এক যুদ্ধে নৌকায় উঠেছিলাম, আরেক যুদ্ধে নৌকা ছেড়ে দিতে হয় ॥ সোহরাব আলী সরকার

আজ অনেকেরই মনে হতে পারে যে হয়তো খুব সহজেই সংঘটিত হয়েছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু এ ধারণা ঠিক না। নানা পথঘাট পেরিয়ে, অনেক শ্রম-ঘাম-মেধা খরচ করে, বিভিন্ন আঁকাবাকা পথ ধরে, উত্তেজনা-আতঙ্ক-নিঃসঙ্গতা, আবার একতা গড়ে তবেই মুক্তিযুদ্ধের নৌকা সচল করতে হয়েছে- এ সব ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী আমি নিজে। এতো সব ঘটনার সাক্ষী হতে পেরে আমি গর্বিত।

আমি সোহরাব আলী সরকার, জন্ম ১৯৪৫ সালের ২ নভেম্বর। আমার বাবা রজব আলী সরকার ছিলেন কৃষক, মা সালেহা খাতুন গৃহিণী। সিরাজগঞ্জ সদরের কালিয়াহরিপুর ইউনিয়নের কান্দাপাড়া গ্রামে আমাদের বাড়ি। গ্রামের স্কুল থেকে প্রাথমিকের ধাপ পেরিয়ে ভর্তি হই সিরাজগঞ্জ শহরের ভিক্টোরিয়া হাই স্কুলে। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সিরাজগঞ্জের অনেক ছাত্রনেতার স্কুলজীবনই কেটেছে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এদের মধ্যে আমির হোসেন ভুলু, আমিনুল ইসলাম চৌধুরী, ইসমাইল হোসেন, আব্দুল বারী শেখ, ইসমাইল হোসেন, ইসহাক আলী, গোলাম কিবরিয়া, এমএ রউফ পাতা অন্যতম। এদের প্রত্যেকেই সিরাজগঞ্জ ছাত্র আন্দোলন তথা স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ভিক্টোরিয়া হাই স্কুলে পড়ার সময়ে আমারও রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়। আমি ১৯৬৭ সালে এই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করি এবং সিরাজগঞ্জ কলেজে ভর্তি হই। কলেজেও যুক্ত হই ছাত্রলীগের সঙ্গে। বৃহত্তর পরিবেশে প্রবেশের পর দায়িত্ব বর্তায় আরো বড় পরিসরে রাজনীতি করার। এ সময় বিভিন্ন স্কুলে কমিটি করার জন্য মহুকুমার নেতাদের সঙ্গে যেতাম। বাড়ি কান্দাপাড়া হওয়ায় একটি বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হতো। তখনকার রাজনীতিতে প্রায়ই ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে মারামারি হতো ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপ ও ভাসানী ন্যাপের কর্মী-সমর্থকদের। সে সব মারামারিতে আমাদের গ্রাম অগ্রণী ভূমিকা রাখতো। এ সময় আমাকে সহযোগিতা করতেন আমাদের গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা আজাহার মন্ডল, তোফাজ্জল হোসেন, আব্দুল আওয়াল, ইউসুফ আলী, আলী ইমাম দুলুসহ আরো কয়েকজন।

কলেজে ভর্তি হওয়ার বছরেই ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আমাকে সমাজকল্যান সম্পাদক পদে ছাত্রলীগের প্যানেলে মনোনয়ন দেওয়া হয়। ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপ, মতিয়া গ্রুপ ও এনএসএফকে পরাজিত করে আমরা খুব সহজেই নির্বাচিত হই। তখন কলেজের অধ্যক্ষ কামরুজ্জামান। আইয়ুব খানের গোলাম বলতে যা বোঝায় তিনি ছিলেন তাই। আইয়ুবীয় স্বৈরশাসকের মতোই তিনি আমাদের শায়েস্তা করতে চাইলেন। আমি এবং এলিজা সিরাজী ছাড়া ভিপি আব্দুল লতিফ মির্জাসহ সবাইকে তিনি ফোর্স টিসি দিয়ে কলেজ থেকে বহিস্কার করেন। ছাত্র সংসদের তহবিল খরচ থেকে শুরু করে সকল ক্ষমতা নিয়ে নেন নিজের হাতে। কিন্তু সাধারণ ছাত্ররা তা মানবে কেন? আমরা তার বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলি। সে আন্দোলন ঠেকাতে পুলিশ কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ওপর বেধড়ক লাঠিচার্জ করে, নিক্ষেপ করে কাঁদুনে গ্যাসও। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে সাধারণ ছাত্ররা। শুরু হয় পুলিশের সঙ্গে মারপিট। মারামারি ছড়িয়ে পড়ে শহরেও। এ ঘটনার পর সিরাজগঞ্জ শহর ছেড়ে পালিয়ে বাঁচে অধ্যক্ষ কামরুজ্জামান। বিজয়ী হয় সাধারণ ছাত্ররা।
’৬৯-এ ঐক্যবদ্ধ ছাত্র আন্দোলনের ফলে আওয়ামী লীগের প্রভাব দ্রত সবখানে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এ সময়ে আমি এইচএসসি পাশ করে ভর্তি হই বিএ ক্লাসে। সে বছরে ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে ভিপি পদে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। জিএস পদে মনোনয়ন পান আমির হোসেন খান (রতনকান্দি)। নির্বাচনে খুব সহজেই আমাদের প্যানেল জয়ী হয়। এই প্যানেলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মধ্যে যাদের নাম এই মূহুর্তে মনে পড়ছে তারা হলেন- লুৎফর রহমান মাখন (বেলকুচি), আজিজুল হক বকুল (কাজীপুর), রফিকুল ইসলাম (চিলগাছা), হাফিজা খাতুন (শহর) প্রমুখ। এরপরই আসে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন। আমাদের আসন থেকে এমএনএ পদে মোতাহার হোসেন তালুকদার, এমপিএ পদে সৈয়দ হায়দার আলী আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান। আমরা ছাত্রলীগের সকল নেতাকর্মী নাওয়া খাওয়া ভুলে গ্রামে গ্রামে ভোট ভিক্ষা করি। ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সারাদেশের মতো আমরাও বিপুল ভোটে বিজয়ী হই।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদের ১৬৮টি আসন পেয়ে পাকিস্তানের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত হয়। পাকিস্তানের পরবর্তী সরকার গঠনের সক্ষমতা অর্জন করে। কিন্তু আমরা কর্মীরা মনে করতাম, পাকিস্তানের সামরিক জান্তা আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা দেবে না। এ জন্য তারা নানা ষড়যন্ত্রে মেতে উঠবে, তাই আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য স্বাধীনতা ছাড়া আর কোনও পথ খোলা নেই। আমরা স্বাধীনতার ব্যপারে সজাগ হয়ে উঠি। মনে করতে থাকি যেকোনও সময় বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দেবেন। শুরু হবে সশস্ত্র লড়াই। এ জন্য আমরা সজাগ দৃষ্টি রাখতে থাকি জাতীয় রাজনীতির দিকে, প্রতিদিনই জমজমাট রাখতে থাকি কলেজ ছাত্র সংসদের অফিস, মিছিল করি শহরে।

