এপিটাফ ॥ শিল্পী নাজনীন


কদবানুর এই অনন্তযাত্রা বিষণ্ন, হতাশ এক বোধে বিবশ, আচ্ছন্ন করে দেয় মোহর আলীর জরাগ্রস্ত, জীর্ণ শরীর। মানসিক বৈকল্য ঘিরে ধরে আষ্টেপৃষ্টে। কদবানু শেষবারের মতো কী একটা বলে, ঠিক বোঝা যায় না। জীবনকে ছেড়ে যাওয়ার অতৃপ্তি আর অপূর্ণতা ঘরময় কেমন গুমোট, গোপন হাহাকার হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। শেষবারের মতো ছেড়ে দেয়া দীর্ঘশ্বাস আর বলতে না পারা অস্ফুট কথাটি, করুণ, মিহিন সুর তুলে অনেকটা ফিসফিসানির মতোই গা শিরশিরে বোধ জাগিয়ে মিলিয়ে যায় হাওয়ায়।
দমবন্ধ মোহর আলী নিশ্চল পড়ে থাকে বিছানায়, অনুভবে কদবানুর অনন্তযাত্রা গেঁথে নিয়ে চোখ বন্ধ করে অপেক্ষা করে ভোরের।

শেষদিকে প্রচণ্ড কষ্ট পায় কদবানু। শ্বাসকষ্ট, গলার কাছে একদলা শ্লেষ্মা জমে বাধাগ্রস্ত করে তার ফুসফুসে অম্লজানের অবাধ যাতায়াত। ঘড়ঘড় শব্দ অনেকক্ষণ বুদবুদ তুলে ঘুরে বেড়ায় ঘরের রুগ্ন, অস্বাস্থ্যকর হাওয়ায়। মোহর আলী চেষ্টা করে শব্দ করতে, পাশের ঘরে ঘুমন্ত ছেলে-বউকে জাগাতে, নিদেনপক্ষে কদবানুর অনন্তযাত্রায় খানিকটা অন্তত সাহস যোগাতে। কিন্তু বহুদিন আগেই বিশ্বসংসারের সাথে শাব্দিক যোগাযোগ ছিন্ন করে নিথর বিছানায় পড়ে থাকা তার অথর্ব, অকেজো শরীরে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল যে ক্ষয়াটে দুটি চোখ, তারা এসব পারে না কিছুই। কদবানুর এই অপ্রত্যাশিত প্রস্থানে মোহর আলীর সচল চোখদুটি তাই উষ্ণ কফোঁটা জল ঝরিয়ে সংসারের সাথে সব রকম লেনদেন আপাতত চুকিয়ে শ্রান্তিতে মুদে যায়। আর মোহর আলী, মূলত তার মস্তিষ্ক, যে এখনও নিজেকে মোহর আলী বলে দাবী করে, কেউ এই নামটি উচ্চারণমাত্র যার নির্দেশে সচল চোখদুটি এখনও উজ্জ্বল, জীবন্ত হয়ে পৃথিবীর সাথে সংযোগস্থাপনে ব্যস্ত হয়, সে, অপেক্ষা করতে থাকে দিনের। অপেক্ষা করতে থাকে জীবনের। পৃথিবী থেকে কদবানুর বিদায়পর্বটা সে মেনে নেয় নীরবে, সাক্ষীও হয়, কিন্তু সে খবর পৃথিবীকে জানানোর অক্ষমতা তাকে ভেতরে ভেতরে আরও হতাশ, ম্লান আর নিষ্প্রভ করতে থাকে।

