কলেজ রোডের জার্নাল-১১ ॥ মামুন মুস্তাফা



বাগেরহাট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে চলে গেছে বাগেরহাট-রূপসাগামী রেললাইন। সমান্তরাল সে রেললাইন আজ উন্নয়নের পীচ ঢালা মহাসড়ক। কিন্তু আমার বালক-বয়সে ওই রেললাইন ছিল শ্রেণিকক্ষের জানালা দিয়ে দেখা কোনো উপন্যাসের মতো মহাকাব্য। আমি যেন কখনো ওই রেললাইনে না উঠি, ওদিকে না যাই, সে ভয় মাকে সবসময় তাড়া করে ফিরতো। নিষেধ ছিল ওখানে না যাবার। তাই স্কুল থেকে ফিরলে মা বলতেন, ‘আব্বা তুমি আজ কেন রেললাইনে গিয়েছিলে?’ হয়তো সেদিনই আমি হঠাৎ কোনো বন্ধুর সঙ্গে গিয়েছি ওখানে। আমি বিস্মিত হয়ে বলতাম, ‘মা তুমি জানলে কি করে?’ মা বলতেন, ‘আমি যে মা। চোখ বুজলেই দেখতে পাই, তুমি কোথায় কি করছো।’ মা আমার চিরদিনের জন্য চোখ বন্ধ করেছেন। তিনি কি দেখতে পারছেন, তার ‘বেন্টু’ আজ কত একা! তার জীবনের নানাবিধ সমসাগুলো? অথচ এখন থেকে ছোট ছোট ব্যথাগুলো অনুচ্চারিত থেকেই যাবে বাকিটা জীবন।
মা আমার কষ্টগুলো অনুধাবন করতেন বিধায়, যখন আমি দু’দুবার বিসিএস পরীক্ষার মৌখিক পরীক্ষা (ভাইভা বোর্ড) থেকে ফেরত এলাম, তখন সেই দুঃসময়ে মা-ই তো আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। যখন সবকিছু ভেঙে পড়ছে। জীবনের প্রায় অনেকটা সময় অপচয় হয়ে গেল। বাবা অবসরে। মধ্যবিত্তের জীবনে একটি সরকারি চাকরি যেন সোনার হরিণ। পরম নিশ্চয়তার, নির্ভরতার।

এরকম দুরাবস্থার মধ্য থেকে লিখে চলেছি দুঃসময়ের কবিতাগুলো- ‘মধ্যবিত্ত’, ‘চিতাভস্ম’, ‘যাত্রা শেষ’ ইত্যাদি । কে যেন আমাকে অলক্ষে থেকে এসব কবিতাগুলো লিখিয়ে নিচ্ছে। এমনও হয়েছে, সারারাত ঘুমের ভেতরে কবিতা লিখেছি, পরদিন সকালে উঠেই মুখ না ধুয়ে কাগজ-কলম নিয়ে বসে গেছি ঘুমের ভেতরে লেখা কবিতাটি প্রাণ দিতে। আমার সেই দুঃসহ মুহূর্তে ছেলেকে প্রাণবন্ত রাখতেই মা পাশে এসে দাঁড়ালেন। ৬০০০ টাকা হাতে দিয়ে বললেন কবিতার বই প্রকাশ করতে। এভাবেই ১৯৯৮ সালে আমার প্রথম কবিতার বই সাবিত্রীর জানালা খোলা’র জন্ম হলো।

তখন বাংলাদেশে শুধু কবিতার বই প্রকাশ করতো ‘বিশাকা প্রকাশনী’। প্রথিতযশা কবিদের বইও এখান থেকে বের হচ্ছে- আবুবকর সিদ্দিক, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, রফিক আজাদ আরও কত নাম। বিশাকার কর্ণধার শাহজাহান বাচ্চু নবীন কবি হিশেবে অমার বইটি যত্ন নিয়েই প্রকাশ করলেন। আজ বাচ্চু ভাইও বেঁচে নেই। ১৯৯৮ সালে তার প্রকাশনীর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকায় তিনি আমার বইয়ের নামটি বলেছিলেন। তখন বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক কাগজগুলোতে আমার বইয়ের প্রচ্ছদসহ খবর বেরিয়েছিল। আর সব থেকে বড় বিষয় ছিল আমার প্রথম বইয়ে একটি পরিচিতি লিখে দিয়েছিলেন বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ কবি আবুবকর সিদ্দিক।