১ মার্চ ১৯৭১, অন্যান্য দিনের মতোই প্রায় সব ছাত্রনেতা সিরাজগঞ্জ কলেজ ছাত্র-সংসদ অফিসে বসে আড্ডা দিচ্ছি। দুপুরে রেডিওতে বিশেষ ঘোষণা প্রচার করা হয়। বলা হয়, ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় সংসদের যে অধিবেশন বসার কথা, তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। এটা যে বাঙালিদের দল আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ষড়যন্ত্র তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। ছাত্রনেতারা সবাই সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদে মিছিলের সিদ্ধান্ত নেই। প্রধান হোস্টেল থেকে বের করে নিয়ে আসি ছাত্রদের। প্রায় একশ ছাত্রের মিছিল বের হয় কলেজ থেকে। মিছিল শহরে ঢোকার পর থেকেই লোক বাড়তে থাকে। দলমত নির্বিশেষে মানুষ যোগ দিতে থাকে মিছিলে। মিছিলের প্রধান শ্লোগান ওঠে- ‘জয় বাংলা’, ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। একশ ছাত্রের মিছিল শহর ঘুরে কলেজ মাঠে ফিরে আসতে আসতে হয়ে ওঠে সহস্রাধিক জনতার মিছিল। আমরা সকল ছাত্রনেতা সে জনতাকে সামনে রেখে শপথ নেই, বাংলাদেশকে স্বাধীন না করে আমরা কেউ ঘরে ফিরবো না।

পরের দিন ঢাকায় স্বাধীনতার নতুন পতাকা উড়িয়ে দেওয়া হয়, ৩ মার্চ ঘোষণা হয় স্বাধীনতার ইশতেহার। ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের দশ লক্ষাধিক জনতার সামনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষনা করেন- ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’। তিনি ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে শত্রুর মোকাবেলা’ করার আহ্বান জানান। এ ভাষণ শুনে আমরা আমাদের স্বাধীনতার ইশারা পেয়ে যাই। পরিকল্পনা করি অস্ত্র প্রশিক্ষণের। যোগাযোগ করি স্থানীয় আনসার সদস্য আব্দুর রহমান (তাড়াশ), জাকির হোসেন (সয়াগোবিন্দ), বাহাদুর হোসেন (হোসেনপুর) প্রমুখের সঙ্গে। তারা আমাদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিতে রাজী হন। ৭ মার্চের দুই একদিন পরেই সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠে শুরু হয় অস্ত্র প্রশিক্ষণ। ছাত্ররা দলে দলে এসে নাম লেখায়। প্রথমে শরীর চর্চা আর রোভার্স স্কাউটের ডামি রাইফেল দিয়ে শুরু হয় প্রশিক্ষণ।

প্রশিক্ষণ চলাকালে একদিন আমরা ছাত্রনেতারা বসে আছি কলেজ ছাত্র-সংসদ অফিসে। বেঙ্গল রেজিমেন্টের এক দীর্ঘদেহী সদস্য এসে আমাদের স্যালুট জানালেন। বললেন, আমি লুৎফর রহমান, বাড়ি গাইবান্ধায়। ছুটি নিয়ে বাড়িতে এসেছিলাম। আপনাদের সিরাজগঞ্জে এসেছি আমার বোনকে দেখতে, তার বিয়ে হয়েছে কালিয়াহরিপুর ইউনিয়নের মোরগ্রামে। কয়েকদিন ধরে সিরাজগঞ্জে আসি ছাত্রদের প্রশিক্ষণ দেখতে। আজ এসেছি আপনাদের কাছে। আপনাদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করবো। এটাকেই নিজের এলাকা মনে করে এখানেই থেকে যাবো, মুক্তিযুদ্ধ করবো। গড় গড় করে এক টানে কথাগুলো বলে থামলেন তিনি। পাকিস্তান আর্মির সদস্য বলে নানা জন নানা প্রশ্ন করতে থাকে। আমি লুৎফর রহমানকে আমার পাশে নিয়ে বসাই। নানা কথা জিজ্ঞেস করে তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ানোর কথা বলি। তিনিও খুশি মনে রাজী হন। তাকে তখন সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে লুৎফর রহমান (মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার নামের সঙ্গে ছদ্মনাম যুক্ত হয়, অরুণ। তিনি পরিচিত লাভ করে অরুণ ওস্তাদ হিসেবে) হয়ে ওঠেন সিরাজগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের একজন অপরিহার্য মুক্তিযোদ্ধা, সিরাজগঞ্জের ঘরের ছেলে। এর দু’একদিন পরেই রবিউল ইসলাম নামে এক বেঙ্গল রেজিমেন্ট সদস্য আমাদের সঙ্গে এসে যুক্ত হন। মু্িক্তযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে রবিউল গেরিলা হিসেবে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। আমাদের প্রশিক্ষণে যুক্ত হন সিরাজগঞ্জের তৎকালীন এসডিও একে শামসুদ্দিন ও এসডিপিও আনোয়ার উদ্দিন লস্কর। তারা প্রতিদিনই আসতে থাকেন প্রশিক্ষণ দেখতে। এক সময় কয়েকটি আসল থ্রিনটথ্র্রি রাইফেলও সরবরাহ করেন তারা। আমরা হয়ে উঠতে থাকি পুরোদমে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা।
আমরা তখন প্রায় সকল ছাত্রনেতা পড়ে থাকি কলেজ ছাত্র-সংসদে। যখন খাওয়া বা একটু ঘুমের দরকার পড়ে, তখন কলেজের হোস্টেলে খেয়ে বা একটু ঘুমিয়ে নেই। ২৫ মার্চ, গভীর রাত। সংসদ অফিসে বসে আছি সবাই। হন্তদন্ত হয়ে এসডিও শামসুদ্দিন ও এসডিপিও আনোয়ার উদ্দিন লস্কর আমাদের অফিসে আসেন। উত্তেজনায় তারা কাঁপছিলেন। টেবিলের ওপর একটি কাগজ মেলে ধরে বললেন, বঙ্গবন্ধু স¦াধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। ঘোষনা এসেছে পুলিশের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে। এই যে ঘোষণার কাগজ। আমরাও উত্তেজিত হয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ি কাগজের ওপর, সবার হাতে হাতে ঘুরতে থাকে সে কাগজ। পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করি যে, রাতেই সে কাগজ ছাপিয়ে ফেলবো, ভোর হওয়ার আগেই বিলি করা হবে জনতার মাঝে। তখনই তা বড় পুলের পশ্চিমের মাথায় নুরে এলাহী প্রেসে ছাপানোর ব্যবস্থা করা হয়। সঙ্গে মাইকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়।

