ ভাস্কর্যেও মায়ের কোলে শায়িত সন্তানের প্রতিমাকল্পে ভালবাসার স্বর্গীয়তার মধ্যেও কোথায় যেন বিষাদের বিপন্নতা রিন রিন করে বাজে। মানুষের মধ্যে যে হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে, মানুষ কোথাও তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। কিছুতেই পূর্ণ স্বরূপের কাছে পৌঁছতে পারছে না, এই এক পাপবোধ তাকে কেবলই বিমর্ষ করে রাখে। তার সত্তাকে ছায়াবৃত করে রাখে। এই বিচ্ছিন্নতা আধুনিকতাবাদী যুগ পর্যন্তও এসে পৌঁছায়। টি. এস. এলিয়টের (১৮৮৮-১৯৬৫) ‘The Love Song of d. Ayred Prufork’ কবিতায় শোনা এরকম উচ্চারণ- ‘I have heard the mermaids singing each to each. I do not think they will sing to me’. প্রকৃতির ভেতর পারস্পরিক সংলাপ চলে অবিরত। কিন্তু প্রকৃতি আমাকে কখনো তার গান শোনায় না। আত্মবিচ্ছিন্নতার এই বিষাদ আধুনিক মানুষকে কেবল বিপন্নতায় নিমজ্জিত করে। একাকিত্বের এই যেমন এক বিষাদ, তেমনি একা হতে না পারার বিপর্যয়ও আধুনিক মানুষকে আলোকদীপ্তিতে উদ্ভাসিত করতে পারে না। এই বিপন্নতার বেদনাও মানুষকে কেবলই সংকুচিত করে। অলডাস হাক্সলি-র (১৮৯৪-১৯৬৩) ‘Brave New World’-এর একটি চরিত্রের মুখে আমরা শুনি: ‘But people hever are alone how. We make then hate solotude; and we arrauge thier lives so that its almost impossible for them ever to have it’. এই যে একলা হতে না পারার সংকট- এটাও আধুনিকতার গভীর এক সংকট। পাশ্চাত্যের আধুনিক সভ্যতা বোধ হয়, আজ আর এরকম বলতে পারে না : ‘একলা বসে বাদলশেষে শুনি কত কী/ ‘এবার আমার গেল বেলা’ বলে কেতকী’।

একাকিত্বের এই আলোর দিকটির সন্ধান আজ আমরা খুব কমই পাই। একাকিত্বকে আজ সংজ্ঞায়িত করা হয় বিচ্ছিন্নতার এক জটিল ও সাধারণত অপ্রীতিকর আবেগময় প্রতিক্রিয়া হিসেবে। ‘Loneliness is a complex and wually impleasant emotional response to isolation. বিচ্ছিন্নতা সক্রান্ত যে একাকিত্ব তা ভয়ংকর এবং সর্বগ্রাসী। তা মানুষকে ক্রমশ আত্মধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। এর উৎস যেমন অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্খা, আত্মশ্লাখা, আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা তেমনি নিজেকে অতিক্রম করে অপরের কাছে পৌঁছতে না পারা, মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে বিস্তৃত করতে না পারা, এক কথায় বন্ধুত্বের অভাব বা ভালবাসায় নিজেকে মেলে ধরতে না পারা। কাজেই একাকিত্বের বিপরীতে আসে প্রীতি বা বন্ধুত্ব। বন্ধুত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সংশ্লিষ্ট থাকে প্রীতি বা ভালোবাসা।

বন্ধুত্ব বা সখ্য শব্দটি আদিকাল থেকেই মানুষকে ভাবিয়েছে। ঋগবেদের ঋষিও বুঝতে চেষ্টা করেছেন এর তাৎপর্য। বন্ধু বা সখা কে? ঋগবেদের ব্যাখ্যা করে আরিন্দম চক্রবর্তী বুঝিয়েছেন, ‘সমান যাদের ‘খা’ বা ‘খ্যাতি’ অর্থাৎ জ্ঞান তারাই ‘সখা’। বলেছেন, ‘খ’ শব্দটির মানে ইন্দ্রিয়। ‘খ’ মানে ছিদ্র বা আকাশ। ইন্দ্রিয়েরও কাজ বাইরের বিশ্বের সঙ্গে মানুষের সংযোগ ঘটানো। এই সংযোগে যারা পরস্পরের সমান, তারাই সখা। তারাই পরস্পরের সঙ্গে বন্ধুত্ব সূত্রে একাত্ম হতে পারে। অহংকারের ঊর্ধ্বে উঠে, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সঙ্গে এই সমতার বোধ যাপন করা, এটাই বন্ধুত্ব। এই বিচ্ছিন্নতা বোধ করে না। বরং একাকিত্বকে সে পূর্ণতায় রূপান্তরিত করতে পারে। এই হল একাকিত্বের দুই রূপ- একটি বিচ্ছিন্নতার, যা আত্মধ্বংসী, অন্যটি পূর্ণতার, যা নিজেকে ভরিয়ে রাখে, তেমনি সৃজনের মধ্য দিয়ে পূর্ণতায় উদ্বুদ্ধ করে অন্যকেও।

