কলেজ রোডের জার্নাল-১৫ ॥ মামুন মুস্তাফা




কবিতা কেমন হওয়া উচিত, গদ্যসাহিত্য কি, কার কার লেখা পড়তে হবে ইত্যাদি উপদেশ দিয়ে তিনি আমার ভেতরের সত্তাটিকে তৈরি করে দিয়েছেন। বলছি কবি ও কথাকার আবুবকর সিদ্দিকের কথা। আমার পিতার ব্যক্তিত্ব এবং তার বন্ধু-কবি আবুবকর সিদ্দিকের সাহিত্যের প্রতি একনিষ্ঠতা আমাকে সৎ ও প্রকৃত সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে সব ধরনের স্ট্যান্টবাজি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। আবুবকর সিদ্দিকের মতো একনিষ্ঠ পাঠকও আমার চোখে পড়েনি। তিরিশের অন্যতম প্রধান কবি বিষ্ণু দে’র সঙ্গে তার সখ্য, চিঠির আদান-প্রদান, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বন্ধুতা, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোজ বসু, বুদ্ধদেব বসু ও প্রতিভা বসু; এদেশে সিকানদার আবু জাফর, হাসান হাফিজুর রহমান- এঁদের সঙ্গে তার কথোপকথনের বিষয় ও আড্ডা কবি আবুবকর সিদ্দিকের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এসব প্রথিতযশাদের ব্যক্তিত্ব ও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ আমার ভেতরের প্রকৃত সাহিত্যিক সত্তাকে প্রতিষ্ঠা দানে সহায়তা করেছে। আর প্রতি মাসে রাজশাহী থেকে আমাকে লেখা তাঁর চিঠিগুলোতে থাকতো হিতোপদেশ। কোন বই পড়বো, কেন পড়বো- সবকিছু তিনি আমার সামনে মেলে ধরতেন সহজ পাঠের মতো।

বাম-ঘরানার এই লেখক নিজে যেমন প্রশ্রয় দেননি কোনো শঠতাকে, ধূর্ততাকে; তেমনি তিনি আমার ভেতরের লেখক সত্তা তৈরিতে ‘সৎ সাহিত্য রচনা’র ঝোঁকটাকে বাড়িয়ে দিয়েছেন, সেই মানস-সত্তা গঠন-প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। আর আমি মনে করি পশ্চিমবঙ্গের হুগলী-বর্ধমানের জনপদ তাঁর কৈশোরের মনোভূমিকে ভিত্তি দিয়েছিল বলেই আবুবকর সিদ্দিকের পক্ষেও এটা সম্ভব হয়েছিল। বর্ধমান শহরের টাউন হলের রাজনৈতিক সভায় যে চারজন কিশোর উদ্বোধনী সঙ্গীত গাইতো, তাদেরই একজন ছিলেন আবুবকর সিদ্দিক। নেহেরু-গান্ধীর জনসভায় থাকার সৌভাগ্য তাঁর হয়েছিল। সেই তখন কংগ্রেসের মিছিলে কিশোর বাহিনীতে থেকে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, শ্লোগান দিয়েছেন। তাছাড়া তাঁর বাবা একজন রাজনীতিক-সাংস্কৃতিক সচেতন মানুষ ছিলেন বিধায় পিতার কাছ থেকেও কবি এ-বিষয়ে দীক্ষা পেয়েছেন। আবুবকর সিদ্দিকের ভাষায়- “এই রাজনৈতিক বাতাবরণ- নেহেরু-গান্ধী-সুভাষ বোসের দর্শন, বিশ্বযুদ্ধের চাপ, ’৭৬-এর মন্বন্তর, দাঙ্গার মতো ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে ফিরে এলাম জন্মভিটে বাগেরহাটের বৈটপুর গ্রামে। আর এ সমস্ত কিছুই পরবর্তীতে আমার লেখক হয়ে ওঠার ভিত্তি রচনা করেছে।”

১৯৪৭ উত্তর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণ-নিপীড়নের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ’৬০-এর দশকে আবুবকর সিদ্দিক প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। কবি বিষ্ণু দে’র সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ, তাঁর রাজনৈতিক দর্শন এবং পরবর্তীতে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে সখ্যের ফলে তাঁর অনেক কবিতা, গল্পে রাজনীতি পরোক্ষভাবে ছায়া ফেলে। তবে খুলনা শহরে ষাটের দশকে সৃষ্টি হয়েছিল ‘সন্দীপন’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। মূলত সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভেতর দিয়েই সে-সময়ের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক শোষণের বিরুদ্ধে মেহনতী মানুষের পক্ষে কথা বলতো ‘সন্দীপন’। খুলনার গার্লস কলেজের পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক খালিদ রশিদের নেতৃত্বে এর সঙ্গে তখন যুক্ত ছিলেন সাধন সরকার, হাসান আজিজুল হক, নাদিম মাহমুদ, মোস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ। এরও আগে কবি কলকাতার আন্ডার গ্রাউন্ড বামরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, ফলে তখন তা আরো তীব্র হয় এবং গণসঙ্গীত লেখা শুরু করেন। একসময় চরমপন্থী নকশাল রাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন তিনি। বলা যায় এ-সময় থেকে আবুবকর সিদ্দিকের লেখায় গণমানুষ প্রধান হয়ে ওঠে, ব্রাত্যজন ঠাঁই নেয় তাঁর সাহিত্যে। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে গাওয়া হতো তাঁর লেখা গণসঙ্গীত- ‘ব্যরিকেড বেয়নেট বেড়াজাল/পাকে পাকে তড়পায় সমকাল’। এই গণসঙ্গীতের কারণে ওই যুদ্ধসময়ে রাজাকার-আলবদরদের দোসরদের হাতে তাঁকে নির্যাতিত হতে হয়েছিল।

