কবিকণ্ঠ, কবিতাপাঠের আসর ও কবি শ. ই শিবলী ॥ শ্যামল দত্ত


(কবিকণ্ঠ, সাপ্তাহিক কবিতা পাঠের আসর, সাপ্তাহিক বিবৃতি, সাপ্তাহিক আরশী’র সম্পাদক, কবি, সাংবাদিক, লেখক, আইনজীবী ও পাবনার অন্যতম সাংস্কৃতিক সংগঠক প্রয়াত শফিকুল ইসলাম শিবলী (শ.ই শিবলী)র ৬৫ তম জন্মদিন উপলক্ষে নিবেদিত গদ্য।)


‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই…’ গানটি শুনলেই একের পর এক ছবি এসে যেন ভিড় করে চোখের সামনে। না, কফি হাউসের সেই আড্ডার ছবি নয়। আমাদের আড্ডার ছবি। মনে হয় এ আড্ডাতো আমাদেরও ছিল। একবারেই আমাদের নিজস্ব আড্ডা। কবিকণ্ঠের আড্ডা।
কবিতা চর্চার বোধহয় একটা বয়স থাকে, আর সে বয়সে সবাই হয়ে ওঠে কবি। বোধহয় সে রকমই একটা বয়সে আমাদের আড্ডাটা গড়ে উঠেছিল। কবিতার আড্ডা।

পাবনার মত একটি মফস্বল শহরে ১৯৭৮-এর কোনো এক সময় এই আড্ডার জন্ম হয়েছিল। কোনো ঘটা কিংবা আড়ম্বরের মধ্যে নয়, নিছক আড্ডার মধ্যেই জন্ম হয়েছিল একটি কবিতা সংগঠনের। কবিকণ্ঠ। শহরের একমাত্র প্রধান সড়ক আবদুল হামিদ রোডের প্যারাডাইস রেস্টুরেন্টে চায়ের টেবিলে জন্ম হয়েছিল এ সংগঠনের। তারপর থেকে সপ্তাহের প্রতিটি শুক্রবার কবিকণ্ঠের স্বরচিত কবিতাপাঠের আসর বসেছে পাবনা তথ্যকেন্দ্রে। কখনও শহীদ বুলবুল কলেজের ছাত্রাবাসের সবুজ চত্বরে, ছাত্রাবাসের উন্মুক্ত ছাদে। আবার কখনো শহীদ আমিনউদ্দিন আইন কলেজের সিঁড়িতে অথবা তথ্যকেন্দ্রের উন্মুক্ত আঙিনা তথা মওলানা কসিমুদ্দীন আহমেদ স্মৃতিকেন্দ্রের মাঠে। শহরের নতুন ব্রিজের নিচে ইছামতির ধারে মওলানা কসিমুদ্দীন আহমেদ স্মৃতিকেন্দ্র- সেখানেই সে সময় জেলা তথ্যকেন্দ্রের অফিস। কবিকণ্ঠের আসর বসেছে বেশি এখানেই। এ আসরের অধিকাংশ সদস্যই সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্রছাত্রী। এছাড়া শহীদ বুলবুল কলেজ এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী এমনকি অনেক পেশাজীবী ছিলেন কবিকণ্ঠের সক্রিয় কর্মী।
শহরের অন্যতম সাংস্কৃতিক সংগঠক শ. ই শিবলীর নেতৃত্বে যারা সক্রিয় ভাবে যুক্ত ছিলেন এই সংগঠনের সাথে, তাদের মধ্যে অনেকেই আজ কর্মজীবনের বৃহত্তর দায়িত্ব পালন করছেন দেশে অথবা দেশের বাইরে। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে যাদের নাম, তার হচ্ছেন-আতাহার আলী, আবু মহম্মদ রইস, মুহম্মদ রাশেদ, রুমী খোন্দকার, জাহাঙ্গীর উল হক, স ম সুবহানী বাবু, মুকুল আহমেদ, দীপকরঞ্জন চৌধুরী, সৈয়দ মোসতাফা আবর সতেজ, শফিকুল ইসলাম রিপন, আবু হেনা মোস্তফা কামাল লী, সমজিৎ পাল, শুচি সৈয়দ, নূরুল হক সোজন, কামাল আহমেদ, খায়রুজ্জামান কামাল, মাসুদ শেখ কানু, সেলিনা খান শেলী, ফয়জুল ইসলাম সুমন, আবদুস সবুর খান হা-মীম, অমল সরকার, গোলাম মোরশেদ মানিক, আবদুল কুদ্দুস সাগর, আবদুদ দায়ন, আবদুল্লা হেল বাকি, রেজাউল করিম সাব্বির রেজা প্রমুখ।