প্রাচীনকালের যুথবদ্ধ সমাজে মানুষ পরস্পরের সঙ্গে একাত্মতার মধ্য দিয়ে বাঁচত। বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে তাকে ক্রমাগত সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হত। সেই বহিঃশত্রু প্রাকৃতিক হতে পারত যেমন ঝড়, ঝঞ্ঝা, দাবানল ইত্যাদি। বন্য পশুর আক্রমণ হতে পারত। অথবা হতে পারত বাইরের স্বতন্ত্র মানবগোষ্ঠী। এ সমস্ত কিছুতে প্রতিরোধ করতে তাদের নিজের গোষ্ঠীর ভেতর সংঘবদ্ধ হতে হত। পরস্পরের সঙ্গে একাত্মতার বোধ গড়ে তুলতে হত। আত্মবিচ্ছিন্নতার কোনো স্থান ছিল না সেখানে। তাই একাকিত্বের কোনো বোধও ছিল না। প্রাগৈতিহাসিক অরণ্যবেশী আদিম জনগোষ্ঠীর জীবনে একাকিত্ব কেমন করে সমীকৃত হতে যেত সমগ্র প্রকৃতির সঙ্গে, মানুষের নিজের কর্তব্যনিষ্ঠার মধ্যে, তার দৃষ্টান্ত হিসেবে আমরা দেখে নিতে পারি ভীমবেটকার গুহাগাত্রের একটি ছবি। ছবিটির বিষয় গোচারণকারী ব্যক্তি পাহাড়ের ঢালে গরু চরাচ্ছে। সহজ রেখায় আঁকা অজস্র গবাদি পশু ছড়িয়ে আছে প্রান্তরে। আর রাখাল বালকটি দাঁড়িয়ে আছে এক প্রান্তে। কেবলমাত্র রেখায় আঁকা দীর্ঘায়াত পীর্ণ দণ্ডায়মান একটি অবয়ব। পা-দুটি ত্রিকোণাকারে সংস্থাপিত ভূমির ওপর। কোমরে এসে মিলেছে। সেখান থেকে আবার দুটি রেখায় বিভাজিত হয়ে শরীরটি উপরের দিকে উঠে গিয়ে কাঁধে মিলিত হয়েছে। তার উপরে মাথা। কাঁধ থেকে দুটি হাত দুদিকে ছড়িয়েছে। ডানবাহু অর্ধবৃত্তাকারে কোমরে যুক্ত হয়েছে। আর বাঁ-হাতটি একটি লাঠি বা দণ্ড ধারণ করে মাথার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এই শীর্ণ জায়ার মধ্যে ব্যক্তির একাকিত্বের আভাস আছে। সে দাঁড়িয়েও আছে একা। পরিপার্শ্বে অন্য কোনো মানুষ নেই। তথাপি সে তার একাকিত্বকে নিরাকৃত করেছে সম্মুখবর্তী চারণরত গবাদিপশুর সঙ্গে একাত্মতায়।

