কলেজ রোডের জার্নাল-১৮ ॥ মামুন মুস্তাফা


বিশ্ববিদ্যালয় জীবনই আমার লেখার মূল স্তম্ভ হিশেবে বিবেচনা করে থাকি। যে যাত্রা শুরু হয়েছিল পঞ্চম শ্রেণিতে তার পরিণতি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই শুরু। এ এক নতুন বাঁক। ১৯৮৯ সালের ৮ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার থিয়েটার হলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রথম ক্লাস করি সৈয়দ আবুল মকসুদ স্যারের। তাঁরই কন্যা প্রখ্যাত নজরুল সঙ্গীত শিল্পী সাদিয়া আফরিন মল্লিক। কন্যা নিয়ে স্যারের গর্ব-কথাও আমরা শুনতাম। অনার্স প্রথম বর্ষে সপ্তাহে দুটি ক্লাস আমাদের হতো। অন্যটি ছিল জাতির অন্যতম কাণ্ডারি, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব সরদার ফজলুল করিম স্যারের ক্লাস। তিনি পড়াতেন প্লেটোর রিপাবলিক।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সরদার ফজলুল করিম স্যারের সংস্পর্শে যেতে ভয় পেতাম। এত বড় একজন মহীরুহ। উপরন্তু প্রত্যক্ষ শিক্ষক। কীভাবে তার কাছে যাই? ফলে সেভাবে সখ্য গড়ে ওঠেনি। মাঝে-মধ্যে কথাবার্তা হতো, এই যা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে কখনো কখনো বিভিন্ন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্যারের সঙ্গে দেখা হয়ে যেত। তখন কথাবার্তা বলতাম। স্যারের ছাত্র, লেখালেখি করছি, এটি তাঁর আনন্দ বা গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়াত। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম তখন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। একদিন সরদার স্যার লেকচার থিয়েটার হলে ক্লাস নিচ্ছেন, তখন স্বৈরাচারবিরোধী শ্লোগানমুখর মিছিল যাচ্ছে। ওই মিছিলের উচ্চস্বরের কারণে কিছু শোনা যাচ্ছিল না, বিধায় স্যার পড়ানো থামিয়ে দিলেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তিনি বললেন, ‘এটিও আমাদের জীবনেরই অংশ’। এই যে স্যারের জীবনমুখি কথা- এগুলোই আমাদের ভবিষ্যত জীবন সম্পর্কে ধারণা গড়ে দেয়। প্রথম দিনের ক্লাসেই স্যার বলেছিলেন, ‘বাবারা-মায়েরা, তোমরা শোনো, যেদিন তোমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছ, সেদিনই তোমাদের সার্টিফিকেট লেখা হয়ে গেছে। এখন তোমরা কিছু জান, শেখ’। এই যে তাঁর মর্মস্পর্শী জীবনবেদ, এটিই তো একজন শিক্ষার্থীর জীবনদর্শন পাল্টে দেবে, এটাই তো স্বাভাবিক। স্যারের সঙ্গে সাক্ষাতে একবার একথা বলতেই স্যার বলেছিলেন, এ কথা তুমি মনে রেখেছ বলেই আজকে তুমি লেখক হতে পেরেছ। সরদার ফজলুল করিম স্যারের এ কথাও আমার জীবনের এক আশীর্বাদ। স্যার আজ নেই। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।

এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে থেকেছি যা আজকে এস এম হল বলেই অধিক পরিচিত। এই হলেই পাঁচের দশকে আমার পিতাও ছিলেন, তিনি থাকতেন হলটির ওয়েস্ট হাউজে, পড়তেন ইংরেজি সাহিত্যে। আর আমি থাকতাম ইস্ট হাউজে, পড়েছি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। আব্বার কাছে তাঁর যেসব শিক্ষাগুরুর কথা শুনতাম তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইন, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং একজন ইংরেজ অধ্যাপক মি. টার্নার। কিন্তু আমি যখন বিশ্বদ্যিালয়ে পড়ি তখন একমাত্র সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ছাড়া আর কেউ বিশ্বদ্যিালয়ে নেই। জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে একাত্তরে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের একজন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর গদ্য আমাকে টানতো। তাঁর প্রচুর লেখা আমি পড়েছি। বিশেষত তিনি তখন সাহিত্যপত্রিকা ‘সাহিত্যপত্র’ প্রকাশ করতেন। এর নিয়মিত পাঠক ছিলাম আমি। এসব কারণে একদিন দুরু দুরু বক্ষে ইংরেজি বিভাগে স্যারের রুমের দরজার সামনে দাঁড়ালাম। স্যার সহাস্যেই আমাকে ডাকছেন, ‘এসো, ভেতরে এসো’। স্যার নিজে থেকেই বসতে বললেন। আমিও তড়িৎ বসে পিতার শিক্ষক তিনি এই পরিচয়ের সূত্র ধরেই আলাপ শুরু করলাম। এরপর প্রায়শই স্যারের রুমে যেতাম। কখনো নিজের লেখা নিয়ে, কখনো শুধুই সাক্ষাত করতে। স্যারও ধীরে ধীরে আমাকে আপন মায়ায় জড়িয়ে নিলেন। আমার সঙ্গে পারিবারিক গল্প করতেন। ততদিনে স্যারের স্ত্রী অধ্যাপিকা, লেখিকা নাজমা জেসমিন চৌধুরী দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারে মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে আব্বা স্যারকে একটি চিঠি দিয়েছিলেন, সেই চিঠির প্রসঙ্গ তুলে অনেকবারই স্যার আমার কাছে আব্বার প্রশংসা করতেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, তাঁর প্রবন্ধ যেমন অকাট্য যুক্তির আলোকে জাতিকে পথ দেখায়, তেমনি তাঁর স্মৃতিকথাও পাঠককে কথাসাহিত্যের রস আস্বাদন দেয়। এর বড় প্রমাণ স্যারের বাবা-মা এবং স্ত্রীর মৃত্যুতে লেখা তাঁর আত্মকথা ‘আমার আপন তিনজন’ গ্রন্থটি। এই বইটি সব পাঠকের পড়া উচিত বলে আমি মনে করি।

