কবি হয়ে ওঠা এবং মাহফুজামঙ্গলের আদিপাঠ ॥ আযাদ কালাম




আশির দশকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শব্দায়ন’ নামে আমাদের একটি কবিতা সংগঠন ছিল। কবিতা পত্রিকা হিসেবে শব্দায়নের প্রকাশনা এবং প্রচুর অনুষ্ঠানও করতাম ক্যাম্পাসে।

শহিদ মিনারের ‘শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা’র মঞ্চে সংস্কৃতিক জোটের তত্বাবধানে অনুষ্ঠান চলছিল। কিছুক্ষণ পর শব্দায়নের কবিদের কবিতা পাঠ। আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। উপস্থাপনার দায়িত্ব আমারই ওপর। ঠিক এরকম মুহূর্তে কে যেন একটি ছেলের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিল। পাতলা, শ্যামলা, লম্বা ছেলেটির নাম মজিদ মেহমুদ। সেও কবিতা পড়তে চায়।

হ্যাঁ, মজিদ মেহমুদ। নামটা ঠিকঠাক মনে থাকার কারণ হলো, ওর মতোই রোগা-পাতলা একখানা কবিতার বই আমার হাতে এসেছিল কিছু দিনের মধ্যেই। বইখানার নাম ‘মাহফুজামঙ্গল’। কবি মজিদ মেহমুদ। ঘটনা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারতো। কালের গর্ভে এসব ঘটনা এভাবেই বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু মজিদ মেহমুদের ঘটনা মহাকাল হজম করতে পারেনি।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কালেভদ্রে মজিদের সঙ্গে হয়তো দেখা হয়েছিল, মনে থাকার মতো কিছু ছিল কি না আজ আর মনে পড়ে না। মজিদ কোন ডিপার্টমেন্টে কোন ইয়ারে তাও মনে পড়ছে না। সময় শেষে একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে যে যার মতো চলে গেছি। দীর্ঘকাল তার সঙ্গে আর যোগাযোগ ছিল না। শুধু দেখি মাঝে মাঝে মজিদ মাহমুদ নামে একজন হঠাৎ উল্কাপাতের মতো জাতীয় কাগজে ঝিলিক দিয়ে ওঠেন। লেখাগুলি পড়ি আর ভাবি, এই কি সেই মজিদ মেহমুদ, যে পালক খসে মেহমুদ থেকে মাহমুদ হয়েছে?

ধাঁধাঁর অবসান হলো দু’আড়াই দশক পর। অনুজ সহোদর (জাহিদুল ইসলাম, বাংলাদেশ টেলিভিশনের বার্তা বিভাগের নির্বাহী প্রযোজক) একদিন বেশ স্বাস্থ্যবান একখানা কবিতার বই আমার হাতে দিয়ে বললো, ‘এই কবিকে চিনিস? বেশ ভালো লেখেন। একাডেমিক রেজাল্টও খুব ভালো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় মাস্টার্স’।

বইটির ছাপা-বাঁধাই-পরিধি এবং ফ্ল্যাপের ছবি দেখে মুগ্ধ আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম, ‘তুই একে কোথায় পেলি?’ ‘বিটিভিতে। ওখানেই আলাপ-পরিচয়’।

কাহিনি বর্ণনা শেষ করার আগে শেষ ঘটনা বলি। দিনাজপুরের একটি সাহিত্যানুষ্ঠানের নিমন্ত্রণপত্রে দেখলাম একটি পর্বের প্রধান আলোচক মজিদ মাহমুদ। অন্য পর্বে আমিও সংযুক্ত।

মোক্ষম সেই দিন দিনাজপুরে তিরিশ বছর পর মজিদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। চিনতে কোনো কষ্ট হলো না কারো। মজিদ আর রোগা-পাতলা নেই। সামান্য বয়সের ছাপ পড়েছে। মোটা মোটা গ্রন্থ জন্মদানের সঙ্গে রুচিশীল ব্যক্তিত্বও গড়ে উঠেছে। বক্তৃতার চমৎকার একটা ভঙ্গিমাও রপ্ত করেছে দেখলাম। মজিদের সাথে পুরনো বন্ধুত্ব নতুন মাত্রায় যাত্রা শুরু করলাম।

