কলেজ রোডের জার্নাল-১৭ ॥ মামুন মুস্তাফা




কথায় বলে- শোককে শক্তিতে পরিণত করতে হবে। এও কি সম্ভব? প্রাণের স্পন্দন যখন থেমে যায়। আমার বাবা-মা তো তাই ছিলেন আমার কাছে। তবু প্রাণপণে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। শীতাভ রোদে দুঃখ শোক জরা ভেঙে আবার উঠে দাঁড়ানোর মুহূর্তে আমার ছোট চাচাও আর নেই। আব্বার মৃত্যুর ৪০ দিনের মাথায় ছোট চাচাও অন্তহীন যাত্রায় পা রাখলেন। এগুবার চেষ্টা করে আবারও হুমড়ি খেয়ে যেন পড়ে গেলাম। তখন আত্মীয়-অনাত্মীয় কোনো কোনো প্রিয়জনের মুখ মনে পড়ে। যদিও আত্মীয়তার সংজ্ঞা আমার কাছে ভিন্ন। আমার অবরুদ্ধ আর্তনাদ টের পান বলেই কি তারা আত্মীয়।

সেই যে ছোট মফস্বল শহর বাগেরহাটের কলেজ ক্যাম্পাস। যার শ্যামল প্রকৃতিতে আমার বা আমাদের বেড়ে ওঠা। কাছাকাছি সময়ে আমার বাবা-মায়ের মৃত্যু, সেই কঠিন সময়ে আমার জন্মভূমি, শৈশব-কৈশোরের সঙ্গী সরকারি পি সি কলেজের সবুজ চত্বর আর তার মানুষগুলোর কথাই তো বেশি করে মনে পড়েছে। যাদের স্নেহ-ছায়ায় বেড়ে ওঠা এই শরীর, দূর থেকে তারাই তো মুঠোফোনে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।

তহুরা খালাম্মা, আমার ছেলেবেলার খেলার সঙ্গী শারমীনের জন্মদাত্রী কিংবা আব্বার বন্ধু ও সহকর্মী রসায়নের অধ্যাপক মোজাফফর হোসেনের স্ত্রী, ছিলেন আমার মায়ের বান্ধবী। সেই ছেলেবেলা থেকে। তাদের বন্ধনের সুতো এভাবে অকস্মাৎ ছিঁড়ে যাবে কে ভেবেছিল? বিধাতা সবই জানেন। তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনের ইশারার অপেক্ষায় আজ আমরা যার যার অবস্থানে অপেক্ষমান। তবু সেই কঠিন পার্থিব শোকে তহুরা খালাম্মা ঠিকই আমাকে খুঁজে নিলেন, জানালেন মর্ম ব্যথা। মায়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা- মায়ের মৃত্যুর তিন দিন আগে।

মায়ের মতো করে একই ভঙ্গিতে আমার পিতাও বিদায় নিলেন ইহধাম থেকে। কী অদ্ভুত মিল দুজনের। দুজন দুজনকে ছেড়ে থাকতে পারেননি বেশি দিন। সাত মাসের ব্যবধানে দুজনের একই লোকে বিচরণ। মায়া-মমতা-বিভ্রম- সবকিছু ফাঁকা। তবু যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধে এই জাগতিক সংসার। যখন পিতার শব নিয়ে চলেছি গন্তব্য পানে। তখনও তহুরা খালাম্মার ফোন। কোনো কথা বলতে পারিনি তখন। মুঠোফোনের ওপারে খালাম্মার আদুরে ডাক, ‘ও বাপ, বাপরে’- আমাকে নিয়ে যায় দড়াটানার পাড়ে স্নিগ্ধ শহর, তালগাছে বাবুইয়ের বাসা, রাধাচূড়া-কৃষ্ণচূড়ার পাশে বোগেনভুলিয়া টগর হাস্নাহেনা গোলাপ কামিনী রক্তজবায় ঘেরা দুই কামরার একচিলতে ঘরের বাসিন্দার কেউ-ই আজ নেই। তার উত্তরাধিকারের চোখে খেলা করে দিগন্ত বিস্তৃত সেই পি সি কলেজের উন্মুক্ত প্রান্ত, রেল স্টেশন, ছোট ছোট চায়ের খুপরি-দোকান, বন্ধুদের সঙ্গে হরিণখানা গ্রামের মেঠোপথে লুকোচুরি খেলা। অথচ আজ আমারই সঙ্গে লুকোচুরি খেললেন বিধাতা। তখনও মুঠোফোনের ওপারে তহুরা খালাম্মা। বলছি- আমি আসবো খালাম্মা। খুব যেতে ইচ্ছে করছে আপনাদের কাছে।

