কবি ও বন্ধু মামুন মুস্তাফা ॥ শিউলী জাহান



কবি মামুন মুস্তাফাকে নিয়ে যখন একজন বন্ধু হিসেবে লেখার আমন্ত্রণ পাই, তখন ভাবনার শৈবালদীঘিতে একটু ডুব দিতেই হয়। একজন কবিকে নিয়ে লেখা খুব কঠিন নয়। একজন কবির বই নিয়ে আলোচনাও জ্ঞাত জ্ঞানে সাবলীল হয়ে ওঠে, কিন্তু একজন কবিকে বন্ধু হিসেবে লেখা খুব সহজ নয়। তাই ফিরে যাই সময়ের তরঙ্গ ঠেলে বিপরীতে।

বন্ধু মামুনের সঙ্গে আমার পরিচয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। প্রথম পরিচয়ে সতেজ চারা গাছের মতো সহজ, সরল, প্রানবন্ত। যদিও তখনই সে কবিতার চাদরে ঢাকা তরুণ কবি, কিন্তু এই কবিসত্তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে আরও অনেক অনেক পরে। যখন সে একজন নিভৃতচারী পূর্ণ কবি। তখন সে নব্বই দশকের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি হিসেবে চিহ্নিত।

বন্ধু মামুন সদালাপী, সজ্জন ও বন্ধুবৎসল। সুশীল বন্ধু পরিবেষ্টিত হয়ে থাকতে পছন্দ করে বরাবরই। কিন্তু একজন কবি মামুনের মনন ঠিক তার উল্টো স্রোতে বইতে দেখি। এখানে সে একাকী, নিভৃত অঙ্গনের বাসিন্দা। আপন সৃজনে আত্মনিমগ্ন। এখানে সে পুরোপুরিই আবৃত তার নিজস্ব বোধ ও কল্পনার মাদকতায়। তার চারিপাশ দিয়ে বয়ে চলে জাগতিক নদী- কর্ম, সংসারের কোলাহল, স্ত্রী, সন্তান। তার কবিসত্তায় সে একজন ভিন্ন মানুষ হয়ে এইসব অবলোকন করে এবং কলমের আঁচড়ে যা লিপিবদ্ধ হয়ে যায় কবিতায়। ২০১৫ সালে প্রকাশিত ‘শনিবার ও হাওয়া ঘুড়ি’কবিতাগ্রন্থে তাই কবিতার পঙক্তিতে তার স্বগত উচ্চারণ :

“অনুভূতির উজ্জ্বল কার্নিশে তোমাকেই অনুভব করি। বাইরে উত্তাল হাওয়া, ভেতরে হিম- এই শীতল প্রকৃতি মলিন হয় হাওয়া ঘুড়ির গল্পে। এভাবেই জীবননদীর বাঁকে বাঁকে স্থির হলো মৌন সন্ধ্যা। আজ যাপিত জীবনের সংকটে শস্য আর চারণভূমি একাকার হয়ে গেছে। সংসারযাত্রায় জন্ম এবং মৃত্যু সহোদরা যেন। হাওয়া ঘুড়ি ছিনিয়ে নিয়ে গেছে আমাদের নির্ভুল অতীত।… আমার এ উচাটন মন বাঁকা নদীর জলে ডুবুক, ভিজুক, ভেসে যাক গহিন বিষাদে;- তবু তো বনিতা চুল বাঁধে সংসারের খুব কাছাকাছি, সেই যাদুস্পর্শে উজ্জ্বল আজও আমাদের রসুই ঘর…”

আমেরিকান কবি ম্যাক্স ইস্টম্যান-এর সেই উক্তিটি মনে পড়ছে, তিনি দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘A poet in history is divine, but a poet in the next room is a joke.’ ‘ইতিহাসের কবি স্বর্গীয়, কিন্তু পাশের ঘরের কবি উপহাসের পাত্র।’ ঠিক এইসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই যুগে যুগে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নতুন কবিদের সিঁড়ির ধাপগুলো পেরিয়ে আসতে হয়। বন্ধু মামুনকেও এই তিক্ত পাত্র সরিয়ে পথ করে নিতে হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। কিন্তু দেখেছি তার একনিষ্ঠতা লক্ষ্যের প্রতি, দায়িত্বের প্রতি।
তার প্রথম কাব্য প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে এবং তারপর এ যাবৎ ১০টি কাব্যগ্রন্থের গর্বিত জনক। আর আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর সন্ধিক্ষণে গেল বছর ২০২০-এর একুশের বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে ১০টি কাব্যগ্রন্থ থেকে বাছাইকৃত কবিতা নিয়ে নির্বাচিত কবিতার সংকলন ‘দশ দশমী’।
দশকের গণনায় নব্বই দশক অনেক তরুণ কবির অঙ্কুরোদগমের উর্বর ক্ষেত্র। তাদের মধ্যে কবি মামুন মুস্তাফা যার পিতৃ-প্রদত্ত নাম মুস্তাফা কালিমুল্লাহ আল মামুন, তার কাব্য সাধনার ধারাবাহিক সিদ্ধিতে আজ পরিণত বৃক্ষ। তার ছায়াতলে আজ বিকশিত হচ্ছে সাহিত্য জগতের নতুন নতুন বীজ। তাদের চর্চায় নিরন্তর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার নির্যাস জুগিয়ে নতুন প্রতিভা বিকাশে তার ঔদার্য প্রশংসনীয়। যদিও কাব্যজগতে তার অন্তর্মুখীন ও একাকিচারী স্বভাবের কারণে আজও কিছুটা কুয়াশাচ্ছন্ন রয়ে গেছে। কিন্তু যারা প্রকৃত সাহিত্য ও কবিতার সমঝদার তারা ঠিকই খুঁজে নেন একজন শুদ্ধ কবি ও লেখককে। সেই পরিমণ্ডলে কবি মামুন মুস্তাফা স্বমহিমায় অধিষ্ঠিত।

