একাকিত্ব হোক সৃষ্টির উৎস ॥ গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়


এই সৃষ্টি এমন আশ্চর্য ছন্দে বাঁধা যে অবাক হতে হয়। মহাবিশ্বের প্রতি বিন্দুতে প্রতি মুহূর্তে দুই বিপরীতধর্মী শক্তির টানাটানি, বিপরীত ধর্মী চেতনার দ্বন্দ্ব। দুই বিপরীত সত্তার টানাপোড়েন। আসলে সৃষ্টির সত্যতা তুলনামূলক, একের সাপেক্ষে অন্য, যার বিস্তৃত ব্যাখ্যা Theory of Relativity তে পাওয়া যায়। সাদা আছে বলেই কালোর উপলব্ধি, আলো না থাকলেই বিপরীতে অন্ধকার, অন্ধকারই তো আলোর স্বীকৃতি, আলোকে সে জয়মালা পড়িয়ে দেয়। দুঃখের অনুভূতিই সুখের উপলব্ধিকে চিনিয়ে দেয়। সুখ না থাকাকে বুঝতে সাহায্য করে।

একাকিত্ব বোধ আসে সাহচর্যের অভাবে। যেখানে আলো, ঠিক তার পাশেই কিংবা উল্টোদিকেই অন্ধকার। যেখানে একাকিত্ব, সেখানেই সাহচর্যের আকুলতা জেগে আছে হাত ধরে।

আমি মানব একাকী ভ্রমি বিষ্ময়ে-এই একাকিত্ব বিষ্ময়কে জাগ্রত করে। জাগিয়ে রাখে কৌতূহল। একটা একাকিত্ব বিষ্ময়কে জাগ্রত করে। জাগিয়ে রাখে কৌতূহল। একটা একাকিত্বও মাথা তোলে, কসমিক বিচ্ছিন্নতা বোধে। কোথায় শুরু, কোথায় শেষ-এই একাকিত্ব বোধে মানব জাতির একক পরিচয়ের সমগ্রতার নিচে এসে দাঁড়ায় সমস্ত মানুষ-সে আর এক সাহচর্য বোধ।

তবু দুঃখ আর একাকিত্বের বোধ থেকে তাকে অতিক্রম করে যাবার আর্তিই নিয়ে আসে যত সৃষ্টির তাগিদ, শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞানের আকাঙ্ক্ষা। এখানেই একাকিত্বের মাহাত্ম। একাকিত্ব আমাদের গভীর অন্তরকে অস্থির করে তোলে, একে অতিক্রম করে যাবার তাগিদে। আর সেই অতিক্রম যে পথে ঘটে, সে পথই তো সৃষ্টির। শেষের কবিতা-র অন্তিমে চিরবিদায়ের মুহূর্তে এসে অমিত তীব্র যন্ত্রণায় লাবন্যকে শোনানোর জন্য পেয়ে যায় চিরকালীন দুঃখের লাইনগুলো, যা হয়ে ওঠে আমাদের একাকিত্বের সম্পদ।
‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।
তারি রথ নিত্যই উধাও
জাগইছে অন্তরীক্ষে বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন।

তবু সে তো স্বপ্ন নয়,
সবচেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়
সে আমার প্রেম।’
শুধু শিল্প সাহিত্য বোধই নয়, এক তীব্র অনুসন্ধিৎসা থেকে বিজ্ঞানের সাধনা, আবিস্কার, জীবন যাপনের দার্শনিক উন্মেষ। জীবনের অর্থহীনতার উপলব্ধিজাত এক গভীর দুঃখবোধ থেকে বুদ্ধের নির্বাণের দর্শনে উত্তরণ। আমাদের রোজকার জীবনে একাকিত্ব নানাভাবে কড়া নেড়ে যায়। আমরা ভেঙ্গে পড়ি। ভেতরের হাহাকার বাইরের বাস্তব সত্যিটাকে বুঝতে সাহায্য করে। কল্পনায় মিথ্যে মিনারটাকে ভেঙে দেয়। ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম’-এই সত্যে এসে দাঁড়াতে সাহায্য করে।

একাকিত্বের সাথে লড়াই আমাদের প্রতিনিয়তই চলেছে। কিন্তু যে একাকিত্ব আমাদের সামনে কোনো নতুন পথের দিশা খুলে দেয়না, সৃষ্টিশীল করে তোলে না, কোনো ভাবে কোনোদিকেই অনুপ্রাণিত করে না, সে একাকিত্ব কিন্তু ‘জলের মতো ঘুরে ঘুরে’ ক্রমাগত টেনে নিয়ে যেতে থাকে আলো কমে আসা এক অন্ধকারের জগতে, বিষণ্নতা থেকে অবসাদের বৃত্তে। সে অবসাদ পৃথিবীকে চেনাতে শুরু করে অন্য এক ধূসর রঙ দিয়ে। যে রঙে জীবনকে অর্থহীন বলে মনে হতে শুরু করে। ঘটে যেতে পারে আত্মহনন পর্যন্ত।
রাশিয়ান কবি মায়াকোভস্কি, এসেনিনের যেমন ঘটেছিল।

একাকিত্ব আমাদের জীবনে দিনের আলোর পাশাপাশি অন্ধকারের মতনই যাতায়াত করে। আমাদের চাওয়া যখন ছোট্ট সীমানায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে, সে চাওয়ায় না পাওয়ায় আমরা তখন দ্রুত একাকি হয়ে পড়ি। চাওয়া যখন সীমানা ভেঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে, নেবার জিনিস হয়ে ওঠে অগণিত। সামান্য কিছু হারানোতেই আমরা আর সব হারিয়ে ফেলিনা। ঠিক যেমন-‘অল্প লইয়া থাকি, তাই মোর যাহা যায় তাহা যায়’। এ যুগের নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা তীব্র কিন্তু অগভীর, সীমায়িত। বিচিত্র সম্পর্কের বিকাশ অবরুদ্ধ হয়ে আবেগের সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র মা-বাবার কাছে সন্তানের ভূমিকাতেই লালিত পালিত হবার ফলে চাওয়ার ক্ষমতার বিস্ফোরণ ঘটে, দেবার ক্ষমতা গড়ে ওঠে না। আত্মকেন্দ্রিকতার সেই ছোট্ট সীমানায় দ্রুত মাথা তোলে একাকীত্ব হতাশা, আক্রোশ, আগ্রাসন, আত্মহনন, প্রতিহিংসা। কৈশোরের বিপুল ভাবে বেড়ে যাওয়া আত্মহত্যার ঘটনা তার প্রমাণ।

ধনতান্ত্রিক সভ্যতার ক্রমাগত বিকশিত অটোমেশনের উপস্থিতি মানুষকে শ্রম থেকে সমাজ থেকে দ্রুত বিচ্ছিন্ন করে চলেছে। পশ্চিমের দেশে দ্রুত বেড়ে চলা বিচ্ছিন্নতা থেকে একাকিত্ব আর তারই ফলে আত্মহননের ঘটনা আমাদের আতঙ্কিত করে। একাকিত্বকে সহজে গ্রহণ করে তাকে অতিক্রম করে যাবার শক্তি ঐ সমাজ দিতে পারে না।