কলেজ রোডের জার্নাল-১০ ॥ মামুন মুস্তাফা




মাতৃ-ঐতিহ্যের শেকড়ে প্রোথিত আমার শৈশব। শুধু শৈশব কেন বলছি, আমার কৈশোর, তারুণ্যের অনেকটাই বাগেরহাটের জলহাওয়ায় পরিপুষ্ট। মা আমার দিন শেষে কাজ থেকে ফিরছেন, আব্বা তখন খুলনা দৌলতপুর বিএল কলেজে। প্রতি সাপ্তাহিক ছুটিতে আসতেন। আমার বোন কলেজ, তার পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। আমি নীরবে, নিভৃতে কবি হয়ে উঠছি। এতটাই মেতে আছি কবিতায়, যে, পাঠ্যবই থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছি। আবুবকর সিদ্দিক তো আছেনই, সঙ্গে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, আবুল হাসান; ওপার বাংলার নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর শক্তি চট্টোপাধ্যায় রীতিমতো ভর করেছেন আমার ওপর।
এসএসসির টেস্ট পরীক্ষায় পুরোদস্তর অকৃতকার্য। স্কুল আমাকে পরীক্ষায় বসতে দেবে না। হেড মাস্টারও বিস্মিত, তিনি বলছেন- আমার স্কুলের একজন কবি, তার এই অবস্থা? কবি স্বীকৃতি যেন তিনিই আমাকে প্রথম দিলেন।

স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক অমলেন্দু বিশ্বাস আমার দায়িত্ব নিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি নিলেন প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে। আব্বা পরীক্ষার আগের তিন মাস আমার সঙ্গে কোনো কথাই বলেননি। মায়ের মমতা দিয়েই মা আমাকে আগলে রেখেছেন। কাজে যাবার আগে পড়া দিয়ে গেছেন, কাজ শেষে বাড়ি ফিরে মাকে সেই পড়াগুলো আমাকে দিতে হয়েছে ঠিক ঠিক। আর অমলেন্দু স্যার প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে এসে অঙ্কসহ বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয়াবলীর অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো ধাতস্থ করাতেন। অমলেন্দু স্যার আজ নেই। কিন্তু তাঁকে স্মরণ করি শ্রদ্ধাভরে। আজকের দিনে এমন শিক্ষর্থীবান্ধব শিক্ষক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

আগেই বলেছি তৃতীয় বিশ্বের তৃতীয় দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের কোনো অভিভাবকই চান না, যে, তার সন্তান কবি-লেখক, চিত্রশিল্পী, গায়ক কিংবা অভিনেতা হোক। তাদের প্রথম পছন্দই থাকে সন্তান ডাক্তার, ইঞ্জনিয়ার, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি হবে। আর তাই আমাকেও নিতে হয়েছিল বিজ্ঞান বা সায়েন্স। যেখানে কোনোদিনই আমি আনন্দ পাইনি। তবুও সেসব গলধঃকরণ করে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেই। আশা ছিল প্রথম বিভাগে পাশ করব। কিন্তু বিধি বাম! মাত্র চার নম্বরের জন্য দ্বিতীয় বিভাগ নিয়েই পাশ করতে হলো। আব্বা তাঁর ভেতরের দুঃখ-কষ্ট, জ্বালা-যন্ত্রণা বকাবকি করে ঝেড়ে ফেললেন। আমি নীরবে ক্ষয়ে যাচ্ছি। আর মা আমাদের দুজনার ব্যথাটুকু নিজের ভেতরে ধারণ করে নির্বিকার। আমার ভেতরের কবিত্বশক্তিটুকু কি মা-ই জাগিয়ে দিয়েছিলেন সেদিন? কেননা কি করে তখন লিখেছিলাম- ‘আমি নিজেকে ঢেকে নেব তোমারই আঁচলে/কালো কালো অক্ষরের কালো কালো দাগ মুছে দেব তোমারই জলপ্রপাতে’।

