করোনা ॥ নাজমুন নাহার

রেস্টিকটেড আবাসিক এলাকায় ঢোকা যে কি ভোগান্তি। যাদের যেতে হয় তারাই জানে। নানা রকম প্রশ্নের জবাব দিয়ে, কাগজপত্র দেখিয়ে, নিজে গাড়ির মালিক কাম ড্রাইভার এসব প্রমাণ করে লিটু যখন আশফাকের বাড়ির গেটে, তখন দেখে আশফাক দুই পকেটে দু’হাত ঢুকিয়ে মেইন গেটে হাঁটাহাঁটি করছে। গাড়ি দেখে আশফাক দাঁড়িয়ে পড়ে। ঝকঝকে রংয়ের লম্বা মেদহীন চেহারার মধ্য বয়স্ক আশফাককে লিটুর চেয়েও কম বয়সী মনে হয়। গাড়িতে উঠতে উঠতে বলল, দোস্ত ‘পৌরষ্যের কাছাকাছি’ গানটা ধর তো। বলেই দু’জনে চোখাচখি করে এক সঙ্গে হো হো করে হেসে ওঠে। গেটে দাঁড়ানো নিরাপত্তা প্রহরী চমকে তাদের দিকে তাকায়। দুজনের উচ্চকিত হাসির রেশে সেই নিরাপত্তা প্রহরীর কুচকানো কপাল সমান হয়ে যায়।

তাদের ইউনির্ভাসিটি লাইফে একবার এক বিকেলে মাঠে গোল হয়ে বসে লিটু তার চমৎকার গলায় একটার পর একটা হেমন্ত আর মান্নার গান গাইছিল। তখন তাদের নাইস নামে এক ফ্রেন্ড লিটুকে রিকুয়েস্ট করে দোস্ত ‘পৌরষ্যের কাছাকাছি’ গানটা একটু গা তো। সবাই হো হো করে হেসে ওঠে, সেই থেকে নাইসকে পুরো ইউনির্ভাসিটি লাইফে ‘পৌরষ্যের কাছাকাছি’ বলে সবাই ক্ষেপিয়েছে। এমনকি আজও নাইস প্রসঙ্গ উঠলে এই গান উঠবেই।
লিটু বলল, স্টিয়ারিং হাতে গান জমবে? তার’চে প্লেয়ারেই শুনি।
– ধুর ব্যাটা, তোর গলার সঙ্গে আর কারো যায়? ধর গানটা।
লিটু গেয়ে উঠে ‘পৌষের কাছাকাছি রোদ মাখা সেই দিন’। তার পর একটার পর একটা মান্না হেমন্ত চলতেই থাকল আর তার ফাঁকে ফুটনোটের মত বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে নানা স্মৃতিচারণ। তারা সেদিন তাদের এক বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে গিয়েছিল। অনেকের সঙ্গে অনেকদিন পরে দেখা হলো। একটা গেট টুগেদারের মত হলো, সবাই বেশ আনন্দে সময়টা কাটালো। আশফাক কথা দিল সেও একদিন সবাইকে ডাকবে কোথাও। কেউ কেউ ঠাট্টা করল কোথায় ডাকবি? তোর নিজের বউ তো সাত সমুদ্র পার? কার বউ লীজ নিবি এসব সামলানোর জন্য? তোর ভাবী তো সারা বছর তোর ঝামেলা সামলাচ্ছে আবার এই বন্ধু বান্ধবদের হ্যাপা? তোর খবর আছে তাহলে?
আশফাক বলে উঠল আরে না না, বাসাতেই ডাকতে হবে এমন কেন? হোটেল রেস্টহাউসের কি অভাব? দাঁড়া, কালই খোঁজ লাগাচ্ছি একটা ভালো রিসোর্টের। আজকাল বেশ সুন্দর সুন্দর রেস্ট হাউস আর রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। তোদের একটা সুন্দর রিসোর্ট বা রেস্টহাউস, সঙ্গে পানীয় আর খাবার হলেই তো চলবে? নাকি আরও কিছু লাগবে? বলে চোখ টিপে একটা অশ্লীল ইংগিত করে। সবাই একসঙ্গে হাসিতে ফেটে পড়ে।