বন্ধু মামুনের চেয়ে একজন কবি মামুন আমাকে অনেক বিস্ময়াভূত করে। কবিতায় তার বিষয় নির্বাচন অর্থবহ ও বৈচিত্র্যময়। উপমা ও উৎপ্রেক্ষা, চিন্তার ব্যাপ্তি ও বিকাশ, বিষয়টির প্রতি তার বোধ ও উপলব্ধির ব্যঞ্জনা একজন পাঠককে গভীরভাবে প্রভাবিত করে ও ভাবায়। আরও একবার ‘শনিবার ও হাওয়া ঘুড়ি’তে চোখ মেলি- “আভূমি নত এই নগরের কাছে এসে টের পাই মধ্য যামে কুয়াশার নাম, প্রান্তরের নীরবতা ভাঙে দূরাগত শিশির। কেবল মনের ঘরে পীত পাতা ঝরে। কিছু কিছু হেমন্তকালীন অভ্যেস বাসা বাঁধে দয়িতার খোলা চুলে…কার্তিকের নরম রোদে ওম নেয় আঙুরের গুচ্ছ বেদনা…হাওয়া ঘুড়ি বড় বেশি দাগ কাটে জলটুঙি সংসারে;”
গ্রন্থের ধারাবাহিকতায় তার সপ্তম কাবিতাগ্রন্থ ‘একাত্তরের এলিজি’ আমাকে বিশেষভাবে অভিভূত করে। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গণ থেকে লিখিত চিঠি অবলম্বনে এমন গদ্যকাব্য রচিত হতে পারে, বিষয়টি ভাবনার আকাশে সহসাই উদয় হয় না। কবিতার বিষয় ও আঙ্গিক যে কত বহুরূপী হতে পারে, কাব্যের নিরীক্ষায় এই গ্রন্থটি একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। একজন কবি মানসের কোনো বাঁধাধরা গণ্ডি নেই, সর্বত্রই তার মুক্ত আকাশে বিচরণ। নিজস্বতাই তাকে কালজয়ী করে তোলে। স্বকীয় সৃজন ও নিজ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা’ই তার মানের পরিমাপক। ‘একাত্তরের এলিজি’প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালের একুশে গ্রন্থমেলায়। এই কাব্যে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা শাফী ইমাম রুমীর চিঠি অবলম্বনে ‘ভোর হবেই, আরোগ্য অরুণোদয়’কবিতা থেকে উদ্ধৃত করছি :
“আগুন কতটুকু পুড়িয়ে মারে? কিন্তু ওদের নৃশংসতা, যা শুনতে পাও- তার থেকেও বীভৎস! অথচ এও জানি, একই ধরনের হিংস্রতা নিয়ে আমরাও ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ব। মারণাস্ত্র-ভালোবাসায় বীর বাঙালি লিখে যাবে স্বাধীনতার অমোঘ ইতিহাস। সে লক্ষ্যেই বেস ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে আজ আমাদের যাত্রা। আমার মায়ের কাছে এ কথা লিখ না তুমি। যুদ্ধ সময়ের নিয়তি তাকেও বিপদসংকুল করে তুলতে পারে।’

