কলেজ রোডের জার্নাল-১৬ ॥ মামুন মুস্তাফা



গত শতকের সাতের দশকের শেষ ভাগ। ১৯৭৭। আমরা দুই ভাইবোন প্রথম স্কুলে ভর্তি হলাম। মফস্বল শহর বাগেরহাট। গাছ-গাছালি ঘেরা, ছোট-বড় তিন-তিনটি পুকুরের জলে, পাড়ে হাঁস-মুরগির তৎসম ধ্বনি; কলেজসংলগ্ন স্টেশন ঘিরে নানা বর্ণের ছোট ছোট দোকান, টি-স্টল- আধা গ্রাম আধা শহুরে জীবনে আমাদের যাত্রা শুরু জীবনের নতুন স্বপ্ন চোখে নিয়ে। সেই তখন বইখাতা সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার জন্য স্কুল ব্যাগের মতো দুটো টিনের বাক্স এলো আমাদের দু’ভাইবোনের জন্যে। ছোট আর কাঁচা বয়সের আনন্দে আমরা চিঠি লিখতে বসলাম উপহারদাতার উদ্দেশ্যে। তিনি থাকেন সুদূর চট্টগ্রামে।

চট্টগ্রাম কেমন শহর? তখনও জানা নেই আমাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী, বন্দর নগরী সম্পর্কে, শুধু ওই শহরে থাকেন আমাদের ছোট মামা ড. খুরশীদ আলম। তিনি অবশ্য লেখেন- ‘খুরশীদ আলম পিএইচডি’। আমার ছোট মামাই স্কুলে ভর্তি হওয়ার প্রাক্কালে উপহারস্বরূপ পাঠালেন এই টিনের বাক্স। শাদা ঝকঝকে ওই বাক্সে আমরা দুই ভাইবোন খুব যত্নে পড়া শেষে বইখাতাগুলো গুছিয়ে রাখতাম। তখন আমাদের পড়ার টেবিল ছিল না। ছোট মফস্বল শহরে পিতার সামান্য আয়ে জীবন চলে যাচ্ছে, কিন্তু পড়ার টেবিল অথবা বই রাখার বুকশেলফ- এগুলো কল্পনা করা বিলাসিতা। মায়ের সামান্য কয়েকটি শাড়িকাপড় রাখার আলমিরাও হয়েছে অনেক পরে। আমার বাবার সেই স্বল্প আয়ের সামান্য জীবনে শান্তি ছিল, স্বস্তি ছিল, ভালোবাসা ছিল। তাকে মাঝে মাঝে আনন্দময় করে তুলতো আমার এই ছোট মামার প্রসঙ্গ।

তখন তিনিও সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় শেষে চাকরি জীবন শুরু করেছেন। বর্তমানে কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (কোডেক) নামক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক তিনি। জীবনের শুরুটাও ছিল ওখানে। আর সেই তখন তিনি তার কর্মদক্ষতা আর সততা দিয়ে জয় করে চলেছেন কোডেকের তৎকালীন কর্তৃপক্ষ তথা ডেনমার্কের ডেনিশ কোম্পানির কর্ণধারদের। ওই সাতের দশকে এটি বাংলাদেশ মৎস্য সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে চট্টগ্রামে জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ শুরু করে। তখন এর বাংলা নামকরণ করা হয় গণ-উন্নয়ন কেন্দ্র। মামা এর বাংলাদেশ অংশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ছিলেন। পরবর্তীতে এরা যখন ফেরত চলে যায় তখন এটি রেক্টিফাইয়ের মাধ্যমে কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার বা কোডেক এনজিওতে রূপ নেয়। সেই যাত্রা সূচনালগ্ন থেকেই মামা এটির নির্বাহী পরিচালক হিশেবেই রয়েছেন। মামার কর্মদক্ষতা, সততা আর সদাচারণ মামাকে তখনই ওই পদের উপযুক্ত হিশেবে বিদেশীদের কাছে উপস্থাপন করে। আমার পিতা যে উপদেশ আমাকে প্রতিনিয়ত দিয়ে গেছেন- ‘জীবনে যত ভাবে উন্নতির শিখরে পৌঁছা যায়, তার অন্যতম হচ্ছে সততা’। সেই সততার প্রকৃষ্ট উদাহরণ আমার ছোট মামা ‘খুরশীদ আলম পিএইচডি’।

