একাকিত্বের সঙ্গে একান্ত বসবাস ॥ দিশা চট্টোপাধ্যায়


জলের ওপর গুমোট চাপা বাতাসের আলতো ছোয়ায় শিরশির কম্পন। তার ওপর ঝলমলে রোদ ঠিকরে পড়ছে, আর সমুদ্র যেন উজ্জ্বল অজস্র হাসি বিলিয়ে নীল আকাশকে দেখছে। ঢালু পাহাড়ী তটের বুকে ঢেউগুলো একের পর এক পাল্লা দিয়ে লুটোপুটি খাচ্ছে। প্রকৃতির কি খেলা, ঝিনুকের মধ্যে যে বন্দী সেই আবার মুক্ত। আকাশ আর সাগরের মাঝের শুভ্রলোককে কলকণ্ঠে ভরিয়ে তুলছে। চঞ্চল তরঙ্গ লাহরীর ওপর প্রতিফলিত কিরণ বিচ্ছুরণ আর তরঙ্গের কলতানে এই পরিবেশ প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। সূর্যের খুশি উজ্জ্বল রৌদ্রতাপে প্রকাশমান আর সেই খুশিমাখা কিরণের স্পর্শ পেয়ে সাগরপুলকিত।

একাকিত্বকে আমার জীবনে একান্তভাবে পেয়ে আমিও পুলকিত। যখন আমার দশ, এগারো বছর বয়স তখন থেকেই মায়ের মুখে আমি একাকিত্বের গল্প শুনেছি। তেমন কিছু বুঝতাম না। শুধু জানতাম ওর সাথে আমার বয়সের একটা ব্যবধান আছে। কারণ তখনও আমার একান্ত বন্ধু। অথর জ্ঞান হবার পর আমি যখন কলম ধরলাম, এরপর যত দিন এগুতে শুরু করল আমিও একাকিত্বের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লাম। বেশ কয়েক বছর পর একাকিত্ব বয়সের ব্যবধান সিকেয়ে তুলে, আমার বন্ধু হলো। একাকিত্ব বলতে হয়তো সকলে ভাবেন, সেতো দুঃখ কষ্টের একটা মাধ্যম। আমি জানি শুধু না, মানিও একাকিত্ব আমার একান্ত আপনজন। ও না থাকলে হয়তো, হয়তো কেন বলছি, সত্যিই তাই, হয়তো আমার কবি হওয়া হতো না, কোনোদিনই। তাই ওর কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। একাকিত্বকে প্রকৃত অর্থে আবেগে সংযমে বেঁধে উপলব্ধি ও অনুভূতির মিশ্রণে ওর প্রতি একটি দৃষ্টি গড়ে তুলতে পেরেছি। ওর অনুভূতিতে দশনও ছুঁয়ে যায়। তখন আমার মনে হয়েছে, ‘ক্যানভাসের গায়ে একান্তে এঁকে যাচ্ছি। কৃষপক্ষের জ্যামিতি’।

একাকিত্বের ঘুমন্তবীজ আমাকে কবিতার অর্ন্তজগতে নিয়ে গেছে। আমি যখন দুঃখ, কষ্টে, বেদনায় কাতর হয়ে থেকেছি, তখন একাকিত্বই আমাকে যন্ত্রণা, মর্মর অনুভবকেই শব্দবন্ধে প্রকাশ করতে সাহায্য করেছে, বার বার। অথবা বলা যেতে পারে অন্তর আত্মার ভেতরের স্পন্দনকে শব্দ স্পন্দনে ধরার প্রয়াস ঘটিয়ে চলেছে আমার মধ্যে। ‘মেঘ বৃষ্টির আঁকাবাঁকা এক নদীপথ। বোকা মেয়ে রোদ্দুরে খুঁজছে অবসর। মেয়েটির সারা গায়ে স্নান ঘরের জলকণা/তবুও নিশ্চুপ নদী পথ’ কিংবা বলতে পারি- ‌’ঘুমন্ত পথ ভিজে যায়/ ভেঙ্গে যায় আল/ ভেসে ওঠে তরী/ আকাশের চোখে রাত বাড়ে/ আঁকা বাঁকা নদী পথ’!

