কলেজ রোডের জার্নাল-২১ ॥ মামুন মুস্তাফা



পূর্ণদৈর্ঘ বাংলা ছবির মতো তিন ঘণ্টা পাকিস্তান এয়ারে ভ্রমণের পর সন্ধ্যা ৭টায় নামলাম নেপালের ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে। এ-সময় নেপালজুড়ে দেওয়ালি উৎসব চলছিল এবং সবকিছু বন্ধ থাকায় আমরা কোথাও যোগাযোগ ছাড়াই চলে আসি। ফলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা নিজেদেরই করে নিতে হয়। ফলশ্রুতিতে একটি হোটেলে আমাদের সবার সংকুলান না হওয়ায় দুটি হোটেলকে আমাদের ঠিকানা করি।

হিমালয়ের দেশ, কাঞ্চনজংঘার দেশ নেপাল। স্বভাবতই এখানে পর্যটকদের আনাগোনা তুলনামূলক বেশি। ফলে এখানকার বাজারদর খুব চড়া। উপরন্তু নেপালের বাজার দখল করে আছে ভারতীয়রা। এখানে নেপালের রুপির পাশাপাশি ভারতীয় রুপিও চলে। এয়ারপোর্টেও ভারতীয়দের জন্যে আলাদা কাউন্টার, আলাদা লাইনের ব্যবস্থা করা হয়। অবশ্য এ-সবই ১৯৯৪-এর কথা। বর্তমান চিত্র ভিন্নও হতে পারে। নেপাল চলনে-বলনে পুরোপুরি পাশ্চাত্যের অনুরূপ। সবই খোলামেলা। আপনাকে এসে জিজ্ঞেস করবে গার্ল ফ্রেন্ড লাগবে কিনা? আমরাও বলতাম, কত গার্লফ্রেন্ড নিয়ে এসেছি, এতে চলবে না? এরই মাঝে আমরা কয়েকজন বন্ধু রাশান ভোদকার স্বাদ নিলাম। ইচ্ছাকৃত মাতলামির অভিনয়ে বন্ধু-বান্ধবীদের মাঝে মান-অভিমানের পাল্লাটা ভারী করে তুলেছিল। কিন্তু এ-সবই মজার টুকরো টুকরো ঘটনা।

কাঠমুন্ডুতে দেখলাম কিছু ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধমন্দির, রাজা বীরেন্দ্র বিক্রম শাহদেবের পূর্বপুরুষের বসতভিটা, সার্ক সচিবালয়। কিন্তু মনে দাগ কেটে আছে পোখারা জেলা শহরের কথা। পোখারায় যাবার পথে ভোররাত ৪টা থেকে অপেক্ষা করে আছি নগরকোট নামক আরেকটি জেলা শহরে। এখান থেকে সূর্যোদয় দেখবো। দিনটি ১৯৯৪-এর ৬ নভেম্বর। নেপালে তখন প্রচণ্ড শীত। আমরা এক-একজন তিন-চারটি করে গরম কাপড়ের ওম নিচ্ছি। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস কাঁপিয়ে দিচ্ছে অন্তরাত্মা। তবু তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করছি সূর্যদেবের উদিত হওয়ার আশায়। তখন সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘প্রার্থী’ কবিতা মনে পড়ে গেল- “হে সূর্য! শীতের সূর্য!/ হিমশীতল সুদীর্ঘ রাত তোমার প্রতীক্ষায়/ আমরা থাকি/ যেমন প্রতীক্ষা করে থাকে কৃষকদের চঞ্চল চোখ/ধানকাটার রোমাঞ্চকর দিনগুলির জন্যে।”

নগরকোটে সূর্যোদয় দেখে ৬ ঘন্টা যাত্রা শেষে সন্ধ্যার কিছু আগে পোখারায় পৌঁছি। এই পোখারায় দেখি সূর্যাস্ত। সেও এক অভাবনীয় দৃশ্য। পোখারা এক নয়নাভিরাম জেলা শহর। না গ্রাম না শহর। এ যেন এক উপশহরের ইতিকথা। বলা যায় গজেন্দ্র মিত্রের ‘কলকাতার কাছেই’ কিংবা ‘শহরের উপকণ্ঠে’। এখানকার দোকানগুলো বাঁশ আর কঞ্চির তৈরি। বাংলার প্রতি গ্রামে আমাদের দাদী-নানী কিংবা মা-চাচীরা যেমন আচারের বয়াম শিকায় করে রোদে দিয়ে থাকেন; তেমনি এখানকার দোকানগুলোতে শিকায় ঝুলছে পাকা আম, পেঁপেসহ নানা জাতের ফল-ফলাদি। এখানে চীনা রেস্তোঁরাগুলোও মুলিবাঁশের তৈরি। আমরা চার বন্ধু- পার্থ, সোহেল, সেলিম ও আমি বাঙালি খাবারের খোঁজে নেমে পড়লাম। এখানেই পেয়ে গেলাম ‘মায়া’কে।