অথচ এমন হওয়ার কথা নয়। মৃত্যুর জন্য মোহর আলীর অপেক্ষা বহুদিনের। বহুকাল থেকে দিন গোনা। কদবানু প্রতিদিন সে আগমনকে ত্বরান্বিত করতে মোহর আলীর গু-মুত পরিষ্কার করেছে, স্বামীর মৃত্যু কামনায় কায়মনোবাক্যে প্রার্থনাও করেছে তিনবেলা, তাকে শুনিয়ে শুনিয়েই। সেসব শুনে প্রতিবাদ করবে তেমন সামর্থ্য যদিও ছিল না মোহর আলীর, তবু, প্রতিবাদ সে করেওনি আদতে। বরং তার সচল মস্তিষ্ক এই ভেবে সুখি হতো যে, কোনো এক ভোরে ঘুম ভেঙে কদবানু দেখবে মোহর আলীর চোখে আর ভাষা নেই, বাকী শরীরের মতোই নিথর, নিষ্প্রভ তারাও, মোহর আলী বলে মূলত পৃথিবীতে কারও অস্তিত্বই নেই আর। তখন শোচনায়, দুঃখে ভরে উঠবে কদবানুর অন্তর, ডুকরে কেঁদে উঠবে সে নিজের এতদিনের ভ্রান্তিময় আচরণে, চোখের জলে একাকার হবে তার স্বার্থময় ভুবন। নিজের মনে এসব কল্পনা করে নিজেই মনে মনে আহ্লাদিত, পুলকিত হয়ে উঠত এতকাল মোহর আলী, চোখের কোনে কফোঁটা জলও অজান্তেই গড়িয়ে পড়ত আনন্দে। কিন্তু এখন, কদবানু নিজেই যখন অনন্তপ্রস্থানরত, লাশ হয়ে পড়ে থাকে মোহর আলীর আধহাত দূরে, তখন প্রবল অভিমানে ভরে ওঠে মোহর আলীর মন। কদবানুর এই সীমাহীন স্বার্থপরতায়, অর্থহীন নির্বুদ্ধিতায় দমবন্ধ, দিশেহারা লাগে তার। মনে হয়, কদবানু ইচ্ছে করেই একজীবনে পাওয়া সমস্ত অবহেলা আর বঞ্চনার শোধ তুলল মোহর আলীকে রেখে এমন স্বার্থপর যাত্রার মধ্য দিয়ে। আর তখনই মোহর আলীর মনে একলাফে হানা দেয় তার অন্ধকার অতীত। যেখানে কদবানুর জন্য কেবলই জমা ছিল অপমান, অবহেলা, অসম্মান। আহা! তা বলে এভাবেই কি শোধ নিতে হয়, কদবানু! এই এমন করে!

নিজেরই ফেলে আসা ভুলের তাপে পুড়তে পুড়তে সকালের অপেক্ষা করে মোহর আলী, অপেক্ষা করে কদবানুর প্রাণহীন শরীরও। মোহর আলীর অপেক্ষা অন্য এক ভোরের, কদবানুর অপেক্ষা নতুনতর এক অভিযাত্রার। অপেক্ষাই নিয়তি। জীবনের, মৃত্যুরও।

ভোরের দিকে মাহেলার চোখ ভারি হয়ে আসে আরও। কদবানু বলে, এসব শয়তানের কারসাজিরে বউ, বুচ্চিস? নামাযেত্তে দূরি লাহার লেগিই শয়তান আইসে চোক জুইড়ে বইসপের চায়। যাতে মানুষ নামায না পইড়বের পারে। গুনাহ্ না হরলি তো মানুষ দোজকে যাবি ল, সেহন তো শয়তানেক হেহ্লা পইচে মরা লাগবি সেহ্নে, তাই সে ফজরের অক্তে অবা চোহিরপর আইসে বসে। খবরদার, পাত্তা দিবি নে, উটে পড়বি টপাত হরে। একবার উটলি পরে চোহিত্তে শয়তান পলায়, গোমও পলায়।

