কলেজ রোডের জার্নাল-১২ ॥ মামুন মুস্তাফা



২০২০। পৃথিবীর মানুষ একে কি করোনাবর্ষ হিশেবে মনে রাখবে? বিশ্বব্যাপী ১৭ লাখের বেশি লোক আজ দেহান্তরিত শুধু করোনার কারণে। কিন্তু করোনায় না হলেও ৬ এপ্রিল আমার মায়ের মৃত্যু, আর ২৫ নভেম্বর আমার বাবার মৃত্যুর মাধ্যমে আমাকে সম্পূর্ণ নিঃস্ব করে গেছে ২০২০। আজ আমি পৃথিবীর পথে পথ চলি শুধু আমারও সংসার আছে, সন্তান আছে- তাই! এও তো বিধির বিধান। ‘আমি তোকে বাঁচিয়ে রাখবো, দহনে-দহনে, আনন্দগহনে, অমিত্রাক্ষর ছন্দে- যেমন তুই কবিতা লিখিস, তেমন করে’। এর সঙ্গে আরও একটি মৃত্যু আমাকে শূন্য করে গেছে- অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যারের মৃত্যু। আমার আরও একজন প্রিয়জন আজ জীবন সায়াহ্নে ধুঁকছেন সুদূর খুলনায়, কবি ও কথাশিল্পী আবুবকর সিদ্দিক। এই বরেণ্য চার জনের তিনজনই আমার জীবন থেকে ঝরে গেছেন আমাকে নিঃস্ব করে। এখন ধূসর ধূসরতায় আমি তাঁদের ছবি আঁকি।

আমার বন্ধু আমার বাবা। আমার সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন আমার পিতা। আমার লেখালেখির যা কিছু তাঁর সঙ্গেই তো বিনিময় হতো। যে পিতার কাছে ছেলেবেলা থেকে পাঠ নিয়েছি সাহিত্যের। ছেলেবেলায় যাঁর প্রশ্বস্ত বুকে শুয়ে জেনেছি শেক্সপিয়ার, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, শেলী, কীটস, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, ওমর খৈয়াম- আরো কত কী! যে পিতা আমাকে নিজের বুক দিয়ে আগলে রেখে রেখে চলেছেন সারাটি জীবন, তিনি নিঃশব্দে চলে গেলেন সবাইকে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিয়ে। আমার সজ্জন পিতা কোনোদিন চাননি তাঁর কারণে অন্যের কষ্ট হোক। আমার মা নানাবিধ রোগে দীর্ঘদিন ধরে জর্জরিত ছিলেন। আব্বা তাই মাকে বলতেন, ‘আমি দোয়া করি আল্লাহ যেন আমার জীবদ্দশায় তোমাকে নিয়ে যান, তা না হলে তোমাকে নিয়ে আমার ছেলেটার কষ্ট হবে’। আমার সেই পিতার মরদেহ নিয়ে আমি নিঃশব্দে চলছি গন্তব্যমুখে। কোথায় তাঁর গন্তব্য? আমারই কি গন্তব্য আজ নিঃষ্কন্টক?

১৯৫৭ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হলে থেকে ইংরেজি সাহিত্যে লেখাপড়া শেষ করেন। বাগেরহাট প্রফুল্লচন্দ্র মহাবিদ্যালয় তথা আজকের সরকারী পি সি কলেজে তার যোগদানও ছিল অদ্ভুত। পি সি কলেজের সে-সময়ের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আউয়াল সাহেব ঢাকায় এস এম হলে এসে আব্বার সঙ্গে নানাবিধ প্রসঙ্গে আলাপচারিতা করলেন। এরপর বিদায় বেলায় আব্বার হাত ধরে অনুরোধ করলেন, ‘আমি বাগেরহাটে ফিরে গিয়ে আপনার নিয়োগপত্র পাঠাবো, আপনি না করবেন না’। তাঁর সেই অনুরোধ আব্বা উপেক্ষা করতে পারেননি। ১৯৬২-এর বাগেরহাট-রূপসাগামী কয়লার ট্রেন আব্বাকে নামিয়ে দিল খানজাহান আলীর পূণ্যতীর্থ শ্যামল ছায়াঘন বাগেরহাটে। সেই থেকে প্রায় চল্লিশ বছরের জীবন অতিক্রম করে তিনি ফিরলেন পিতৃভূমি মাগুরায়।