মাঝরাতে ফাঁকা রাস্তায় বেশ ফুরফুরা মেজাজেই আশফাককে বাসায় নামিয়ে দিয়ে নিজ আস্তানায় ফেরে লিটু।
তাদের বন্ধুত্ব অনেক দিনের। সেই ইউনির্ভাসিটি লাইফের প্রথম দিন থেকেই। তারা দু’জনে দু জায়গায় থাকলেও যোগাযোগটা সবসময় ছিলই, সে কাগজে কলমে হোক কিংবা মোবাইলে। আর এখন তো দুজনেই রাজধানীতে থাকে। আশফাক অনার্স শেষ করেই বিসিএস দিয়েছিল। মার্স্টাস শেষ করেই তার চাকরি হয়ে যায় এডমিন ক্যাডারে। চাকরির দশ বছরের মাথায় বিয়ে করে রীতা নামের এক দুর্ধর্ষ সুন্দরীকে। সে শুধু সুন্দরীই নয় পড়াশুনাতেও দারুণ। বিয়ের পর পরই তাদের দুটো ছেলে হয় । ছেলেরা একটু বড় হওয়ার পর সেই সুন্দরী বউ রীতা আবার পড়াশুনা শুরু করে। দেশে এমফিল করে বাইরে পিএইচডির জন্য ট্রাই করে আমেরিকায় একটা ভালো ইউনির্ভাসিটিতে সুযোগ পায়। আশফাককে অফার করে চলো, ওখানে সেটেল করি। কিন্তু আশফাকের মন টানে না। রীতা এদেশের দুর্নীতি, অশিক্ষা, জনসংখ্যা অনেক রকম উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করে। আশফাকের বড় ভাইকেও যেয়ে ধরে রীতা, যেন তিনি আশফাককে বোঝান। কিন্তু আশফাকের মন সায় দেয় না। প্রায় মাস ছয়েক ধরে ঝগড়া-ঝাটি শেষে রীতা একাই ছেলেদের নিয়ে উড়াল দেয়। আশফাক একা মানুষ তাই বাসাটা ছেড়ে দিয়ে বড় ভাইয়ের বাড়িতেই ওঠে।

লিটুও একটা বিদেশি কোম্পানীতে চাকরি করে। তার ব্যস্ততা সীমাহীন। এর পরে একদিন লিটুর কথা হয়েছে আশফাকের সাথে। আশফাক জানায়, তার বউ ছেলেরা দেশে আসছে খুব শীঘ্রই এবং তাকে দেশ ছাড়ার জন্য আবার প্রেশার ক্রিয়েট করছে। আশফাকের চাকরি পঁচিশ বছর পূর্ণ হয়েছে। বউ বলছে এবার চাকরি ছেড়ে দিতে পার। আচ্ছা চাকরি না ছাড়, একবার চলো ঘুরে আসো। দেখ আমরা কিভাবে থাকি।
তখন চীনে করোনা করোনা গুঞ্জণ। বাংলাদেশেও ছড়াতে পারে, নানারকম কথা ভাসছে। আবার আশফাকের প্রমোশন নিয়ে কি একটা ঝামেলাও হয়েছে। তাই তার বড় ভাই এবার স্ট্রংলি বলল আচ্ছা এত করে যখন বলছে, তখন যা ঘুরে আয়। অসুবিধা কি? একটা রিফ্রেসমেন্টও হলো। আশফাক নিমরাজি।
তার ভাই বলল, ‘আচ্ছা বলে বসে থাকলে তো হবে না, কাগজপত্র সাবমিট করতে হবে। ওরা আসার পর কাগজপত্রের জন্য দৌড়াবি, না ওদের সময় দিবি? কালই লেগে পড় কাগজপত্র জোগাড়ে’।
ভিসার জন্য যেসব কাগজপত্র দরকার সেসব জোগাড়ে নেমে পড়ল আশফাক। কোথাও কাগজপত্র সাবমিট করতে গেলে দেখা যায় এটা আছে তো ওটা নাই ওটা আছে তো সেটা নাই। যাহোক সব কাগজপত্র ম্যানেজ করে সে লাইনে দাঁড়ায়। লাইনে শুধু তারা পাঁচজন, এ সময় এক বাঙ্গালী অফিসার এগিয়ে এসে হাসতে হাসতে বলে, আপনারা যে আমেরিকা যাবেন ডোনাল ট্রাম্প তো আপনাদের কাছে আরও একটা কাগজ দেখতে চাইবে। সেই কাগজ কই? তারা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। বলে, সব কাগজই তো জমা দিয়েছি। অফিসার বলল, না সব দেন নাই। করোনা টেস্টের কাগজ লাগবে। সেটা আপনারা জমা দেননি। করোনা টেস্ট করিয়ে রির্পোট জমা দিতে হবে।