প্রায় প্রতিদিনই কদবানু মাহেলাকে এসব উপদেশ দেয়, মাহেলাও চুপচাপ শোনে, কিন্তু ঘুম থেকে ভোরবেলা উঠে ফজরের নামায আর পড়া হয় না তার। কদবানু তাতে বিশেষ নাখোশ হয় কিনা বোঝা যায় না গেলেও তাকে নতুন উদ্যোমে মাহেলাকে উপদেশ দিতে দেখা যায়। বস্তুত, সংসারে এখনও এই একটা ক্ষেত্র আছে, যেখানে তার উপদেশ পুরোপুরি গৃহিত না হলেও অগ্রাহ্য হয় না, অন্তত মাহেলা অন্যসব ব্যাপারের মতো তাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবার সাহস করে না, সেটুকু ভেবেই কদবানুর গভীর পরিতৃপ্তি। পানের সাথে আরেক হাতা চুন নিয়ে সে তার খয়েরি, উঁচু দাঁতের ফাঁকে গুঁজে চিবোয়, পিক ফেলে শব্দ করে।

কোনো কারণ ছাড়াই মাহেলার ঘুমটা ভোর ভোর ভেঙে যায় আজ। কী এক অস্বস্তি ভর করে। সে কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে, হাই তোলে। জানালা গ’লে আসা আবছা আলোয় চোখ মেলে ঘরের ভেতরটা দেখার চেষ্টা করে। একইরকম। অন্য দিনের মতোই। কোনো অঘটন নেই। কোনো অশোভন নেই। শরীফের মুখটা অস্পষ্ট। বিশাল হা। নাক ডাকে বিকট স্বরে। কিন্তু এ শব্দে মাহেলা অভ্যস্ত। এতে ঘুম ভাঙে নি। তাহলে? কান পেতে কিছু একটা শোনার চেষ্টা করে মাহেলা। একটু বেশি নীরব মনে হয় সকালটা। একটু অধিকরকম নির্জন। গা ঝাড়া দিয়ে শেষে উঠে পড়ে। কলপাড়ে গিয়ে হাত-মুখ ধোয়, প্রাতঃকৃত্য সারে। তারপর মুখটা একটু কুঁচকে ওঠে বিরক্তিতে। কদবানু এতক্ষণে উঠে সকালের কাজ অনেকটা গুছিয়ে রাখে অন্যদিন। ছেলের সংসারে বিনে পয়সার ঝি হিসেবে তার আসন পাকাপোক্ত হয়েছে মোহর আলী বিছানায় পড়ার পরপরই। এতবেলায়ও তার না ওঠাটা বরদাস্তযোগ্য নয় মোটেই। মাহেলা বিরক্তি নিয়ে একটুক্ষণ কী ভাবে, উঠোনে ছড়ানো বাসি ময়লায় চোখ পড়তে মেজাজ আরও খারাপ হয়। কদবানুর এই তাহলে আক্কেল! এতবেলা অবদি ঘুমোয়! আরেকটু পরেই শরীফের বের হওয়ার সময় হবে, ছেলে-মেয়ে দুটো উঠে কিছু মুখে দিয়ে স্কুলে যাবে, আর কদবানুর কি-না এখনও ওঠার নামটি নেই! কিন্তু এমন তো করে না সে। আজ হলো কী।

ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে মাহেলা হাত দিয়ে একটু শব্দ তোলে হাতলে। তারপর প্রায় ভুলে যাওয়া, অনভ্যস্ত গলায় ডাকে, মা!
কোনো সাড়া নেই। কদবানুকে আজকাল আর মা বলে ডাকার তেমন প্রয়োজন পড়ে না। সম্পর্কটা ঢের আগে প্রভু-ভৃত্যে রূপ নিয়েছে। তবু কিছু একটা বলতে হয় বলেই বহুকালের সেই পুরনো, ভুলে যাওয়া শব্দটা একটু অস্বস্তি আর অনভ্যাসে আবার ডেকে ওঠে মাহেলা, মা!