আদিম মানুষের অস্তিত্বের একাকিত্ব যে আত্মবিচ্ছিন্নতা নয় এই ছবিটি তারই এক নিদর্শন। গোচারণরত শীর্ণকায় এই মানুষটির ছবিই যে আমরা বেছে নিলাম একাকিত্বের স্বরূপ বোঝাতে, তার অন্য একটি কারণ আছে। এই অবয়বের অস্বাভাবিক বা অ-প্রাকৃতিক শীর্ণতার মধ্য দিয়ে অস্তিত্বের নিভৃত করুণাকে রূপায়িত করা, এটা ভারতবর্ষের আদিম মানুষ প্রাক-ইতিহাসের কোন আদিপর্বে করেছে। আধুনিক বা আধুনিকতাবাদী ইউরোপ এই মডেলটিকে অনুসরণ করে মানুষের আত্মবিচ্ছিন্নতাজনিত একাকিত্বকে রূপ দিয়েছে বিংশ শতকে এসে। আলবের্তো জাকোমেতি-র (১৯০১-১৯৬৬) জীর্নকায় মনুষ্য অবয়বের (১৯২৮-২৯) ভাস্কর্যগুলি এর অনবদ্য দৃষ্টান্ত। পিকাসো-র ‘স্টিক-স্ট্যাচু’র কথাও স্মরণে আনা যায় (১৯৩১)। আধুনিকতাবাদী এসব রচনায় জীর্ণতার মধ্য দিয়ে অভিব্যক্তি হয়েছে শূন্যতা, যে শূন্যতা আধুনিক মানুষকে ঘিরে থাকে প্রতিনিয়ত, যা তার একাকিত্বের উৎস। এরকমই এক শীর্ণ অবয়ব নিয়ে ভাস্কর্য করেছিলেন শান্তিনিকেতনে রামকিভ্বর। ১৯৩৫ সালে সঙ্গীতভবনের সম্মুখবর্তী ইউক্যালিপটাস ঘেরা প্রান্তরে বৃক্ষের মাঝখানে তিনি তিনি সিমেন্ট-কংক্রিটে গড়েছিলেন ‘সুজাতা’ নামে শীর্ণকায়া মানবী অবয়বের এক ভাস্কর্য। একটি বিষয় লক্ষণীয় এখানে ‘সুজাতা’ কিন্তু জাকোমেত্তি বা পিকাসোর শীর্ণকায় রচনার মতো শূন্যতাসম্পৃক্ত নয়। অর্থাৎ এই মানবী পূর্বোক্ত ইউরোপীয় দুটি ভাস্কর্যের মতো একাকিত্ব বা নিরাশায় দীর্ণ নয়। ভীমবেটকার সম্পৃক্ততার উত্তরাধিকার আত্মস্থ করতে পেরেছেন রামকিভ্বর। অন্য দিকে পাশ্চাত্যে এই উত্তরাধিকার হয়ে উঠল একাকিত্বজনিত শূন্যতায় দ্বন্দ্বাকীর্ণ। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য রূপবোধের এই এক বিভেদের ক্ষেত্র।

অরণ্যচারী আদিম মানুষ যখন কৃষিজীবী হল, তখন ভূমির সঙ্গে, বর্ষণের সঙ্গে, নদ-নদী বৃক্ষ পশু-পাখির সঙ্গে তাদের এক আত্মসম্পৃক্ত সম্পর্ক গড়ে উঠল। মানবীর ব্রত-আচারের মধ্যে পরিস্ফূট হল এক পূর্ণতার বোধ। ‘রনে রনে এয়ো হব, জনে জনে সুয়ো হব, আকালে লক্ষ্মী হব, সময়ে পুত্রবতী হব।’ ব্রতের এই প্রত্যাশা এর মধ্যে কোথাও আত্মবিচ্ছিন্নতা নেই, একাকিত্ব নেই। কিন্তু এরকম পরিস্থিতিতেও কোনো কোনো ব্রতের মন্ত্রে বিচ্ছিন্নতার সুর শোনা যায়। সেরকম একটি মন্ত্রে বসুন্ধরাকে বলছেন মানবী- ‘বসুমাতা দেবী গো। করি নমস্কার। পৃথিবীতে জন্ম যেন না হয় আমার।’ কেন এই বিচ্ছিন্নতা? কেন পৃথিবীকে পরিহার করতে চাইছেন মানবী, যে পৃথিবী তিনিই তার সৃজনময়তা দিয়ে নির্মাণ করেন। এ কি কোনো ব্যক্তিগত দুঃখের প্রকাশ, যে দুঃখ জীবনের জটিলতা থেকে বা পুরুষের আধিপত্য থেকে জেগে ওঠে।

অবনীন্দ্রনাথ তার ‘বাংলার ব্রত’ পুস্তিকায় একে বলতে চেয়েছেন প্রক্ষিপ্ত। লিখছেন :
‘এই যে পৃথিবীর যা-কিছু তার উপরে ঘোর বিতৃষ্ণা এবং ‘গোক’লে
গোকুলে বাস, গোরুর মুখে দিয়ে ঘাস, আমার যেন হয় স্বর্গে
বাস’ এই অস্বাভাবিক প্রার্থনা ও ব্রতের ছড়াগুলির মধ্যে ঐক্য ও
ব্যবধানের স্বরূপ বুঝিয়েছেন। বলেছেন- ‘দু’জনেই পৃথিবীর, কিন্তু বেদসূক্তগুলি ছাড়া ও স্বাধীন, বনের সবুজের উপর নীল আকাশের গান, উদার পৃথিবীর গান; আর ব্রতের ছড়াগুলি যেন নীড়ের ধারে বসে ঘন-সবুজের আড়ালে পক্ষিমাতার মধুর কাকলি- কিন্তু দুই গানই পৃথিবীর সুরে বাঁধা।’ তথাপি এই পার্থিবতার মধ্যে কেন বিচ্ছিন্নতার সুর বেজে ওঠে, … তা স্পষ্ট করে বলেননি। প্রক্ষিপ্ত হলেও এই বিচ্ছিন্নতা জীবনের ভেতরেই কোথাও মিশে থাকে বা ছিল কৃষিজীবী সভ্যতার উষালগ্ন থেকে- এ কথা আমাদের মেনে নিতে হয়।