মা তাঁর ধৈর্য আর সহনশীলতা দিয়ে আপন সুই-সুতোয় গেঁথেছেন এ সংসারকে। আজীবন অভাব-অনটন, দুঃখ-কষ্টকে সেধেছেন স্বামীকে ভালোবেসে, আমাদের দিকে তাকিয়ে। তাই বোধহয় এসএসসিতে প্রথম বিভাগ থেকে মাত্র চারটি নম্বর দূরে দাঁড়ানো আমার কষ্টটুকু মা হয়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। আর সেটুকু আমাকে ফিরিয়ে দিতে তিনি আমাদের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের মাধ্যমে যশোর বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে পৌঁছেছিলেন আমার কয়েকটি খাতা রি-এগজামিনের জন্যে। কিন্তু আমাদেরই এক নিকট-আত্মীয় ওই দূর সম্পর্কের আত্মীয়কে চাপ দিয়ে যশোর বোর্ডের চেয়ারম্যানকে নিবৃত্ত করেন এ কাজ করা থেকে। একথা বেশকিছু কাল পরে মা জানতে পারেন। মাকে নিজমুখে অপরাধ স্বীকার করে ওই দূর সম্পর্কের আত্মীয় ক্ষমা চেয়েছিলেন। এরপরও আমার মা সবকিছু সয়ে নিয়েছেন, সম্পর্ক ধরে রেখেছেন। জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়ে দিয়েছেন তাঁর শৈশবের প্রিয়জনদের কাছে।
এ-রকম কত শত আঘাত মাকে সহ্য করতে হয়েছে তার পিতৃভূমি বাগেরহাটে নিজেরই চেনাজানা আত্মীয়জনদের কাছে? সে খবর আমার জানা নেই। সব কি তিনি উন্মুক্ত করেছিলেন? অথচ একটা বিস্তার ছিল সেখানে। ক্রমশ তার সংকোচন ঘটেছে। সময় বৈরিতা করেছে, মিত্রের বেশে। আমার বাবাও কেন তবে বাগেরহাট ছেড়ে এলেন দীর্ঘ প্রায় চল্লিশ বছরের সম্পর্ক-সূত্র ছিন্ন করে? সে কি কেবল পিতৃভূমিতে ফিরবেন বলে? ভালোবাসার এই মানুষ দুটো- আমার বাবা-মা চিরকাল শুধু অনুচ্চারিত থেকে গেছেন আমাদের কাছে। দিয়ে গেছেন শুধু নৈতিক শিক্ষা আমাদের দুই ভাইবোনকে। যে নির্ভরতা থাকার কথা ছিল আমার মায়ের, তাকে তিনি ওখানেই হারিয়েছেন বহু আগেই, আমার নানার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে।

অথচ মা আমার কী বাবার বাড়ি, কী শ্বশুর বাড়ি- প্রতিটি সদস্যের সঙ্গে মানিয়ে চলতেন আপনজনের মতো। তাদের দেখভাল করেছেন নিঃস্বার্থ ভাবে। বিশেষত শেষ বয়সে শ্বশুর বাড়ি এসেও কেমন মানিয়ে নিয়েছেন সবকিছু। প্রতিটি সদস্য তার নিজের হয়ে গিয়েছে। মিঞা বাড়ির উত্তর প্রজন্মের প্রতিটি পুত্রবধূকে তিনি স্নেহবৎসল মায়া-মমতায় ঘিরেছিলেন নিজে মিঞা বাড়ির পুত্রবধূ বলে। কিন্তু মিঞা বাড়ির সব সদস্য কি তাঁর যোগ্য স্থান দিতে পেরেছিল? ব্যতিক্রম কেবল আমার বড় চাচী। আজ তিনিও লোকান্তরিত। একই কবরস্থানে একই মাটির গহীনে দুই জা আজ শুয়ে। কেমন তাদের সেই সংসার। জানতে নেই বুঝি। স্রষ্টার এমনি খেলা, মাটির ওপরের বাসিন্দাদের তা জানতে নেই যেন। বিধাতার এও কি স্বার্থপরতা? এই স্বার্থপরতার দলিলে লেখা আছে অনেক পুরাণকথা। এমনি তো দলিল আমার মা বয়ে এনেছেন পিতৃভূমি বাগেরহাট থেকেও। সে অধ্যায়ের যবনিকা তিনি নিজেই টেনেছেন। কিছু তার আমি লিখতে পেরেছি আমার দ্বিতীয় কবিতাগ্রন্থ ‘কুহকের প্রত্নলিপি’তে।