অধ্যাপনা এবং সাহিত্য- এ দুয়ের ভেতরে কোনো চালাকি ছিল না তাঁর। আর তাই আবুবকর সিদ্দিক বাংলা ভাষাভাষী সাহিত্যমোদিদের কাছে পূজনীয় নাম। ২০১৫ সালে আমি শুরু করি ছোটকাগজ লেখমালা সম্পাদনা। সে-বছরই কবির ৮০ বছর পূর্ণ হয়। লেখমালা তাঁকে নিয়ে যৎসামান্য একটি সংখ্যা করে। লেখমালা’র ওই সংখ্যায় আমি আমার পিতাকে আবুবকর সিদ্দিক সম্পর্কে লিখতে বলি। আব্বা তাঁর সহকর্মী আবুবকর সিদ্দিক সম্পর্কে অনেক কিছুই লেখেন, কিন্তু তাঁর অধ্যাপনার গুণপনা সম্বন্ধে বলেন, “অধ্যাপনা জীবনে কবির মধ্যে অনেক গুণের সমাবেশ দেখেছি। যদি কোনো অনুষ্ঠানে ছাত্রদের মধ্যে অস্থিরতা বা চাঞ্চল্য লক্ষ করা গেছে বা তাদের মধ্যে সোরগোল শুরু হয়েছে, আমরা কবিকে (আমাদের সিদ্দিক ভাইকে) দাঁড় করিয়ে দিতাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে। তিনি চমৎকারভাবে তাঁর ভাষার মহিমা ও বাচনভঙ্গি দিয়ে শান্ত করেছেন ছাত্রদের। এ যাদুবিদ্যা হলো তাঁর বাংলা ভাষার উপর অগাধ স্বাচ্ছন্দ্য ও পাণ্ডিত্য। তাঁর ভাষার সুললিত শব্দমাধুর্যের এক চিত্তাকর্ষক তরঙ্গ ছাত্র-ছাত্রীদেরকে মন্ত্রমুগ্ধ ও নীরব করে রাখতো। তখন মনে হয়েছে ইংরেজ কবি সুইনবার্নের কথা। এ ইংরেজ কবির রচনার বিষয়বস্তু ইংরেজী সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের বুঝতে কষ্ট হলেও তাঁরা বুঝতে পারেন কবির গীতিময়-ছন্দময় ভাষার শিল্পনৈপুণ্য। আবুবকর সিদ্দিকের মধ্যে সুইনবার্নের ওই গুণাবলী আমরা লক্ষ করি। আর এ কারণেই ক্লাসের পাঠদানে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে আবুবকর সিদ্দিক ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয় এক শিক্ষক, আবার একই কারণে কোনো কোনো সহকর্মীদের চোখে ঈর্ষাপরায়ণ।”

এই ঈর্ষাপরায়নতাই আবুবকর সিদ্দিকের জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সহকর্মী, সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর সহযাত্রী, এমনকি তাঁর অনেক ছাত্ররাও আবুবকর সিদ্দিককে আড়ালে রাখতে চান। পাছে তারা আবুবকর সিদ্দিকের শিক্ষকতা ও সাহিত্যকৃতির ঔজ্জ্বল্যের কাছে ম্লান হয়ে পড়েন। আর এ জন্যই বোধহয় আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির বিবিধজন তাঁর কবিত্বশক্তিকে কিংবা শক্তিমান কথাকার হিশেবে তাঁকে অনুধাবন করলেও অকুণ্ঠ চিত্তে গ্রহণ করে নিতে পারেননি। আর পারেননি বলেই আজকের মিডিয়াও তথাকথিত বাজারচলতি লেখকদের পেছনে ছুটে বেড়ায়, আবুবকর সিদ্দিকের মতো জাতকবি ও লেখককে তারা খুঁজে পায় না। এটা আমাদের সাহিত্যের জন্যেই ক্ষতি। আবুবকর সিদ্দিকের ভাগ্যে জোটেনি একুশে পদক কিংবা স্বাধীনতা পদক। জাতি হিশেবে এটাও আমাদের ব্যর্থতা। তবু বিশ্বাস রাখি, একদিন তাঁর মূল্যায়ন হবে এবং সে পথেই এগুবেন তাঁর অনুরাগীরা।