বিচ্ছিন্নতা সঞ্জাত যে একাকিত্ব, তার একটা লক্ষণ গভীর বিষাদ। পক্ষান্তরে এই বিষাদই হয়ে ওঠে একাকিত্বের স্মারক। তখন বহু মানুষের মধ্যেও ব্যক্তি হয়ে যায় একান্তই একা। তার কোনো উদ্যোগ থাকে না, উৎসাহ থাকে না, সে হয়ে ওঠে হতাশায় ভরপুর। এরকম পরিস্থিতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক দৃষ্টান্ত মহাভারতে যুদ্ধের পূর্বে অর্জুনের বিষাদ। অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বলেন : ‘হে মধুসুদন! এই সমস্ত আত্মীয়গণ যুদ্ধার্থী হইয়া আগমন করিয়াছেন দেখিয়া আমার শরীর অবসন্ন, কম্পিত ও রোমান্টিক হইতেছে; … আমার আর অবস্থান করিবার সামর্থ্য নাই; দিত্ত যেন উদভ্রান্ত হইতেছে; আমি কেবল দুর্নিমিত্তই নিরীক্ষণ করিতেছি। এই সমস্ত আত্মীয়গণকে নিহত করা শ্রেয় স্কর বোধ হইতেছে না। হে কৃষ্ণ। আমি আর জয়, রাজা ও সুখের আকাঙ্ক্ষা করি না।’ (কালীপ্রসন্ন সিংহ ৩/পৃ: ২০২)
এরকম বিষাদ জ্ঞাপণ করে অর্জুন অস্ত্র ত্যাগ করে নিরামক্ত হয়ে বসে রইলেন। এই পরিস্থিতিতে অর্জুনের যে বিষাদ তা তার নিজস্ব নৈতিকতা থেকে উদ্ভূত। তথাপি এই একাকিত্ব সাময়িকভাবে অর্জুনকে বিকল করে দিয়েছিল। এরকম দৃষ্টান্ত প্রাচীন মহাকাব্যে অনেক পাওয়া যায়।

এই যে বিষাদমগ্নতা, সমস্ত ঐশ্বর্যের মধ্যেও এই যে আনন্দবিমুখ অন্তর্লীন তন্ময়তা এর দৃষ্টান্ত বিশ্বশিল্পে বিরল নয়। মিসরের শিল্পকলা বা ইউরোপের মধ্যযুগে বাইজান্তাইন, রোমানেক্স, গথিক হতে পারে এর দৃষ্টান্ত। প্রাগৈতিহাসিক শিল্পে বা আদিম শিল্পে জঙ্গমতা বা গতিময়তা এবং অন্তর্নিহিত শক্তির সংক্ষুব্ধ ও অভিব্যক্তিময় বিচ্ছুরণ ছিল প্রধান একটি মাত্রা। মিসরের শিল্পপ্রকাশ এর একেবারে বিপরীত। স্থিতি, স্তব্ধতা ও নৈঃপণ্যই এর প্রধান লক্ষণ। সব সময়ই যেন তা মৃত্যুচেতনাকে জড়িয়ে থাকে। এই স্তব্ধতার মধ্যেই অন্তর্মুখী এক আধ্যাত্মচেতনা উন্নলিত হয়। প্রায় তিন সহস্রাব্দ জুড়ে বিস্তৃত হয়েছে প্রাচীন মিসরের শিল্পকলা। তিন হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে প্রায় তিন শত খ্রিস্টপূর্বাব্দ বা আরও কিছুটা পরবর্তী সময় পর্যন্ত এর বিস্তার। এতদিন ধরে একটি জাতি চৈতণ্যের গভীরে স্তব্ধতার ধ্যান করেছে। ঐশ্বর্য ও বিলাসের মধ্যেও তন্ময় একাকিত্বকে সঞ্জীবিত রেখেছে। ৩৩০ খ্রিস্টাব্দ থেকে পঞ্চদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত চর্চিত বাইজান্তাইন শিল্প মূলত আধ্যাত্মচেতনা অনুপ্রাণিত শিল্প এবং অন্তর্মুখী। খ্রিস্টীয় আখ্যান ও পুরোকল্প সেখানে ছবির বিষয় হিসেবে এসেছে। এর অন্তনালে থেকে গেছে মগ্ন স্তব্ধতা, যা একাকিত্বের স্মারক।