আজ যে তিনি পিএইচডি লিখছেন নামের শেষে, এটিও ডেনিশ কোম্পানি তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাদের স্কলারশিপে ডেনমার্কের অলবর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করিয়ে এনেছে। আবার এরও আগে তারাই স্কলারশিপ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার সেন্ট্রাল স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে মামাকে এমবিএ করিয়ে আনে। এ সবই মামার সততার পুরস্কার। পিতার ব্যক্তিত্ব, সৎ জীবনযাপন; অন্যদিকে দূর থেকে শোনা মামার সততার গল্প আমার ভেতরের সত্তাটিকে গড়ে তোলে একটু একটু করে। আর তাই বুঝি মামার স্নেহাস্পদ হতে পেরেছি আমার সামান্য জীবনেও। আমার লেখক জীবনের পূর্ণতা দানে মামা নীরবে সমর্থন দিয়ে গেছেন। সে জন্যেই তিনি কখনো চাননি আমি রাজধানী ঢাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাই। যখন আমি দুই-দুইবার বিসিএস পরীক্ষার ভাইভা বোর্ড থেকে ফেরত এলাম, অন্য কোনো সরকারি চাকরিও হচ্ছে না; তখনও মামা চাননি বেসরকারি কোনো কাজ নিয়ে আমি ঢাকা ছাড়ি। যাই করি না কেন, ঢাকাতেই থাকতে হবে, লেখালিখি করতে হবে। অবশেষে মামাই চাকরির সন্ধান দিলেন। কোস্টাল ফিশারফোক কমিউনিটি নেটওয়ার্ক (কফকন) নামক ৩৬টি এনজিওর সচিবালয়; যারা নদী ও সমুদ্রে মাছ ধরা জেলেদের নিয়ে কাজ করে; এই প্রতিষ্ঠানে ‘সহকারি প্রোগ্রাম অফিসার’ হিশেবে যোগ দিলাম।

একবার অফিসের কাজে চট্টগ্রাম গেলাম। বাস স্টেশন থেকে মামার বাসায় যাওয়া থেকে ঢাকায় ফেরত আসা পর্যন্ত আমার কোনো খরচ হয়নি। থাকা-খাওয়া মামার বাসাতেই। লোকাল যাতায়াতে মাঝেমধ্যে দু’একটি সিএনজি ভাড়া ছাড়া আর কিছুই লাগেনি। মামী বলেছিলেন, ওকে একটা হোটেল বিলের ব্যবস্থা করে দিলেই তো হয়। মামা বলে উঠলেন, ‘কেন? তা হবে না।’ ঢাকায় ফিরে অফিসে লোকাল যাতায়াত আর ঢাকা-চট্টগ্রামের বাস ভাড়ার টাকা দিয়ে মাত্র হাজার দুই টাকার বিল জমা দিলাম। অফিস কর্তৃপক্ষ তো রীতিমতো বিস্মিত! আমার মামা অনেকটাই ইন্ট্রোভার্ট মানুষ। সে কারণে অনেকেই তাকে ভুল বুঝতে পারে। কিন্তু তার কাঠিন্যের ভেতরে যে সততা তা কেউ উপলব্ধি করতে পারে না। ঘড়ির কাঁটায় মেপে তার জীবন চলে। অফিসে তিনি সবার আগে পৌঁছান। আর বের হনও সবার শেষে। অফিস টাইমের পরে কোনো কর্মী থাকতে পারবে না। অফিস টাইমের ভেতরে সবাইকে যার যার কাজ সেরে ফেলতে হবে। এই যে নিয়মানুবর্তিতা তা আজকের অফিসগুলোতে নেই বললেই চলে। কর্মীদের মানসিক চাপে রাখা যেন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হয়ে গেছে। কোডেকের অনেক কর্মচারীর মুখেই শুনেছি, খুরশীদ আলম এখান থেকে চলে গেলে, অনেক কর্মীও তার সঙ্গে সঙ্গে চলে যাবে। তাই বুঝি মামা চাকরি থেকে অবসর নিলেও তার ছুটি মেলেনি। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে এখনও তিনি রয়েছেন।