আমরা কবিতার আসর করেছি পাবনা শহরের শতবর্ষ প্রাচীন অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরিতে, প্রেসক্লাবে, শহীদ মিনারের পাদদেশে, বুলবুল কলেজে, পাবনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে এবং আরও অনেক স্থানে। পাবনার বাইরে শাহজাদপুর রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে, শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে, সিরাজগঞ্জ কলেজে এবং রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলায়।

‘কবিকণ্ঠে’র আড্ডাটা ছিল আসলে আলাদা এক ধরনের আড্ডা। স্বরচিত কবিতা পাঠ এবং আলোচনা এ আড্ডার মূল বিষয় হলেও কবিতা কিংবা আবৃত্তির ব্যতিক্রমী উপস্থাপনার চেষ্টা ছিল সবসময়ই। অভিনয়, সঙ্গীত, আলেখ্য, শব্দানুষঙ্গ ইত্যাদির ব্যবহারে ‘কবিকণ্ঠ’ এক আলাদা নিয়মে কবিতা পরিবেশনের চেষ্টা শুরু করেছিল। ‘কবিকণ্ঠ’র এই ব্যতিক্রমী চেষ্টায় সামিল হয়েছিলেন পাবনার বিভিন্ন সংগঠনের সংগীতশিল্পী, নাট্যশিল্পী এবং কলা-কুশলী। এদের মধ্যে ছিলেন ভক্তিদাস চাকী, সুদীপ্তা রায় পুতুল, আবুল কাশেম, প্রলয় চাকী, মলয় চাকী, কাজী আবদুর রাজ্জাক, মিনতি সান্যাল, সুলতান মুহাম্মদ রাজ্জাক, আমিনুর রহমান, কোবাদ আলী, মো. সোলেমান, এম এ মহসীন, পারভীন সুলতানা পাঁপড়ি, শিবানী নাগ, শাহনেওয়াজ খান স্বপন, নন্দকিশোর, পল্লব সান্যাল, পরজ চৌধুরী, আবদুর রশিদ, রীতা বসাক, আবদুল কাদের মন্টু, ইসমাইল হোসেন মন্টু প্রমুখ।

মনে পড়ছে ‘কবিকণ্ঠ’র প্রথম বর্ষপূর্তির উৎসবমুখর সেই সময়ের কথা। ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে পাবনার অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে জাঁকজমকপূর্ণ এক বিশাল অনুষ্ঠানে উদযাপিত হয়েছিল বর্ষপূর্তি। পাবনা ছাড়াও সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, চট্টগ্রাম এবং ঢাকা থেকে বিভিন্ন প্রতিনিধি এসেছিলেন। এ প্রথম বর্ষপূর্তিতেই ‘কবিকণ্ঠ’ পরিবেশন করেছিল এক ব্যতিক্রমী কবিতা আলেখ্য : ‘আমরা সুবর্ণগ্রামে যাবো’। পাবনায় অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরিতে যারা সেদিন অনুষ্ঠানটি দেখেছিলেন, বোধহয় আজও তারা মনে রেখেছেন সেদিনের কথা। কবিতার মতো একটি আবৃত্তিপ্রধান মাধ্যমকে অভিনয়, সংগীত, অভিব্যক্তি এবং সেই সাথে আলো আর শব্দের ব্যঞ্জনায় কত আকর্ষণীয় করে তোলা যায়, মফস্বল শহরের কবিতাকর্মীরা সেদিন তার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি সেদিন তাদের কাছে সহজলভ্য ছিল না কিন্তু তাদের অন্তর ভরা ছিল সৃষ্টির এক নতুন আকাঙ্ক্ষায়।