ধ্রুপদি যুগের শিল্পে থাকে সামগ্রিক এক সামাজিক ঐক্যের বোধ। সৌন্দর্যের উদাত্ততা থাকে। থাকে লৌকিকের সঙ্গে অলৌকিকের মেলবন্ধন। যার ভেতর দিয়ে তন্ময়তা ও প্রেমের প্রকাশ ঘটে। আপাত-একলা মানুষও সেখানে একলা নয়। একাকিত্বের ভেতরই সে সমগ্রকে ধারণ করে। সভ্যতা ভেদে দেশ ভেদে এই ধ্রুপদি রূপের প্রকাশও বিভিন্ন হয়। এর দৃষ্টান্ত হিসেবে আমরা একই কালপর্বে করা গ্রিস ও ভারতের দুটি মানবী-মূর্তির উল্লেখ করব। দুটিই ১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নির্মিত। গ্রিসের হেলেনিস্টিক যুগের ‘ভেনাস ডি-মিলো’ এক যৌবনময়ী মানবী মূর্তি। স্বাভাবিকতা সেখানে আদর্শায়িত হয়েছে পার্থিবতারই পরমতম অভিব্যক্তিতে। আর ভারতের মৌর্য যুগের বেলেপাথরের রচনা ‘দিদারগক্রের যক্ষ্মী’র যে পূর্ণতাদীপ্ত শরীরী রূপায়ন সেখানে মর্ত্য উদ্ভাসিত হয়েছে স্বর্গীয় আলোয়। ‘প্যাশান’ বা শরীরী কামনার প্রকাশ আছে দুটি ভাস্কর্যেই। কিন্তু গ্রিক ভেনাস যেখানে শুধুই আদর্শায়িত পার্থিব মানবী দিদারগঞ্জের যক্ষ্মী সেখানে। কামনাময়ী হয়েও একই সঙ্গে প্রজনন ও মাতৃত্বের প্রতীক এবং স্বর্গের প্রতিমা। দুটি মূর্তিই একাকী দণ্ডায়মান। কিন্তু তাদের আপাত-একাকিত্বের মধ্যে দুটি সভ্যতার দুই মর্মবাশী উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে।

একাকিত্বের ধারণা কাল-ভেদে সংস্কৃতি ভেদে যেমন বিভিন্ন হয়, তেমনি একাকিত্বের যে বিপরীত মেরু অর্থাৎ জীবন-সম্পৃক্ততা সভ্যতা ভেদে এমনকি ব্যক্তি ভেদে তারও চরিত্র পাল্টায়। এটা সবচেয়ে ভাল বোঝা যায় শিল্পকলার মধ্য দিয়ে। আমরা তাই আবহমানের একাকিত্বের স্বরূপ বুঝতে শিল্পেরই সহায়তা নিচ্ছি।

