শিবলী মোকতাদিরের ব্যবহারিক বিস্ময় : এক কাব্যিক বিস্ময় ॥ আনিফ রুবেদ



কবিতা হলো কথা। কিন্তু সবকথাই কি কবিতা? না সব কথা কবিতা নয়। কথাদের কিছু গল্প, কিছু উপন্যাস, কিছু প্রবন্ধ ইত্যাদি। কিছু আছে কেজো কথা, কিছু কথা আবার গালি, কিছু কথা প্রলাপ। কিছু কথা বিজ্ঞানের কাজে লাগে, কিছু কথা দর্শনের প্রকাশ করে।

কবিতা হলো কথা। বলে দেওয়া কথা নয়, অনুভব করানোর কথা। কবিতা পাঠ করতে গিয়ে যে কথাগুলি পাঠ করি বা কবিতা শুনতে গিয়ে যে কথাগুলো শুনি সেসব কথার বাইরে আরো কিছু অনুভব করাতে চায় কবিতা।

কবিতা ঘুম ভাঙানোর কাজ করে, ভেতরের বদ্ধঘর খুলে অবারিত রসের ধারা বইয়ে দেয়। ধরে নেয়া যাক, একটা লোক ঘুমুচ্ছে। এই ঘুমন্ত লোককে বিভিন্নভাবেই জাগিয়ে তোলা যেতে পারে। তার কানের কাছে বিকট চিৎকার দিয়ে জাগিয়ে দেয়া যায়। আবার তার মাথায় হাত বুলিয়ে ধীরে ধীরে জাগিয়ে দেওয়া যায়। প্রথম ক্ষেত্রে লোকটা হতচকিত হতে পারে, রেগে যেতে পারে, রেগে গিয়ে মারামারিও শুরু করে দিতে পারে। ফলে ঘুম ভাঙানো যে জন্য সে কারণ ভেস্তে গিয়ে রণক্ষেত্র তৈরি হয়ে যেতে পারে, তৈরি হতে পারে এক বিকার অবস্থার।

কবিতা কাজ করে ওই দ্বিতীয় ধরনের ঘুম ভাঙানোর মত করে। খুব নরম পরশ দিয়ে ঘুমন্তকে জাগিয়ে তোলে তারপর তার হৃদয়ের রসের ধারার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। কবিতা আর কবিতার পাঠকের মধ্যে চলে দারুণ এক রসায়ন। যেটাকে বলা যেতে পারে এক ধরনের দিদার। কবিতা নিজেকে নিজের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। নিজের রসের সাথে নিজের পরিচয় করিয়ে দেওয়া এ এক বিরাট ব্যাপার।
যে কোনো বই পাঠের আগে হাতে নেবার সময়, পাঠের সময় এবং পাঠের পরে বিভিন্ন কথা মনে করায়। কবি শিবলী মোকতাদিরের কাব্যগ্রন্থ ‘ব্যবহারিক বিস্ময়’ পাঠ করার সময় উপরের এসব কথা মনে আসলো।

কোনো কবিতাকে ব্যাখ্যা করতে যাওয়া কবিতাটিকে একটা আগুনের কুণ্ডে ফেলে ছাই করে দেবার মত। সুতরাং কবিতা ব্যাখ্যা করা থেকে বিরত থাকি। অবশ্য ব্যাখ্যা করার ক্ষমতাও আমার নাই। ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বাদ দিয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করা সহজ এবং ভালোও। যদি মুগ্ধতা তৈরি না হয়, যদি রসনদীতে ঢেউ না তোলে তবে সেটাও বলে দেয়া যায় ব্যাখ্যাহীনভাবেই।

শিবলী মোকতাদির নব্বই দশকের কবি। কবিতাতে তার নিজস্ব স্বর বেশ পোক্ত। যে স্বরে, যে মেজাজে তিনি কবিতা লেখেন তা একান্তই তার। একজন কবির সবচেয়ে বড় হচ্ছে নিজের স্বর তৈরি করতে পারা। শিবলী মোকতাদির সেটা পেরেছেন বলে আমার মনে হয়।

কবিতার ভেতর তিনি রস সৃষ্টি করেন। রসের মৃদু ঢেউ সৃষ্টি করেন কিন্তু রসের বিক্ষুব্ধ ঢেউ বা ঝড় সৃষ্টি করেন না। ফলে পাঠককে হতচকিত হতে হয় না। রসসিক্ত হতে সময় পান পাঠক। ধীরে ধীরে কবিতার রসে স্নান করার সুযোগ পান। এটা একটা বিরাট শক্তির ব্যাপার। অনেকেই আছেন যারা কবিতার ভেতর হঠাৎ এক বিশাল ঢেউ তোলার চেষ্টা করেন যাতে সবকিছু ভেসে যায়। অনেকেই আছেন যারা চমক তৈরি করে চমকে দিতে চান বিজলীর মত। কিন্তু এগুলোর আয়ু হয় ওই আষাঢ়ে বিদ্যুতেরই মত।

