একের ভেতরে দুই : প্রথম কাব্যগ্রন্থ ॥ মাসুদুল হক



তখন আমাদের কবি হবার বয়স। লিখছি আর কবিতার বই পড়ে চলেছি। ন‌ওরোজ সাহিত্য সংসদ সেই সময় পশ্চিমবঙ্গের কবিদের বাংলাদেশ সংস্করণ নাম দিয়ে বেশ কিছু কবিতার বই প্রকাশ করেছিল। এর মধ্যে সুনীল-শক্তির ব‌ইও ছিল। ১৯৮৭ সালে আমার হাতে আসে শক্তির ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’। ন‌ওরোজ প্রকাশিত ব‌ইটি হাতে পেয়ে চমকে গেলাম। ওর প্রচ্ছদ শ্মশানের গুড়ি কাঠ, কয়েকটা মাত্র পাতা আর চাঁদ। রঙের বাহুল্যতা নেই। ভেতরের কবিতা পড়ে মন বুদবুদিয়ে ওঠে। প্রাত্যহিক জীবন ও তার কথাগুলো কী অসাধারণ সরল কথায় গভীর হয়ে উঠেছে।
তখন সবে দু’চারটে লেখা প্রকাশ হচ্ছে। ৩০, হায়দার বক্স লেনে কবি ব’নজীর আহমেদের বাসায় আড্ডা দিতে যাই। তার সঙ্গে কয়েকটি সাহিত্য আসরে যাচ্ছি। জাহাঙ্গীরনগরে পড়ছি। হায়াৎ মামুদ, মোহাম্মদ রফিক, সেলিম আল দীন স্যারের সান্নিধ্য পাচ্ছি। ইচ্ছে জাগছে একটা কবিতার ব‌ইয়ের।

নানা বাড়ি জিন্দাবাহারে, ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি প্রেসপাড়া। লেটার প্রেস, হাইডেলবার্গ মেশিন, কালি, গালি, সিসার ফন্ট। বাইন্ডিং কারখানা। নানা বাড়ির বিশাল জায়গা, বাড়ির পেছনে গড়ে উঠেছে প্রেস আর বাইন্ডিং কারখানা। সেখানে সম্পর্ক গড়ে ওঠে মোয়াজ্জেম নানার সঙ্গে। মানিকগঞ্জের মানুষ, বাইন্ডিং কারখানার মালিক। এতো আন্তরিক এই মানুষগুলোকে আর পাওয়া যাবে না। ওনার ওখানে গেলেই ডালপুরি আর চা সবসময় বরাদ্দ। ওনার জীবনের গল্প শোনাবেন আর ব‌ই বাইন্ডিং-এর তদারকি করবেন। মাঝে মাঝে আমার কবিতাও শুনবেন। মাঝে ‘স‌ওগাদ’ আর ‘বেগম’ পত্রিকার মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিনের গল্প শোনান। ওনার ওখানে বাইন্ডিং সেকশানে তিনি কাজ করতেন। তো, তিনিই প্রথম আমাকে উস্কে দেন। তারপর ব’নজীর ভাই। এই দুজনের প্রেরণায় তৈরি করতে থাকি ‘টেনে যাচ্ছি কালের গুণ’। এর মধ্য বন্ধু আমিনুল ইসলাম, নাঈম আব্দুল্লাহ আর আমি মিলে গঠন করি কুমুদ সাহিত্য সংসদ। এখানে আরো আছে সালাউদ্দিন মেনু, আফসানা, শাহীন, নুরুল্লাহ মাসুম। অনেকের নাম ভুলে গেছি। আমরা সবাই মিলে ইসলামপুরের হোটেল ডিলাক্সে একটা সাহিত্যের আসরের আয়োজন করেছিলাম। প্রধান অতিথি কবি আল মুজাহিদী। এই সব কিছু মিলে একটা কবিতার বই বেরিয়ে আসতে চাইছে। মনে মনে বাসনা, বাইরে পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। সালাউদ্দিন মেনু প্রস্তাব দিলো একটা যৌথ কাব্যগ্রন্থের। সেই সময় সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল আর নাসিমা সুলতানা বের করেছেন ‘তবু কেউ কারো ন‌ই’। সম্ভবত ফরিদ কবির কি মারুফ রায়হানেরাও এই কন্সেপ্টে ব‌ই করছেন। প্রস্তাব মন্দ নয়। যৌথ কাব্যগ্রন্থের কাজ‌ও শুরু হয়ে যায়। যৌথ এ গ্রন্থের নাম ঠিক করা হয় ‘অলৌকিক স্পর্শ’। তবে নিজ নিজ অংশের আবার ভিন্ন নাম। আমার অংশের নাম আমি ঠিক করি ‘বৃক্ষ ও ধ্রুপদী প্রেম’।