২৬ মার্চ সিরাজগঞ্জ শহর যখন স্বাধীনতার উৎসবে মাতোয়ারা তখন আমরা ছাত্রনেতারা এসডিও শামসুদ্দিন ও এসডিপিও আনোয়ার উদ্দিন লস্করের সঙ্গে বৈঠকে বসি। আলোচনার বিষয়, এখন ঢাকা থেকে পাকসেনারা ছড়িয়ে পড়বে মুক্ত বাংলাদেশের দখল নিতে। তাদের প্রতিরোধ করতে হবে। পাকিস্তানিদের সম্ভাব্য আক্রমণের পথ হিসেবে চিহ্নিত করি সড়ক পথে বাঘাবাড়ি এবং নৌপথে যমুনা হয়ে। আমরা একটি গ্রুপ বাঘাবাড়ি আর এক গ্রুপ যমুনার পাড় প্রতিরোধের ব্যবস্থা করি। আমি, আব্দুল লতিফ মির্জা, লুৎফর রহমান অরুণ একটি বড় মুক্তিযোদ্ধা দল নিয়ে চলে যাই বাঘাবাড়িতে। অন্যেরা থেকে যায়, যমুনার পাড় পাহারা এবং শহরের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে।
আমরা বাঘাবাড়িতে গিয়ে বাঙ্কার খুঁড়ে বসে যাই হানাদার বাহিনী প্রতিরোধে। আমাদের সকল কাজে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে শাহজাদপুর কলেজের ছাত্রনেতারা। তারা বিভিন্ন গ্রাম থেকে ডালভাত রান্না করে এনে খাইয়ে এবং বাঙ্কার খুঁড়ে দিয়ে সহযোগিতা করে। এদিকে, হানাদার বাহিনীর নিষ্ঠুর নির্যাতনে বিভিন্ন বড় বড় শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরতে শুরু করে সাধারণ মানুষ। তাদের কাছে শুনতে থাকি পাকবাহিনীর ভয়াবহ নির্যাতনের খবর। পাশাপাশি প্রতিরোধের খবর। তাদের কাছে পাওয়া খবরে হানাদার প্রতিরোধের প্রতিজ্ঞা আরো দৃঢ় হয়। কিন্তু বুঝতে পারি যে, আমাদের অস্ত্র ওদের অস্ত্রের তূলনায় খেলনা হাতিয়ার, তবুও আমাদের মনোবল অটুট থাকে। এ সময় নওগাঁ-বগুড়া থেকে ইপিআরের একটি দল আসে বাঘাবাড়িতে। তাদের সহযোগিতা ও পরামর্শে আরো কিছু বাঙ্কার খোঁড়া হয়। দুই এক দিন আমাদের সঙ্গে থেকে তারা সিদ্ধান্ত নেয় নগরবাড়ি-পাবনা রোডের কাশীনাথপুরে পাকসেনাদের প্রতিরোধ করার। আমরা থেকে যাই বাঘাবাড়িতেই। পরে খবর পাই, কাশীনাথপুরের ডাব বাগানে তুমুল যুদ্ধ হয়েছে ইপিআরের সঙ্গে পাকসেনাদের। শহীদ ও আহত হয়েছে অনেক ইপিআর। এসডিও শামসুদ্দিন, আমিসহ আরো কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে ডাব বাগানে যাই। সেখানে বেশ কয়েকজন আহতকে উদ্ধার করা হয়। তার মধ্যে আলী নামের এক ইপিআর সদস্যকে নিয়ে সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করি। তার বাড়ি সম্ভবত নোয়াখালী এলাকায়। এরপর থেকে আমাকে সিরাজগঞ্জ কলেজ হোস্টেলে অবস্থান নিয়ে এসডিও সাহেবের সঙ্গেই থাকতে হয়।
এক সময় অস্ত্রের সীমাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন কারণে এসডিও শামসুদ্দিন বাঘাবাড়ি থেকে উঠে গিয়ে ঘাইটনা রেল সেতুর কাছে পজিশন নিতে বলেন মুক্তিযোদ্ধাদের। ঘাইটনা রেলসেতুতে যখন পাকসেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ হয় তখন আমি সিরাজগঞ্জে। সম্ভবত ২৬ এপ্রিল বিকেলের দিকে এসডিও শামসুদ্দিন সাহেব জানান, তোমাদের শহর ছেড়ে চলে যেতে হবে। সিরাজগঞ্জ শহরে মিলিটারি চলে আসবে যে কোনও সময়। আমিও শহর ছেড়ে টাঙ্গাইল যাবো, সেখানে মায়ের সঙ্গে দেখা করে তোমাদের সঙ্গে মিলিত হবো রতনকান্দি-কাজীপুর এলাকায়। কলেজ হোস্টেলে আমরা তখন প্রায় ১৬/১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান করছিলাম। তার নির্দেশে আমরা চলে যাই রতনকান্দি ইউনিয়নের চিলগাছা গ্রামে ছাত্রনেতা রফিকুল ইসলামের বাড়িতে। অপরদিকে, শহরে অবস্থানরত এবং বাঘাবাড়ি-ঘাইটনা থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধারা সে রাতেই শহর ত্যাগ করে উত্তরের দিকে চলে যায়। এ সুযোগে সে রাতেই ন্যাশনাল ব্যাংক লুট করার চেষ্টাসহ, জেলখানার অবাঙালি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটায় স্বাধীনতা বিরোধীরা।

