একুশের প্রথম প্রহরে কবিতার মাধ্যমে প্রতিবাদ ॥ আয়েশা সিদ্দিকা রাত্রী




সমাজবদ্ধ ভাবে জীবন যাপনের প্রয়োজনের মানুষকে কথা বলতে হয়। কথার মাধ্যমেই মানুষ মনের ভাব প্রকাশ করে। স্বাভাবিকভাবেই তাই কথার অর্থাৎ ভাষার গুরুত্ব অনেক বেশি। আমরা বাঙালি, কথা বলি বাংলা ভাষায়। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্ত হবার পর আমাদের ওপর চেপে বসে পাকিস্তানি শাসন ও শোষণ। পাকিস্তানিরা আমাদের ভাষার ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। আমাদের ওপর জোর করে অন্য একটি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এর প্রতিবাদে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার করার দাবিতে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি। এদিন পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহিদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা অসংখ্য মানুষ। ভাষার জন্য বাঙালির এই আত্মত্যাগ বাংলার শোষিত নির্যাতিত জনগনের মধ্যে দৃঢ় ও লড়াকু মনোভাবের জন্ম দেয়। এই নির্মম ঘটনার পরপরই প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে বাংলার মানুষ। ছাত্র-জনতার এই আন্দোলন দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় চট্টগ্রাম জেলা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক মাহবুব উল আলম চৌধুরী চট্টগ্রামে বসে একুশের প্রথম প্রতিবাদ পংক্তিমালা রচনা করেন। নিরস্ত্র ছাত্রজনতার উপর গুলি বর্ষণের খবর পেয়ে সে দিনই তিনি রচনা করেন ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’-শিরোনামে ১০৩ পংক্তির দীর্ঘ কবিতা। সেদিন পাকিস্তানিদের নির্বিচারে গুলি ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এই কবিতাটিই প্রথম সাহিত্য কর্ম হবার গৌরব অর্জন করে। আর কবি ও কবিতাটি হয়ে ওঠে ইতিহাসের অংশ। কবিতাটি ঐ রাতেই আন্দরকিল্লার কোহিনূর ইলেকট্রিক (আর্ট) প্রেসে বই আকারে ছাপা ও প্রকাশিত হয়। প্রকাশক হিসেবে কামাল উদ্দীন খানের ও মুদ্রাকর হিসেবে দবিরউদ্দিনের নাম যুক্ত ছিল।

রাতে কম্পোজ ও প্রুপ দেখার শেষ মুহূর্তে প্রেসে পুলিশ তল্লাশি চালায়। প্রেসের কর্মচারীরা পাণ্ডুলিপি লুকিয়ে ফেলে। পুলিশ কোথাও কিছু খুঁজে না পেয়ে চলে যায়। তখন আবার শুরু হয় ছাপার কাজ। পর দিন ২২ ফেব্রুয়ারি দুপুরের মধ্যে ১৫ হাজার কপি বই প্রকাশিত হয়ে হাতে হাতে চলে আসে। ২৩ ফেব্রুয়ারি লালদিঘির ময়দানের জনসভায় চৌধুরী হারুন-উর-রশিদ কবিতাটি পাঠ করেন।
প্রগতিশীল রাজনীতি ও সাহিত্য চর্চার সঙ্গে কিশোরবেলা থেকেই জড়িত ছিলেন মাহবুব উল আলম চৌধুরী। ‘সীমান্ত’ পত্রিকার সম্পাদনা, ‘প্রান্তিক নবনাট্য সংঘ’ প্রতিষ্ঠা তাঁর মুক্তবুদ্ধি ও সাম্যবাদী ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গেও তিনি অতোপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তাই নিরীহ ছাত্রজনতার ওপর গুলির খবরে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন। একদিকে আন্দোলনরত ভাইদের জন্য ভালোবাসা অন্যদিকে মায়ের ভাষার প্রতি মমত্ববোধ তাকে ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ লিখতে অনুপ্রাণিত করে। কবি নিজেই তাঁর নিজের ‘স্মৃতির সন্ধানে’ গ্রন্থে বলেছেন- ‘সাংবাদিকরা আমার এই কবিতা নিয়ে আমার অনুভূতির কথা জানতে চাইলে আমি বলি, এই কবিতা মুহূর্তের সৃষ্টি নয়, এই কবিতা লিখতে আমার দশ বছর সময় লেগেছে। ৪২ সালের ভারত-ছাড়ো আন্দোলন থেকে শুরু করে ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্যে ব্যাপ্তি’। প্রকাশের পর পরই কবিতাটি সরকারি আদেশে বাজেয়াপ্ত হয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কবিতাটি পুনরায় আলোচনায় আসে। লেখক নিজের কিছু সাক্ষাৎকারেও ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ কবিতাটি কারো কাছে থাকলে তাঁকে জানাতে অনুরোধ করেন। পরবর্তী সময়ে প্রাবন্ধিক মফিদুল হক কবিতাটি উদ্ধার করে লেখককে দেন। হারিয়ে যাওয়া কবিতাটি উদ্ধারের ঘটনায় জানা যায়- ভাষা আন্দোলনের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লা মুসলিম হল তল্লাশি করতে গিয়ে অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তা মীর আশরাফুল হক কবিতাটি পান। তিনি সেটি তার স্ত্রীকে দেন। স্ত্রী জোবেদা হক কবিতাটি নিজেদের কাছে রাখা নিরাপদ মনে না করলে তিনি তা তার ননদ মঞ্জুরা বেগমকে দেন। মঞ্জুরা নিজের খাতায় কবিতাটি লিখে রেখে মূল কবিতাটি নষ্ট করে ফেলেন। প্রাবন্ধিক মফিদুল হকের ফুফু মীর মঞ্জুরা বেগম। আর এভাবেই একুশের প্রথম প্রতিবাদি কবিতাটি হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পায়।

