কলেজ রোডের জার্নাল-২০ ॥ মামুন মুস্তাফা




১৯৯৪ সালের অক্টোবরের কথা বলছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী আমরা। শিক্ষা সফরে গেলাম পাকিস্তান ও নেপাল। তখন ভারতে প্লেগ মহামারী দেখা দেওয়ায় আমাদের ভারত সফর বাতিল করতে হয়। করাচী এয়ারপোর্টে পা রাখলাম অক্টোবরের ২১ তারিখ। আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানালেন করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপক এবং সিন্ধু সরকারের একজন প্রটোকল অফিসার। করাচীতে তখন এমকিউএম ও পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে বিরোধ চলছিল। তাই যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আমাদের সঙ্গে সবসময় থাকতো পুলিশ ফোর্স। সেই সিকিউরিটির ভেতরে আমরা প্রথমে গেলাম পাক-ভারত উপমহাদেশের অন্যতম রাজনীতিক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সমাধিতে। সেখানে দেখলাম সেনাবাহিনীর ৪ জন সদস্য ৫ মিনিট পরপর বাঁশি বাজিয়ে তাদের জায়গা বদল করে স্যালুটের মাধ্যমে তাদের জাতির পিতাকে সম্মান জানাচ্ছে।

এখান থেকে বেরিয়ে আমরা সোজা চলে এলাম ক্লিফটন সি-বীচে। তখন সন্ধ্যা ঘুরে গেছে। রাতের সমুদ্র দর্শন রাতের আঁধারেই ঢাকা পড়ে গেল। ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। করাচীর আবহাওয়ায় তখন দিনে গরম, সন্ধ্যা হতে হতেই ঠাণ্ডার পরশ বুলিয়ে দিয়ে যায়। সেই আলোআঁধারির ঠাণ্ডা সমুদ্রজলে পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়েছিল পারুল। তখন রাধিকার ঘনতনুশ্রী তার চিবুকে দুলে ওঠে। বেদনায় ভরা সারা দেহ যেন বলে- ‘তুমি যদি রাধা হতে শ্যাম’। কিন্তু সে ছিল ছবির কথা। কল্পনায় ফিরে আসে জাতীয় কবি নজরুল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সেই সফল সৈনিক ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়ে বসত গেড়েছিলেন এই করাচীতে। তাঁর রিক্তের বেদন গল্পগ্রন্থ, বাঁধনহারা পত্রপোন্যাস সৈনিক জীবনেরই আখ্যান। বাউণ্ডলের আত্মকাহিনী’র সেই ‘বাওয়াটে যুবক’, ঝিলম নদীর তীরের ‘মেহের নিগার’ কিংবা রিক্তের বেদন গল্পের বেদুঈন যুবতী ‘গুল’- তারা আজ কোথায়? ওই প্রতিকৃতি যেন কিছু সময়ের জন্য সমুদ্রের লোনাজলে পা ডুবিয়ে দাঁড়ানো পারুলের শান্ত চেহারায় ধরা পড়ে। আমার অনুসন্ধিৎসু চোখ, পিপাসার্ত মন করাচীর প্রশস্ত সড়কের বক্ষ চিরে চিরে ‘মেহেরনিগার’, ‘গুল’ কিংবা হাস্নাহেনা’র ‘হেনা’- ওদেরকেই খুঁজে ফেরে।

শিল্পসাহিত্যের ওইসব কালজয়ী চরিত্রগুলো করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভেতরে আবিষ্কারের চেষ্টা করলাম। আবদা, ফারজানা, মোস্তাক, মোশাররফ এদেরই প্রতিভূ যেন। করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রী ফারজানা। সবেমাত্র তার বিয়ে হয়েছে। দেহ থেকে হলুদগন্ধ যায়নি এখনো। ঠিকানা জানতেই সে বললো, ‘তুমি আগে লিখো না। আমিই প্রথম তোমাকে লিখবো’। কারণ তার স্বামী যদি কিছু মনে করে, সেই ভয় ছিল তার। আমি বললাম, ‘তেমন কিছু হলে তুমি আমার কাছে চলে এসো’। ফারজানা হেসে দিয়ে বললো, ‘তোমরা খুব উদার, খোলামেলা। তোমাদের বন্ধুদের সঙ্গে তোমাদের সম্পর্ক খুব চমৎকার’। ওরই সতীর্থ আবদা তখন আমার অন্য বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ জমিয়েছে। আমি তাকে ডেকে বললাম, ‘আবদা, আই মিস ইউ’। আবদা ত্রস্ত পায়ে আমার কাছে এসে বললো, ‘আই লাভ ইউ ডার্লিং’। আমাদের এইসব ছোট ছোট হাসিঠাট্টা আমাদেরকে হৃদয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করলো সহসাই। ফারজানা উর্দুতে আবদাকে জানালো, ‘ মামুন কিন্তু আমাকেও প্রেম নিবেদন করেছে আবদা- সাবধান’। তখন আমার বান্ধবী পারুল বললো, ‘কবিরা এমনই হয়’। সেই প্রথম করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে আমার কবিখ্যাতি চাউর হলো।