মামার এই যে সততার শিক্ষা- এটা যেমন তিনি আমার নানার কাছ থেকে পেয়েছেন, তেমনি তিনি তা তার সারা জীবেনর শিক্ষা থেকেও অর্জন করেছেন। আমার পিতা মামার শিক্ষকও ছিলেন। মামা ভগ্নিপতি হিশেবে আব্বাকে যত শ্রদ্ধা করতেন তার থেকেও বেশি শ্রদ্ধা করতেন তার শিক্ষক হিশেবে। যখনই আব্বার সঙ্গে তার দেখা হয়েছে, তিনি শিক্ষক হিশেবে আব্বাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতেন। আব্বা মামাকে ডাকতেন ডক্টর বলে। আব্বা একবার অসুস্থ হয়ে ঢাকাতে আমার কাছে। হাসপাতালে ভর্তি। আমার এই ছোট মামাই আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন নির্ভরতার প্রতীক হয়ে। বার বার ফোন দিয়েছেন আমাকে। সাহস জুগিয়েছেন। ঢাকায় এসে দেখা করেছেন। তার সেসব দান আজ স্বীকার করি অকুণ্ঠ চিত্তে।

এমনকি আমার লেখক জীবনেও মামার দানকে অস্বীকার করা যাবে না। তিনি যেমন চাননি আমি ঢাকা ছাড়ি, লেখালিখির ব্যাঘাত ঘটুক। তেমনি আমার ছোটকাগজ ‘লেখমালা’র প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে কিংবা ‘লেখমালা’র অনুষ্ঠানে নেপথ্যে থেকে মামা যে আর্থিক সহযোগিতা করে চলেছেন, সে ঋণ তো আমি শোধ করতে পারবো না কখনো। আমার সাহিত্য সাধনার পথে মামার অকৃপণ দান আমাকে প্রেরণা জুগিয়ে চলেছে নিঃস্বার্থ ভাবে। আমি শুধু মামাকে আমার দ্বিতীয় গদ্যগ্রন্থ মননের লেখমালা উৎসর্গ করেছি। আজ স্বল্প সময়ের ব্যবধানে বাবা-মাকে হারিয়ে একাকী দুঃখবোধে নিমজ্জিত আমি। সেইখানে দাঁড়িয়ে যে কয়েকটি মুখ আমাকে প্রাঞ্জল রাখে তার অন্যতম আমার এই মামা।

এই শীতাভ রোদে নিজেকে উষ্ণ রাখার চেষ্টা করি। সময়ের বেদিতে নিপতিত আমি সব বাধা দু’হাতে ঠেলে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছি। সামনে ভেঙে পড়া প্রভূত স্বপ্ন। মাথা উঁচু করে পৃথিবীর প্রান্ত ছুঁতে কার না সাধ জাগে? আমি সেই সাধ্যাতীত কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছি যেসব আদর্শকে সামনে রেখে, তাদেরই একজন আমার ছোট মামা। সেই গত শতকের সাতের দশকে শাদা ঝকঝকে টিনের বাক্সে বর্ণপাঠের পরিচয়ে যে সততাকে আদর্শ ভেবে যত্নে তুলে রেখেছিলাম; আজ একুশ শতকের যান্ত্রিক সভ্যতায় নিষ্পেষিত মানবতা আর শঠতা, হিংসা, দ্বেষের মাঝে সৎ মানুষের খোঁজে উঠে আসে একটি নাম- ‘খুরশীদ আলম পিএইচডি’। আমার ছোট মামা।