কলেজ রোডের জার্নাল-১৯ ॥ মামুন মুস্তাফা




বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ‘মুখর সাহিত্য সংগঠন’ আমার সাহিত্যকৃতির পথকে সহজ করে তোলে। এই সংগঠনটির সঙ্গে যখন সব সম্পর্ক ছিন্ন হয় তখনও আমি এর সাহিত্য সম্পাদক। মূলত আমরা যারা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম, তাদের দু’একজন বাদে প্রায় সবাই তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। এর প্রধান ছিলেন সাংস্কৃতিক কর্মী মান্নান মোহাম্মদ। তিনি আজ প্রয়াত। আর সে-সময় যিনি সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন, তিনি কবি আসাদ কাজল। পুরনো ঢাকার মানুষ। ওই সময়ে তিনি লিখতেন আসাদুজ্জামান কাজল নামে। তখন তার কবিতা ইত্তেফাকসহ অন্যান্য কাগজে ছাপা হতো। আমার লেখার উৎকর্ষতা হয়তো তারা বুঝেছিলেন, সে কারণে ওই সময়ের ‘মুখর’ কর্তৃপক্ষ আমাাকে সহ-সাহিত্য সম্পাদক হিশেবে নির্বাহী কমিটিতে কো-আপ্ট করে। এরও পরে আসাদ কাজল যখন ‘মুখর’ ছেড়ে দিলেন, তখন আমাকে পুরোপুরি সাহিত্য সম্পাদক করা হয়।

‘মুখর’ প্রতি সপ্তাহের ছুটির দিনে বিশেষত শুক্রবারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে সাহিত্য সভা করতো। মুখরের সদস্যরা কবিতা, গল্প, ছড়া পাঠ করতো, আর তার আলোচনা চলতো। বেশকিছু বিশেষ সাহিত্য সভাও আমরা করেছি গুলিস্তানের মহানগর পাঠাগারের মিলনায়তনে। তবে উল্লেখযোগ্য দুটি সাহিত্য অনুষ্ঠান আমাকে আজও তাড়িত করে। একটি টিএসসির ফাস্ট ফুডের দোকান ‘ডাস’ সংলগ্ন সড়কদ্বীপে করেছিলাম ‘শরৎকালীন কবিতা উৎসব’ এবং অন্যটি ‘মুখরের শততম সাহিত্য আসর’ বাংলামটর সংলগ্ন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের মিলনায়তনে। শরৎকালীন কবিতা উৎসবের অতিথিদের অন্যতম ছিলেন তৎকালীন জনকণ্ঠের সাহিত্য সম্পাদক কবি নাসির আহমেদ। আর মুখরের শততম সাহিত্য আসরের প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশের কবিতার বরপুত্র শামসুর রাহমান এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন। উল্লেখ্য ওই দুটো অনুষ্ঠানেরই উপস্থাপনার দায়িত্বে ছিলাম আমি।