২২ অক্টোবর রাতে করাচী থেকে পাঞ্জাবের উদ্দেশে ট্রেনে চড়লাম। দীর্ঘ ২৬ ঘন্টার ট্রেন যাত্রা শেষে পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে পৌঁছলাম ২৩ অক্টোবর রাত ১১ টায়। এই দীর্ঘ যাত্রায় বই পড়ার মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। মাঝে-মধ্যে বান্ধবীদের কণ্ঠে রবীন্দ্র-নজরুলের গান শোনা, আর শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. আব্দুল ওদুদ ভূঁইয়ার আহ্বানে আমাকে কবিতা আবৃত্তি করতে হতো।

১৯৪০ সালে অবিভক্ত ভারতবর্ষে লাহোরের যে স্থানটিতে বসে বাংলার বাঘ এ কে ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব করেছিলেন, সেখানে পাকিস্তান প্রস্তাব নামে একটি লাহোর মনুমেন্ট দাঁড়িয়ে আছে। মনুমেন্টের দেয়ালে বাংলা, ইংরেজি ও উর্দুতে লেখা আছে সেদিনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। যা দেখে নিজের ভেতরেই শিহরণ জাগলো। এরপরই আমরা পাঞ্চাব বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাই। সেখানে আবিষ্কার করি ‘সাজনা’কে। কোমল, স্নিগ্ধ শান্ত দীঘির স্থির জল সে। আমার সতীর্থ পার্থর মতে, ‘সাজনাকে নিয়ে গ্রন্থ লেখা চলে, কিন্তু সব কথা বলা যায় না’। সত্যিই কি তাই? সাজনার রূপের মায়াজালে নির্বাক হতে হয় ঠিকই। কিন্তু সেই কমনীয়তা সন্ধ্যার গাঢ় রঙ মুছে দিয়ে জীবনের কথা বলতেও তো প্রস্তুত। সাজনার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল আমার। কিন্তু সবকিছু কি বলা সম্ভব হয়েছিল? সাজনাই তো চেয়েছিল কিছু না বলা কথা না-ই বলা থাক। এরপর লাহোরেই ব্রিটিশ রাজনীতির নীল দংশনে যেমন সম্রাট জাহাঙ্গীর আর সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের সমাধি হয়েছে বিভক্ত; তেমনি দূরাগত সানাইয়ের সুরে যবনিকা ঘটলো আমাদের নীরব বন্ধুত্বের।

লাহোর দুর্গ মোঘল সাম্রাজ্যের এক সমৃদ্ধ কীর্তি। যার অধিকাংশ তৈরি করেছেন সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহান। এর ভেতরের শীষমহল, ঠাণ্ডাঘর, অতিথিঘর অন্যতম নিদর্শন। শালিমার গার্ডেন আরেক ইতিহাস। কথিত যে, মোঘল সম্রাট আকবর যুবরাজ সেলিমের প্রেম ও প্রেমিকা বাঁদীকন্যা রওশন আরাকে মেনে নিতে পারেননি। আর তাই রওশন আরাকে সম্রাট আকবর জীবন্ত সমাধি দিয়েছিলেন। ওই রওশন আরাই হলেন সেলুলয়েডের ফিতায় ‘আনারকলি’। জনশ্রুতি আছে, আনারকলির জীবন্ত সমাধিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে পাকিস্তানে আজকের শালিমার গার্ডেন। এর বৈশিষ্ট্য হলো প্রাণী জগতের জন্ম, বয়োবৃদ্ধি এবং মৃত্যু- এই তিনটি বিষয়কে বোঝানো হয়েছে এখানে গড়ে ওঠা নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজির মাধ্যমে। সত্য হোক আর মিথ্যা হোক, তবু এক অদৃশ্য শক্তির হাতছানিতে যুবরাজ সেলিম অর্থাৎ সম্রাট জাহাঙ্গীর বারবার ফিরে এসেছেন এখানে, এই লাহোরে। প্রেমিক কবি কাজী নজরুল ইসলাম যুবরাজ সেলিমের অব্যক্ত যন্ত্রণা নিজেই ধারণ করেছিলেন, পৃথিবীর সমস্ত রূপরসগন্ধ ঢেলে তাই তিনি বলেছিলেন- ‘জীবন্ত সমাধির বিগলিত পাষাণে/আজিও প্রেম-যমুনার ঢেউ ওঠে উথলি/আনার কলি, আনার কলি’। ঠিক তেমনি করে দপ করে নিভে গেল সাজনা লাহোরের জীবন ও জীবিকাজটে।