ইউরোপে মধ্যযুগ পেরিয়ে যখন এল রেনেসাঁসের যুগ, এখনও উদারতার থেকে মগ্ন অন্তর্মুখীনতাই প্রাধান্য পেয়েছে অনেক সময়। তার কিছু দৃষ্টান্তের কথা আমরা উল্লেখ করেছি আগে। তবু তন্ময়তার মধ্যে কেমন করে ঝংকৃত হয় অলৌকিকের বর্ণিল ছটা, তার দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যায় বত্তিচেল্লির (১৪৪৫-১৫১০) ‘বার্থ অব ভেনাস’ ছবিটি (১৪৮২-৮৪ খ্রি.)। সাগর-তরঙ্গে তরণী সম সমুদ্র ঝিনুকের উপর একাকি দাঁড়িয়ে থাকে সদ্যোখিতা ভেনাস। তার এই একাকিত্ব কিন্তু স্বর্গীয় বিভায় পরিপূর্ণ। সপ্তদশ শতকে বারোক যুগে পৌঁছে একাকিত্বের দুই ভিন্ন রূপ পাই- একদিকে যৌথতার মধ্যে আর একদিকে ব্যক্তির নিবিড় নির্জনতার মধ্যে। পিটার পল রুবেনস (১৫৭৭-১৬৪০)-এর ১৬৩৪৭-এ আঁকা ‘হরবস অব ওয়ার’ ছবিতে হিংসার যে উন্মত্ততা, তা বুঝিয়ে দেয় পরিবৃত সন্ত্রাসই মানুষকে কিভাবে একা করে দেয়। অন্যদিকে ফরাসি শিল্পী বেড়ৎবং de la Tour (১৫৯৩-১৬৫২) ১৬৪-এ আঁকেন ‘দ্য রিপেন্টেন্ট ম্যাগডালেন’ নামে যে ছবি তাতে পাই ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতাদীর্ণ বিষাদের এক তমসালীন প্রতিরূপ। এক মানবী গালে হাত দিয়ে বসে আছে একাকী। তার দুই হাঁটুর উপর একটি মৃত মানুষের করোটি। তার ডান হাতটি স্থাপিত সেই করোটির উপর। সামনে টেবিলের উপর জ্বলছে একটি দীপবীশিখা। সেই আলোতে উদ্ভাসিত হয়েছে মানবীর মুখ ও শরীর। চিত্রপটের বাকি সমস্তাই নিবিড় অন্ধকারে আবৃত। খ্রিস্টিয় পাপবোধ মানুষের মধ্যে যে একাকিত্ব জাগিয়ে রাখে, এ ছবি তার আদর্শ দৃষ্টান্ত। এরই পাশাপাশি ফরাসি বারোক-এ আনন্দিত ধ্রুপদি উদযাপনের একটি দিকও থাকে। নিকলা জুসাঁ (১৫৯৪-১৬৬৫) ১৬৩৮-এ এঁকেছিলেন ‘আ ডান্স টু দ্য মিউজিক অব টাইম’ নামে একটি ছবি। প্রকৃতির আলোকিত উদ্ভাসের মধ্যে যেখানে উন্মলিত হয়েছে নৃত্যরত মানব-মানবীর যুথবদ্ধ আনন্দযাপনের আবহ। মানুষ তার জীবনবিচ্ছিন্ন একাকিত্ব থেকে মুক্তি পেতে পারে প্রেমপূর্ণ এই সম্মিলিত যাপনের মধ্য দিয়ে।

রোমান্টিক যুগে এসে সচেতন শিল্পী বিচ্ছিন্নতাদীর্ণ অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ব্যক্ত করে। ফ্রানসিস্কো দে গইয়া-র (১৭৪৬-১৮২৮) ১৮২০ সালের ‘স্যাটার্ন’ ছবিতে শয়তান শৈশবকে ধ্বংস করে বিভৎসভাবে। জীবনের এই যে অভিশাপ, তাই তো বিচ্ছিন্নতাদীর্ণ একাকিত্বের উৎসভূমি। এর প্রায় এগার বছর আগে ১৮০৯ সালে রোমান্টিকতার আবহমণ্ডলেই জার্মান শিল্পী Caspar David Friedrieh (১৭৭৪-১৮৪০) এঁকেছিলেন ‘মস্ক অন দ্য সি’-শোর’ নামে একটি ছবি। সমুদ্রে একটি জাহাজ ডুবে গেছে গতরাতে। এই সর্বনাশের পর আজ সকালে সমুদ্র শান্ত, নির্লিপ্ত হয়ে আছে। কেবল তীরবর্তী বালুকাবেলায় পরদিন প্রভাতে একাকী একটি কুকুর নীরব আর্তনাদ করে যাচ্ছে। সর্বগ্রাসী বিপন্ন একাকিত্বের এক প্রতীক যেন।

