কলজে রোডের র্জানাল-৪০॥ মামুন মুস্তাফা



এই যে আমি। তার রূপরসগন্ধ জারিত হয়েছে সেই ছোট্ট মফস্বল শহর বাগেরহাটের কলেজ ক্যাম্পাসে। সরকারি প্রফুল্লচন্দ্র মহাবিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে। আজও তার টান উপলব্ধি হয় প্রতিটি লেখার ভেতরে। পি সি কলেজের প্রায় প্রতিটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যুক্ত থেকে, বন্ধুদের নিয়ে মঞ্চ তৈরি করে স্বরচিত নাটক মঞ্চায়ন কিংবা শুকলাল সঙ্গীত বিদ্যাপীঠের অনুষ্ঠান সঞ্চালনা অথবা সংলাপ সাহিত্য আসরে কবিতা পাঠ- এসব কিছু ধীরে ধীরে ‘বেন্টিঙ্ক’ নামের বালকটিকে কখন যে গড়ে তুললো ‘মামুন মুস্তাফা’, আজ নিজেই যেন সেই পাঁকে ডুবে খাবি খাচ্ছি। সত্যিই কি তাই? অদ্ভুত নিয়তির এ বিধান।

তবে নিজের লেখার মূল্যায়নে এটুকু বলতে পারি বাগেরহাটের জলহাওয়া, পি সি কলেজের বিস্তৃত উদার পরিবেশ, রাধাচূড়া-কৃষ্ণচূড়ার বিশালত্ব আমার কবিতা কিংবা গদ্য- উভয় ক্ষেত্রেই স্মৃতিকাতর করে তোলে। ‘স্মৃতিসত্তা’র কবি কি তবে আমি? এ প্রশ্নের বিশ্লেষণে আবিষ্কার করি দড়াটানার নীরব স্রোতধারা আমাকে ‘কুহকের প্রত্নলিপি’ লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। আমার পিতার ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে, মায়ের ফর্শা চিবুকে রঙিন প্রজাপতির ছন্দ- তাঁর নৃত্যের তালে বেজে চলেছে ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’। আহ শৈশব। পরাক্রান্ত ওই ইমেজে গড়ে উঠলো একদিন ‘জাতকের চিঠি’।

দড়াটানার নিরবধি শান্ত জলে শৈশবের ছায়া। ৫০-উত্তীর্ণ জীবনে সব স্মৃতিতর্পণ ধূসর হয়ে যায়। ধূসরতম দ্বীপে সত্যিই কি ভেঙে ফেলা যায় ‘গার্হস্থ্যবেলা’? “ঘরের আলো জ্বেলে জ্বেলে দেখেছি/শংসাপত্র, ফ্রেমের ছবি, খাটের পাশে/পিতার চটি- আর মা? /ভেজানো কপাটে প্রতীক্ষার সেই চোখ।” কলেজ রোডের আলোআঁধারিতে ওরাই তো ফিরে আসে বার বার। আমার মায়ের নিরন্ন সংসার, বাবার মগ্ন পাঠশালা, বোনের রবীন্দ্রসঙ্গীত, আর নিজের ‘যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা’-সবকিছু উজ্জ্বল আজ ফেলে আসার দূর অতীত ছোট শহর বাগেরহাটের পথে পথে। ‘তুমি যাবে ভাই, যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়’।

ছোট গাঁয়ের মতো মফস্বল শহর বাগেরহাটের শ্যামলিমা দীপ্র দহন হয়ে পুড়িয়ে মারে পঞ্চাশ পেরুনো এই যুবাবৃদ্ধকে। ফিরে আসে ‘চরণবাবু’র ফেলে আসা পথ, রেল লাইনের পোড়াগন্ধ, ভূতুড়ে স্টেশন; মহাকাব্যিক সেই জগতের সঙ্গে আজও লীন আমার বাবা-মা। আমি তাঁদের উত্তরাধিকার শেষ আলোটুকু জ্বালি জীবনের প্রচ্ছদপটে। দিনান্ত শেষে ফুরিয়ে যাওয়া সলতেটুকু আমাকেই প্রশ্নবাণে হানে- ‘এখানেই যাত্রা শেষ। পথেরও।’ আমি এক ধর্মবিশ্বাসে চরম অস্তিবাদী মানুষ স্রষ্টার সৃষ্টিকে স্মরণ করি তখন- ‘ফাবি আইয়ে আলা ই রব্বিকুমা তুকাজযিবান’। তোমার কোন অনুগ্রহ আমি অস্বীকার করবো?