তার জখম আমাকে দংশন করে, সেই ভয়ে আমাকে আগলে রেখেছেন সবসময়। কোথয় যাই, কোথায় যাব না, সন্ধ্যার আগে বাসায় ফেরা- নানাবিধ বিষয়ে আমাকে নিয়ে মার দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। হয়তবা শৈশব থেকেই রোগাক্রান্ত ছিলাম, হয়তবা থিতু হতে পারিনি চাকরি ক্ষেত্রে, হয়তবা অর্থকড়ি নেই সংসার জীবনে, হয়তবা উদারচিত্তে যে কাউকে বিশ্বাস করি সবথেকে বেশি- এমন নানাবিধ বিষয় মাকে উতলা রেখেছে সবসময়। তাই তো আমার স্ত্রীকে ফোনে জিজ্ঞাসা করতেন, ছেলের চাকরিটা আছে তো? বেতন পেয়েছে? টাকা পাঠাব? আজ মনে হয়- মাকে কি আমিই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছি। হাই প্রেসার, ডায়াবেটিস, হাড় ক্ষয়, আমাদের অজান্তেই ঘটে যাওয়া মাইল্ড স্ট্রোক- সে কি তবে আমার দুশ্চিন্তায়? আমিই তো লিখেছিলাম কুহকের প্রত্নলিপির উৎসর্গ-পাতায়-

মুহম্মদ গোলাম রসূল

হামিদা রসূল
জনক-জননী
যাঁরা আজও আমার কারণে ক্ষয় হন

যদিও আমি মনে করি আমার পিতামাতার কালটি ছিল শ্রেষ্ঠ সময়। হয়তবা তারাও শুনেছেন তাদের পূর্বসূরিদের সময়টি শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখে। তবে কি এসব বংশপরম্পরায় প্রতিশোধ গ্রহণ? নাকি স্বস্তি আর শান্তির স্বর্গকে পেছন ফিরে দেখা? তাকে বর্তমানে না পেয়ে। তবে কি আমার পিতামাতার ক্ষয়-পতন ওখান থেকেই শুরু? কিন্তু তাঁদের জীবনের শুরুতে ছিল একটি একান্নবর্তী পরিবারের মায়াজাল। আমার ছোটখালা মাসের শুরুতেই বাসায় চলে আসতেন। বাবার বেতন হবে। আব্বাকে নিয়ে বাগেরহাটের বাজার ঘুরে ঘুরে তার ছোট ছোট আবদারগুলো কিনে নিতেন। প্রতি মাসে একটি মিষ্টির দোকানে আব্বার নামে বাকিতে মিষ্টি খেয়ে আসতেন, তার বিল মিটিয়ে দিতেন আব্বা। এসব মধুর স্মৃতি আজ কি ভুল, মিথ্যে। অথচ মানুষের ক্ষুণ্নিবৃত্তি অপত্য স্নেহ, মায়া-মমতা, ভালোবাসাকে পরাজিত করে দেয়।

সেই মধুর ভালোবাসাকে তাঁরা প্রোথিত করে এসেছেন তাঁদের বড় সন্তান আমার একমাত্র সহোদরা মাসরুরাতুল আসফিয়া পুতুলের বাগেরহাটের ফকিরহাটে বিয়ে দিয়ে। আমার ভগ্নিপতি এখন যশোর অঞ্চলের এলজিইডি’র এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার হিশেবে দায়িত্বে আছেন। ওর দুই মেয়ে। বড় মেয়ে এবছর ডাক্তার হয়ে বেরিয়েছে, আর ছোটটি কলেজে প্রবেশ করলো। তার মানে? বাগেরহাট ছাড়লেও তাকে অস্বীকার করতে পারেননি আমার বাবা-মা। তাঁদের শেকড় সেখানে পুঁতে রেখে এসেছেন।