তখন করোনার প্রথম দিক। আশফাক টেস্টের লাইনে দাঁড়ালো। নির্ধারিত দিনে রিপোর্ট এলো, পজেটিভ। সর্বনাশ। রিপোর্ট পেয়ে আশফাক আর বাসায় ফেরে না। সরাসরি করোনা রোগীর জন্য নির্ধারিত হসপিটালে এডমিট হয়। তাকে একটা কেবিন দেয়া হয় ঠিকই কিন্তু তার তো জ্বর কাশি, শ্বাসকষ্ট কিছুই নাই। সে স্বাভাবিক মানুষ আর স্বাভাবিক মানুষের মত তার ক্ষুধা তৃষ্ণায় খাবার পানি দরকার। কিন্তু এখানে প্রায় কাউকেই পাওয়া যায় না। এর মধ্যে রীতা তার দু বাচ্চা নিয়ে দেশে এসেছে। ফিরে তারাও চৌদ্দ দিনের কোয়ারিন্টিনে। সান্ত্বনা হল হসপিটালে কোন ভিজিটর এলাউ না। কি অদ্ভুত এক রোগ এলো পৃথিবীতে যে রোগে কেউ রোগীর সংস্পর্শে আসতে পারবে না, কেউ সংস্পর্শে এলে তারও আক্রান্ত হবার শংকা।

আশফাক মোবাইলে ভিডিও কলে সবার সঙ্গে কথা বলে সময় কাটায়। রীতাও কল দেয় কথা আর কান্নাকাটি চলে দুজনের। ভাগ্যে ভিডিও কল ছিল। ভিডিও কলে ছেলেদের দেখল বড় হয়ে গেছে ছেলেরা। বড়টা চৌদ্দ ক্রস করল গতমাসে। গোফের হালকা রেখা। বয়ঃসন্ধি চলছে। ছেলেরাও খুব কান্নাকাটি করছে। আশফাক অভয় দেয় আমার কিছুই হয়নি। দেখ জ্বর নাই, সর্দি, কাশি কিছুই নাই। কিচ্ছু হবে না আমার। ঠিকমত খেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তবু কোথায় যেন একটা চোরা আতংক ভর করে। করোনা মানেই মৃত্যু। দেশে দেশে লক ডাউন ঘোষণা করছে। হসপিটালে এডমিট এর দুদিন পরে তার ভাই অন্য একটা বিশেষায়িত হাসপাতালে কেবিনের ব্যবস্থা করে। সেখানে সে আরও তের দিন থাকে। যদিও সেখানেও ভিজিটর এলাউ করে নাই। ভিডিও কলই সম্বল। তার একটু খারাপ লাগছে ভেবে যে, বৌ বাচ্চাদের সময় দিব ভেবে আগেই কাগজপত্র সাবমিট করতে নামলাম, কপালের ফের। কি হলো? সেই হসপিটালের বেডে শুয়ে বসে সময় কাটাচ্ছি। করোনা নিয়ে কত গল্প কত ভয়, কত দেশে কত লাশের খবর।

