একাকিত্ব বন্ধু আমার ॥ প্রবীর মণ্ডল


আমাকে ঘিরে অসংখ্য মানুষ-মানুষের ভীড়-আামি তবু তাদের কেউ নই। ভীড়ের মাঝেও একা একজন না মানুষ আমি। একাকিত্ব আমার অহংকার।

আবার একাকিত্ব বাঘের থাবার থেকেও ভয়ানক-মানুষের চরম দুঃখ। আমি আমার অনেক কবিতার মধ্যে, আমার একাকিত্বের গল্প বলেছি। বলেছি, আমার একাকিত্ব খুঁটে খায় চারটি শালিক। বলেছি, তুমিও শোনো-শুনো রাখো মোহিনী, একাকিত্ব আমাদের বড় শত্রু।
সে আমার পেছন পেছন হাঁটে। ডায়নোসরেরর মতো ছুটে আসে। আমার গলা লক্ষ্য করে ছুটে আসে লম্বা দুটো হাত। দড়ি ছুটে আসে। ছুরি ছুটে আসে। বুলেট ট্রেন ছুটে আসে। আমি পালানোর পথ খুঁজে পাই না। সত্যজিৎ রায়ের প্রথম যৌবনের একাকিত্বের দিকে আমি হেঁটে যাই। ঋতুপর্ণ ঘোষের একাকিত্বের মধ্যে হারিয়ে যাই। কবি বিনয় মজুমদার তার একাকিত্বের ভয়ঙ্কর আগ্নেয় গহ্বরে আমাকে সাদরে আহ্বান করেন। দেখি, বিনোদিনী কুঠি-কুঠির মধ্যে একটা একা মানুষ। অন্ধ ঘরে মানুষটি একাকী পায়চারী করছেন। নিজের সঙ্গে নিজেই কথা বলছেন। চাকা ফিরে আসছে না কিছুতেই। ঘরের মধ্যে দেখতে পাই স্পট লাইটের মতো ছোট্ট একটা আলো-আভা। দেখি বিনয়ের মুখে বিড়ির আগুন জ্বলছে। একটা মানুষ পুড়ে যাচ্ছে দেখতে পাই, দেখতে পাই একাকিত্ব পুড়ে যাচ্ছে…

আমার মন-খারাপের মধ্যে একাকিত্বে বৃষ্টি নামে। আমার একাকিত্ব বাঘের তাড়া খাওয়া ভীত-সন্ত্রস্ত হরিণের মতো, আমারই হৃদি মাঠে ঘুরে মরে। আমি ভয়ে ভয়ে কবিতার কাছে সাহায্যের পাত পাতি। কবিতা গান হয়ে আমার হৃদয়ে বাজে। আর তারই মাঝে উঁকি মারে মোহিনী।

মাঝে মাঝে মনে হয়, একাকিত্ব আমার শত্রু নয়, আমি তাকে পছন্দ করি। সে আমার হাতে কলম তুলে দেয়। যেন একাকিত্ব আমার দেবী সবস্বতী। আমি লিখি-একাকিত্ব লিখি।
শিল্প একাকিত্ব ছাড়া হয় না।
আমার একাকিত্বে একাকিত্বকে পেয়ে জাপ্টে ধরি। তারপর কবিতার মুখে চুমকুড়ি এঁকে দেই। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি নামে আমার মাথা জুড়ে। আমার সমগ্র শরীর হিম-শীতল হয়ে যায়।

কিছুদিন আগে ‘মন কী রাত’-এ প্রধানমন্ত্রী একাকী মানুষটির হৃদয়ের পাশে দাঁড়াতে বলেছেন। বলেছেন, ভালোবাসা দিতে।
বলুন তো, আমাদের একাকিত্বকে মানব-মানবী আদর করবে সে সময় কোথায়। আমরা সবাই সলিটারি। সোলজার-সলিটারি। বরং সবাই আসুন, শিল্পের আধারে, একাকিত্বের দু’চোয়ালে কাম্মি দিয়ে আদর করি। বলি, তুমিও বন্ধু আমার, আমার প্রতিবেশী।

পুনশ্চ: একবার কবি জয় গোস্বামী দাদাকে বললেন, সুবীর, আজ একটা মজার কাণ্ড ঘটেছে। দাদা জানতে চাইলেন, কী?
জয় গোস্বামী: আজ একটি বাচ্চা ফোন করেছিল আমাকে-কী বললো জানো?
দাদা: কী?
জয় গোস্বামী: বললে, তোমার নাম কী কাকু?
আমি না খুব ছোট্ট। বাবা-মা অফিসে গেছে। একা লাগছিল-আমার খুব একা লাগছিল-তোমাকে ফোন করলাম। আমাকে একটা গল্প বলবে-একটা ভূতের গল্প…

এই যে গল্পটি বলবার অর্থ-আসলে একাকিত্বের ভূত আমাদের সকলের ঘাড়ে চেপে বসে আছে। আমাদের কাজ, ওই ভূতটির কাঁধে চেপে বসে, তাকে বলা হেই-হেট…