সমাজে থাকে অচলায়তন। ওই অচলায়তন আমার বাবা-মা ভাঙতে পেরেছিলেন তাঁদের ভালোবাসায়। আর তাই সমাজ-মানুষের কোনো ক্ষুণ্নিবৃত্তি তাঁদের দাম্পত্যকে করতে পারেনি পর্যুদস্ত, ম্লান। তাই তো অভাব-অনটনের মাঝেও আমার পিতা কোনো লোভ-লালসার কাছে বিক্রি হননি। আমার মাও তাঁর মলিন আঁচলে ঢেকে দিয়েছিলেন সেসব অসহায়ত্ব। তিনি তাই স্বপ্ন দেখেছিলেন, শাহনাজ রহমাতুল্লাহর কণ্ঠে গীত সেই গানের ভাষায় তিনি বলতে পেরেছিলেন- ‘স্বপ্নের চেয়ে সুন্দর কিছু নেই, স্বপ্ন আমার রাখলাম তোমাতেই’। এ কথাই তো আমিও বলেছি ‘কুহকের প্রত্নলিপি’তে- ‘আজ তাই তিনিও ফিরে যান শূন্য হাতে/স্বামীর নতুন জীবনে নতুন স্বপ্নের/দোলচালে। তোমরা তাঁকে মনে রাখলে/কি রাখলে না, সে প্রশ্নের উত্তর/তিনি খুঁজবেন না কখনো তোমাদের/স্বার্থান্বেষী মনের কাছে’।

আর তাই মায়ের জানাজায় আব্বাকেও বলতে শুনি, ‘এক দোতলা-বাড়ির মেয়েকে আমি নিয়ে এসেছিলাম আমার কুঁড়েঘরে। আমি আর কি বলবো, আমার ছেলেই বলেছে সেসব কথা তার কবিতায়। আমি তাকে কিছুই দিতে পারিনি। কিন্তু তাঁকে আমি সম্মানের সঙ্গে বিদায় দিতে পারছি, এই সান্ত্বনা’।

অভাব-অনটনের সংসারে আমার মায়ের বিনোদন ছিল সিনেমা দেখা। আমার বাবাও তাঁকে সিনেমা দেখতে উৎসাহ দিতেন, পাঠাতেন বাগেরহাটের টাউন হলে। অনেক সময় মায়ের সঙ্গী ছিলাম আমি। সেই থেকে চলচ্চিত্রের প্রতি ঝোঁক আমারও রয়ে গেছে। মায়ের তারুণ্যে তাঁর আবৃত্তি, নাচ, নাটকে ভরে তুলেছিলেন জীবনের জলসাঘর। ছবি বিশ্বাসের ‘জলসাঘর’-এর মতো আমার মায়ের জলসাঘরও এখন মৃত। কিন্তু তার সুর রয়ে গেছে আজও।
বাইসাইকেলের চাকা গড়িয়ে চলার মতো জীবন নামক চাকাও গড়িয়ে চলেছে। নিঃশব্দ সে ঘূর্ণায়মান চাকার গতির ভেতরে হারিয়ে যেতে থাকে সময়পাবক। সময়, স্রোত আর স্মৃতির আয়নায় তবু আজও অমলিন আমার জন্মশহর বাগেরহাট আর তার শ্যামল প্রকৃতি। সেও তো আমার মায়েরই কারণ। ওই শহরেই তো একদিন আমার মা-ই ছিলেন। তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা, প্রণয়, পরিণয়- সবই তো বাগেরহাটকে ঘিরে। আমি তাকে ভুলি কি করে।