এই দুটো অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে কবি নাসির আহমেদ ও কবি শামসুর রাহমানের সঙ্গে আমার একটি যোগসূত্র স্থাপন হয়। জনকণ্ঠে পরবর্তীতে আমি অনেক কবিতা লিখেছি। গদ্যের সংখ্যাও কম হবে না। নাসির ভাই (কবি নাসির আহমেদ) আমার কবিতা পছন্দ করেছিলেন। নাসির ভাই জনকণ্ঠ ছেড়ে যাবার পর তাঁর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ কম হতে থাকে। এরও পরে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে যোগ দিলে আমাদের যোগসূত্র কদাচিৎ মুঠোফোনে ছাড়া আর হয়ে ওঠেনি। আমার চতুর্থ কবিতাগ্রন্থ ‘এ আলোআঁধার আমার’-এর অধিকাংশ কবিতাই জনকণ্ঠে প্রকাশিত। আর এই কাব্যটি আমি উৎসর্গ করেছিলাম আমার তিন প্রিয় মানুষ কবি নাসির আহমেদ, কবি শিহাব সরকার ও কবি সৈয়দ হায়দারকে। অন্যদিকে শামসুর রাহমানের সঙ্গে আমার খুব যে সাক্ষাৎ বা কথাবার্তা হতো তা নয়। কেননা তখনও আমি ছাত্র এবং বরাবরই মুখচোরা, আড্ডাবাজহীন মানুষ। যে কারণে অনেক কবি-লেখকদের সঙ্গে আজও আমার পরিচয় হয়ে ওঠেনি। তবে শামসুর রাহমানের বন্দী শিবির থেকে ও নিজ বাসভূমে কাব্যদুটি আমাকে অনুপ্রাণিত করে, আমার ভালোলাগার কাব্য। এই দুটো কাব্য নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্যপাতায় নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ লিখলে তা কবি শামসুর রাহমানের নজরে আসে। তিনি তখন আমার খোঁজ করেন এবং আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করি। সেই সময় মুখর সাহিত্য সংগঠনের প্রসঙ্গ তুললে তিনি সহসাই আমাকে শনাক্ত করতে পারেন। শামসুর রাহমান আমাকে একটি শুভেচ্ছাবার্তাও লিখে দিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্য তা আজ হারিয়ে ফেলেছি। পরবর্তীতে শামসুর রাহমানের সঙ্গে কদাচিৎ দেখা-সাক্ষাৎ করেছি, আমার কবিতা প্রসঙ্গেই তিনি বেশি আলোচনা করতেন। এবং আমি যে খুব কম লিখি ও প্রকাশ করি, এটিও তাঁর নজরে আসে। এটিরও ভালো ও মন্দ দিক সম্পর্কে তিনি আমাকে সজাগ করেছেন। ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট শামসুর রাহমানের শেষযাত্রায় আমি অংশ নিতে পেরেছি, এটি আমার বড় প্রাপ্তি। একই সঙ্গে ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক, প্রয়াত কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের হাত-ক্যামেরায় ধারণকৃত শামসুর রাহমানের ওপর যৎকিঞ্চিৎ কথাবার্তায় কবি নাসির আহমেদ, শামীম রেজা ও আমি উপস্থিত ছিলাম- এটিও আমার একটি বড় প্রাপ্তি।

কিন্তু এ কথা মানতে হবে যে, আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার গুটিকয়েক বন্ধু-বান্ধব আমার সাহিত্যকৃতির পাশে দাঁড়িয়েছিল বলে, আমি উৎসাহ পেয়েছিলাম সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যেতে। তাদেরই একজন সাজু, ছায়েদুর রহমান। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পরম বন্ধু। সাতক্ষীরার ছেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ও আমার অনেক দেখভাল করেছে। আজকে ও জেলা শিক্ষা অফিসার। বর্তমানে নড়াইলে আছে। সাজু টিউশনি করতো, বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীন ও একটি মেয়েকে পড়াতো, নাম তামান্না। এই তামান্না তখন নিতান্তই বালিকা। প্রাইমারি লেভেল থেকে শুরু করে নবম শ্রেণি পর্যন্ত সাজু ওকে পড়িয়েছে। সাজু ওকে আমার লেখালেখির গল্প বলতো। মাঝে মাঝে আমার কবিতা শোনাতো। মেয়েটি ধীরে ধীরে আমার কবিতার প্রতি আকৃষ্ট হলো। আমার সঙ্গে দেখা করতে সে একবার বিশ্ববিদ্যালয়ে চলেও এলো তার ছোট খালাকে সঙ্গে করে। আমি দু’একবার তামান্নার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি। সাজুর কাছেই শুনেছি টেলিফোনে আমার কণ্ঠস্বর অনেক সুন্দর লাগে বলে মন্তব্য করেছে তামান্না। বালিকা থেকে সদ্য কিশোরী হয়ে ওঠা মেয়েটি অনেক স্বপ্ন দেখেছিল হয়তো। ধীরে ধীরে স্বপ্নেরা ডানা মেলছে। প্রকৃতির গাঢ় লাল রঙের মতো শ্যামলবরণ মেয়েটিরও প্রচ্ছদ রঙিন হয়ে উঠছে। সেই তখন চাকরিসূত্রে তামান্নার বাবা-মা সুদূর মধ্যপ্রাচ্যে। একটি উন্নয়নকামী রাষ্ট্রের সংকটময় রাজধানী ঢাকার রায়েরবাজারে খালার সঙ্গে থাকে তামান্না আর তার ছোট দুই ভাই। পাওয়া না পাওয়ার অনেক চরিতার্থতা মনের ভেতরে গুমরে মরে। কিন্তু একজন বালিকার অবুঝ মনের খামখেয়ালিকে আমি কিংবা আমার বন্ধু পরিণত মানুষের মতোই সামাল দিতে সক্ষম হয়েছিলাম। তামান্না এখন সংসারী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার। ওর স্বামীও সিএমএইচ-এর ডাক্তার। ওর বাবা-মাও এখন দেশেই থাকেন। তামান্নার ছোট দুই ভাই গ্রামীণ ফোনে চাকরি করে। তামান্না ভালো আছে ভাবতেই আমাদেরও ভালো লাগে। সাজুর সঙ্গে আজও ওর মাঝেমধ্যে কথা হয়।