তেমনি একজন ওই পি সি কলেজেই পেয়েছিলাম আমি তাকে। আমার বোন যখন ঢাকায় হোম-ইকনোমিক্স কলেজে চাইল্ড কেয়ার-এ অনার্স-মাস্টার্স করছে, তখন এই ফুপুর কাছে থেকে সে কিছুদিন ক্লাস করেছে। কেননা তখনও সে তার হোস্টেলে সিট পায়নি। আর আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলাম, তখন ফুপু দর্শনের মাস্টার্স ফাইনাল ইয়ারে। ওই একটি বছর ফুপু আমাকে আগলে রেখেছিল আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে। আমার খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে আমার চলার পথে কোনোরকম হোঁচট না খাই, সেই যত্নটুকু আমাকে দিয়েছিল।

আমি তখন থাকি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই গত শতকের পাঁচের দশকে আমার পিতা যে হলে থেকেছিলেন, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে। আব্বা থাকতেন ওয়েস্ট হাউসে, আমি থাকি ইস্ট হাউসে। প্রতি সপ্তাহে ফুপু তখন আমার রুমে এসে আমার জামাকাপড় নিয়ে গিয়ে নিজ হাতে ধুয়ে ইস্ত্রি করে দিয়ে যেত। ওই সময় এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। ছুটির দিনের এক সকালে ফুপুর সঙ্গে দেখা করবো বলে রোকেয়া হলের গেটে অপেক্ষা করছি, এমন সময় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, টিএসসিসহ ভাষা ইনস্টিউিট চত্বর জুড়ে গোলাগুলি শুরু হয়ে গেল। লোকজন সব ছুটাছুটি করছে। আমি তখন রোকেয়া হল গেটের সামনে থেকে একবার টিএসসি আরেকবার উপাচার্যের বাসভবনের দিকে দৌড়াচ্ছি। ফুপু রোকেয়া হলের গেটের বড় ছিদ্র দিয়ে (যেখান থেকে চোখ রেখে বাইরেটা দেখা যায়) আমাকে অবলোকন করে হাত বাড়িয়ে আমার জামার কলার টেনে ধরে দারোয়ানকে বলছে, দরজা খোলেন, আমার ভাইয়ের ছেলে। এরপর দরজা খুলে আমাকে ভেতরে নেওয়া হলো। সেদিন ফুপু না ধরলে হয়তো দুর্ঘটনা ঘটেও যেতে পারতো।

আমার সে ফুপু এখন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া প্রবাসী। প্রথম যেবার ‘ওপি ওয়ান’ দেওয়া হলো, সেবারই ফুপু ‘ওপি ওয়ান’ নিয়ে আমেরিকা পাড়ি জমায়। তখন ফুপু সবেমাত্র এমএ শেষ করেছে এবং সদ্য বিয়ে হয়েছে। তার বিয়েতে যদিও আমি ও মা আসতে পারিনি। কিন্তু আব্বা ও আপা ঠিকই এসেছিল। আমি যখন কলেজ পাঠ চুকিয়ে ফেলেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছি। তখন আমার এই ফুপুই ঢাকা থেকে বিভিন্ন ধরনের গাইড কিনে বাগেরহাটে নিজে চলে এসেছিল। ভর্তি প্রস্তুতি যেন আমার ভাল হয়। এই ভর্তি নিয়েও নাটকীয়তা কম হয়নি। রেজাল্ট দিলে, ফুপু কোনো কারণে সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারেনি। তার এক বান্ধবী বা রুমমেটকে রোল নম্বর দিয়ে বলেছিল দেখে আসতে। কিন্তু সে এসে জানায় আমি চান্স পাইনি। এ সংবাদে আমাদের সবার মন খারাপ। ফুপুও মুসরে পড়েছিল। এরপর ফুপু নিজে যায় এবং দেখে আমি ঠিকই চান্স পেয়েছি, এমনকি মেধাক্রমে উপরের দিকেই আছি। পরবর্তীতে ফুপু বিস্তারিত চিঠি দিয়ে আমাদেরকে জানায়।