মাহফুজা মঙ্গলের আদিপাঠ

সেদিন অনুষ্ঠান শেষে বাসায় ফিরেই মজিদ মাহমুদের সেই ‘মাহফুজামঙ্গল’ এর আদি কপি ব্যক্তিগত বইয়ের স্তুপ থেকে খুঁজে বের করলাম। দেখি মজিদ নিজ হাতে লিখেছে, আযাদ কালাম, প্রিয়জনেষু। স্বাক্ষরের নিচে তারিখ দিয়েছে ৭ মার্চ ’৮৯। প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯। প্রচ্ছদ করেছেন দরদী আযম। মুদ্রিত হয়েছে লিয়াকত প্রেস, কুষ্টিয়া থেকে। প্রকাশ করেছে কবি বন্দে আলী স্মরণ পরিষদ। পরিবেশক নওরোজ সাহিত্য সংসদ, ঢাকা। রচনাকাল ডিসেম্বর ১৯৮৮। প্রিন্টার্স স্ট্যাটাস পুরোটাই তুলে দিলাম, কারণ এখন এর একটি ঐতিহাসিক মূল্য সৃষ্টি হয়েছে। উৎসর্গ পাতায় বিস্ময়ভরা মুগ্ধতা তিরিশ বছর ঘুমিয়ে ছিল জানতাম না। বিস্তৃত উৎসর্গ পত্রের বিশেষ অংশটি উদ্ধৃত করছি-

‘তারপর মতিহারী কাব্য বন্ধু
আমিনুর রহমান সুলতান
আহমেদ লুৎফর
আযাদ কালাম
পরিমল রায় ও
শামীমকে
যাঁদের সখ্য ও হিংসা আমাকে দহনে আনে
আনে শীতলতার’।

ব্যক্তিগত স্তুতি চর্চা অনেক হলো। এবার মাহফুজামঙ্গলের আদিপাঠে নজর দিই। মাত্র তিরিশ পৃষ্ঠার মাহফুজামঙ্গলে একুশটি কবিতা মুদ্রিত হয়েছে। কবিতাক্রম- কুরশিনামা, আমার এবাদত, দাসের জীবন, দেবী, খবর, মাতাল ডোম, এন্টার্কটিকা, তোমার অহংকার, তোমাকে জানলেই, বিরহের দিনগুলি, মানুষের দেনা, কেমন আছেন, যা ছিল সব নিয়ে গেলি, কেন তুমি দুঃখ দিলে, তোমারই মানুষ, রিনিঝিনি, মাহফুজামঙ্গল, আমার বিশ্বাস, তোমার দাক্ষিণ্যে, মাহফুজা, একদিন আসবে দিন।

কবিতাগুলি সম্পর্কে ব্যক্তিগত উপলব্ধি ব্যক্ত করার আগে গ্রন্থের শুরুতে এক পৃষ্ঠার ভূমিকা লিখেছেন কবি নিজে, সেখান থেকেও উদ্ধৃত করতে চাই। ভূমিকার প্রথম কয়েকটি পঙ্ক্তি প্রণিধানযোগ্য- ‘ঈশ্বরের সৃষ্টিতে মানুষের দাবী আছে। আর মানুষ যখন ঈশ্বরের কারখানায় সৃষ্টিকর্মে অংশগ্রহণ করে তখন মানুষও ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসাবে ঈশ্বর হয়ে যায়। তাই কখনো বা একজন মানুষের আরাধ্য হয়ে ওঠে নারী’।

এই কয়টি পঙ্ক্তিই মাহফুজামঙ্গলের সারবস্তু। অবাক হতে হয় ১৯৮৮ সালের এক ডিসেম্বরে মজিদ যখন মাহফুজার সৃষ্টিসুখে মগ্ন তখন তার বয়স মাত্র বাইশ (মজিদের জন্ম ১৯৬৬)। একজন উঠতি যুবক, যখন তার প্রেম ও বিপ্লবের গাথা সৃষ্টির কথা তখন সে লিখছে মানুষও ঈশ্বরের সৃষ্টিতত্ত্ব মাহফুজা নামের এক নারীর প্রতীকে।