কোনো ভোগবিলাস তাঁকে ছুঁতে পারেনি। কোনো ব্যাংক ব্যালান্স তাঁর নেই, কোনো বাড়িঘর তাঁর হয়নি কখনো। তাঁর সম্পদ ছিল তাঁর দুই সন্তান। এরও প্রধান কারণ তাঁর সহজাত শিক্ষা ও নিজ ধর্মের প্রতি অনুরাগ। আব্বাকে দেখেছি পবিত্র কোরআনের আরবী, ইংরেজি ও বাংলা অনুবাদ এবং তাফসির একত্রিত করে এর গুঢ় মর্মার্থ উদ্ধারে একাগ্রতা। তাঁর ধর্মই তাঁকে শিখিয়েছে স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য এবং পাশাপাশি তাঁর ভেতরে জাগ্রত করেছে স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতি মানবতাবোধ। এর ফলে তিনি তাঁর ধর্মের ক্ষেত্রে যেমন কখনো আপস করেননি, তেমনি সব ধর্ম-বর্ণ, শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতি ছিল তাঁর অগাধ বিশ্বাস ও মহানুভবতা।

আবার আমার সেই পিতাকেই দেখেছি রবীন্দ্রনাথের সঞ্চয়িতা ও গীতবিতান থেকে জীবনের নানাদিক উন্মোচন করতে। শেক্সপিয়ার মানবচরিত্রের যে অন্তর্মুখিতা ও বহির্মুখিতা অঙ্কনে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন, তার জয়গানও তিনি করেছেন। প্রকৃতই একজন ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ও অধ্যাপক হয়েও আমার পিতা ছিলেন মনেপ্রাণে একজন খাঁটি মুসলমান। আমার পিতাকে তাই কখনো ধর্মান্ধ হতে দেখিনি। যে চোখে তিনি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দকে দেখেছন কিংবা শেলী, কীটস, শেক্সপিয়ারকে অবলোকন করেছেন; ঠিক একই ভাবে তিনি তাঁর রাসূলকে (স.) নিজ মর্মে অনুধাবন করেছেন, স্রস্টাকে খুঁজেছেন নিবিষ্ট চিত্তে। এদের ভেতরে যা কিছু ভালো, যা কিছু সুন্দর, যা কিছু নতুন জীবনের দিক নির্দেশ করে; নিজের জীবনে তিনি তাই গ্রহণ করেছেন। আর সে জন্যেই বোধহয় যতবারই আমার সঙ্গে কথা হতো, তিনি বলতেন, ‘‘জীবনে মানুষ যত পন্থায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারে তার অন্যতম হচ্ছে ‘সততা’।” অথচ আজকের পৃথিবীতে সেই ‘সৎ মানুষের খোঁজ’ পাওয়া বড়ো দুষ্কর। তাই তো সমাজে নানা স্তরে প্রতিষ্ঠিত আব্বার কোনো কোনো ছাত্র আব্বাকে চিঠিতে তাদের মানসিক যন্ত্রণার কথা এভাবে জানিয়েছেন, ‘স্যার, আপনি যে মূল্যবোধ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, যে আদর্শ আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন তা আজকের যুগে অচল’।

আব্বার মৃত্যুর খবরে তাঁর পুরনো ছাত্ররা নানা ভাবে তাঁকে স্মরণ করেছেন। কেউ তাঁর ইংরেজিতে পাণ্ডিত্যের কথা, আবার কেউ তার অন্যান্য বিষয়েও অগাধ জ্ঞানের কথা বললেন। অনেকে আবার আব্বার ক্লাসে বাংলা বললে শুধু বাংলা, আর ইংরেজি বললে শুধুই ইংরেজি বলার কথা স্মরণ করলেন। এ দুই ভাষার মিশ্রণে তিনি কখনো কথা বলেননি। অনেকেই তাঁর রোল কলের মাধুর্যের কথা বলেছেন- ওয়ান ও ওয়ান, ওয়ান ও টু ইত্যাদি। কিন্তু তার এক ছাত্রী চেলী দুঃখপ্রকাশ করে বললেন, “যখন স্যারের ফোন নম্বর পেলাম তখন স্যার আর নেই্, স্যারের সঙ্গে কথা বলা আর হলো না। আমার কপালে নেই”। আর বাংলাদেশ সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জালাল আহমেদ জানালেন, “স্যারের সঙ্গে মৃত্যুর দশ দিন আগেও কথা হলো। ইচ্ছে ছিল বাগেরহাটে যাবার পথে মাগুরা থেমে স্যারের সঙ্গে দেখা করবো, স্যারের কাছে যাব, হলো না”।