শহর ত্যাগ করে উত্তরের দিকে যাওয়া প্রায় দেড় শ’ মুক্তিযোদ্ধা মিলিত হই ছোনগাছার একটি মাঠের মধ্যে। নেতৃবৃন্দের এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, এখন ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে গেরিলা কৌশলে যুদ্ধ করতে হবে। কতদিন যুদ্ধ চলবে তার কোনও ঠিক নেই। তাই, তার আগে সবাই যার যার মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করে বিদায় নিয়ে আসতে হবে। সাত দিন পরে আবার আমরা মিলিত হবো এখানেই। তখন পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে। এ বলে সবাইকে বিদায় দেওয়া হয়। যে যার সুবিধা মতো ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। তার আগেই আমাদের অস্ত্রশস্ত্র অনেক যত্ন করে ছাত্রনেতা রফিকুল ইসলামের বড় ভাই কামাল মিলিটারির সহযোগিতায় পুঁতে রাখা হয়। ব্যাক্তিগত নিরাপত্তার জন্য আমার কাছে ছিল মাত্র ছয়টি গ্রেনেড।
আমি আর আব্দুল আজিজ সরকার একই এলাকার মানুষ, একত্রিত হলাম দুজন। শফিকুল ইসলাম শফির বাড়ি শহরে, মিলিটারি আসায় সেখানে তার যাওয়ার উপায় নেই, সে-ও এলো আমাদের সঙ্গে। বেলকুচির লুৎফর রহমান মাখন আর চৌহালীর মনিরুল কবীরের বাড়ি অনেক দূরে, আর সেখানে যেতে হলেও আমাদের সঙ্গেই যাওয়া সহজ, তাই পাঁচজন একজোট হয়ে রওনা হলাম আমাদের এলাকার দিকে। এসে উঠলাম, আমার মামা ওসিম উদ্দিন শেখের বাড়ি ভদ্রঘাটের জাঙ্গালিয়াগাঁতি গ্রামে। গ্রামটি একেবারেই যোগাযোগ বিচ্ছিহ্ন জঙ্গলার্কীর্ণ, আমাদের পালিয়ে থাকার জন্য সবচেয়ে উপযুক্তও বটে। সেখান থেকে মনীরুল কবীর, লুৎফর রহমান মাখন আর আজিজ সরকার বাড়িতে গেল। কিন্তু দু’একদিনের মধ্যেই সবাই আবার ফিরে এলো জাঙ্গালিয়াগাঁতীতে। এখন অপেক্ষা, আবার সবাই মিলিত হওয়া এবং পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা। এদিকে পাকসেনারা এসে পুরো শহর পুড়িয়ে দিয়েছে, গ্রামেও হানা দিতে শুরু করেছে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামীর মতো স্বাধীনতা বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা, সঙ্গে চোরডাকাত, লুটেরারাও।

নির্দিষ্ঠ দিনে নির্দিষ্ট সময়ে আমরা পাঁচজন পৌঁছে যাই ছোনগাছার নির্দিষ্ট মাঠে। কিন্তু অন্যরা আসে না। সবাই চিন্তায় পড়ে যাই, খোঁজ নিতে শুরু করি সবার। খুঁজতে খুঁজতে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, অন্যরা ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছে। কে কোন পথে গেছে তার কোনও হদিস পাওয়া যায় না। বুঝতে পারি যে, এ সময়ে কেউ হদিস রেখেও যাবে না, আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। এখন কোথায় যাবো? অবশেষে আবারো মনে পড়ে জাঙ্গালিয়াগাঁতী মামাবাড়ির কথা। চলে আসি সে গ্রামেই। চিন্তা আসে ভারতে যাওয়ার, আমরাও পথ খুঁজতে থাকি যে, কোন পথে যাওয়া যাবে। কিন্তু ততদিনে স্বাধীনতা বিরোধীরা গ্রামে গ্রামে পাকসেনাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে উপদ্রুপ বেড়েছে ডাকাত লুটেরাদের। এসব থেকে আত্মরক্ষা করতে গ্রামের মানুষ রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে নিজের গ্রাম। যাতে অপরিচিত কেউ সে গ্রামে ঢুকে ডাকাতি করতে না পারে।