ফুপুর ভালোবাসা বলতে যা বোঝায়, আমার জীবনে এই ফুপুর কাছ থেকেই পেয়েছি। ফুপুকে কাছে না পাওয়ার বেদনায় জীবনে কতবার যে কেঁদেছি। ফুপুও চোখের জল ফেলেছে আমারই কারণে। সেই ছেলেবেলায় যখন ফুপু আমাদের বাগেরহাটের কলেজ ক্যাম্পাসের বাসা থেকে আইএ পরীক্ষা দিয়ে বিদায় নিল, তখন তো সারা পৃথিবীজুড়ে আমার হাহাকার। আমি তখন ষষ্ঠ কিংবা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। ফুপুকে হারানোর বেদনায় রাতেও ঘুম ভেঙে গেছে কতবার। তখন কবিতা লিখে ফেললাম ‘হারানো পথিক’। ওই সময় শুধু আমার কারণে ফুপু অনেকবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার পথে বাগেরহাট হয়ে তারপর গেছে। তখন আমার সময়টুকু আনন্দময় হয়ে উঠতো।

ফুপু যখন প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে এলো, তখন আমি অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ি। আমার জন্যে হাতঘড়ি নিয়ে এসেছিল ফুপু, আব্বার জন্যে স্যুটের কাপড়। মা আর আপার জন্যে অনেক কিছুই। ফুপু আর ফুপা মিলে চলে গেল বাগেরহাটে আব্বা-মার সঙ্গে দেখা করতে। এই সেদিনও ফুপু আমার জন্যে ‘অ্যাপল’ কোম্পানির ‘আই-প্যাড’ পাঠিয়েছে যা এখন আমার নিত্যদিনের সঙ্গী। ওটি দিয়েই ফুপুর সঙ্গে ভাইবারে, ম্যাসাঞ্জারে কথা বলি। যখনই ফুপু বাংলাদেশে আসে, আমার সঙ্গে তার একটি/দুটি দিন কেটে যায়। আমি অফিস থেকে ছুটি নেই শুধু ফুপুর কারণে।

যে ফুপুর কথা আমি বলছি আনন্দ নিয়ে, প্রাণ ভরে; তার পরিচয় মূলত সে আমার পিতার ছাত্রী। তার বড় ভাই তখন বাগেরহাট মহাকুমার এসডিও ছিলেন, নাম মোশাররফ হোসেন। এই মোশাররফ চাচা যখন খুলনায় বদলি হয়ে গেলেন, তখন ফুপুর আইএ পরীক্ষা শুরু হবে। বাগেরহাটে কোথায় থেকে সে পরীক্ষা দিবে? ফুপুই মোশাররফ চাচাকে বললো, আব্বার কথা, গোলাম রসূল স্যারের বাসায় থেকে পরীক্ষা দেবে, তাঁকে যদি চাচা বলে দেন। এ ভাবেই দুটি পরিবারের যোগসূত্র, সেই থেকে আত্মীয়তার বন্ধন- গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে উঠলো। আব্বাও ফুপুর কাছে পরবর্তীতে আর ‘স্যার’ থাকেননি, হয়ে উঠেছিলেন ‘ভাইয়া’। আব্বা যখন ঢাকায় একবার অসুস্থ হয়ে আমার কাছে, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ভর্তি। তখন ফুপু ঢাকায়। ফুপু, ফুপা দুজনে ছুটে এলেন হাসপাতালে। আব্বা শিশুর মতোন ফুপুকে দেখে কেঁদে ফেললেন। ফুপু আব্বার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। নিজের ভাইবোন ছাড়া এমনটি হতে পারে না। আর আমার মা এবং আব্বা দুজনেই যখন পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন, তখন সেই সুদূর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফুপুই তো আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। কীভাবে সান্ত্বনা দেবে, কি বলবে আমাকে- সেই যেন অস্থির তখন।