আমার প্রথম বই প্রকাশের দুই বছর আগে থেকে অর্থাৎ ১৯৯৬ সাল থেকে জাতীয় দৈনিকে আমার কবিতা প্রকাশ হতে থাকে। অধুনালুপ্ত দৈনিক ‘আজকের কাগজ’-এ আমার ‘বিবর্ণ মানবীর স্খলন’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়। তখন এর সাহিত্যপাতা দেখতেন কথাসাহিত্যিক সালাম সালেহ উদদীন। সালাম ভাই এখন দৈনিক ‘যায় যায় দিন’-এ কর্মরত। তিনি গত ২০ নভেম্বর ২০২০-এও আমার ‘মেয়ে তুমি দাঁড়িয়ে আছ’ কবিতাটি প্রকাশ করেন। একজন সজ্জন মানুষ সালাম ভাই। আমার তৃতীয় গদ্যগ্রন্থ ‘অন্য আলোর রেখা’ সালাম ভাইকে উৎসর্গ করি। অবশ্য সালাম ভাইয়ের সঙ্গে আরও একজনকে বইটি নিবেদন করি, তিনি কাজী রফিক। পেশায় প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, প্রাচীন দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক হিশেবে কর্মরত আছেন। তিনি একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, নাট্যকর্মী, কবিতাও লেখেন।

কাজী রফিক ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় পেশাগত ভাবে। আমি তখন বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রোগ্রামস (বিসিসিপি)-র প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর। কাজ করি মিডিয়া ও পাবলিকেশন নিয়ে। সেই সূত্রে প্রায় সব দৈনিক ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার নিউজ সেকশনের প্রধানসহ রিপোর্টার জগতের অনেকের সঙ্গে আমার ওঠাবসা। প্রতিনিয়ত তাদের সঙ্গে গোল টেবিল বৈঠক, বিভিন্ন জেলায় রিজিওনাল বৈঠক, ওয়ার্কশপ, সেমিনার করতে হতো। সেই সুবাদে দু’একজনের সঙ্গে আন্তরিকতা নিবিড় ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয়। তারাও আমাকে স্নেহ করেন, ভালবাসেন। আর তাই তারা কখনো আমার কোনো আবদার ফেলে দেননি। এদের মাঝে সংবাদের কাজী রফিক, সমকালের তপন দাশ, ইত্তেফাকের আশরাফুল আলম, প্রথম আলোর মোর্শেদ নোমান, ইন্ডিপেন্ডেন্টের এমদাদুল হক বাদল, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার মোরসালিন নোমানী, কালের কণ্ঠের ওমর ফারুক, দি সানের খাজা মাঈনুদ্দীন, বাংলা ভিশনের মোস্তফা ফিরোজ, চ্যানেল আইয়ের আরেফিন ফয়সাল, ভোরের কাগজের ইব্রাহিম খলিল জুয়েল অন্যতম।