আমারও তো অনেক কিছুই ইচ্ছে ছিল, হলো না। পথে পথে বাবার মরদেহ বয়ে নিয়ে যাব, এ তো আমি চাই নি। আব্বাকে তো আমার কাছে আনতেই যাচ্ছিলাম মাগুরায়। বেলা তখন ১২টা। পাটুরিয়া ঘাটে অপেক্ষা করছি। অ্যাম্বুলেন্সে করে আব্বাকে ঢাকা আনা হচ্ছে; উন্নত চিকিৎসা, সেবা-যত্ন- কত কিছু তাঁর প্রয়োজন ছিল। পাটুরিয়া ঘাটে অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হচ্ছে। না গরম না শীত। ধুলোময় পরিবেশ। করোনার মুখোশ এঁটে আমি দাঁড়িয়ে। মাথার ভেতরে স্মৃতির ধাক্কা। কবে কখন আব্বা আমাকে কি বলেছিলেন? ‘লিখে যাও, এই লেখাই থেকে যাবে’। আমার বালক বয়সে আমার নানাবিধ অসুস্থতায় আমার বাবা কীভাবে আমাকে আগলে রেখেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত কালে আমার পক্স কিংবা হাম হলে- এই বাবাই তো ছুটে গিয়েছিলেন আমার পাশে। আজ আমি তার অচেতন দেহের অপেক্ষায় ড্রেজিং করে বাঁচিয়ে রাখা পদ্মার পাড়ে ‘নিজেরে হারায়ে খুঁজি’।

কিন্তু সে কয়েক মুহূর্তের জন্যে শুধু। ফেরি পাটুরিয়া ঘাটে ভিড়তেই আব্বার অচেতন দেহের সঙ্গে আসা আমার মেজ চাচার ছেলে (রফিক ভাই) ফোনে জানালেন, অক্সিজেন আর টানছেন না তিনি। আমাদের দেখানো উচিত পথে কোনো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। আমি আব্বার অচেতন দেহের পাশে উঠে পড়লাম অ্যাম্বুলেন্সে। প্রথমে ঘিওর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, পরে মনিকগঞ্জ মুন্নু হাসপাতালে নেওয়া হলে ডাক্তার জানালেন, আব্বা আর নেই।

বিকাল ৪টা। শীতার্ত সূর্য ঢলে পড়ছে। মনের ভেতরে ঘোঁট পাকানো সমস্ত গুমোট এবার খুলে যেতে লাগলো। ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেল সমস্ত অবলম্বন। অধিকার, আশ্রয়, বিশ্বাস, ভরসা- সবকিছু হারিয়ে গেল। অন্তর্হিত হলো আশ্বাস। সত্য শুধু এই মৃত্যু। আমাকেই তো তা বহন করতে হলো নিঃশব্দে, নীরবে। একমাত্র পুত্র সন্তান হিশেবে আমি তাঁর উত্তরাধিকার সেই তখন দিয়ে চলেছি আত্মীয়জন, চেনাজানা সব মানুষকে আব্বার শোকবার্তা কেমন ঠাণ্ডা স্বরে। এও সম্ভব ছিল আমার জন্যে। মনে হচ্ছে, আমি একাধারে একাকী, বৈরী সময়ের দ্বারা আক্রান্ত। তখন আব্বার সঙ্গে আসা আমার মেজ চাচার ছেলে রফিক ভাই আর ছোট চাচার ছেলে জয় সমস্ত বাঁধা ও আড়াল ঠেলে আমার পাশে ভরসার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে।