মধ্যযুগের মঙ্গল সাহিত্য কবিকে প্রভাবিত করে এবং সম্পূর্ণ আধুনিক রীতির কাব্যশীলনে অজস্র ইসলামি মিথ আর রূপক-উপমা-প্রতীকে ভরপুর করে তোলে একেকটি কবিতা। মাহফুজামঙ্গলের প্রথম কবিতার (কুরশিনামা) প্রথম পংক্তি ‘ঈশ্বরকে ডাক দিলে মাহফুজা সামনে এসে দাঁড়ায়’। গ্রন্থের শুরু যে কবিতায় সে কবিতার প্রথম পংক্তিতেই সেই একই প্রতীক- মানুষ ও ঈশ্বর।

কুরশিনামার শেষের পংক্তি- ‘তোমার নাম অঙ্কিত করেছি আমার তজবির দানা / তোমার স্মরণে লিখেছি নব্য আয়াত’।

দ্বিতীয় কবিতা (আমার এবাদত) মজিদ শুরু করছে এভাবে- ‘মাহফুজা তোমার শরীর আমার তজবীর দানা /আমি নেড়েচেড়ে দেখি আর আমার এবাদত হয়ে যায়’। দেবী কবিতায় মাহফুজার ঐশ্বরিকত্ব স্পষ্ট হয়েছে- ‘এখন আমার মনে হয় মাহফুজা তুমিতো দেবী /আর আমরা তোমারই গোলাম’। দেবী’র শেষের পংক্তি আরো ব্যঞ্জনাময়-

‘তুমিতো পাঁচ হাজার বছর আগের মাহফুজা
তুমিতো পাঁচ লাখ বছর আগের মাহফুজা
তুমিতো সৃষ্টির প্রথম মাহফুজা
আমিতো চাই পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হোক
তোমার শাসন’।

মাহফুজা সবসময় ঈশ্বরী হয়ে থাকেনি মজিদের কাছে। নালয়েক কবি হঠাৎ কখনো স্বভাবসুলভ প্রবণতায় মাহফুজাকে রক্তমাংসে খুঁজে বিব্রত হয়েছে অপরাধে বোধে।

‘এমন নালায়েক কবিকে তুমি সাজা দাও মাহফুজা /যে কেবল খুঁজেছে তোমার নরম মাংস’।
বাইশ বছরের তরুণ মজিদ মাহমুদের বিস্ময়কর কাব্যপ্রতিভার বহুমুখিতা মাহফুজা মঙ্গলের কবিতাগুলিতে থরে থরে সাজানো। আন্তর্জাতিকতা মাহফুজা মঙ্গলের আরেক দিক।

‘বরং মাহফুজা আর মানুষের ভালোবাসায়
ভূগোল থেকে মুছে যেতে পারে সীমান্তরেখা
চীনের প্রাচীর আর লোহিত সাগর
আমাজান অরণ্য কালাহারী মরু
একই সূর্যের আলোহারী সমস্ত জমীন
মুছে দিতে পারে শ্বেত আর কালের তফাত’।

গ্রন্থশিরোনামের ‘মাহফুজামঙ্গল’ কবিতার আটটি পর্যায়। প্রতিপর্বের পংক্তি চৌদ্দ। প্রতিটির শেষ দু পংক্তি আলাদা প্যারা এবং পরিণতি। কোনোটি আট পংক্তির প্যারা কোনোটি চার পংক্তির। বলাবাহুল, বিষয়বস্তু মাহফুজা। চতুর্দশপদী সনেট রচনার এই যে প্রয়াস এও সেই তরুণ মজিদের কাব্য প্রতিভার বিচ্ছুরণকেই নির্দেশ করে। তৃতীয় পর্যায়ের সনেটটি উদ্ধৃত করা আবশ্যক বোধ করছি।