কেমন একটু লাগে। দ্বিধা, দ্বন্দ্ব। এতবেলা করে ঘুমোয় না কদবানু। তার ঘুমও পাতলা। একটুতেই জেগে যায়। আজ হলো কী? এতবার ডাকায়ও কেন সাড়া নেই কোনো? জোরে ধাক্কা দেয় মাহেলা। ভেজানো দরজা। খুলে যায়।
ঘরটা অতিরিক্ত নীরব, শান্ত। একটু শীতলও। গুমোট গন্ধ, দরজা-জানালা বন্ধ থাকায় প্রথমে ঝাপসা দেখায় সব, অস্পষ্ট। অন্ধকার চোখ সয়ে আসে ধীরে। মোহর আলীর বুকের ওঠা-নামাটা চোখে পড়ে প্রথমে। তারপর চোখে পড়ে তার বন্ধ দুটো চোখ, সেখান থেকে গড়িয়ে পড়া ক্ষীণ, সুক্ষ্ণ জলধারা। বাতাস শোকে মাহেলা, কী একটা আভাস লাগে নাকে। চোখ পড়ে কদবানুর দিকে। কদবানুর শোয়াটা বড় চোখে ঠেকে। কেমন বেয়াড়া রকম, টানটান। অথচ সে শোয় গুটিসুটি, নিজের উপস্থিতিতে নিজেই সবচে বেশি মিইয়ে থাকে কদবানু, সবসময়। পায়ে পায়ে এগোয় মাহেলা। একটু গা ছমছম করে, মনের মধ্যে কু গায় কেউ। কদবানুর মাথার কাছে গিয়ে সাবধানে দাঁড়ায়, একটু ঝুঁকে বোঝার চেষ্টা করে কিছু। কদবানু স্থির, সটান। কপালে হাত রাখে মাহেলা। চমকে ওঠে ভীষণ। শীতল, নৈর্ব্যক্তিক। বুকের ভেতর তুমুল মাদল নিয়ে সে হাত রাখে কদবানুর নাকের কাছে। নেই। পৃথিবীতে হাওয়া নেই কোনো, বায়ুশূন্য পৃথিবীটা হঠাৎই ভীষণ দুলে ওঠে। টাল সামলে পড়তে পড়তে মাহেলা ডুকরে ওঠে, ওরে আল্লারে, ওরে মারে…
শরীফ ওঠে, ছেলে-মেয়েরাও। ভীড় বাড়ে ধীরে। কথা। মরার সময় একটু জল পর্যন্ত পায় নি, কিংবা কানে পায় নি আল্লাহর নাম।

আহা। আহা। না জানি কখন মরেছে! শক্ত হয়ে গেছে লাশ। হাহুতাশ বাতাসে ভর করে ওড়ে। ওড়ে নানা ফিসফাস, কানাঘুষা। মাহেলার শোকটাকে বেশিরভাগই নকল, লোক দেখানো বলে মত দেয়। কেউ কেউ আবার সান্ত্বনাও দেয়, কয়েকজন খুঁজে-পেতে প্যারাস্যুটের ডিব্বাটা এনে মহা আয়োজনে তেল মাখায় মাহেলার মাথায়। মাহেলা সুর করে, হাত-পা ছুঁড়ে, ভারি কসরত করে কাঁদে। যদিও তার চোখে তেমন একটা জলটল দেখতে পায় না কেউই। শরীফ থম ধরে বসে থাকে। পাড়ার মুরুব্বি গোছের কেউ কেউ তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে কয়েকবার। কিন্তু তার থমথমে বিরক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তারা অতি দ্রুত রণে ভঙ্গ দেয় আর তারপর শরীফের চেয়েও দ্বিগুণ শোক চোখ-মুখে লেপে নিয়ে বসে থাকে। শরীফের ছেলে-মেয়ে দুটোকে যথার্থই মর্মাহত, দুঃখী দেখায়।