কবিতার যে শান্তরূপ, যে রূপ ভেতরে গিয়ে অন্তর মথিত করে নতুন রূপের মুখোমুখি করে এমন বৈশিষ্ট্যধারী কবিতা লিখেন শিবলী মোকতাদির।

বইটির প্রথম কবিতা ‘ব্যবহারিক বিস্ময়’। ব্যবহারিক বিস্ময় শিরোনামে একশটি আলাদা কবিতা আছে। একশটি কবিতা একশ স্বাদ বহন করছে তবে এদের গঠন একই। ত্রিপদী কবিতা। এ ধরনের ছোট ছোট কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো হয় তীক্ষ্ণ, সুতীব্রভাবে অন্তর্ভেদী। এই একশটি কবিতার সবগুলো না হলেও বেশিরভাগ কবিতাতেই সেই বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে পেরেছেন কবি।

কবির অন্তর দারুণ এক ক্ষমতার খনি। অসাধ্যকে সাধ্য করতে পারার প্রচুর ক্ষমতা কবির অন্তরে থাকে। কবির অন্তর দারুণ এক মমতার খনি। সমগ্র বিশ্বের জন্য এ মমতা কাজ করে চলে।

ওই যে বলা যাচ্ছিল কবির অন্তরের ক্ষমতা। সেটা তো এভাবেই ব্যক্ত হয় :

নীলের মধ্যে চিল উড়ে যায়
এমন দৃশ্য বহু কষ্টে
দেখেছি বর্ষায়!
[ব্যবহারিক বিস্ময়- ০১]

বর্ষা বলতেই চোখের আগে ভেসে আসে বৃষ্টিধারার ছবি, কালো মেঘের মুখ, ভেজা গাছের পাতা। কিন্তু কবির তার অন্তরের ক্ষমতায় দেখে নিয়েছেন চিল, দেখেছেন আকাশের নীল। ‘বহু কষ্ট’ হলো তার বিনয়। একজন কবি বিনয়বীরও।

ওই যে বলা যাচ্ছিল কবির অন্তরের মমতা। সেটা তো এভাবেই ব্যক্ত হয়-

যেখানে শাদা মাঠ জুড়ে শীতের তারা উড়ে যায়
খুরের আঘাতে ধূলিকণা। আমার সমস্ত পোশাক
উড়ে গিয়েছিল নীল মেঘে। আর বালুচর থেকে লাখ লাখ
কচ্ছপ উঠে এসে তাদেরই সাথে আমাকে জড়ায়।
[কৃতি]

নৌকা থাকে নদীর ঘাটে বাঁধা
বর্ষা আসে, বসন্ত যায়
মাঝির পায়ে কাদা!
[ব্যবহারিক বিস্ময়- ১১]

কত লোক পার হয়ে যায় মাঝির পেশীচাপের উপর বসে বসে। মাঝিই শুধু থাকে নদী নিয়ে। পায়ে তার আজীবনের কাদা। নদী ছেড়ে সে কোথাও যেতে পারে না। একজন কবির মমতা না থাকলে মাঝিকে এভাবে দেখা সম্ভব নয়।

সবকিছুর ভেতর দুভাবে দৃষ্টিপাত করা যায়। একটা দৃষ্টি সোজা। আরেকটা বাঁকা। এই বাঁকা আবার নেতি অর্থে নয়। এটার অর্থ আরো একটু খতিয়ে দেখা, আরো একটু গভীর করে দেখা, আরো একটু ঘুরিয়ে দেখা। আমরা সোজা দৃষ্টিতে দেখি ফুলের কাছে ঋণী থাকে ফল, নৌকার কাছে নদী কারণ নদীত্বকে স্বীকার করে নেয় নৌকা। কিন্তু একটু ঘুরিয়ে যদি দেখি ফুলও কি ফলের কাছে ঋণী নয়? ফল কি ফুলকে স্বার্থক করে তোলে না? তেমনভাবে অন্য ব্যাপারগুলো ভাবা যেতে পারে। শিবলী মোকতাদিরও আমাদের সেই ঘোরানো দৃষ্টি দান করেন, বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি দান করেন।

ফুলমাত্রই ফলের কাছে ঋণী
নদীর কাছে নৌকা যেমন
সোনার কাছে গিনি!
[ব্যবহারিক বিস্ময়- ২০]