আমার বাল্যসখা জাকিরের কথা পূর্বে বলেছি। জাকিরের পরে সাজু হয়ে উঠেছিল আমার হরিহর আত্মা। আজও সে সম্পর্ক অমলিন। ছাত্রাবস্থায় আমি ওর বাড়ি সাতক্ষীরায় কলারোয়া উপজেলার মুরারীকাটি গ্রামে অনেকবার গিয়েছি। সাজুও এসেছিল আমাদের বাগেরহাটের বাসায়। আব্বা তখন বাগেরহাটের সরকারি পি সি কলেজে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। সাজুর বিয়েতেও আমি গিয়েছি সাতক্ষীরায়। ওর বউও সরকারি স্কুলের শিক্ষিকা। বর্তমানে পোস্টিং সাতক্ষীরাতেই। সাজুর দুই মেয়ে ও এক ছেলে। কিন্তু অকস্মাৎ ওর বড় মেয়ের ২/১ দিনের জ্বরে সমস্ত দেহ অবশ হয়ে যায়। ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাত্র ৬/৭ বছর বয়সে মারা যায় মেয়েটি। আমি সে সময় ছিলাম। আমিও তখন পিতা। একজন পিতা হিশেবে সন্তানের মৃত্যু আমিও পরখ করেছি। আমার বন্ধুর ব্যথা, তার কষ্ট কত যন্ত্রণার কত দুঃসহ তা বলে বোঝানো যাবে না। প্রথম সন্তানের মৃত্যুর পর সাজুও পাল্টে গেছে অনেক। জীবনধারাই বদলে নিয়েছে সে। খোদাভীরু, ধর্মের প্রতি অনুরাগ তাকে অন্য সাজুতে পরিণত করেছে। মেয়ের মৃত্যুর সময় সাজু আমাকে বলেছিল, ‘আমার প্রতিটি দুঃসময়ে তুমি আমার পাশে ছিলে। আজও আমার এই কঠিন মুহূর্তে তুমিই আমার হাত ধরেছ, আমাকে ছেড়ে যাওনি। তুমি শুধু আমাকে ঋণী করে চলেছ বন্ধু’। সেদিন আমাদের চোখে ছিল শুধু কান্না। ভাষা ছিল মূক। আজ বলি, বন্ধুর কাছে বন্ধুর কোনো ঋণ হয় না। ভালোবাসাটুকু সঞ্চয়ে রেখ। আগামীতেও আমরা যেন পরস্পরের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতে পারি।