কেঁদেকেটে চোখ-মুখ ফুলিয়ে ফেলে তারা। কদবানুর সাথে তাদের সম্পর্কটা ঠিক বৈষয়িক নয়। কদবানু ছিল নাতি-নাতনি বলতে অজ্ঞান। ছেলে-মেয়ে দুটোও কদবানুকে ভালোই বাসতো। মাঝে মাঝে কদবানুর সাথে তাদের বাপ-মায়ের করা অন্যায় আচরণের প্রতিবাদেরও চেষ্টা করত। দাদীর এই অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর জন্য তারা প্রস্তুত ছিল না একেবারেই। কেউই ছিল না আসলে। বরং সবাই একধরণের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল মোহর আলীর মৃত্যুর। সংসারে তার আর কোনো প্রয়োজনই ছিল না, নাই। নিতান্তই অদরকারি বোঝা হয়ে, অপ্রয়োজনীয় জঞ্জাল হয়ে বহুদিন ধরে সে পড়ে আছে, পরিত্যক্ত। কদবানুর পরিশ্রমটাকে ঢেরগুণ বাড়িয়ে তুলতেই সে মরার মতো পড়ে আছে বিছানায়, সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষের মতোই তিনবেলা দিব্যি খাচ্ছে-দাচ্ছে আর হেগে-মুতে বিছানা ভাসাচ্ছে নিত্যি। তার মৃত্যুটা তাই কাম্য ছিল সবারই।
কদবানুর দাফন-কাফন শেষে যে যার কাজে ফেরায় পাতলা হয়ে যায় বাড়ি। দুপুরে, কদবানুকে নিয়ে যাওয়ার পর, গ্রামের বয়স্ক কজন মুরুব্বি মিলে মোহর আলীকে গোসল করিয়ে, খাইয়ে যে যার বাড়িতে চলে গেলে, আরেকবার ডুকরে কেঁদে ওঠে মাহেলা। এবং তার এবারের কান্নাটাকে, কেন কে জানে, ভাণ বলে মনে হয় না আর। কদবানুর এই হঠাৎ নাই হয়ে যাওয়ার গুরুত্বটা অনুধাবন করতে পেরে তার শোক এবার উথলে ওঠে আরও। কদবানুর নাই হয়ে যাওয়া মানে তার বিনে পয়সার ঝি নাই হয়ে যাওয়া, সকালে বেলা করে ঘুম থেকে ওঠার সুখ নাই হয়ে যাওয়া। কদবানুর নাই হয়ে যাওয়া মানে সংসারে তিনবেলা হাড়িঠেলার অসুখ সামলানো, সমস্ত ঝুট-ঝামেলা ঘাড়ে নেয়া, একমাত্র ছড়ি ঘুরাতে পারার মানুষটাকে হারানো, সেইসাথে অথর্ব শ্বশুরের দেখভালের মতো কঠিনতম ঝক্কি ঘাড়ে এসে পড়া।

মোহর আলীকে একবেলা করে খাবার দেয়ার নির্দেশ দেয় শরীফ। পাড়ার গরিব এক বুড়ি কিছু টাকার বিনিময়ে রাজী হয় তাকে হপ্তায় একদিন গোসল করানোয়। প্রতিদিন সে রাজি হয় না কিছুতেই। একবেলা সে কোনোমতে নাকে-মুখে কাপড় চেপে খাবার গেলায় মোহর আলীকে, তা-ও আধপেটা। তবু মোহর আলীর হাগা-মুতার ঘটা কমে না। দুর্গন্ধে ঘরের আশপাশে টেকা যায় না আর। কদবানুর ছায়া শীঘ্রই মুছে যায় বাড়ি থেকে, দুর্গন্ধ জেগে থাকে শুধু। যেন কদবানু নামে কেউ ছিলই না কোনোদিন এ বাড়িতে, এই দুর্গন্ধই ছিল কেবল, আছে, অনন্তকাল থেকে। পাড়ার লোকজন কানাঘুষা করে, সব পাপের শাস্তি, পাপ কখনও বাপকেও ছাড়ে না, হুঁ।