একদিন খবর পাই কালিয়াহরিপুরের ছাত্রনেতা আব্দুল হামিদ তালুকদারের। যোগাযোগ করি তার সঙ্গে। পরিকল্পনা করি ভারত যাওয়ার। আলোচনা করে পথ ঠিক করা হয় রাজশাহী সীমান্ত দিয়ে পার হওয়ার। এ রাস্তা আমাদের একেবারেই অপরিচিত, তারপরেও চাটমোহর পর্যন্ত যেতে হবে রেললাইন দিয়ে। সে রেললাইনে পাকসেনা বহনকারী ট্রেন চলাচল করে। তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেল লাইন ধরে রওনা হই মূলাডুলি চাটমোহরের দিকে। পাবনা-নাটোর-রাজশাহী সড়কের কাছাকাছি পৌঁছার পর এলাকার মানুষ আমাদের সে সড়ক পার হতে বাঁধা দেয়। তারা জানায়, এ সড়ক দিয়ে পাকসেনাদের গাড়ির বহর সব সময় চলাচল করছে। আর মানুষের ছায়া দেখলেই তারা গুলি করে হত্যা করছে। আমরা নিজেরাও দূর থেকে হরদম গাড়ি চলাচল করতে দেখে আর সাহস পাই না সড়ক পার হওয়ার। ফিরে আসতে বাধ্য হই। ভাঙ্গুরা যখন পৌঁছি তখন বেলা ডবুডবু, এদিকে ক্ষুধার জ্বালায় সবারই অবস্থা কাহিল। এক ছেলেকে ডেকে কয়েক টাকা দিয়ে তাকে আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করি। কিছুক্ষণ পর সে ফিরে এসে তাদের বাড়িতে নিয়ে যায়। তার বাবা স্থানীয় স্টেশন মাস্টার। নাম সোহরাব আলী। তিনি আমাদের অনেক যত্ন করেন। এই বিপদের সময় তার এতো আদর যত্ন আমাদের ভীত করে ফেলে। মনে হতে থাকে, এ লোক আমাদের পাকসেনাদের হাতে তুলে দেবে নাতো? কিন্তু উপায়হীন ক্ষুধার্ত আমরা সেখান থেকে পালাতেও পারি না। খাওয়াদাওয়া করে সজাগ থেকে সে বাড়িতেই রাত কাটাই। পরের দিন সকালে দেখি, স্টেশন মাস্টার সাব আমাদের জন্য নৌকা ঠিক করেছেন মোহনপুর পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার জন্য। আমাদের দেওয়া টাকা তো ফিরিয়ে দেনই, সাথে আরো কিছু টাকা ধরিয়ে দেন বিপদআপদে খরচ করার জন্য। আমরা সে নৌকায় মোহনপুর এসে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি সেই জাঙ্গালিয়াগাঁতী গ্রামে।
ততদিনে পাকসেনা, স্বাধীনতা বিরোধী, বিশেষ করে ডাকাতের উপদ্রুপ বেড়ে গেছে ভীষণভাবে। মনে হতে থাকে, আমাদের উপস্থিতির কারণে ডাকাতেরা ডাকাতি করতে ভয় পাচ্ছে। আবার সশস্ত্র ভেবে আমাদের ওপর হামলা চালানোরও সাহস পাচ্ছে না, ষড়যন্ত্র করছে আমাদের এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য। প্রয়োজনে আমাদের হত্যাও করতে পারে। অথচ আমাদের কাছে কয়েকটি হ্যান্ড গ্রেনেড ও একটি পিস্তল ছাড়া কোনও অস্ত্র নেই। ফলে নিজেদের এবং এলাকাবাসীকে ডাকাতদের হাত থেকে রক্ষার জন্য অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি ভীষণভাবে। আমার বাবার কাছে একটি টুটু বোর রাইফেল ছিল, তিনি তখন বাড়ি ছেড়ে পরিবারসহ পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। অবস্থান করছিলেন শিয়ালকোল ইউনিয়নের শিবনাথপুর গ্রামে। আমি আমার মামাতো ভাই চান্দুকে নিয়ে শিবনাথপুরে বাবার কাছে থেকে সেই রাইফেলটি চেয়ে নেই। কিন্তু তা বহন করে আনতে গিয়ে এক বিপত্তির মুখে পড়তে হয়। কারণ, স্বাধীনতা বিরোধীরা ভয়ভীতি দেখিয়ে বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দাদের নামিয়ে দিয়েছে আমাদের বিরুদ্ধে। শিয়ালকোলের স্বাধীনতা বিরোধী মজিবরের জগৎগাঁতী গ্রামের পাশ দিয়ে আসার সময় গ্রামবাসী আমাদের আটক করে তার বাড়িতে নিয়ে যায়। এ খবর আশপাশের গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে সেখানকার ছাত্ররা মজিবরের বাড়িতে এসে হাজির হয়। তারা আমাদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলে। ভয়ে মজিবর বাড়ির ভেতর থেকে বের হওয়ার সাহস পায় না। এক সময় বাড়ির ভেতর থেকেই আমাদের ছেড়ে দিতে বলে, কিন্তু আমরাও রাইফেল ছাড়া সে বাড়ি থেকে নামবো না বলে পণ করি। অবশেষে রাইফেল ফেরত দিয়ে আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। আমরা চলে আসি জাঙ্গালিয়াগাঁতী গ্রামে।

একদিন ডাকাত দল আমাদের কাছে চিরকুট পাঠিয়ে তাদের সঙ্গে বিভিন্ন গ্রাম লুট করার প্রস্তাব দেয়। এটা অনেকটা চ্যালেঞ্জ করার শামিল। এই টুটু বোর দিয়ে ডাকাতদের কতটুকু সামাল দিতে পারবো তা নিয়ে আমরা চিন্তিত। তারা চিরকুট দিয়ে আমাদের পাশের এক গ্রামে হামলা চালায়। আমরাও তাদের প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যাই। ডাকাতদের লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুঁড়ে মারি। তা বিস্ফোরণের পর ওরা পালিয়ে যায়। তখন আমরা ভীষণভাবে রাইফেলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। যদিও চিলগাছা থেকে সবাই মিলিত ভাবে ছাড়া অস্ত্র না নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল তবুও চলে যাই সেখানেই। সেখানে একটি ভরসা ছিল, আমার কাছে থাকা চাইনিজ রাইফেলটি রফিকুলের কাছে দিয়ে বলেছিলাম যে, আমার প্রয়োজনে রাইফেলটি আমি নিতে আসবো, এ কারণে রাইফেলটি আলাদা করে রাখা ছিল রফিকুলের কাছে। আমি, মনিরুল কবীর ও আমার এক মামাতো ভাই চলে আসি চিলগাছায়। তাকে জানাই এখানকার পরিস্থিতি, কিন্তু রফিকুল প্রথমে রাইফেল দিতে অস্বীকার করে। অনুনয়, বিনয়, অনুরোধ, বিপদ, কিছুটা রাগারাগি করলে অবশেষে চাইনিজ রাইফেল আর তার গুলিগুলো আমাদের হাতে তুলে দেয় রফিকুল। ততক্ষণে সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। রাইফেল আর গুলি দিলেও রফিকুল সাফ জানিয়ে দেন, এ পরিস্থিতি তাদের বাড়িতে থাকা নিরাপদ নয়। তখন আমরা আরো বিপদে পড়ে যাই। কারণ, ডাকাতের ভয়ে তখন গ্রামে গ্রামে পাহারা বসিয়েছে মানুষ। সে সব গ্রাম পার হয়ে রাতের আঁধারে এতো দূর যাওয়া প্রায় অসম্ভব। তবুও একটি ছোট্ট শোলার আঁটিতে রাইফেলটি বেঁধে চিলগাছা গ্রাম থেকে বের হই আমরা।