সাজুর মতো করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর কোনো বন্ধু আমার গড়ে ওঠেনি। তবে বান্ধবীর সংখ্যা ছিল অনেক। বন্ধুরা বলে আমার নাকি ‘কন্যা রাশি’। পত্রিকার পাতায় রাশিফল বলে আমার ‘কর্কট রাশি’। কোনো এক সময় কোনো একজন জ্যোতিষ আমর হাত দেখে বলেছিল আমি ‘কুম্ভ রাশি’র জাতক। কিন্তু যে রাশিরই আমি হই না কেন, বান্ধবীর সংখ্যা অনেক হলেও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রকৃত বান্ধবী হতে পেরেছে ক’জন। যে তিনজনের নাম করবো- তারা অবধারিত ভাবে বান্ধবী হয়ে উঠেছিল। পারুল, আইনুন এবং শিউলি সব স্বার্থপরতার উর্ধ্বে আমার বন্ধুই বটে। পারুল বিয়ে করেছে আমাদেরই সতীর্থ সমরকে। আইনুন আমাদের এক ইয়ার সিনিয়র বাংলা বিভাগের সবুজ ভাইকে প্রণয় থেকে পরিণয়ে আবদ্ধ করে। আর শিউলি এখন কানাডায় স্বামী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে ভালোই আছে। আমার এই তিনজন বান্ধবীই ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’ তা প্রমাণ করেছে। এদের মধ্যে শিউলি লেখালেখির সঙ্গে সম্পৃক্ত। সুদূর কানাডা থেকেও লেখা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রবাসী সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গেও তার যোগসূত্র নিবিড়। ‘শিউলি জাহান’ নামে লিখে চলেছে কবিতা, গদ্য। তার কবিতার বই আছে, লিখেছে আমার সম্পাদিত ছোটকাগজ লেখমালা’তেও।

কিন্তু এর বাইরেও আমার বন্ধু ছিল বাংলা বিভাগের ছাত্র সাজুরই বাল্যসখা রাজ্জাক। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সাজু, রাজ্জাক আর আমি অনেক মান-অভিমানে জড়িয়ে চলেছি গায়ে গা রেখে। সেই রাজ্জাক এখন সাতক্ষীরাতেই কলেজ শিক্ষক, ওর বউও শিক্ষিকা। রাজ্জাকের বিয়েতেও আমি বরযাত্রী ছিলাম। রাজ্জাকের প্রথম সন্তান, তার শিশু পুত্রের অকাল প্রয়াণ পৃথিবীর প্রতিটি অপাপবিদ্ধ জীবনকে করে তোলে বিপর্যস্ত। সাজু ও রাজ্জাক- দুই বন্ধুর পরিণতি, নিয়তি একই সুতোয় গাঁথা যেন! এও কি বিধাতার দান? যে সাইকেলের ঘূর্ণায়মান গতির সঙ্গে এগিয়ে গেছে আমাদের যুগপৎ জীবন; ওখানেই আটকে গেছে আবার ভবিতব্য! ওই ভবিতব্যের কাছে হারিয়ে ফেলেছি আমি রীতা আর জীনাতকে। ওরাও ছিল আমার অতি কাছের দু’জন বান্ধব। রীতা পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে পড়তো, আর জীনাত ছিল সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী। প্রতিদিনই আমাদের দেখা হতো ক্যাম্পাসে, প্রতিদিনই কথা।

আমরা কেউ অমিত-লাবণ্য ছিলাম না। অথবা শোভনলাল। আমরা কেউ হতে চাইনি দেবদাস-পার্বতী, সরযূ। মানুষ হিশেবে আমরা স্বার্থপরতার উর্ধ্বে উঠে পরস্পরকে ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছি। জীবনকে অনুভব করতে চেয়েছি। তাই বিশ্বাস ছিল আমাদের ভেতরে। ওই বিশ্বাসের রথে চড়ে শেষ পর্যন্ত আমরা যুগলবন্দি হেঁটে গেছি। মানুষই তো আশা জাগিয়ে রাখে, স্বপ্নভরা দৃষ্টি ছড়িয়ে দেয় বিশ্বসমাজে। উত্তরণের এ এক আশ্চর্য শক্তি। আর তাই হাজারো দহনের মধ্যে; একদিকে উজ্জীবন, অন্যদিকে বিষেভরা নাগরিক জীবনের মধ্যে প্রবাহিত আমাদের অমৃতের স্রোতস্বতী। দাহ, ব্যথা, অগ্নিদগ্ধ- সভ্যতার এই সমস্ত গরল ও যন্ত্রণার নিবিড় উপলব্ধি পাঠ করি, আর আবিষ্কার করি আমার কেউ-ই শেষ পর্যন্ত মিথ্যে হয়ে যাইনি- এই স্বল্পায়ু জীবনের অনুধ্যানে।