বিশ্ববিদ্যালয় শেষে আমার নিজের জীবন গুছিয়ে নিতেই যখন আমি তালমাতাল, তখন স্যারের সঙ্গে সম্পর্কে ভাটা পড়ে। তবে চাকরিতে ঢোকার পড়ে আবারও স্যারের সংস্পর্শে যাই। স্যার তখনও আমাকে একই ভাবে গ্রহণ করেন। ততদিনে স্যার ‘নতুন দিগন্ত’ নামে সাহিত্য-সংস্কৃতির ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন প্রকাশ শুরু করেছেন। নতুন দিগন্তে লেখা দিচ্ছি। স্যার উৎসাহ নিয়ে তা পাঠ করছেন। এ-সময় ‘সূর্যতরু’ নামে একটি মাসিক সাহিত্য ম্যাগজিন অল্প কিছুদিনের জন্য প্রকাশ হয়েছিল। এই পত্রিকার ২০০৬ সালের ৬ জানুয়ারি সংখ্যায় আমার একটি প্রবন্ধ ‘সাম্প্রদায়িক সংঘাতে বাঙালি’ প্রকাশ হয়। এই প্রবন্ধ পড়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার আমার অফিসে ফোন দিয়ে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন, প্রশংসা করেছিলেন। এরপর থেকে স্যার আমাকে শুধু গদ্য লিখতে উৎসাহিত করতেন। আমার অফিস তখন মোহাম্মদপুরে স্যার সৈয়দ রোডে, কাজ করি ‘কোস্টাল ফিশারফোক কমিউনিটি নেটওয়ার্ক’ নামে একটি এনজিওতে। আর স্যারের বাসা তখন ধানমণ্ডিতে। এ-সময় বহুবার স্যারের বাসায় আমি গিয়েছি।

বর্তমানে যখন কাগজে যোগ দিলাম। দৈনিক বাংলাদেশের খবরের সম্পাদকীয় পাতা দেখছি। তখন পত্রিকায় পাতায় কলাম লেখার জন্য তাঁর ছাত্রের পুত্র- সেই প্রগাঢ় দাবি নিয়ে স্যারের সামনে দাঁড়ালাম। স্যার আমাকে বিমুখ করেননি। বরং এই অধিকারও দিয়েছেন, যদি কোথায় পত্রিকার নীতিমালা অনুযায়ী পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়, আমি যেন করে নেই। এমনকি, কখনো কখনো তাঁর লেখার শিরোনামও আমাকে দিয়ে দিতে বলেছেন। এই যে অগাধ বিশ্বাস তিনি আমাকে করেছিলেন, আমি মনে করি, নিশ্চয়ই তাঁর ছাত্রের ছেলে বিধায় তিনি আমার ওপর ওই বিশ্বাসটুকু রেখেছিলেন। আর আমার পিতারও ইচ্ছা ছিল আমি যেন আমার সম্পাদিত ছোটকাগজ ‘লেখমালা’য় তাঁর শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নেই। যেমনটি নিয়েছিলাম আনিসুজ্জামান স্যারের।

অথচ আজ স্যার স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি। কারো সঙ্গেই দেখা করেন না, ফোনও ধরেন না খুব প্রয়োজন না হলে। করোনা মহামারী তাঁকে মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। গত বছরের তথা ২০২০-এর শুরুতেই যখন বাংলাদেশে ‘কোভিড ১৯’ জেঁকে বসেছিল, তখন এতে আক্রান্ত হয়ে স্যারের ছোট ভাই ও ভ্রাতৃবধূ দুজনেই মারা যান। সেই শোক স্যারকে বিপর্যস্ত করেছে। ওই তখন আমার মায়েরও মৃত্যু আমাকে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য করে। দীর্ঘ চার/পাঁচ মাস সুদূর মাগুরায় অবস্থান করে ঢাকায় ফিরলাম। এর মাত্র দুই/তিন মাসের মাথায় পিতাও চলে গেলেন আমাদেরকে ছেড়ে। তাঁকে সমাধিস্ত করে যখন সুস্থির হচ্ছি, তখন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর স্যারের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম টিএসসি সংলগ্ন উচ্চতর বিজ্ঞান ও সামাজিক গবেষণা কেন্দ্রে। ওখানে গিয়ে জানতে পারি স্যারের বর্তমান অবস্থার কথা। এরপর স্যারের সঙ্গে আমি দেখা করার কিংবা ফোনে কথা বলার চেষ্টা করিনি, এই কারণে যে, আমি তাঁকে আর কোনো মৃত্যু সংবাদ দিতে পারবো না। তিনি বরাবরের মতো অবধারিত ভাবে জিজ্ঞাসা করবেন, ‘তোমার আব্বা-মা কেমন আছেন’? আমি তাঁকে কীভাবে বলবো- তাঁরা আর এই ধরাধামে নেই! কিন্তু পিতার ইচ্ছানুযায়ী স্যারের সাক্ষাৎকার নেব বলে প্রশ্নপত্র তৈরি করে বসে আছি। জানি না, তাও সম্ভব হবে কিনা। আমার এই অনিচ্ছাকৃত অপরাধটুকু আপনি মার্জনা করবেন স্যার।