সত্যি সত্যি বিপদে পড়ে যাই ছোনগাছা এলাকায় এসে। গ্রামের লোকজন আমাদের আটক করে এবং স্থানীয় চেয়ারম্যানের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য জোরাজুরি করে। কিন্তু আমরা জানি যে, স্থানীয় চেয়ারম্যান পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দল পিডিপির সদস্য। তার কাছে নিয়ে গেলে নির্ঘাত পাকবাহিনীর হাতে তুলে দেবে সে। আমরা তখন এলাকার বাসিন্দা ফ্যাসন টেইলার্সের শফির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে অনুরোধ করি। গ্রামের মানুষ আমাদের শফির বাড়িতে নিয়ে যায়, ভাগ্যক্রমে তাকে পেয়েও যাই। সে বাড়ি থেকে রের হয়ে এসে আমাদের জড়িয়ে ধরে। গ্রামবাসীকে বলে, কোনও অসুবিধা নেই, এরা আমার পরিচিত ছাত্রনেতা। আজ রাতে ওরা এখানেই থাকবে, তোমাদের দরকার পড়লে সকালে এসে চেয়ারম্যানের কাছে নিয়ে যেও। আমরা গ্রামবাসীর হাত থেকে নিস্তার ও শফির বাড়িতে আশ্রয় পেয়ে অকূলে কূল পাই। কিন্তু সকালে আবারও আসে গ্রামবাসী। ওরা ততক্ষণে বুঝে গেছে যে, আমরা মুক্তিযোদ্ধা। তখন ওরা বায়না ধরে, আমাদের কাছে থাকা গ্রেনেড তাদের দেখাতে হবে। ভয় তখনো কাটেনি। তবুও রাজী হই আমরা। তবে বলি, গ্রামের বাইরে গিয়ে গ্রেনেড দেখাবো। তাদের সঙ্গে নিয়েই শোলার আঁটিটি মাথায় করে বের হই আমরা। গ্রামের সীমানার বাইরে এসে কোঁচড় থেকে গ্রেনেড বের করে গ্রামবাসীকে দেখাই। রওনা হই জাঙ্গালিয়াগাঁতী ভদ্রঘাটের দিকে।
চাইনিজ রাইফেলটি এনে সাহস বাড়ে আমাদের। খোঁজ নিতে শুরু করি, আমাদের মতোই আরো ক্উে এলাকার মধ্যে আছে কিনা? খবর পাই, যমুনার চর এলাকায় তৎপর রয়েছে আওয়ামী লীগের বিপদের দিনের সহযোদ্ধা জহির চাচা। তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করতে থাকি। ডাকাত ও স্বাধীনতা বিরোধীদের বিতাড়িত করাই প্রথম কর্তব্য বলে সিদ্ধান্ত নেই। তখন কালিয়াহরিপুর ইউনিয়নের স্বাধীনতা বিরোধী এক কাজী সাহেবের তৎপরতার খবর পাই। আমরা পাঁচজনেই তার বাড়িতে হানা দেই। তাকে না পেয়ে তার দুই ছেলেকে ধরে এনে মৃত্যুদন্ড দেই। ভাগ্যক্রমে এক ছেলে বেঁচে যায়।
একদিন আমাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে এলাকার ধামকোল গ্রামের এক ব্যক্তি। সে জানায় যে, তার বাড়িতে ডাকাতেরা হামলা চালাবে বলে খবর পাঠিয়েছে, তাকে রক্ষা করতে হবে। এটা ডাকাত দলের ষড়যন্ত্র মনে হয়, কারণ এ লোকের বিরুদ্ধে ডাকাতির দুর্নাম আছে। তবুও আমরা তার বাড়িতে যাই। দেখি, সে আমাদের জন্য সুন্দর করে বিছানা পেতে রেখেছে, খাওয়াদাওয়া করিয়ে সেখানে আমাদের ঘুমাতে বলে। এতে আমাদের সন্দেহ আরো বেড়ে যায়। তখন তার ছেলেদেও ডেকে আনার জন্য বলি। সে জানায়, ছেলেরা অসুস্থ। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করি যে, নিশ্চয়ই ওরা ততক্ষণে ডাকাতি করতে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের সন্দেহের কথা তাকে বুঝতে না দিয়ে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকি। কিছুক্ষণ পরই পটকা গুলির শব্দ শুনতে পাই আমাদের প্রধান আশ্রয় জাঙ্গালিয়াগাঁতীর পাশ্ববর্তী পাড়া কালীবাড়ি ভদ্রঘাটের দিকে থেকে। বুঝতে পারি, সেখানে ডাকাতি হচ্ছ্।ে আমরা কয়েকজন চাইনিজ রাইফেলটি নিয়ে ছুটে বেরিয়ে আসি। কাছাকাছি এসে ডাকাত দলকে লক্ষ্য করে গুলি চালাই। নিহত হয় এক ডাকাত। রাইফেলের গুলির শব্দ পেয়ে ডাকাতেরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। গ্রামে গিয়ে দেখতে পাই, ওরা ডাকাতি করতে পারেনি। তার আগেই আমরা পৌঁছুতে পেরেছি। এতে আমাদের ওপর গ্রামবাসীর আস্থা বাড়ে, সাহস বাড়ে আমাদেরও। শুরু হয় ডাকাতদের বিরুদ্ধে অভিযান।