লাহোর থেকে আমরা রাওয়ালপিন্ডি, ইসলামাবাদ, পেশোয়ার, খাইবার পাস, মারী, তক্ষশীলা প্রভৃতি স্থানে নোঙর ফেললাম। দেখলাম ৫০ বছর আগের একই দেশের পশ্চিম প্রান্ত। কীভাবে তারা বিভক্ত হলো। কেনো আমাদের ভাগ হওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। প্রশ্নের উত্তর করাচী থেকে লাহোর আসার পথে ট্রেনে পরিচয় হওয়া এক যুবক (আজ আর নাম মনে নেই বলে দুঃখিত) দিয়ে দিল। ছেলেটি লাহোর যাচ্ছে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষা দিতে। সে জানায়, এখনো তারা বঞ্চিত, অবহেলিত। পাঞ্জাব মনে করে, তারাই পাকিস্তানের কর্তামুণ্ডের অধিকারী। অন্যান্য প্রদেশ তাদের তাঁবেদার। সুতরাং সিন্ধু, বেলুচিস্তান- সব প্রদেশই এখনও বঞ্চনার শিকার। যুবকটি আরও বলে, তোমাদের মতো ১২০০ মাইলের ব্যবধানে এসব প্রদেশের অবস্থান হলে এগুলোও ভাগ হয়ে যেত। শুধু একটিই ভূখণ্ড বলে টিকে আছে। কত নির্জলা সত্য এ মন্তব্য। ভাবতেই অবাক লাগে। এই তক্ষশীলাতেই দাঁড়িয়ে মহাবীর আলেকজান্ডার বলতে পেরেছিলেন, ‘সত্যি সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!’

ফিরে এলাম আবারো করাচী। কেননা এখান থেকেই যেতে হবে হিমালয়ের দেশ নেপালে। লাহোর থেকে করাচী ফেরার পথে শালিমার ট্রেনে লিখলাম স্বদেশের টানে কবিতা ‘শুধু তুমি’। কবিতার নামকরণ করেছিলেন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. আব্দুল ওদুদ ভুঁইয়া। পরবর্তীতে কবিতাটি দৈনিক মাতৃভূমিতে প্রকাশ হয় : ‘তোমাকে সম্পূর্ণ ভুলবার আগে/আমি তোমাকে স্মরণ করি।/আমার নিদ্রা চোখের পাতায়/শপথ করে তোমাকে ঘিরে।/ঝিলমের তীর থেকে/আমাকে ফিরে যেতে হয়/ধানসিঁড়ি কীর্তনখোলা যমুনার কাছে/আকণ্ঠ পিপাসা মেটাতে/…আমার স্বেচ্ছায় এ নির্বাসিত জীবন/তোমাকে ভোলার জন্য নয়/আরও নিবিড় করে পাবো বলে/তোমাকে ধারণ করি আমার অস্থিমজ্জায়।/জীবন উন্মুখ এখন তোমাকে ঘিরে/মৃত্যু উৎসব কামনায়ও শুধু তুমি’।

তখন সন্ধ্যা নামছে। করাচীর লু হাওয়া শীতল হচ্ছে। বাড়ি ফিরছে আরব সাগরের তীর হতে বালিহাঁস। পৃথিবীর এ প্রান্তে তখন বিশ্বমানবের সুখ-দুঃখ বুনে চলেছে ডন, জিও নিউজ…। শুধু একটি চিরকুট পৌঁছে গেল হাতে। আবদা, ফারজানা, মোস্তাক, মোশাররফ খেলা করে ছোট দুই স্তবকে। যেমন বলেছিল ঝিলমের তীর থেকে নজরুলের হেনা, মেহের নিগার- “হে ক্ষুধিত বন্ধু মোর, তৃষিত জলধি,/এত জল বুকে তব, তবু নাই তৃষার অবধি!” তেমনি আবদা আমার কীর্তনখোলায় ঢেউ দেয়, সাজনার স্নিগ্ধ তনুতে খেলা করে রাধিকার যমুনা, আর ফারজানা বলে- “দুই যুগ পরে এসে দেখবে ফ্রেম খসে পড়ে গেছে/ভেতরের ছবি নেই, আরো দেখবে সিঁড়ি ফেটে চৌচির।/শোবার ঘর থেকে শূন্যতা এসে ডাক দেবে, কণ্ঠস্বর/চিনলেও তাকে আর ভালো লাগবে না।…”

তখনও হাতের মুঠোও চিরকুট। করাচীর সন্ধ্যায় হু হু করে বইছে ঠাণ্ডা বাতাস। দূরে আরো দূরে নীল গগনকে ব্যবচ্ছেদ করে উড়ে চলে ‘হায় চিল, সোনালী ডানার চিল’। খোলা বারান্দায় দুচোখ মেলে দিয়েছি সেই ধূসর প্রকৃতিতে। চিরকুটের উত্তর মেলে ধরেছি মেঘহীন আকাশের শূন্য প্রান্তে- “যতদূর থাকো ফের দেখা হবে। কেননা মানুষ/যদিও বিরহকামী, কিন্তু তার মিলনই মৌলিক।/মিলে যায়-পৃথিবী আকাশ আলো একদিন মেলে”।