একাকিত্বও যেন যথার্থ কবি। আমার মতন একজন সারা জীবনের কবিতা প্রেক্ষিত লেখকের কাছে একাই প্রাপ্তি, এই অনেক আমার কাছে। এই বিশ্বায়নের যুগে একাকিত্ব আমাকে দিগন্ত থেকে দিগন্তে নিয়ে চলে। তখন এই বয়সে এসে মনে প্রশ্ন জাগে, মনে হয়, এ হৃদয়ে কোনো পুরুষ মেঘে কী সে ভাবে কোন চিহ্ন রেখে যেতে পেরেছে? এ প্রশ্ন অনন্য কারোর উদ্দেশ্যে নয়, এ প্রশ্ন নিজেকে। কিন্তু নিদ্বির্ধায় বলতে পারি, একাকিত্ব কিন্তু আমার হৃদয় জুড়ে চিহ্ন একেছে। যে কোন চিহ্ন যে কোন স্মৃতি সুখ, দুঃখের মিলিত ছবি। এমন কেউ কি আছে যার মুখ সহজেই আঁকতে পারি, হয়তো আছে আমার গোপন ঘরে। সে ঘরের চাবি আছে একাকিত্বের ঝুলিতে। এ সবে আমার মনে হলো যদি এভাবে বলি কোনো কথা- ‘একটা প্রশ্ন ছিল তোমাকে/শুধু তোমাকে। যদিও জানি না তুমি কে!/আমাকে ছুঁয়ে যায় বৃষ্টি/ আমাকে ছুঁয়ে যায় রবীন্দ্রসংগীত। আমাকে ছুঁয়ে যায় পিকাসোর ছবি। আমাকে ছুঁয়ে যায় একাকিত্ব/ সম্পূর্ণভাবে নিজের মতন করে উপলব্ধির অনুরণন দেখেছি একাকিত্বের ভেতর। যখন সংবেদনশীল মন অনুভূতির ডাকে সাড়া দেয়, তখন আমার একাকিত্বকে খুঁজে পাই। আমার স্বজনেরা আমাকে কতটুকু জানে? তার থেকে অনেক বেশি ঘুমিয়ে পড়া রাত জানে। জেগে থাকা চাঁদও তা জানে না। তখন মনে হয়,
‘আমার একটু দেরিতে ঘুম ভাঙ্গলে সূর্যের অভিমানের পারদ বেড়ে যায়।
আমি প্রতিদিন আলপিন হতে চাই
জমে ওঠে বাঁচার গল্প!
লেখর পাশের মতো ভালোবাসার ভাবনায়
আমার কপালে পড়ে বলিরেখার চলাচল।
এই বাস্তব ও পরাবাস্তবের অদ্ভুত সমাবেশে
একাকিত্বই আমাকে দিয়েছে জীবনের মানে, যা
কবিতায় ধরা দেয়। অন্ধকারকে নাড়চাড়া করতে
করতে পাঁজরের ভেতর পারদের ওঠানামায় দেখতে পারি
চারপাশে অন্ধকার ছাড়া কেউ নেই। আর তখন অশরীরী মতন একাকিত্ব-ই একমাত্র আমাকে সামলায়।

আপাতভাবে কেউ কেউ ভাবতে পারেন, একাকিত্বের প্রতি এতো টান এতো প্রেম কিসের, এর অর্থইবা কী? ইংগিত ধর্মী কল্পনা ও বাস্তবের সম্মিলনের জন্ম একাকিত্বের সঙ্গে খেলা চলে আমার। ওর পাখনায় স্বপ্ন, আশা, ভালোবাসা বেঁধে দেই, আর ও তখন আমার চারপাশ খেলা করতে থাকে। এই খেলা চলে সারাবেলা তাই অনুভূতি সকলকেই কোন না কোন সময় জাড়িয়ে ধরে। এক মুখ হাসি নিয়ে ভেসে যেতে যেতে দেখেছি অপলক ভাবে আমাকে দেখে কোঁজাগরি চাঁদ। অদ্ভুত সুন্দর রহস্যময় এই উপলব্ধি, একাকিত্বের শরীরে অনেক অনেক স্তবক লেগে আছে। একাকিত্বকে আমি অনুভব করতে পেরেছি, আর কিছু চাই না। সব কথার আক্ষরিক অর্থ যেমন কবিতায় থাকে না। আমার এই লেখায় হয়তো একাকিত্বকে নিয়ে পাগলামো দেখবেন। আমি বলব, বলতে চাই, আমার একাকিত্ব প্রকৃত কবিতা, ব্যঞ্চনাগর্ভ হয়ে উঠেছে। এই লেখাটা তারই নিদর্শন।

তুমি আসবে ভেবে
দরজা খোলা রাখি
হাতের তালুতে
অনেক আকাঙ্ক্ষা রেখেছি জমিয়ে।
সকাল গড়িয়ে দুপুর
দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যে
তোমার আগমনের শব্দ পেলে
সন্ধ্যাতারা ফুটে ওঠবে জুঁই ফুল হয়ে
হলুদ রঙের রেণু গায়ে মেখে, উড়ছে মৌমাছি,
যতবার তোমাকে দেখেছি
ততবার অনন্ত সময় ধরে মায়াজাল বুনেছি-
আগত যেন স্টেশন পেরিয়ে
তুমি হেঁটে আসছ জীবনের দিকে।