কবিতাতো শব্দের খেলা। চিরপুরাতন শব্দকেও নতুন অর্থ দান করে। শব্দের সাথে শব্দের জোড়ে তৈরি হয়ে যায় অর্থের নতুন বিশ্ব।

সভায় এসে সভ্য হওয়া অতীব দরকারি
লোকারণ্যে যেমন পুরুষ শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে
যাচ্ছে ঢুকে যৌনচাপে ভিন্ন নারীর বাড়ি!
[ব্যবহারিক বিস্ময়- ৩৭]

কবিতাটি শুধু তুলে দিলাম ‘যৌনচাপে’ শব্দটির জন্য। অদ্ভুত মনে হয়েছে এ শব্দের ব্যবহার।

বারোয়ারি রস থাকতে পারে কবিতায়। সবগুলোতে দখল থাকে না সকলের। বড় জোর দুএকটা রস নিয়ে কাজ করে একেকজন। হাস্যরস তৈরি করা খুব কঠিন একটা কাজ। এবার শিবলী মোকতাদিরের হাস্যরস-

সিনেমা দেখছে ভাবী, টানটান করে সিনা
ভিলেন ঢুকেছে নায়িকার বেডরুমে
দেবর বলছে আমি দেখব না, আমি দেখব না!
[ব্যবহারিক বিস্ময়- ৪৭]

লোকালয়ের ভাষা আছে। বাসার ভেতরে থেকে তার ভাষা আছে। নদীর কাছে অবস্থানের সময়ের ভাষা আছে। বনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাবার সময় ভাষা আছে। এগুলো সবই পৃথক। এগুলো শিখতে হয় না এমনিতেই বেরিয়ে আসে ভেতর থেকে। বনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাবার ভাষা বলে দিচ্ছেন আমাদের কবি-

বনের পথে হাঁটা মানেই গল্পে ফিসফাস
বন্যরীতি এমন কথাই বলে
নো এন্ট্রি অট্টহাসি, হাঁচি কিংবা কাশ!
[ব্যবহারিক বিস্ময়- ৬০]

শিল্প মানুষের ক্ষমতার দিকে তাকিয়ে সৃষ্টি হবে না কি মানুষকেও শিল্পের রস নেবার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। এ নিয়ে কথা বলার চেয়ে একটি ত্রিপদী পড়ে নেওয়া ভালো-

গান ধরেছে ওস্তাদজি, কণ্ঠ হচ্ছে ক্ষয়
রাগরাগিণী অর্থ যতই দিক
ব্যর্থ শ্রোতার লক্ষ্যার্থে নয়!
[ব্যবহারিক বিস্ময়- ৬৩]

দর্শন ছাড়া কবিতা নয়, কবিতা নাই। কিছু একটা থাকেই বলতে চাওয়ার। শিবলী মোকতাদিরের কবিতাতেও দর্শন আছে গ্রহণযোগ্যমাত্রায়। গ্রহণযোগ্যমাত্রা এজন্যই বলতে হচ্ছে, কবিতাতে যদি দর্শন প্রচারই মুখ্য হয়ে ওঠে তখন সেখানে শিল্প মার খায়। শিল্পমানও থাকবে, দর্শনও বাদ যাবে না এমনই কবিতা হতে হবে। এটা গ্রহণযোগ্যমাত্রা। এবার তেমনই একটি ত্রিপদী-

মুদ্রা হলো মায়ার চাকা
এপিঠ-ওপিঠ যতই করো
যায় না তারে রাখা!
[ব্যবহারিক বিস্ময় – ৭৫]

শিবলী মোকতাদিরের বড় একটা ক্ষমতা তার বিষয় বৈচিত্র্য। তার কবিতার ভেতর প্রেম আছে, যেমন ‘ও নূপুর’, আছে, দেশের প্রতি ভালোবাসা, দেশের জন্য চিন্তা, যেমন, ‘বাংলাদেশের টান’, আছে অধ্যাত্মিকতা, যেমন, ‘নাড়ুয়ামালা’।

‘ব্যবহারিক বিস্ময়’ খুব ছোট একটা বই কিন্তু এর মধ্যেই কবিতার বিষয় বৈচিত্র্য, ছন্দের দোলা, শব্দের চৌকস ব্যবহার, ভাব-ব্যঞ্জনা প্রভৃতিতে বাজিমাত করেছেন তিনি। বইটা নিয়ে কথা না বাড়িয়ে শেষে বলা উচিত বলে মনে করছি- বইটি পড়ে দেখুন পাঠকগণ।