আর ফেসবুক জুড়ে তো করোনা হলে কি করবেন, করোনা হলে কি কি হয় এই ভিডিওতে ছয়লাব। এসব দেখতে দেখতে আশফাকের মাথা ধরে যায়। কিন্তু এসব দেখা ছাড়া তো উপায়ও নাই। কোন কাজ নাই, বাইরে যাওয়া নাই। এখন শুধু অপেক্ষা, ষোল দিনের দিন নেগেটিভ রির্পোট নিয়ে সে রিলিজ নিবে। ভিসা অফিসে রির্পোট জমা দিয়ে বাসায় যাবে। সবার উদ্বেগ আর দুচিন্তার অবসান ঘটবে। রীতারাও বাসায় ফিরবে কোয়ারিন্টিন শেষে।
ঘুম থেকে উঠেই আজ মনটা ভালো লাগছে আশফাকের, আজ তার রির্পোট দিবে। রাতে সে শুনেছে রির্পোট নেগেটিভ এসেছে। জীবনে এই প্রথম সে উপলব্ধি করল নেগেটিভও দারুণ দামী। এই ষোল দিনে সে আরও অনেক কিছু শিখেছে, আরও অনেক নতুন নতুন বিষয়ও উপলব্ধি করেছে, যা কর্মময় ব্যস্ত জীবনে কখনও সেভাবে ভাবনায় আসেনি, উপলদ্ধিতে আসেনি। সে তার পরিবারের জন্য ছেলেদের জন্য অদ্ভুত এক ভালোবাসার টান অনুভব করেছে। এতদিন সে ভেবেছে ছেলেরা তার মায়ের সঙ্গে আছে, উন্নত দেশে উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থায়। তাদের নিয়ে আর চিন্তা কি। কিন্তু এই একাকিত্বের দিনগুলোতে সে ছেলেদের কাছে পাওয়ার জন্য একধরণের হাহাকার বোধ করেছে।

মন ভালো করা ঝকঝকে রোদ উঠেছে। হাসপাতাল চত্বরের ঘাসগুলো ইশ কি সবুজ আর রাস্তার দুপাশে ফুটে থাকা ফুলগুলোও কি চমৎকার লাগছে। জীবন কি অদ্ভুত দেখ, শরীর ভালো তো সব ভালো। কথায় আছে না জান হ্যায় তো জাহান হ্যায়। বিছানায় উঠে না বসতেই নাস্তার ট্রে দিয়ে গেল। ওয়াসরুমে যাওয়া দরকার, আজ অনেক কাজ। আর শুয়ে থাকা নয়। আশফাক আল্লাহর কাছে অনেক শুকরিয়া জানায়, কত কিছু শুনেছে করোনা নিয়ে। আল্লাহ রহম করায় তাকে সেভাবে ভুগতে হয়নি।
সে উঠে ওয়াস রুমে যেয়ে কমোডে বসতে যেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। কমোডের ধারে মাথা ঠুকে যায় আর ব্লিডিং শুরু হয়।

একঘন্টা পরে নার্স আসে রুমে এসে রোগীকে না পেয়ে ওয়াস রুমে ধাক্কা দেয়। পরে চাবি এনে দেখে ওয়াসরুমের ফ্লোর রক্তে ভেসে গেছে। রোগীকে অচেতন অবস্থায় ওটিতে নেয়া হয়। কিন্তু ইন্টারন্যাল হেমারেজ বন্ধ করতে পারে না ডাক্তাররা। শেষে রোগীর ভাইকে বলা হয় আমরা ব্লিডিং বন্ধ করতে পারছি না, আপনি অনুমতি দিলে অপারেশনে যাব। এ অবস্থায় অনুমতি না দিয়ে তো কিছু করার নাই।
ওটির সামনের লাউঞ্চে রীতা ছেলেরা তার ভাই ভাবীসহ সবাই করোনা উপেক্ষা করে অধীর অপেক্ষায় বসে আছে আশফাকের জন্য। ওটিতে নেয়ার এগারো ঘন্টা পর ডাক্তার জানায়, সরি আমরা ব্লিডিংবন্ধ করতে পারি নি।
We are very sorry.