কবি মানেই স্বপ্ন বিলাসী, ভাবাবেগের আধার। কিন্তু মামুন অভিজ্ঞতা ও বাস্তব চেতনায় উজ্জীবিত মানুষ। কবি মামুনকে যেমন পাই প্রকৃতি ও প্রেমে, তেমনি পাই নাগরিক চেতনায়। সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের দোলাচল তার লেখায় সাবলীলভাবে স্থান করে নেয়। প্রতিবাদী চরিত্রে প্রবল হুঙ্কার নেই, ভাষার সূক্ষ্ম ধারে থাকে তার চকচকে ঝিলিক। এই ব্যক্তিত্বে বন্ধু মামুন ও একজন নিভৃতচারী কবি মামুন পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়। যেমন তার কবিতাগ্রন্থ ‘কফিনকাব্য’-তে পাই, ‘বিচারকের কলমে আছে কাটামসলার গন্ধ। দারা-পুত্র-পরিবার নিয়ে তার সন্ন্যাসজীবন। কখনো দাঁড়াতে শেখেনি মেরুদণ্ড সোজা করে। বিচারকের ময়ূর সিংহাসনে মৃতের কর্পূর আর কিছু ধূপদুনো। সাত হাজার পৃষ্ঠার রায়ে দুলছে মহাকালের হৃৎপিণ্ড।’
কবি মামুনের সাম্প্রতিক কবিতা নির্দিষ্ট বিষয়ধর্মী। ‘কফিনকাব্য’র বিষয় নির্বাচনও কেমন চমক জাগায়। জাগতিক জীবনের কোলাহলের পাশাপাশি মানুষের চিরপ্রস্থান, মৃত্যু, কফিন, গোরখোদকের মাটি খুঁড়ে চলার এক অদ্ভুত অনাকাঙ্ক্ষিত চিত্র। এই বইয়ের কবিতাগুলো ২০১৬-তে লেখা। বইটি প্রকাশিত হয়, ২০১৮ সালে। কিন্তু বইটির কবিতাগুলো যেন বর্তমান করোনাকালীন বিপর্যস্ত জীবনের কথাই বলছে। কোনো অদৃশ্য অশুভের ছোবলে মানুষের মৃত্যু, থরে থরে লাশ এসে জমা হচ্ছে গোরস্থানে, গোরখোদকের বিস্ফোরিত শুষ্ক চোখে তার দিবারাত্র- ‘গোরখোদক আলো জ্বালে। ভাঙে আকাশের নতমুখ, ভাঙে শোকের অবাধ পাথর। তবু তার বুকের ভেতরে হা হা শূন্যতা- ওই হাহাকার নিয়ে বেড়ে ওঠে বায়ুহীন বাঁশি। যমের বাড়ি চিনে নেয় সে কোদালের সখ্যতায়।’ একজন কবি যখন পরিণত হয়ে ওঠেন তখন এমনি করেই তার রচনা স্থান পায় কালজয়ী শব্দে। দশক ছাড়িয়ে আদৃত হয় পাঠক মনে। ‘কফিনকাব্য’র কবিতাগুলো পড়তে গিয়ে আমাকে কবি এডগার এলেন পো-এর মিস্টিক গদ্যকবিতার আবহ ছুঁয়ে যায়।
‘Deep into that darkness peering, long I stood there wondering, fearing, Doubting, dreaming dreams no mortal ever dared to dream before; But the silence was unbroken, and the stillness gave no token,..Quoth the Raven Nevermore’

একজন কবি মামুনের অন্তর্গত ভাবনায় বিচিত্র বিষয় খেলা করে। ঈশ্বর, প্রেম, প্রকৃতি ছাড়াও জাগতিক পরিপার্শ্বের বিভিন্ন পরিবর্তনও তার কবিতার মননে এসে ধরা দেয়। ঠিক নাগরিক কবি নয়, কিংবা পুরো আধ্যাত্বিকও নয়, এর মাঝ দিয়ে ধাবমান এই কবিসত্তা। কাল ও সামাজিক পরিবর্তনকে ধারণ করা ‘কফিনকাব্য’ থেকে এই কবিতাটিও উদ্ধৃত করা যায়- ‘ডাকপিয়নের আজ ছুটি। ডাকবাক্স হাওয়ায় দুলছে। অবিনাশী শক্তির দিকে আজ ধাবমান সকল সন্দেশ। ডাকপিয়ন নিত্যনতুন প্রযুক্তিভারে সকল কর্তব্যনিষ্ঠা নিয়ে আজ প্রত্নইতিহাস। জীবনমরণের মাঝামাঝি চলছে তার হিশেবনিকেষ। ছিটকে পড়া আকাঙ্ক্ষার সর্বনাশ নিয়ে বেড়ে উঠেছে ডাকপিয়নের শবযাত্রা। ওই কফিনের গাঢ় সমারোহে জেগে ওঠে ভাইবার…স্কাইপি কল…একুশ শতকের পৃথিবী…’

এই দেখুন, বন্ধু মামুনকে নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি কিন্তু পৃষ্ঠার বেশিরভাগ অংশ জুড়ে একজন কবি মামুন মুস্তাফাকেই আঁকলাম। আসলে একজন বন্ধু যখন একজন প্রতিষ্ঠিত সর্বজনীন কবি, লেখক হয়ে ওঠেন তখন তার সব সত্তা, ব্যক্তিত্ব নিয়েই মানুষটি আমাদের চোখে প্রতিফলিত হয়। তাকে আলাদা আলাদা ভাবে ব্যবচ্ছেদ করা যায় না, কিংবা ক্যানভাসে সুনির্দিষ্ট বিভাজনে চিত্রায়ন করা যায় না।