রোমান্টিসিজমের থেকেই পাশ্চাত্য শিল্পে মানুষের একাকিত্ব যেন, প্রগাঢ়তর হচ্ছিল। রোমান্টিকসিজমের পরে এসেছিল বাস্তববাদ বা রিয়ালিজমের একটি ধারা। স্বাভাবিকতাবাদী আঙ্গিক ও রোমান্টিক প্রতিবাদী চেতনার সমন্বয়ে গর্ভে উঠেছিল এই ধারা। এই ধারাই একজন ফরাসি চিত্রকর অনরে দোমিয়ে (১৮০৮-৭৯)। ১৮৬২ সালে তিনি একটি ছবি আঁকেন ‘দ্য থার্ড ক্লাস ক্যারেজ’ নামে। ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণীর কামরায় ভিড়ে ঠাসা হয়ে বসে আছে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণীর যাত্রীরা। ঘন সংবদ্ধ অথচ প্রত্যেকেই প্রত্যেকের থেকে বিচ্ছিন্ন করুন একাকিত্বে আবদ্ধ হয়ে আছে। ইম্প্রেশনিজমের যুগে এসে আমরা পেয়েছি কিছু আনন্দিত যৌথতার ছবি, রেনোয়া, দেগা, সিউরা এইসব শিল্পীর কাছে। পোস্ট-ইম্প্রেশনিজমে এসে ভ্যান গখ-এর (১৮৫৩-৯০) কাছে পেলাম একাকিত্বের নানা আধ্যাত্মিক বিস্তার। তার ১৮৮৫-র ‘দ্য পটেটো ইটার্স’ ছবিটি অবশ্য বিচ্ছিন্নতাদীর্ণ একাকিত্বের এক বিপরীত অভিজ্ঞান। ঘরের ভেতর রহস্যময় আলোয় নৈশভোজে ব্যাপৃত রয়েছে দরিদ্র শ্রমিকেরা শুধুমাত্র আলু ছাড়া তাদের ভোজ্য আর কিছু নেই। কিন্তু তারা পরস্পরে সম্পৃক্ত, সহানুভূতিময়। দারিদ্র্য তাদের বিচ্ছিন্ন করেনি, বরং পরস্পরের সহমর্মী করেছে। ১৮৮৮-তে ভ্যান গখ যখন আঁকেন ঘরের ভেতর একাকী একটি চেয়ারের ছবি তখন সেই নির্জনতা বা একাকিত্ব আধ্যাত্যিকতার মাত্রা পায়। একই বছর পল গগ্যাঁ-ও (১৮৪৮-১৯০৩) একেছিলেন প্রায় সমধর্মী একটি নির্জন চেয়ারের ছবি যার উপর স্থাপিত ছিল একটি প্রজ্জ্বলিত মোম। ভ্যান গখ কার নিসর্গের ছবিগুলিতে নির্জন প্রকৃতির ভেতর একাকিত্বের এক আধ্যাত্মিক রূপ উন্মীলন করেছিলেন। ১৮৮৯-এর ‘হুইটফিল্ড উইথ আ রিপার’ এই ধারার এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত।
এরকম পরিস্থিতিতে উনবিংশ শতক যখন শেষ হতে চলল, ঊপনিবেশিকতা প্রসারিত হচ্ছে, ধনতন্ত্রের বিকাশের ফলে বেড়ে যাচ্ছে শোষণ, বাড়ছে মানুষের বিপন্নতা, অস্তিত্বের সংকট, একাকিত্ব তখন হয়ে উঠল সর্বগ্রাসী। এড্ভার মুংক-এর (১৮৬৩-১৯৪৪) ১৮৯০-তে আঁকা ‘দ্য স্ক্রিম’ বা ‘চিৎকার’ ছবিটি মানুষের বিচ্ছিন্নতাদীর্ণ একাকিত্বের এক প্রকট প্রতীক। এই একাকিত্বই প্রসারিত হয়েছে সাহিত্যে।

ফ্রানৎস কাফকা-র (১৮৮৩-১৯২৪) ‘দ্য মেটামোরফোসিস’ (১৯১৭), ‘দ্য ক্যাসল’ (১৯২৬), ‘দ্য ট্রায়াল’ (১৯২৫)- এসব উপন্যাসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিস্ফোরক বিশ্বে পাশ্চাত্যের মানুষের সর্বগ্রাসী একাকিত্বের আবহ ফুটে উঠেছে। ১৯০৭ সালে পিকাসো (১৮৮১-১৯৭৩) যখন আঁকেন ‘আভিসিওর নারীরা’ তখন তা শুধু ফর্মের নতুন উদ্ভাবনই থাকে না, সেই উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠে দাঁড়িয়ে থাকা পাঁচজন মানবীর পারস্পরিক সংযোগহীন একাকিত্বের এক আলেখ্যও। একাকিত্বের এই সংঘাত ও করুণাই আরও প্রকট হয়েছে সুররিয়ালিজমের কোনো কোনো প্রবাহে এবং ‘ফিউচারিজম’-এ।