ডাকাতদের অবস্থানে গিয়ে হানা দিতে শুরু করি আমরা। বল্লভবাড়ির কাছে ডাকাতের অবস্থানের খবর পাই। তার আগের রাতেই ওরা এক বাড়িতে ডাকাতি করেছে। এক ডাকাতকে ধরে তার কাছে থেকে ডাকাতি করা টাকা উদ্ধার করে গ্রামবাসীকে ফিরিয়ে দেই। সে ডাকাতকে বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এতে আমাদের ওপর গ্রামের মানুষের আস্থা বাড়তে থাকে। এ সময়ে একদিন খবর পাই যে, লুৎফর রহমান ভারত থেকে এলাকায় ফিরেছে, সে আমার বাড়িতে গিয়েও খুঁজে এসেছে। ছুটে যাই তার বোনের বাড়ি মোরগ্রামে। তাকে খুজে বের করে এনে যুক্ত করি আমাদের সঙ্গে। কিন্তু মাত্র এই ক’জনেই তো শত্রু মোকাবেলা করা সম্ভব নয়, তখন এলাকা থেকে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, ঘনিষ্ঠজনদের ডেকে এনে দল ভারি করতে থাকি। তাদের সীমিত পরিসরে প্রশিক্ষণ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রস্তুত করতে থাকেন লুৎফর রহমান অরুণ। এটাই সিরাজগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধানতম সংগঠন পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের ভ্রণ। গড়ে উঠতে থাকে পলাশডাঙ্গা যুব শিবির। এ পর্যায়ে একদিন উদয় হন প্রখ্যাত ছাত্রনেতা আব্দুল লতিফ মির্জা।
আব্দুল লতিফ মির্জা সিরাজগঞ্জ ছাত্রলীগের অন্যতম নেতা, ভালো সংগঠক, কর্মী এবং জনগণের মধ্যে সুপরিচিত। তিনি ভারতে গিয়েছিলেন। বিএলএফের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছেন। সিরাজগঞ্জের বেশ কিছু ছাত্রনেতাকে সঙ্গে নিয়ে মিটিং হয়েছে কেন্দ্রীয় নেতাদের। বিশেষ কিছু দায়িত্ব দিয়ে নেতারা তাকে দেশের ভেতরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আব্দুল লতিফ মির্জা পলাশডাঙ্গায় যুক্ত হওয়ায় দলটি যেন পূর্ণতা পায়। বিভিন্ন জায়গায় খবর ছড়িয়ে পড়ে, আব্দুল লতিফ মির্জা ভদ্রঘাটের জাঙ্গালিয়াগাঁতীতে অবস্থান করছেন। অনেকেই চলে আসতে থাকেন এখানে। বাগবাটী এলাকা থেকে আসেন আব্দুল হাই তালুকদার, ইয়াকুব আলীরা। সশস্ত্র অবস্থায় খোরশেদ আলী, শামসুল ইসলামরা প্রায় দশজন উল্লাপাড়ার কয়ড়া এলাকা থেকে আসেন। যোগ দেন জহির চাচা, আওয়ামী লীগ অফিসের পিয়ন হিসেবে পরিচিত আব্দুস সোবহানও। হেদায়েত-জামিলরা আসেন বহুলী থেকে। সর্বশেষ এসে যুক্ত হন আমিনুল ইসলাম চৌধুরী। জমজমাট হয়ে ওঠে পলাশডাঙ্গা। একটি প্রাথমিক সাংগঠনিক রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেই। পরিচালক নির্বাচন করা হয় আব্দুল লতিফ মির্জাকে। সিএনসি করা হয় আমাকে। আর সামরিক কর্মকর্তা নির্বাচিত হন লুৎফর রহমান অরুন।

জুনের মাঝামাঝি জগৎগাতী গ্রামের স্বাধীনতা বিরোধী মজিবর রহমানের সহযোগিতায় পাকসেনারা হামলা চালায় জাঙ্গালিয়াগাঁতী গ্রামে। এটা আমাদের ওপর প্রথম আক্রমণ। যুদ্ধে অনভিজ্ঞ আমরা একটু দিশেহারা হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করি। কিন্তু অস্ত্র-গুলির স্বল্পতার কারণে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বাধ্য হই। এতে কেউ কেউ দল থেকে বিচ্ছিহ্ন হয়ে পড়ে। মূল দলটি চলে যাই রান্ধুনিবাড়ির দিকে। আমাদের কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হয় না, এটাই আমাদের সফলতা। আমরা রান্ধুনিবাড়ির পাশে হুড়াসাগরে গিয়ে একটি নৌকা ঠিক করে তাতে উঠে পড়ি। পথে পথে দুর্বল শত্রুকে আঘাত করতে করতে এক সময় আমাদের প্রধান বিচরণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে চলনবিল এলাকা। পর্যায়ক্রমে মুক্তিযোদ্ধা বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে নৌকা। এক নৌকা থেকে ধীরে ধীরে প্রায় ৫৫টি নৌকা আমাদের ভাড়া করতে হয়। পলাশডাঙ্গার সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে চারশ।