কমলকুমার মজুমদার, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি বুদ্ধদেব, বিষ্ণু, জীবনানন্দ- মূলত এঁদের মিশেলে নিজের ভেতরে এক আলাদা স্বতন্ত্র লেখক সত্তা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন আবুবকর সিদ্দিক। এক লেখায় আবুবকর সিদ্দিকের রচনাসমূহের স্বাতন্ত্রিকতা বুঝাতে গিয়ে বিশিষ্ট গবেষক ও কবি তপন বাগচী বলেছিলেন, ‘আবুবকর সিদ্দিকীয়’। আদতেই তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। কি কবিতায়, কি কথাসাহিত্যে। তাঁর লেখা যেমন ভাষা-নিরীক্ষা ও বিষয় বৈচিত্র্যের স্বাতন্ত্রিকতায় বিশিষ্ট, তেমনি তাঁর গ্রন্থগুলোর নামকরণও অনন্য। যেমন- ধবল দুধের স্বরগ্রাম, বিনিদ্র কালের ভেলা, হেমন্তের সোনালতা, শ্যামল যাযাবর, কঙ্কালে অলঙ্কার দিয়ো, মানবহাড়ের হিম ও বিদ্যুৎ, চরবিনাশকাল, কুয়ো থেকে বেরিয়ে, ছায়াপ্রধান অঘ্রান, জলরাক্ষস, খরাদাহ, একাত্তরের হৃদয়ভস্ম ইত্যাদি।

এই মহীরুহের সঙ্গে চলতে চলতে আমার বইগুলোর নামকরণেও আমি সচেতন হয়ে উঠি। কুহকের প্রত্নলিপি, এ আলোআঁধার আমার, শিখাসীমন্তিনী, এই বদ্বীপের কবিতাকৃতি বইগুলোর নামকরণে কবি আবুবকর সিদ্দিকের সহযোগিতার কথা বলতেই হবে। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয় যে, পশ্চিমবঙ্গের আমার সময়কার তথা নব্বইয়ের কবি মিতুল দত্ত একবার আমাকে বলেছিল, ‘তোমার কবিতার বইগুলোর নাম খুব চমৎকার, আকর্ষণীয়’। তখন আবুবকর সিদ্দিকের কথা বলতেই হয়। আবুবকর সিদ্দিকের বিনিদ্র কালের ভেলা কবির দ্বিতীয় কাব্য যা প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে। এ বইয়ের নামকরণে ভেতরে আধ্যাত্মিক সুর প্রতিধ্বনিত হয়। আমার পিতা মাগুরাতে যে বাড়িটি গড়ে তুললেন তাঁর অবসর জীবনে, সেই বাড়ির নামকরণ করেছেন- ‘বিনিদ্র কালের ভেলা’। এই বইতেই আব্বাকে নিয়ে লেখা একটি কবিতাও রয়েছে ‘আমি সেবা আমি প্রেম’ শিরোনামে। এছাড়াও কবি প্রান্ত প্রকাশন থেকে ২০০৮ সালে প্রকাশিত নদীহারা মানুষের কথা কাব্যটি আমার পিতাকে উৎসর্গ করেন। শুধু তাই নয় আবুবকর সিদ্দিক ২০১০ সালে শুদ্ধস্বর থেকে প্রকাশিত তাঁর শ্রেষ্ঠ গল্প গ্রন্থটি আমাকে উৎসর্গ করে গৌরবান্বিত করেছেন। সেই ষাটের দশকে কবি বিষ্ণু দে যেমন আবুবকর সিদ্দিককে ‘সংবাদ মূলত কাব্য’ কবিতাগ্রন্থটি উৎসর্গ করে কবিকে শিহরিত করেছিলেন, ঠিক তেমনি অনুভূতি আমার ক্ষেত্রেও। তবে সিদ্দিক চাচাকে আমি উৎসর্গ করি আমার তৃতীয় কবিতার বই আদর্শলিপি : পুনর্লিখন যা ইমন প্রকাশনী থেকে ২০০৭ সালে বের হয়।

গত শতকের পাঁচের দশকের শেষ ধাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে আমার পিতা মুহম্মদ গোলাম রসূল এবং কবি আবুবকর সিদ্দিকের সম্পর্কের যে সূত্রপাত, আজ সেই দায়ভার একা আমাকেই টেনে নিতে হচ্ছে। আমার প্রত্যক্ষ এবং প্রিয় শিক্ষক সরদার ফজলুল করিম, জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের মৃত্যুতে পত্রিকায় লিখেছিলেন, ‘আমার দ্বিতীয় পিতা’। স্যারের মতো করে আমিও বলতে চাই- আমার সাহিত্যকৃতির জন্মদাতা আবুবকর সিদ্দিক। এর ব্যত্যয় হতে পারে না। অনেক চিঠি তিনি আমাকে দিয়েছেন। কিন্তু তা ধরে রাখতে পারিনি। শুধু আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরে সিদ্দিক চাচা একটি দীর্ঘ চিঠি আমাকে লিখেছিলেন। মমতা-ভরা লেখা সে চিঠি আজও আমি সংরক্ষণ করি। সেখানে তিনি বলেছেন- ‘তুমি শুধু রসূলের পুত্র নও, আমার মানসপুত্র’। সেই বাঁধন, সেই সম্পর্কসূত্র আমৃত্যু আমি লালন করে চলি।