কদবানুর বিয়ে হয়ে আসার সময় বাপের দেয়া যে গাই গরুটা নিয়ে ঢুকেছিল এ বাড়িতে, কদবানুর সাথে সাথে সে-ও বছরান্তে বাছুর বিইয়েছে নিয়ম করে। গোয়ালে হালচাষের জন্য যে দামড়া গরুদুটো বাঁধা থাকে সবসময়, তারাও সেই গাইয়েরই উত্তরসুরি। কদবানুকে দাফন শেষে ফিরে আসতে না আসতেই দামড়া জোড়া বিকট শব্দ করে আছড়ে পড়ে মাটিতে, প্রবল যন্ত্রণায় ছটফট করে কিছুক্ষণ, তারপর চোখ-মুখ উল্টে, মুখ দিয়ে গ্যাঁজা তুলতে তুলতে পটল তোলে, একসাথে দুটোই। গ্রামের মানুষ অতি উৎফুল্ল হয়ে বলে, ঐ যে। মোহর আলীর বাড়ি থেকে লক্ষ্মী চলে গেল এবার। এখন বুঝবে মজা!

কিন্তু মোহর আলীকে মজা বোঝায় তেমন আগ্রহ প্রকাশ করতে দেখা যায় না। সে তেমনি জড়ের মতো পড়ে থাকে। সকালে একবেলা পাড়ার বুড়িটা এসে তাকে খুব অনিচ্ছে আর অবেহেলার সাথে যাহোক কিছু গিলিয়ে যায়, হপ্তায় একদিন এসে গোসল করিয়ে যায়, আর বাড়িময় ছড়িয়ে থাকা দুর্গন্ধ, এছাড়া তার অস্তিত্বের আর কোনো প্রমাণই মেলে না। কিন্তু বিরক্তি চেপে বসে মাহেলা আর শরীফের মধ্যে, তাদের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে, আশেপাশের আরও সব মানুষদের মধ্যেও। একটা মানুষ, যার আর কোনো প্রয়োজনই নাই সংসারে, তবু সে চেপে আছে জগদ্দল পাহাড়ের মতো, হাজারো অসুবিধের কারণ হয়ে, হেগে-মুতে যাচ্ছেতাই করে, এ অত্যাচার কাহাতক আর সহ্য করা যায়। সব রাগ গিয়ে পড়ে শেষে কদবানুর ওপর। হারামি বুড়ি, মরার এত তাড়া কিসের ছিল তার। আর সময় পেল না।

গরুদুটো মরলে তা ফেলে আসা হয় দূরের মাঠে। দিনকতক পরেই, গরুর পচা গন্ধে পেট পচে ওঠে মানুষের, মাঠের কাজ ফেলে তারা ফেরে বাড়ি। তারপর দল বেঁধে হাজির হয় গিয়ে মোহর আলীর বাড়িতে। ভরদুপুরে শরীফ তখন ঘরের দাওয়ায় সবে শরীর মেলেছে, পাশে মাহেলা তার শরীরে আচ্ছাসে তেল দিয়ে দলাইমলাই করছে, আবেশে চোখ প্রায় মুদে আসে শরীফের। ক্ষীণ একটু নাসিকাগর্জনও শোনে বলে ভ্রম হয় মাহেলার। ঠিক তখন, মাঠফেরত লোকগুলো হাঁক ছাড়ে জোরে, ও পরামানিকির ব্যাটা, বাড়িত আচো নাহি?