উল্লেখ্য ‘টেনে যাচ্ছি কালের গুণ’ ব‌ইটির পাণ্ডুলিপি তৈরি করে ব’নজীর ভাইকে দিলাম। তিনি ওটা আগামী প্রকাশনীর ওসমান গনি সাহেবের কাছে দেন।
অন্যদিকে কুমুদ সাহিত্য সংসদ থেকে আমার বন্ধুরা উদ্যোগ নেয় ‘অলৌকিক স্পর্শ’ গ্রন্থটি বের করার। সময়টা ১৯৮৮ সাল। টার্গেট ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব‌ই প্রকাশ। অমর একুশের ব‌ই মেলায় ব‌ই বের হবে, এ এক অন্যরকম অনুভূতি।
‘অলৌকিক স্পর্শ’-র প্রুফ দেখছি। প্রেসে গিয়ে কম্পিজিটারের পাশে বসে গালি থেকে ফন্ট বের করে বানান ঠিক করছি। কালি হাতে মেখে যাচ্ছে। নিউজপ্রিন্টে প্রুফ নিচ্ছি। রাতে প্রুফ দেখে সকালে প্রেসে গিয়ে কম্পোজিটারের জন্য অপেক্ষা করছি। তিনি এলে আগে চা খেয়ে তারপর কম্পোজখানায় ঢুকি। ফাইনাল প্রুফ ঠিক করার পর আমি আর সালাউদ্দিন আবার চেক করে প্রিন্ট অর্ডার দেই। তিনশ ব‌ই। টাকার জোগান দেয় আমিন আর নাঈম। কুমুদ সাহিত্য সংসদ থেকে ব‌ইটি বের হয়। ব‌ই বাইন্ডিং করে দেন মোয়াজ্জেম নানা। যা বিল হয়, অর্ধেক নিয়েছিলেন। অবশ্য নানার সঙ্গে ব‌ইয়ের পুস্তানির কাজ আমি নিজে করি। সেই থেকে ব‌ই বাইন্ডিং এর কাজ শিখে গেছি।

যথারীতি ব‌ই বের হয় ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বর। আত্মীয়-স্বজনের কাছে ব‌ই বিক্রি চলছে, কিন্তু সংকোচ, দ্বিধা কাজ করছে। কবি হচ্ছি অথচ ব‌ই ফেরী করতে হচ্ছে। গোটা বিশেক ব‌ই বিক্রির পর ফেরী করা বন্ধ হয়ে যায়। সালাউদ্দিন‌ও কিছু বিক্রি করে। শামসুর রাহমানের কবিতার ব‌ই খুঁজে খুঁজে পাঠক নিয়ে যায়, আর আমাদের আত্মীয়-স্বজনও নীরব। ব‌ই গছিয়ে দিতে হচ্ছে। লজ্জা আর লজ্জা। ব‌ইটা তখনই আমার ক্যাম্পাসে নিয়ে যাই না। ইচ্ছে ফেব্রুয়ারি ব‌ই মেলায় নিয়ে তারপর ক্যাম্পাসে নেব। পরে স্যারদের দেব। আমাদের হাতে ব‌ই থাকলো আড়াই শ। আগে ভেবেছিলাম আত্মীয়দের কাছেই বিক্রি করে ফেলতে পারবো দু’শ ব‌ই। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

ব‌ই মেলা এলো, এক অন্যরকম ভালো লাগা। এবার ব‌ই মেলায় আমার বই আছে। হুমায়ূন আহমেদ কি হুমায়ুন আজাদের মতো স্টলে বসে অটোগ্রাফ দেবার দিন আসছে! কিন্তু কোথায় অটোগ্রাফ আর কোথায় স্টল। শেষে মনে পড়ে আশি সালে কবি মোহাম্মদ রফিক বাংলা একাডেমীর ব‌ই মেলা প্রাঙ্গণে একা দাঁড়িয়ে ‘খোলা কবিতা’ গ্রন্থটি বিক্রি করতেন। চিন্তায় নতুন অভিঘাত পরে, ভাবনাগুলোর সঙ্গে লিটল ম্যাগাজিনের দর্শনগত মিল পাই। ব‌ই নিয়ে বাংলা একাডেমীর মাঠে দাঁড়িয়ে যাই। পরিচয় ঘটে লিটল ম্যাগ‌ওয়ালাদের সঙ্গে। ততদিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথাবিরোধীদের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ‘কারুজ’-এ লিখতে শুরু করি। একটু বদলে গেলাম সে বছর ব‌ই মেলা থেকে।

এরমধ্যেই আগামী প্রকাশনী থেকে বের হয় ‘টেনে যাচ্ছি কালের গুণ’-আমার একক কবিতার বই, ঐ বছর মেলার শেষ দিনে বের হয়। প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বই। ব’নজীর বাইয়ের প্রত্যক্ষ্ সহযোগিতায় ব‌ইটি বের হলো। কিন্তু আমি তো একটু বদলে গেছি। আমি যে তখন অনেকটাই প্রতিষ্ঠান বিরোধী। তাহলে প্রথম ব‌ই কোনটি?

অনেক দিন লেগেছে প্রতিষ্ঠান আর লিটল ম্যাগের দ্বন্দ্ব কাটিয়ে আমার নিজের অস্তিত্বের অবস্থান সংহত করতে। বহুদিন দৈনিকে লিখিনি। ‘দ্রষ্টব্য’ লিটল ম্যাগাজিন কেন্দ্রিক লেখালেখিতে আবদ্ধ থাকি। আমি আর মজনু শাহ এ নিয়ে বিভিন্ন সময় নিজেদের মধ্যে আলোচনা ভাগাভাগি করি। কামরুল হুদা পথিক আর মোহাম্মদ শাহ আলম তো আছেই। আমি ততদিনে গল্পকার হয়ে উঠি। ‘দ্রষ্টব্য’ থেকে বের হয় প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘তামাকবাড়ি’। তবে ব‌ই কোনটি আমার? ‘অলৌকিক স্পর্শ’ না কি ‘টেনে যাচ্ছি কালের গুণ’? একটি যৌথ, অন্যটি একক। তাই আমি বলি আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ একের ভেতরে দুই।