পৌষের ঠাণ্ডা মেঝেতে জমে আছে আমার বরফ
স্পন্দন থেমে আসে মাঘের এ্যাবসুলেট হিমাংকে
ফাল্গুনে আমার গলিত তুষার অর্ঘ দিব যাকে
সেতো এলোনা আজো কেবল চৈত্রের বৈষ্ণবী টোপ
আমার যৌবন বিরহ করে নিয়ে গেল বৈশাখে
হে প্রাণখী, আমি আজ জ্যৈষ্ঠের খরাদগ্ধ প্রান্তর
আমার অশ্রুতে ভিজেছে আষাঢ় সমস্ত প্রহর
দুঃখ দুঃসহ ভার চাপাবো কেন শাওনের কাঁখে
ভাদ্রও কেটে গেল শেষে তোমার ব্যর্থ প্রতীক্ষায়
আশ্বিন শিশির শিক্ত করে আজ চলে গেলো শেষে
কার্তিকে হয়েছি পাথর বেরিয়েছি বৈরাগী বেশে
অগ্রহায়ণ কি করে কেটেছে বঁধু আমার জানা নাই।

তোমার বিহনে কেমনে রাখি বল জীবন দেহ
মাহফুজা তুমি আসলে না তাই জানল না কেহ।

বাংলা কবিতার মধ্যযুগে বারমাসি বর্ণনাবোধ কবিকে অনায়াসে প্রভাবিত করলেও মাহফুজাকে আশ্রয় করে যথেষ্ট মুনশিয়ানা দৃশ্যমান হয়েছে। আঠার মাত্রার চৌদ্দ পংক্তির এরকম আটটি সনেট শুধু মাহফুজাকে নয় মজিদ মাহমুদকেও রিপ্রেজেন্ট করে সমান তালে।

শেষ কবিতার শেষ চরণ দিয়েই প্রসঙ্গের সমাপ্তি টানার উপাদান দেখে নেয়া যায়।

‘একদিন তুমিও হয়ে যাবে প্রত্নতত্ত্ব বিষয়
আমাদের পাখিদের মতো
আমাদের বৃক্ষের মত
তোমার অনুপস্থিতিতে দূষিত হয়ে যাবে
পৃথিবীর মাটি’।

মাহফুজামঙ্গল মজিদ মাহমুদের প্রথম কাব্যপ্রয়াস। প্রতিটি কবিতা, কবিতার প্রতিটি পংক্তি, পংক্তির প্রতিটি প্রতীক-উপমা-চিত্রকল্প কাব্যময়তায় ঠাঁসা। একজনমাত্র মাহফুজাকে কতশতভাবে দেখা যায়, কতভাবে উপস্থাপন যারা যায় তার অনন্য নজীর তিরিশ পৃষ্ঠার এই পুস্তিকাটি। পরবর্তীতে পুস্তিকাটির অবয়বে অনেক বদল ঘটেছে। যুক্ত হয়েছে আরো অনেক কবিতা। মুদ্রণ, কাগজ, বাঁধাই-প্রচ্ছদে এসেছে অনেক চাকচিক্য। দীর্ঘ তিরিশ বছরে বেরিছে দশ দশটি সংস্করণ। একাধিক ভাষায় ভাষান্তরও ঘটেছে। বহু বোদ্ধা আলোচক, কাব্যবিশ্লেষক খরচ করেছে দিস্তার পর দিস্তা কাগজ। কিন্তু মূল এবং আদি মাহফুজা মঙ্গলেই রয়েছে মজিদের কবিসত্তার অন্তনির্হিত মৌলিকত্ব। হতে পারে আদি মাহফুজার দেহ শীর্ণকায়। হতে পারে মাহফুজার জন্ম গ্রাম্য-জৌলুশহীন। কিন্তু এই আদি মাহফুজা নামক আঁতুর ঘরই আজকের ডাকসাইটে লেখক, গবেষক, চল্লিশখানা স্বাস্থ্যবান গ্রন্থের জনক কবি মজিদ মাহমুদের ভিত্তিভূমি। মজিদ মাহমুদের সুতিকাগার এই মৌলিক মাহফুজা মৃত্তিকা।