‘কবিকণ্ঠ’ই পাবনায় সর্বপ্রথম গুণীজন সংবর্ধনার প্রবর্তন করেছিল। সংবর্ধিত হয়েছিলেন পাবনার বিশিষ্ট কবি ওমর আলী এবং প্রবীণ নাট্যশিল্পী শ্রীতপনচন্দ্র লাহিড়ী।
প্রবীণ কণ্ঠশিল্পীদের নিয়ে সংগীতসন্ধ্যায় আয়োজনও ছিল ‘কবিকণ্ঠ’র নতুন এক উদ্যোগ। এ অনুষ্ঠানে পাবনা শ্রীমতী রেণু অধিকারী, শ্রীমতী রূপবাণী ঘোষ, মোজাম্মেল হোসেন, শ্রী শৈলেশ সান্যাল, দেলোয়ার হোসেন, শম্ভু জোয়ার্দারের মতো প্রবীণ শিল্পীরা অংশ নিয়েছিলেন। পাবনা প্রেসক্লাবের তৎকালীন স্বল্প পরিসর মঞ্চে হলেও এই সঙ্গীত সন্ধ্যার সুর-মূর্ছনা পাবনাবাসীকে আলোড়িত করেছিল।
ছোটদের আবৃত্তি প্রতিযোগিতার আয়োজনও করেছে ‘কবিকণ্ঠ’ বিভিন্ন সময়। ছোটদের বিভিন্ন সংগঠন এ সময় ‘কবিকণ্ঠ’র পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। অন্যান্য সংগঠনের মধ্যে পাবনা থিয়েটার ’৭৭; অরণি; বনমালী ইনস্টিটিউট; উদীচী শিল্পী গোষ্ঠি, পাবনা জেলা শাখা; ললিতকলা কেন্দ্র ইফা; কিশোর কুঁড়ির মেলা; সবসময়ই ‘কবিকণ্ঠ’র পাশে থেকেছে। বয়স্কদের মধ্যে যারা বিভিন্নভাবে ‘কবিকণ্ঠ’কে সহযোগিতা করেছেন, তাদের মধ্যে ছিলেন- অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন জাহেদী, অধ্যক্ষ এ আর শামসুল ইসলাম, অধ্যাপক শিবজিত নাগ, অধ্যাপক ফিরোজা বেগম, অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, অধ্যাপক খোন্দকার খালিকুজ্জামান, আনোয়ারুল হক, রবিউল ইসলাম রবি, আবদুল মতীন খান, রোখসানা ইসলাম, শ্রীমতী মীরা রায়, এডভোকেট খোরশেদ আলম এবং জি এস এম চিশতি প্রমুখ।

নিয়মিত কবিতাচর্চার পাশাপাশি প্রকাশনা ছিল ‘কবিকণ্ঠ’র আরেকটি দিক। বিচ্ছিন্ন এবং অনিয়মিতভাবে হলেও ‘কবিকণ্ঠ’র সদস্যরা বিভিন্ন সময় সাহিত্য সাময়িকী, লিটল ম্যাগাজিন ইত্যাদি বের করেছেন। আবার পাবনা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন সাময়িকী প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে বাছাই করে ‘কবিকণ্ঠ’ শ্রেষ্ঠ গল্পকার, শ্রেষ্ঠ কবি, শ্রেষ্ঠ নিবন্ধকার, শ্রেষ্ঠ প্রচ্ছদশিল্পী, শ্রেষ্ঠ সম্পাদক হিসেবে পুরস্কারও দিয়েছে। শুধু কবিতাকর্মী বা কবি গড়ে তোলা ‘কবিকণ্ঠ’র লক্ষ্য ছিল না, সংস্কৃতির বিচিত্র ভুবনকে স্পর্শ করার সাহস সকলের মধ্যে সঞ্চারিত করাই ছিল তার আসল উদ্দেশ্য।