আজ বলতে দ্বিধা নেই, আমার চাচা-ফুপুর আদর যেভাবে আমাদের পাওয়া উচিত ছিল তা আমরা দুই ভাইবোন পাইনি ঠিকই, হয়তোবা আব্বার চাকরিসূত্রে অন্যত্র থাকতে হয়েছে বলে- তারপরও বলবো সিদ্দিক চাচা (কবি আবুবকর সিদ্দিক) এবং ঝুনু ফুপুর (ফুপুর সনদ নাম নাজমা আজাদ, ডাক নাম ঝুনু) কাছ থেকে যে স্নেহ ভালোবাসা পেয়েছি, আজ তারাই আমার নিকটাত্মীয়। ফুপুদের বাড়ি পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলায়। অথচ আমি যখন চাকরিসূত্রে পটুয়াখালীর গলাচিপায় গেলাম, তখন মোটরসাইকেল ভাড়া করে বাউফলে চলে গেলাম ফুপুর বাড়ি যাব বলে। যদিও জানি সেখানে কেউ থাকে না। ফুপুর বাবা ছিলেন ডাক্তার রমিজউদ্দিন আহমেদ। এই নামটি সম্বল করে অনেক খোঁজাখুঁজির পর পেলাম ‘ডাক্তার বাড়ী’ নেম-প্লেট সম্বলিত শূন্য দোতালা কাঠেরবাড়ি। বাড়িটির দায়িত্বে তখন তাদের জ্ঞাতি আত্মীয়। সেখান থেকে ঢাকায় ফোন দিলাম ফুপুর বড় ভাই মোশাররফ চাচার স্ত্রী শাহীন চাচীকে। তিনি তো অবাক। সেই শূন্য বাড়ির ছবি তুলে পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে ফুপুকে পাঠাই।

আজ মোশাররফ চাচাও অবসরে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব হয়ে অবসরে গেছেন, তাও বহুদিন। চাচীও আজ দাদী-নানী-শাশুড়ি। অথচ আমার ছেলেবেলায় আমার বাবা-মায়ের মতো এদেরও যৌবন আমি দেখেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন মোশাররফ চাচা বিপিএটিসি’তে কর্মরত ছিলেন, কতবার সেখানে গিয়েছি। যে-সময় মাকে কবরে শুইয়ে দেব, সে-সময়ও মোশাররফ চাচার ফোন। বাবার মৃত্যুর পরেও চাচীর ফোন- এসব মানুষের স্নেহমাখা স্পর্শ আমি ভুলি কি করে? একুশের বইমেলা ঘুরে এই চাচী-ই তো আমারও বই কিনে নেন। চাচী আজও আমাদের আত্মীয়তার গল্প বলেন তার চেনাজানা স্বজনদের। আর ঝুনু ফুপু?

ফুপু বলেছে আমাকে- চলে আসবে সে আমার কাছে, বাকি জীবন আমার সঙ্গেই কাটাতে চায়। আমি তার চরণধ্বনি শুনতে পাই। মানুষ মায়ায় বাঁচে। কিন্তু সে মায়া কিসের? এ এক ইলিউশন। ওই মায়ার বিভ্রমে জড়িয়ে ফুপুও কাছে টেনে নেয় আমাদের পরিবারকে- পরিবারের চারটি প্রাণিকে। আমি কাছে এসেছি ফুপুর, তার ‘ভাইয়া’র সন্তান হয়ে। আজ সেই পরিবারের দুজন নেই। ফুপু ফিরবে কি সেই শূন্য স্থানে? সংসারজীবনে হয়তোবা এও এক কথার কথা। তবু ফুপু আমার। আমারই হয়ে থাকবে চিরকাল।