বাবা-মায়ের কবরে যে সমাধিফলক তাকে চিরন্তনী মেনে পঞ্চাশ পেরুনো আমি এগিয়ে চলেছি ৫১, ৫২, ৫৩…। এরপর…। বাগেরহাটের বন্ধুরা কে কোথায়? জাকির, রুমি, মূসা, মাহবুব, শারমীন, শর্মি, লাজু- সবাই আজ সংসারবিষে সরীসৃপ। তবু ওদেরই হাতছানি ডেকে নেয় কাটাখালির মোড় থেকে দশানি, শালতলা, আমলাপাড়া, পুরাতন বাজার হয়ে কলেজ রোড- প্রফুল্লচন্দ্র মহাবিদ্যালয়। আমার মায়ের মৃত্যুসময়ে, আমার বাবার অন্তিম চোখে কথা বলেছিল ওই সময়খণ্ড- ৬২-এর কয়লার ট্রেন, আষাঢ়স্য দিবস, ৬৭’র ১৫ জুন, দুর্বিনীত ৭১, ৭৪-এর দুর্ভিক্ষ, ৭৯’র সরকারি পি সি কলেজ, ৯৬-এ প্রথম সন্তানের সংসারযাপন; এরপর অবসরের ক্লান্তি। জীবনকে বয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া শুধু- ‘কত গানের স্বরলিপি লিখেছি আমি, জীবনের স্বরলিপি লেখা হলো না’। আমিও তো সেই সূর্যালোকিত দিনের চন্দ্রগ্রহণ শেষের পথে হাঁটছি শুধু।

কিন্তু আমারও যাত্রা শেষে আমিও দাঁড়াতে চাই কলেজ রোডের পাশে বাতিজ্বলা লাইটপোস্টের নিচে। উপলব্ধি করতে চাই নতুন শিশুর মতো জন্মজননীর চিবুক, পিতার নির্ভরতার হাত ছুঁয়ে দেখতে চাই, একমাত্র সহোদরার অপত্য স্নেহছায়া অঙ্গে মেখ নিতে চাই। আরো চাই স্ত্রীর অনুরাগমিশ্রিত ভালোবাসায় সিক্ত হতে। সন্তানদ্বয়ের সততার বিশ্বাসটুকু বুঝে নিতে। যে কলেজ রোড আমাকে আজ এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে, তার ফেলে আসা পথের চূর্ণ নুড়িটুকু দিয়ে আমারও কবরের সমাধিফলকে লেখা হোক : ‘নেউল রাত্রির চোখে তবু ভোর বুনি/জেনে যাই, গৃহ- এক অসমাপ্ত পাঠশালা।’

তাই ৫০-উত্তীর্ণ জীবনে যে বন্ধু দিয়েছে উপহার ‘সংক্রান্তি’, তাকে প্রণতি জানাই। ভুলে যাই ওই মাহেন্দ্রক্ষণে কোনো কোনো শঠতা, হিংস্রতা, বিদ্বেষ, বক্র দৃষ্টি, ব্যাঙ্গাত্মক শ্লেষ। এ আমারই অর্জন। মায়ের অফুরন্ত ভালোবাসা, পিতার আশীর্বাদ। কলেজ রোডের জার্নালে এটুকুই লিপিবদ্ধ হোক : “রূপাঞ্জনা। তবে তাই হোক/সব পরিচয় মুছে যাক দীঘির কালো জলে/স্মৃতিরা মরে যাক ধুতুরা গেলাসে করে বেদনা পান/শুধু ঘাসফুল জেগে উঠুক নতুন আবাহনে/তারপর যেটুকু রবে উচ্ছিষ্ট/জীবনের ভাগাড়ে হবে তার বলিদান/এর পর কোরো বিদায়ের আয়োজন।”

ওই বিদায়ের পথে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা ৫০-উত্তীর্ণ এই পার্থিব জীবন বুজে আসা নিদ্রিত চোখে তখনও স্মরণ করে জন্মশৈশবের শ্যামলছায়া বাগেরহাটের জলহাওয়ায় বেড়ে ওঠা একজন এই ‘আমি’র নাড়িপোঁতা ঋণ। কীভাবে সে লীন হলো ‘মামুন মুস্তাফা’র চরণচিহ্নে! সেই ঋণ স্বীকারে তখনও প্রণত হই আমার স্রষ্টার কাছে, নির্ভার হয়ে আবারও বলি- ‘ফাবি আইয়ে আলা ই রব্বিকুমা তুকাজযিবান’- তোমার কোন সৃষ্টিকে আমি অস্বীকার করবো? হে বিধাতা, শুধু এই প্রার্থনা, শেষ বিচারে কবি হয়েই যেন দাঁড়াতে পারি তোমার সামনে। তোমার বিচারের বাণী শোনার অপেক্ষায় ঘর্মাক্ত মানুষের ভিড়ে তুমি তাকে চিনে নিয়ো- পিতা মুহম্মদ গোলাম রসূল, মা হামিদা বেগম, সাং পারনান্দুয়ালি, জেলা মাগুরা। ওই শেষ বিচারের সনদপত্রে লেখা হোক আমার জন্মশহর বাগেরহাট-কথা; আর তার নিয়ন বাতির নিচে জেগে ওঠুক কলেজ রোডের জার্নাল।