পলাশডাঙ্গায় যুক্ত হন বেশ কিছু বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ, আনসার সদস্য। তারা যুদ্ধ সম্পর্কে অভিজ্ঞ, আর আমরা ছাত্র-কৃষক-শ্রমিকেরা অনভিজ্ঞ। মূল নিয়ন্ত্রণটি আমাদের হাতে থাকলেও তারাই মূলত পলাশডাঙ্গাকে একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীতে পরিণত করেন। ছোট অবস্থায় প্রথমে সেকশন, আরো বড় হলে প্লাটুন, পরে কোম্পানি, আকার আরো বাড়লে ব্যাটেলিয়ন গঠন করা হয়। ব্যাটেলিয়ন কমান্ডার নিযুক্ত হন লুৎফর রহমান অরুণ। আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা বিএলএফের আব্দুস সামাদ (বেড়া), আব্দুল আজিজ মির্জা (বঙ্কিরহাট), বিমল কুমার দাস ([জামতৈল), আব্দুল বাকী মির্জা (শাহজাদপুর) ও ইফতেখার মোবিন চৌধুরী পান্না (সলপ)। সময় যেতে থাকে, ধীরে ধীরে ছাত্র-কৃষক-শ্রমিকদের মধ্যে থেকে সেকশন কমান্ডার প্লাটুন কমান্ডার পদে উন্নীত হতে থাকে। পরিচালনা কাঠামো আরো সুশৃঙ্খল হয়। পরিচালক আব্দুল লতিফ মির্জা, সহকারী পরিচালক আব্দস সামাদ (বেড়া) ও মনীরুল কবীর। ব্যাটেলিয়ান কমান্ডার লুৎফর রহমান অরুণ। কমান্ডার ইন চিফ আমি সোহরাব আলী সরকার, সহকারী কমান্ডার ইন চিফ বিমল কুমার দাস (জামতৈল) ও আমজাদ হোসেন মিলন (তাড়াশ)। অর্থ বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয় আব্দুল হাই তালুকদার (পিপুলবাড়িয়া) ও ইফতেখার মোবিন পান্না (সলপ)কে। তাদের আরো কয়েকজন সহযোগী দেওয়া হয়। অর্থ সংগ্রহ করতেন আব্দুল আজিজ মির্জা। তাকে সহযোগিতা করতেন লুৎফর রহমান মাখন (বেলকুচি), আব্দুল আজিজ সরকার (ঝাঐল) ও মোসাদ্দেক আলী (হোসেনপুর)। আমাদের শেল্টারের দায়িত্বে জসীম উ্িদ্দন (মোহনপুর), আসাদ (খানমরিচ) ও বাসেদ (তাড়াশ)। তারা ঘুরে ঘুরে আমাদের এই বিরাট বাহিনীর নিরাপদ আশ্রয় ঠিক করতেন। পরিচালক লতিফ মির্জা তাদের সঙ্গে আলোচনা করে শেল্টারের স্থান নির্বাচন করতেন।
আমরা প্রতিদিন সন্ধ্যায় খাওয়াদাওয়া সেরে পুরনো শেল্টার ছেড়ে বের হতাম। নতুন শেল্টারে পৌঁছতে পৌছতে গভীর রাত হয়ে যেত। ভোরে সেখানে পিটি-প্যারেড, তারপর নাস্তা শেষে অস্ত্র প্রশিক্ষণ। তখন আমরা গ্রামের মানুষের সাথে মেলামেশার সুযোগ পেতাম। গ্রামের মানুষ আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে সহযোগিতা করতো, আবার গ্রামের মানুষের কাছে থেকে কখনো কখনো মুষ্ঠির চালও চেয়ে নিতাম। সকালে বিভিন্ন সেকশনের বাজার খরচ হেডকোয়ার্টার থেকে দিয়ে দেওয়া হতো। স্থানীয় বাজারঘাট থেকে বাজার করে নিয়ে আসতো সেকশনের যিনি রান্নাবাড়ির দায়িত্বে থাকতেন। এ সময় কিছু হাত খরচও দেওয়া হতো। এ ভাবেই পলাশডাঙ্গার প্রতিটি কাজ নিয়মে বাঁধা পড়ে একটি নিয়মিত বাহিনীর মতো।

পলাশডাঙ্গার বিচরণ এলাকা হয়ে ওঠে সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, পাবনা, নাটোর, বগুড়া অঞ্চল। পলাশডাঙ্গা প্রায় সত্তুরটি ছোটবড় যুদ্ধে অংশ নেয়। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলো হচ্ছে ভদ্রঘাট, ব্রহ্মগাছা, বনওয়ারীনগর ফরিদপুর থানা, তাড়াশ থানা, গুরুদাসপুর থানা, কাশিকাটা কাটেঙ্গা রাজাকার ক্যাম্প, সলঙ্গা রাজাকার ক্যাম্প, কইডাঙ্গা, দিলপাশার, কালিয়াহরিপুর রেলব্রিজ ইত্যাদি। আমাদের কাছে এক্সপ্লোসিভ না থাকায় এসব ব্রিজ ধ্বংস করতে পারিনি। আমাদের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হান্ডিয়াল নওগাঁর যুদ্ধ। এ যুদ্ধে প্রায় দুই শ’ রাজাকার ও এক কোম্পানি পাকসেনা নিশ্চিহ্ন হয় আমাদের হাতে। জীবিত ধরা পড়ে একজন ক্যাপ্টেনসহ ১২ পাকিস্তানি সৈনিক। একটি মেসিনগানসহ বেশ কিছু পাকিস্তানি অস্ত্র আমাদের হাতে আসে। এক যুদ্ধে আমরা নৌকায় উঠেছিলাম, এ যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে আমাদের নৌকা ছেড়ে দিতে হয়, কারণ বর্ষা চলে যাওয়ায় চলনবিল তখন অনেক সংকুচিত হয়ে গেছে। অপরদিকে, এ যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে আমরা প্রায় গুলি শূন্য হয়ে পড়ি। এছাড়াও নওগাঁ যুদ্ধের পর চলনবিলের চারপাশের গ্রামগুলোতে ভয়াবহ নির্যাতন অগ্নিসংযোগ শুরু করে পাকিস্তানিরা। গুলির প্রয়োজনে আমরা সিদ্ধান্ত নেই পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে রৌমারী যাওয়ার। নানা বিপদ সঙ্কুল পথ পেরিয়ে বিমান হামলার শিকার হয়ে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে পৌঁছাই রৌমারী। সেখানে বাহিনীর অন্যদের রেখে পরিচালক আব্দুল লতিফ মির্জা, আব্দুল আজিজ মির্জা, লুৎফর রহমান মাখন, আব্দুল আজিজ সরকার, হেলাল, মোসাদ্দেক হোসেন (হোসেনপুর) ও আমি প্রবাসী সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে চলে যাই কোলকাতায়।

অনুলিখন : সাইফুল ইসলাম