মাঝবয়সী বাবা-মা আর অষ্টাদশী মায়া পর্যটকদের জন্য রান্না করে খাওয়ায়। একেবারেই ঘরোয়া পরিবেশে। এটাই ওদের উপার্জনের পথ। ছোট্ট একটি ঘর, তার বারান্দায় বসে খাওয়া-দাওয়া করি। এই পরিবারটি অতি যত্নের সঙ্গে পুঁইশাক, ডাল, কৈ মাছ, ঘরে তৈরি আচার দিয়ে আমাদের খাবার পরিবেশন করতো। আমরা যেন ওদেরই ঘরের সন্তান হয়ে গিয়েছিলাম। বিশেষত মায়ার অতিথি-প্রীতি আমাদেরকে মুগ্ধ করেছিল। তার সে ভালোবাসায় কোন কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল নিখাঁদ ভালোলাগার অনুভূতি। মায়াকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম- ‘তোমার নামের অর্থ জানো?’ উত্তরে সে সলজ্জ হেসে বলেছিল, ‘প্রেম’। আবারও বললাম, ‘প্রেম করেছো কখনো?’ আরও লাজরাঙা হয়ে মায়া যে চতুর উত্তর করলো, তা ছিল এক সরল গ্রামীণ বালিকার সহজ স্বীকারোক্তি, ‘একটু একটু করে প্রেমে পড়েছি’। তার সেই আকাশ ছোঁয়া প্রেমের কাছে আমরা চার বন্ধু ঋণী। অথচ শত চেষ্টা করেও মায়ার একটি ছবি তোলা গেল না। আমরা মায়ার বাড়ির নাম দিলাম ‘মায়া কা হোটেল’। মায়া এখন কোথায় আছে? কেমন আছে? জানি না। জানা সম্ভবও নয়। জানি না অতিথি আপ্যায়ন করে মায়ার দৈন্য ঘুচেছিল কিনা। কিন্তু আজও মনে মনে খুব করে চাই- মায়ার একটি সংসার হোক। সুখ নয় সেখানে শান্তি ঝরুক। স্বপ্নভরা দিন আসুক, সোহাগী রাত হোক। মায়াময় জীবন সে পাক।

কাঠমুন্ডুর ‘রধিঘর’-এর জলসার ভেতরে নেপালে শেষ রজনী তার যবনিকা আঁকলো। রধিঘর- এই বারে আমরা চার বন্ধু খেতাম- আমি, সেলিম, সোহেল ও পার্থ। পরে অবশ্য অনেকেই যোগ দিয়েছিল। রধিঘরের মালিক পশ্চিমবঙ্গে পড়ালেখা করায় বাংলা জানতেন। আমাদের বিদায়ী সন্ধ্যায় তিনি তাৎক্ষণিক এক পার্টির আয়োজন করেন। সেখানে আরও উপস্থিত ছিল কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ওলন্দাজ, অস্ট্রিয়ার পর্যটক। বান্ধবী পারুল রবীন্দ্র সঙ্গীত পরিবেশন করে ‘পুরনো সেই দিনের কথা ভুলবি কিরে হায়’, সতীর্থ ইকবাল গায় ‘মনে পড়ে রুবি রায়’, আমার কণ্ঠে হৃদয়ের কবি আবুবকর সিদ্দিকের শপথের স্বর ‘আবার আমি ফিরে আসব/ তোমার অনন্ত সান্নিধ্যে’। প্রায় একটি মাস ধরে সার্ক দেশ ভ্রমণের পর্দা নামলো এই সন্ধ্যায়।

মনের শার্সিতে উঁকি দেয় করাচী, লাহোর, পেশোয়ার, পিন্ডি, মারী, ইসলামাবাদ, কাঠমুন্ডু, পোখারা। কখনো, আবদা, ফারজানা, সাজনা, মায়া। বাদ যায় না মোস্তাক, মোশাররফ। কেউ কি ফিরে আসে? একুশ শতকের মানুষ ক্রমশ হয়ে যাচ্ছে নাম-ঠিকানাহীন, দেশে দেশে যাযাবর। ডিজিটাল পদ্ধতিতে চুরি হয় প্রজাবর্গের মনের অধিকার- তাদের বেদনা, দুঃখ, কষ্ট, এমনকি স্বপ্ন। সেই দুঃস্বপ্নের মাঝে আমার স্বপ্নকে হারিয়ে নতুন সূর্যের আলোয় যখন মাথা উঁচু করে দাঁড়াই- দেখি একটাই পৃথিবী- সে আজ ‘হীরক রাজার দেশ’। আন্দামান নিকোবার, ময়না দ্বীপ, নিঝুম দ্বীপ- সবখানে ছায়া দীর্ঘ হয়। ‘আশা ও স্বপ্ন’ এবং ‘বিপ্লব ও বিপ্লবী’র সকল গল্প শেষে ওই প্রলম্বিত ছায়ার ভেতরে বেড়ে ওঠে যে মুখ, সে এক সম্পূর্ণ মানুষ। তখন কবির সাথে সাথে পৃথিবীর সকল মানব-অন্তর গেয়ে ওঠে, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’।

ওই সম্পর্কটুকু নির্ণয় শেষে ক্ষত্রিয় সময় ছুঁয়ে যায় সকালের উদিত সূর্য, অলস দুপুর, চিরধরা রোদ, বিকালের মৌনতা, আঁধারের চিবুক, এমনকি রাত্রির শরীর। সেখানে স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা শান্তি ও কল্যাণের আহ্বান ছাড়া আত্মহননের জটিল শব্দবন্ধ থাকে না। তখন এই মানুষের সঙ্গে পুনর্মিলন ঘটে তারই ভেতরের সত্তাসন্ধানী মানুষের। সেই মিলনে কোনো বিষাদ নেই। তাই রাত্রির ব্যুহ ভেদ করে উদিত সূর্যের উঠোনে আমি অন্য জীবনের এপিটাফ লিখি। সেখানে আমার সতীর্থরাই তো মুখ্য। বিদেশ বিভুঁইয়ে আত্মীয়জনহীন আমরা যারা আপন ও ঘনিষ্ঠ হওয়ার দুর্লভ মুহূর্তটুকু পেয়েছিলাম। আমার সেইসব বন্ধু- পারুল, আইনুন, শিউলি, সেলিম, পার্থ প্রধান চরিত্র এই জীবনাতিহাসের। আজ ওটুকুই সম্বল করে আগামীর পথ চলা।