ঢাকা নয়, উন্নত চিকিৎসা আর নয়, ফিরে চলছি মাগুরায়। ঝাপসা চোখের মধ্য মনিতে খেলা করছে আমার ছেলেবেলা- আমার বাবা, আমার মায়ের যৌবনদীপ্ত সংসার; দুই সন্তানকে নিয়ে তাঁদের রঙিন পৃথিবী। কীভাবে তাঁরা বুকে-পিঠে করে মানুষ করেছেন আমাদের। লোভ-লালসা নয়, অর্থবিত্ত নয়, ঘরবাড়ি নয়, সুসন্তান যেন বলে পৃথিবীর মানুষ- পরমকরুণাময়ের ‘আশরাফুল মাখলুকাত’। হতে পেরেছি কি? সম্পত্তি নয়, সম্পদ ছিলাম তাঁদের আমরা দুই ভাইবোন। বাবার নিথর দেহ ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছি- আপনাকে নিয়ে ফিরছি আব্বা। এই তো শেষ ডাকা। আর কোনোদিন ভাঙাবো না আপনার ধ্যান। তাকে তাকে সাজানো আপনার লাইব্রেরির বইগুলো আমাকেই তো দিয়ে গেলেন? ওখানে আপনার গন্ধ, স্পর্শ, ভালোবাসা আমাকে মমতা দেবে, শান্ত রাখবে। আমি বিচলিত হবো না বাবা। আপনিই তো বলতেন- ‘প্রকৃত মানুষ সেই, যে বিপদে ধৈর্য ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে’। আমার মনে থাকবে, একটু একটু করে দেওয়া আপনার সব উপদেশগুলো।

আবারও ছুঁয়ে দিচ্ছি আব্বার হিম শরীর। সারারাত আব্বাকে পাহারা দিলাম আমার ছোট চাচার বড় ছেলে জুয়েল, ছোট ফুপুর একমাত্র ছেলে জাকির আর আমি। এই শেষ আব্বার সঙ্গ। তিনি তো কোনো কথা বলেননি আর! ধর্ম বলে, উনি দেখেছেন সব, বুঝেছেন সব, শুধু চলৎশক্তি নেই। আপনি কী তখনও আশীর্বাদের হাত রেখেছেন আমাদের মাথার ওপর? হয়তো-বা। তখনও বলেছেন, ‘লিখে যেয়ো। ওটাই থেকে যাবে।’ স্কুলে কত কলম হারিয়েছি। বকা নয়, প্রতিদিনই আপনি আমাকে নতুন কলম দিয়েছেন ভালোবেসে। তাই বুঝি আজ আমি লিখতে পারি। কত কথা, কোনটি আমি লিখব আব্বা? থেমে গেলে, আপনাকেই তো ফোন দিয়ে নিজেকে ঋদ্ধ করতাম। আজ যদি ভুলভাল লিখে ফেলি, আপনি রাগ করবেন না তো? আমার তো সবকিছু ভেঙে গেছে আজ। মা একা করে চলে গেছে মাত্র সাত মাস আগে। আপনি আজ নিঃস্ব করে চলে গেলেন। কেন আব্বা? এ যাওয়া কি আপনার জানা ছিল? তাই বুঝি নিজের ভূমি ছেড়ে যেতে যাননি কোথাও; বলতেন, ‘আমি আর বেশিদিন নাই’।

আপনার জানাজায় মসজিদের ইমাম সাহেব যে বক্তব্য রেখেছেন, তাঁকে আমি শ্রদ্ধা করি। এত কথা তিনি বুঝেছেন মাত্র কদিন আপনার সঙ্গে চলে। তাঁর শেষ বাক্য ছিল- ‘অনেক প্রিন্সিপালের জন্ম হবে। কিন্তু একজন প্রিন্সিপাল গোলাম রসূল শত বছরেও জন্ম নেবে কিনা জানা নেই’। আপনার সময়-কাল-পরিধিকে ছুঁয়ে দেখার সাহস আমাদের কারো নেই। আমি শুধু আমার আব্বা মানুষ গোলাম রসূলকে নামিয়ে দিচ্ছি নিঃসীম গহীন মাটির অতলে। তখন ঠিক মধ্যাহ্ন। শীতের দুপুর। রোদগুলো মুক্তোর মতো ঝরে পড়ছে। গোরস্থানের গাছগাছালি শোকস্তব্ধ। তার মাথার ওপরে গুটিকয়েক পাখ-পাখালির ডানা ঝাপটানি- সেও কেমন ব্যথাতুর! তখন কী গভীর মমতায় শ্যেন দৃষ্টি মেলে অতল মাটির গভীরে চেয়ে আছে আপনার বংশের উত্তরাধিকার আপনারই দুই পৌত্র, আমার পুত্রদ্বয়। কী গভীর ক্ষত নিয়ে তারা দাঁড়িয়ে। মাটির গুঁড়োর মতো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে হৃদয়, ভেঙে পড়ছে জাগতিক সংসার- পৃথিবী, তুমিও কি আমার মতো একা? আমি ফিরছি রক্তহীন শূন্য করতলে পিতার মুখচ্ছবি নিয়ে।