যে কথা বলছিলাম, ওই সময়টা ছিল আমার জন্যে খুব দুঃসময়ের। কিছুকাল অধুনালুপ্ত ‘বাংলাদেশ ওবজারভার’-এর প্রতিবেদক হিশেবে কাজ করেছি। ভালো লাগেনি, ছেড়ে দিলাম। লিখে চলেছি দুঃসময়ের কবিতা। বেকারত্বের অভিশাপ, বাবার অবসরগ্রহণ, বাগেরহাট ছাড়া ইত্যাদি উঠে এলো আমার কবিতায়। লিখতে থাকলাম এক অদ্ভূত ঘোরের ভেতরে। ওই যে বললাম, কে যেন লিখিয়ে নিচ্ছে সেসব কবিতা। ওই সময় খুব পড়েছি পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম শীর্ষ কবি জয় গোস্বামী’কে। তাঁর মেটাফিজিক্যাল দর্শন আমাতেও ভর করেছিল অন্য স্তরে। সঙ্গে আবুবকর সিদ্দিকের ‘মানুষ তোমার বিক্ষত দিন’, যদিও কাব্যটি প্রণয়মূলক , তথাপি তার ভেতরের গূঢ় দার্শনিকতাযুক্ত জীবনাভাষ্য আমাকে আলোড়িত করেছিল। তাই তো লিখেছিলাম- ‘কবিতাশিল্প’, ‘বিশুদ্ধ কবর’, ‘প্রতিমানগর’ ইত্যাদি। আর এসবেরই সংকলন ২০০১-এ বের হলো কুহকের প্রত্নলিপি’তে। আর এই বইটি সে-বছর রাজশাহীর পুঠিয়া সাহিত্য পরিষদ আয়োজিত অনুষ্ঠানে নবীন কবির স্বীকৃতি বয়ে আনে। সেই আমার প্রথম সাহিত্যকৃতির সম্মান। আর তাই কুহকের প্রত্নলিপি আমার সাহিত্যজীবনের অনন্য অধ্যায়। বইটি প্রকাশের পর কবি ও কথাকার আবুবকর সিদ্দিক দৈনিক প্রথম আলো’তে একটি আলোচনা লিখে দেন। যেখানে তিনি বলেছিলেন, “বহু কবির প্রচুর কাব্যের অরণ্যে মামুন মুস্তাফা কিন্তু তাঁর এই দ্বিতীয় কাব্য কুহকের প্রত্নলিপি-তে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র কবি ব্যক্তিত্বের চিহ্ন তুলে ধরতে পেরেছেন। এই স্বাতন্ত্র্য যেমন বিষয়ের অধিকারে, তেমনি ভাষাশিল্পের অনন্যতায়। …আর এরই সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তিনি তাঁর মতো এক ধরনের ক্লাসিক অথচ আধুনিক ভাষারীতি অবলম্বন করেছেন। বিশেষ করে উপমা ও প্রতীকগুলোতে এই রীতির ব্যবহার লক্ষণীয়। …প্রচলিত রোমান্টিক প্রণয়াবেগের বিপরীতে মামুন মুস্তাফা পিতৃপুরুষের শিকড়চেতনায় নিবিষ্ট হন, যা বাংলাদেশের একমেটে কবিতার ভুবনে নতুন সুর ও ব্যতিক্রমী বলে মনে হয়েছে”।

যশস্বী সাহিত্যিক আবুবকর সিদ্দিকের এই মূল্যায়ন আমার কবি-স্বীকৃতির পথকে মসৃণ করেছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বলা আবশ্যক, আমার ওই দুঃসময়ে আবুবকর সিদ্দিক ঢাকাতেই অবস্থান করছিলেন। তিনি সেই সময়ে পিতৃস্নেহের হাতটি আমার মাথার ওপর রেখেছিলেন বলেই আমি সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পেরেছি। তাঁর প্রসঙ্গ এক কথায় কিংবা একদিনে শেষ হবার নয়। সে কথা বলবো অন্যত্র। শেষ করবো মায়ের কথা বলেই। মা আমার ২০২০-এর বইমেলায় প্রকাশিত নির্বাচিত কবিতার সংকলন ‘দশ দশমী’ দেখে যেতে পেরেছেন। মোট দশটি কবিতার বই থেকে চয়ন করা হয়েছে ‘দশ দশমী’র কবিতাগুলো। মায়ের উৎসাহে ১৯৯৮-এ ‘সাবিত্রীর জানালা খোলা’ প্রকাশ না হলে আজ ‘দশ দশমী’ হতো কিনা আমি জানি না। তবে শেষ দিকে এসে মা কাগজে প্রকাশিত আমার ছবিটিই শুধু দেখতেন; কি লিখলাম বা কে কি লিখেছে আমাকে নিয়ে তা ছিল গৌণ। মুখ্য হয়ে উঠতো তাঁর সন্তানের ছবিটি। ওতেই তিনি শান্তি বা স্বস্তি পেতেন।

কিন্তু আমি কি তাঁকে কোনো স্বস্তি দিতে পেরেছি, অন্তত তাঁর শেষ যাত্রায়? মাকে নামিয়ে দিচ্ছি নিঃসীম মটির গহীনে। আমার বুকের সঙ্গে ধরা মায়ের মুখমণ্ডল। কী ঠাণ্ডা, শান্ত। প্রকৃতিতে তখন অন্ধকার। শুধু নীরবতা ভাঙছে কিছু হাজার পাওয়ারের এলইডি লাইট আর গুটিকয়েক মানুষের নড়াচড়া। মা আমার হারিয়ে যাচ্ছেন, ক্রমশ দূরবর্তী হচ্ছেন, পা রাখছেন অন্য কোনো ভুবনে, অন্য লোকে। মাটির গড়িয়ে যাচ্ছে মাটির গহ্বরে, মাটিরই দেহ সেখানে প্রোথিত। এরপর কেবলি শূন্যতা…নিখিল শূন্যতা ঘিরেছে তখন আমার দু’চোখের জ্যোতির্বলয়ে।