এই কবিতার প্রতিটি ছত্রে ছড়িয়ে রয়েছে ভাষা আন্দোলনের তীব্র আবেগ ও ক্রোধ। কবিতার পরতে পরতে বাংলার ঐতিহ্য মিশে আছে। আছে আলাওলের কথা, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল, রমেশ শীল, জসিম উদদীনের কথা। কবি ভেবেছেন যারা প্রাণ দিয়েছে তাদের মধ্যে তো কেউ লিংকন, রকফেলার, আরাগঁ, আইনস্টাইনও হতে পারতো। কারণ হীরের মতো জ্বলজ্বলে ছেলেগুলো ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী মুখ। এদের যারা হত্যা করেছে কবি তাদের কাছে কোনো ভাবেই কোনো আবেদন বা নিবেদন তিনি রাখতে চান না। তিনি ‘যারা এসেছিল নির্দয়ভাবে হত্যা করার আদেশ নিয়ে’ তাদের সেই ‘খুনী জালেমদের’ ফাঁসীর দাবি জানিয়েছেন। কবি বারবার স্মরণ করেছেন যে সেই সব শহিদদের সবাই সাধারণ রক্ত মাংসের মানুষ। তাদের মা, বাবা, ভাই ও বোন আছে। তাদের কারো কারো বাবা হয়ত অন্য অনেকের বাবার মতো মাঠে ফসল ফলায়, কারো মা হয়ত ছেলের অপেক্ষায় দিন গুনছে। শহিদের কারও হয়ত স্বপ্ন ছিলো ‘আইনস্টাইনের বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে আরো গভীর ভাবে বিশ্লেষণ করার’। অথবা ‘যাদের স্বপ্ন ছিল- রবীন্দ্রনাথের ‘বাঁশিওয়ালার’ চেয়েও সুন্দর একটি কবিতা রচনা করার’। সব স্বপ্ন বুকে নিয়ে এই শহিদেরা মায়ের ভাষার দাবিতে বাংলার মাটিতে কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ির মতো ঝরে পড়েছে। তাদের কথা কেউ কোনো দিন মুছে ফেলতে পারবে না কবি এই প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেছেন কবিতাতে। শহীদদের এই আত্মত্যাগ নিপীড়নকারীদের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিকে এক্যবদ্ধ করেছে। লড়াই করে ন্যায় নীতির দিন ছিনিয়ে আনার দৃপ্ত অঙ্গিকার উচ্চারিত হয়েছে কবিতায়। কবিতার শেষে শহীদদের হত্যার প্রতিশোধ নিয়ে বাঙালি বিজয় নিয়ে ফিরবে বলে কবি আশা ব্যক্ত করেছেন।

মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ ইশতেহারের মতো বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়েছিল। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ভাষায়, ‘কবিতাটির কিছু মুদ্রিত কপি গোপনে দেশের নানা জায়গায় দেয়া হয়। মনে পড়ে, ফেব্রুয়ারির ২৬/২৭ তারিখের দিকে একটা কপি এসে পৌঁছায় আমার হাতে। সরকারের তীব্র দমননীতির মধ্যেও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের রেশ তখনো লেগে আছে। সেই অবস্থায় কবিতাটি পড়ে কী যে আপ্লুত হয়েছিলাম, তা সহজে ব্যক্ত করা যায় না। গণ-আন্দোলনের এমন কাব্যরূপ, তীব্র আবেগ ও ন্যায্য ক্রোধের এমন মর্মস্পর্শী প্রকাশ তখনো আমাদের সাহিত্যে ছিল বিরল’।

আয়েশা সিদ্দিকা রাত্রী : শিক্ষক, গণ বিশ্ববিদ্যালয়