ভারতবর্ষে বা চিন, জাপানের মতো প্রাচ্য দেশে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতাদীর্ণ একাকিত্বের আবহ প্রাচীন থেকে ধ্রুপদী যুগ পর্যন্ত ছিল খুবই কম। ঈশ-উপনিষদের প্রথম শ্লোকে বলা হয়েছে ‘ঈশাবাসং ইদং সর্বং’। এই বিশ্বের সমস্তই পরমের দ্বারা পরিবৃত। ব্যক্তি কখনো নিজেকে প্রকৃতি বা মহাবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ভারত না। ভারতের ‘নটরাজ’ মূর্তিতে একক ব্যক্তি তার নৃত্যের মধ্য দিয়ে মহাবিশ্বকে উন্মীলিত করেছে। এই দর্পণ সাধারণ মানুষের মধ্যেও পরিব্যাপ্ত ছিল। ধ্রুপদি যুগ পেরিয়ে মধ্যযুগে অনুচিত্রের আলোকিত আবহে প্রকৃতির সাথে ব্যক্তি মানুষের সম্মিলনই প্রাধান্য পেয়েছে। মুঘল যুগে সম্ভবত কেবল মাত্র একটি ছবিতেই মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির করুণ একাকিত্ব ছবির বিষয় হয়ে উঠেছে। জাহাঙ্গিরের আমলে ১৬১৮ সালে শিল্পী বাল চাঁদ এঁকেছিলেন ‘ইনায়েৎ খাঁ-র মৃত্যু’ নামে একটি ছবি, যেখানে মৃত্যু শয্যায় শায়িত রয়েছে শীর্ণ এক ব্যক্তি। অবশ্য একথা ঠিক প্রাচীন থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত ভারতীয় চিত্র-ভাস্কর্যে মানুষের দুর্দশার আলেখ্য যে ছিল না, তা নয়, সিন্ধু সভ্যতা থেকে বৌদ্ধ ও হিন্দু যুগেও এর কিছু নিদর্শন ছিল। কিন্তু বিচ্ছন্নতা এত প্রকট ছিল না যেটা এসেছে ব্রিটিশ আধিপত্যের পরবর্তী আধুনিক যুগে।

ঊনবিংশ শতকে সামন্ততান্ত্রিক পরিস্থিতিতে যখন আধুনিকতার সূচনা মাত্র হচ্ছে তখন মানবীর একাকিত্বের দুই রূপের দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যায় রাসসুন্দরী দেবী-র (১৮০৯-১৮৯৯) ১৮৬৮-তে প্রকাশিত আত্মজীবনী ‘আমার জীবন’। সেখানে এক জায়গায় তিনি বলছেন; ‘ঐ বাটীতে আটজন চাকরানী ছিল। তাহারা বাহিরের লোক। সে সময়ে ঘরের কাজের লোক ছিল না। ঘরের মধ্যে আমি একা মাত্র ছিলাম। আমি পূর্বের ঐ নিয়মমত সংসারের সমুদয় কাজ করিতাম।’ তথাপি বাসসুন্দরী দেবীর এই একাকিত্বের মধ্যে কোনো বিচ্ছিন্নতা ছিল না। যে বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’ গল্পের চারুলতা।

আমাদের দেশের প্রাক-আধুনিক চিত্রকলা অর্থাৎ কালীঘাটের পটচিত্র বা প্রবঙ্গীয় ঘরানা থেকে শুরু করে ব্রিটিশ অ্যাকাডেমিক স্বাভাবিকতাবাদী ধারা থেকে অবনীন্দ্রনাথ বা পরবর্তী নব্য ভারতীয় ঘরানা পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী একাকিত্ব তত প্রকট হয়। একাকিত্বের এক আলোকিত আবহ আমরা প্রথম পাই রবীন্দ্রনাথের ছবিতে। কিন্তু সেই একাকিত্ব অবিশ্বাসীর একাকিত্ব নয়। বরং বিশ্বের সাথে একাত্ম হতে না পারার যে বেদনা, তারই প্রকাশে তন্ময়। যেমন তিনি লিখেছিলেন বহু আগে মাত্র ২০ বছর বয়সের এক গানে ‘কিছুই তো হল না’।

বিচ্ছিন্নতাবাদী একাকিত্ব আমাদের চিত্র ভাস্কর্যে প্রকট হয়ে ওঠে ১৯৪০-এর দশকের পরবর্তী বিস্তারে। জয়নুল আবেদিন ও অন্যান্য শিল্পীর দুর্ভিক্ষের ছবিগুলি এবং সোমনাথ হোরের সারা জীবনের কাজে এর প্রকাশ রয়েছে। একাকিত্বের এই ধারাই ১৯৬০-এর দশকে ইউরোপীয় অস্তিত্ববাদী দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সম্পৃক্ততা ও বিচ্ছিন্নতার এক দ্বান্দ্বিক আবহের সঞ্চার করে, যার শ্রেষ্ঠতম দৃষ্টান্ত গনেশ পাইনের ১৯৭২-এ আঁকা ‘ফিশার ম্যান’ ছবিটি। অন্ধকারে দীপালোকে একাকি ধীরব তার জলযানে বসে সাফল্যের প্রতীক্ষা করছে। আত্মদীপ তাকে জ্বালতে হবে। একাকিত্ব জীবনকে যেন ধ্বংস না করে সমস্ত কোলাহলের বাইরে তার নিজের সাধনায় নিমগ্ন রাখে, এই হতে পারে আজকের বিপন্ন সময়ে মানুষের একমাত্র উত্তরণের পথ।