বিরক্ত শরীফ গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে, বিড়বিড় করে লোকগুলোকে অভিশাপ দেয়, অশ্রাব্য ভাষায় বকে, তারপর গায়ে পাঞ্জাবী চড়িয়ে কাচারিতে গিয়ে বসে। শুকনো, ভারি গলায় বলে, কী কবা তুমরা, কও, শুনি।
গলাখাঁকারি দিয়ে, নাকে কাপড় চেপে একজন বলে, বাপুরে শোনেন, আপনের বাড়িত তো গন্দের চোটে আসার যো নাই, সে আমারে না আসলিউ চলবি, কিন্তু মাটে তো আমারে সগলেরই যাতিই অবি রে বাপু। আমরা কাম না হরলি প্যাটে বাত আসপি কোন্তে কন তো, খাতি দিবি কিডা?
ক্যা? মাটে যাবা তাতে অসুবিদেডা কী? কী অয়চে মাটে?
কী অয়চে জানেন না? মরা গরু দুডে যে মাটে ফেলা থুয়াইচেন, উয়ো তো শিয়েল-কুত্তোয়ও ছোঁচ্ছে না, চিল-শগুনিও খাচ্ছে না। পচে যে গন্দ ছাড়েচে, আমরা মাটে যাব কেবা হরে? আপনে বাপু এটা কিচু হরেন। লোকজন দিয়ে উডা মাটি চাপা দিয়ার ব্যবস্তা হরেন। তা না অলি আমরা কাম-কাইজ কইরবের পারতিচিনে।
অপমানে, বিরক্তিতে চোখ-মুখ লাল হয়ে ওঠে শরীফের। নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে পরে বসা থেকে। ফ্যাসফেসে, নিচুস্বরে বলে, আচ্চা, দেকতিচি কী করা যায়।
চলে যায় সবাই। তাদের গুঞ্জনও নিভে যায় ধীরে। তবে দুয়েকটা শব্দ ঠিকই ভেসে ভেসে চলে আসে কানে। শরীফের, মাহেলার, ছেলে-মেয়েদের, পড়শীদের, এমনকি জড়প্রায় মোহর আলীরও। সুদখোর, চরিত্রহীন, জুলুমবাজ, বদমাশ ইত্যাকার শব্দগুলো ভাসতে থাকে হাওয়ায়, উড়তে থাকে ডালপালা মেলে। যৌবনে মোহর আলীর লাম্পট্য ছিল সীমাহীন। সুদে ব্যবসা করে টাকার পাহাড় জমিয়েছিল। যে বুড়ি তাকে গোসল করানো, খাওয়ানোর দায়িত্ব নিয়েছে পেটের দায়ে, শোনা যায় যৌবনে সে-ও মোহর আলীর লালসা থেকে বাদ যায়নি। মোহর আলীকে গোসল করানোর সময় তাই বুড়িটা ইচ্ছে করেই শরীরে জোরে ডলা দেয়, সময় সময় থুতুও ছিটায়। ইচ্ছে করে কষে একটা লাথি দেয়। কিন্তু আপাতত সেটা সম্ভব নয় জেনে, হারামজাদা, খচ্চর বুড়ো! -বলে বিড়বিড় করতে থাকে বুড়ি।

মোহর আলীর ঘরে মাঝে মাঝে চোখ-কান বুঁজে, নাকে কাপড় চাপা দিয়ে ঢোকে শরীফ। গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠে তার। আস্ত এক কৌটা পাউডার সে ঢেলে দেয় মোহর আলীর বিছানায়, শরীরে, আশেপাশে। গন্ধ কমে না। বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে শরীরে পচন ধরেছে মোহর আলীর। কিলবিলে পোকা। বাইরে এসে কলপাড়ে বসে হড়হড় করে বমি করে মোহর আলী। মাথা ঘোরে, অসুস্থ লাগে তার। শুয়োরের বাচ্চা! -দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে। কাকে বলে, কেন বলে বোঝে না নিজেও। আশ্চর্য ব্যাপার হলো, মোহর আলীর কোনো পরিবর্তন নেই। না উন্নতি, না অবনতি। তার খাবার যে তিনবেলা থেকে একবেলায় নামিয়ে আনা হলো, গোসল গিয়ে ঠেকল হপ্তায় একদিনে, বিছানাপত্তর পরিষ্কারেরও নেই কোনো ঠিক-ঠিকানা, তবু সে যে-কে-সেই। বরং, শরীফের মনে হয় তেমন, মোহর আলীর চোখ যেন দিন দিন আরও উজ্জ্বল আর তীক্ষ্ণ হয়ে উঠছে! যেন সে চোখ দিয়েই গ্রাস করে নেবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড! বড় বড়, ঘোলাটে চোখে সে তীব্র ভর্ৎসনায় যেন পুড়িয়ে দিতে চায়, উড়িয়ে দিতে চায় তার প্রতি জমা হওয়া সব অভিযোগ আর অপমান, অবহেলা আর অসম্মান।

মাহেলার বিরক্তি চরমে ওঠে। দুর্গন্ধে জীবন অতিষ্ঠ। সে শরীফকে কড়া নির্দেশ দেয়, এম্বা আর চলবি নে। কিচু এটা ব্যবস্তা নিয়া লাগবি। আমার ছাওয়াল-মিয়া দুডে শুহো মইলে।
কী কইরবের কচ্চ? -অসহায়, করুণ কণ্ঠে বলে শরীফ। জীবন তারও অতিষ্ঠ।
ডাক্তার দেহাও তুমার বাপেক।
দেহাই নাই? ডাক্তার কয়া দেচে লাব নাই কোনো, মনে অচ্চে জানো না সিডা?
আবার দেহাও। বাঁচপি নে জানো যেহন সেহন আর বাঁচা থুয়ে লাব কী!
চমকে মাহেলার মুখের দিকে তাকায় শরীফ। মাহেলা নির্বিকার। যেন কী বলেছে সেটা সে বোঝেই নি, অথবা বলেই নি কিছু।
কী কও? -ধমকে ওঠে শরীফ।
মেলা সইজ্য হরিচি। আর পারব নানে। অয় এটা ব্যবস্তা নিবা আর নায়তো আমি ছাওয়াল-মিয়াক সাতে হরে যেনে চোক যায় চলে যাব, এই কয়া থুলাম।

গোটাস্কুল ভেঙে পড়ে মোহর আলীর বাড়িতে। ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারী সবাই হাজির। ক্লাশ বন্ধ ঘোষণা করা হয় সেদিনের মতো। মোহর আলী ছিল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি। তার সম্মানে সবাই মোহর আলীর বাড়ি সংলগ্ন কবরস্থান জিয়ারতে অংশ নেয়।
কবরে জ্বলজ্বল করে সোনালী অক্ষরের এপিটাফ। বহু পয়সা খরচ হয়েছে তাতে, জৌলুস দেখে বোঝা যায়। কদবানু আর মোহর আলীর পাশাপাশি কবর। সারাগ্রাম অংশ নেয় খানায়। সারা বাড়ি গন্ধে ভুরভুর।
মোহর আলীর ঘরটা আলোকোজ্জ্বল, ঝলমলে। হালকা একটু আগরবাতির ধোঁওয়া আলোটাকে যেন উস্কে দেয় আরও। আগরবাতি, আগর-লোবানের গন্ধ ছড়ানো ঘর জুড়ে। মাহেলা হাসিমুখে সব তদারক করে। শরীফও ব্যস্ত হয়ে এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করে। গ্রামের ওষুধ বিক্রেতা কাম ডাক্তার ছেলেটাকে যত্নআত্মি করে খুব। কৃতজ্ঞতায় মাথা নেড়ে বলে, খাও, প্যাট ভইরে খাবা কিন্তুক। তুমার ওষুদি বালো কাম অয়।
ছেলেটা মাথা নিচু করে খায়। চোখ তুলে তাকাতে সাহস করে না। তার মনে হতে থাকে, বড় বড়, অদৃশ্য দুটি ঘোলাটে চোখ তাকে দূর থেকে দেখে। ভস্ম করে দিতে চায়…