প্রথম বর্ষপূর্তিতে ‘কবিকণ্ঠ’ একটি ছোট্ট স্মারক প্রকাশ করেছিল। এর রচনা থেকে শুরু করে মুদ্রণের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ‘কবিকণ্ঠ’র সদস্যদের নিজের হাতের ছাপ রয়েছিল। আজ থেকে বিশ বছর আগে পাবনার লেটার প্রেসে নিজেরা কম্পোজ করে, প্রুফ দেখে এবং ছাপার বাকি কাজ শেষ করে একটি সংকলন প্রকাশ খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু ‘কবিকণ্ঠ’র কর্মীরা তা করেছেন। করেছেন আন্তরিকতা এবং নিষ্ঠার সাথে। সে সময় পাবনার একমাত্র অভিজাত প্রেস বাণীমুদ্রণ-এর স্বত্বাধিকারী ইয়াসিন আলী মৃধা রতন ছিলেন ‘কবিকণ্ঠ’র অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। প্রেসের ম্যানেজার দেবদাস ঘোষকে অভিব্যক্তিতে আপাত-গম্ভীর মনে হলেও তিনি ছিলেন সকলের কাকাবাবু। ‘কবিকণ্ঠ’র যাবতীয কর্মকাণ্ডে তার ছিল নীরব সমর্থন। একই রকম সমর্থন জুগিয়েছেন বুলবুল আর্ট প্রেসের স্বত্বাধিকারী আব্দুল হাই। এদের অপরিশোধ্য সহযোগিতার ঋণ ‘কবিকণ্ঠ’র কর্মীরা বহন করবেন আজীবন।

প্রথম বর্ষপূর্তি স্মারকে ‘কবিকণ্ঠ’র সদস্যদের কবিতা নিয়ে একটি চমৎকার মূল্যায়নধর্মী নিরীক্ষা রচনা করেছিলেন অধ্যাপক আতাহার আলী। ‘কবিকণ্ঠ’র তাত্ত্বিক সদস্য হিসেবে পরিচিত আতাহার আলী ‘সাম্প্রতিক কবিতা : কবিকণ্ঠ’ নিবন্ধে লিখেছিলেন, ‘গত একটি বছরে কবিকণ্ঠ প্রায় তিন শতাধিক কবিতার জন্ম দিয়েছে। এই জন্মের পেছনে রয়েছে প্রায় চল্লিশজন লেখকের অবদান।… আধুনিক তথা সাম্প্রতিক কবিতার জীবনপিপাসা অর্থাৎ কবিতার জীবন এবং তৎসম্পর্কিত মৌলিক সমস্যাবলী ও হৃদয়বৃত্তির মৌল আবেদনকে কবিকণ্ঠর কবিরা পাশ কাটিয়ে যায়নি। বরং গভীর প্রত্যয়ে তাকে আবাহন করেছে। তাদের দৃষ্টি প্রসারিত সামনের দিকে। তাই সাম্প্রতিক কবিতার সঙ্গে সঙ্গতি বজায় রাখতে তারা পারঙ্গম। তবে সঠিক বিচারের ভার আগামীকালের হাতেই রইল। আমরা শুধু এটুকু বলব যে, যেহেতু কাল এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাচ্ছে কবিতা এবং সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে কবিকণ্ঠ ও তার কবিতা। পথই তাদের পথ দেখাবে এই ভরসায় এগিয়ে যাবার বিরাম নেই তাদের। কবিকণ্ঠর সম্মিলিত প্রতীক উচ্চারণে একথা স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে-
‘ছুটেছে ঘোড়া রাজা জোড়া খুনের ধ্বনি,
পিঠের ’পরে চাবুক পড়ে শব্দ শুনি।
উর্ধ্বশ্বাসে এই বাতাসে উড়িয়ে কেশর
চলছে উড়ে অনেক দূরে আপন দেশ ওর।’
(এই চারটি পংক্তি রচনা করেছিলেন ‘কবিকণ্ঠ’র তিন সতীর্থ: শুচি সৈয়দ, জাহাঙ্গীর-উল হক এবং শ্যামল দত্ত)।’’

স্মৃতি সতত সুখের নয়, দুঃখেরও। ‘কবিকণ্ঠ’র সেই সুখস্মৃতির সঙ্গে একটি গভীর কালো ক্ষত আজও আমাদের হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে আছে। শোকাবহ সেই অধ্যায়টির নাম জাহাঙ্গীর-উল হক। ‘কবিকণ্ঠ’র নীলকণ্ঠ বলে খ্যাত জাহাঙ্গীর এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায় আমাদের কাছ থেকে।
শুরু থেকেই ‘কবিকণ্ঠ’র আড্ডা ছিল বিচিত্রমুখী। এসব আড্ডার আলোচনার বিষয় ছিল কখনও কবিতা, কখনও নাটক, কখনও সঙ্গীত কবিতা, কখনও নাটক, কখনও সংগীত, আবার কখনও প্রকাশনা। ছোটখাট প্রকাশনার পাশাপাশি একটি নিয়মিত সাপ্তাহিক প্রকাশেরও স্বপ্ন ছিল অনেকদিনের। সে স্বপ্ন পূরণও হয়েছিল। ‘কবিকণ্ঠ’র কবিতা কর্মীদের সম্মিলিত উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছিল ‘সাপ্তাহিক বিবৃতি’। সম্পাদক শ. ই শিবলী এবং প্রকাশক ইয়াসিন আলী মৃধা রতন।

নিয়মিত প্রকাশনার মাত্র এক বছরের মধ্যেই সারা পবনায় সাপ্তাহিক ‘বিবৃতি’ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। বেনিয়াপট্টিতে সাপ্তাহিক ‘বিবৃতি’র নিজস্ব কার্যালয় ছিল তখন ‘কবিকণ্ঠ’র নিয়মিত আড্ডা। এই আড্ডায় এসে যোগ দিয়েছেন শহরের প্রায় সব ক’টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পী-কর্মীরা। এভাবেই একটু একটু করে সম্প্রসারিত হয়েছে ‘কবিকণ্ঠ’। বেড়েছে তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা একসময় জাহাঙ্গীর-উল হকের নেতৃত্বে ঢাকায় এবং মহম্মদ রাশেদের নেতৃত্বে চট্টগ্রামেও কবিকণ্ঠর শাখা কার্যালয় গড়ে উঠেছিল। ‘কবিকণ্ঠ’র চট্টগ্রাম শাখা মহম্মদ রাশেদের সম্পাদনায় প্রকাশ করেছিল একটি মনোরম সংকলন ‘অবয়ব’ নামে। ঢাকায় কবিকণ্ঠর কয়েকটি বিচ্ছিন্ন আসর সংগঠিত করেন প্রয়াত জাহাঙ্গীর-উল হক, মন্জু নুরুল আলম, জাহাঙ্গীর আলম মুকুল, মহম্মদ রাশেদসহ অনেকেই সে উদ্যোগে ছিলেন।

সবকিছু এত তাড়াতাড়ি স্মৃতি হয়ে যায়- ভাবতেও অবাক লাগে। মনে হয়, এইতো সেদিনের কথা। অথচ একই মধ্যে পার হয়ে গেছে বিশটি বছর। একটি জীবন থেকে বিশটি বছর খসে যাওয়া কম নয়। এই বিশ বছরে পাবনা শহর অনেক বদলেছে। একাধিক দৈনিক পত্রিকা বের হচ্ছে এখন পাবনার মতো একটি মফস্বল শহর থেকে। সাপ্তাহিক বিবৃতি আজ দৈনিক। কিন্তু নেই ‘কবিকণ্ঠ’। ‘কবিকণ্ঠ’র সদস্যরা কে কোথায় কে জানে? মোস্তফা আরব সতেজ পাবনাতেই, সুবহানী বাবু একটি জাতীয় দৈনিকের জেলা সংবাদদাতা, সমজিৎ পাল দেশের বাইরে স্কলারশিপ নিয়ে পিএইডি-র জন্য গবেষণা করছে ফিলিপাইনে। আবু মহম্মদ রইস রয়েছেন রংপুর ক্যাডেট কলেজে। রুমী খোন্দকর চাটমোহর কলেজে শিক্ষকতায়। আতাহার আলী ছিলেন শান্তাহার সরকারি কলেজে। দীপক রঞ্জন চৌধুরী শান্তি নিকেতন থেকে ফিরেছে কিনা কিংবা ফিরলে কোথায় আছে জানি না। জানি না কেমন আছে মাসুদ শেখ কানু, শ. ই রিপন, নূরুল হক সোজন।

শ. ই শিবলী পাবনায় আইন পেশায় যুক্ত ছিলেন। তিনি আজ নেই।
সেই আড্ডাটাও আজ আর নেই। আবদুল হামিদ রোডে প্যারাডাইস রেস্টুরেন্ট আছে আগের মতোই। আগের মতোই বেচাকেনা, হৈ-চৈ সব আছে। শুধু ‘কবিকণ্ঠে’র ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেই আড্ডাটা নেই। সেই আড্ডার কথা ভাবতে-ভাবতে আজ মনে হয়, জীবনের সোনালি দিনগুলো কি এভাবেই একদিন হারিয়ে যায়?


শ্যামল দত্ত : চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক